শিকারি যখন শিকার

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত হয়েছে অনেক ছোট-বড় যুদ্ধ, গেরিলা হামলা ও সম্মুখ সমর। কিন্তু এসময় দেশের ভিতরে-বাইরে ঘটে গেছে জানা-অজানা নানা ঘটনা। একদিকে যখন মুক্তিবাহিনী প্রাণপণ লড়ে যাচ্ছে দেশ রক্ষার মহান সংগ্রামে, তখন আরেকটি চক্র একে প্রচার করছে ইসলাম রক্ষার জিহাদ হিসেবে। আবার আরেকদল চক্রান্ত করছে বাঙ্গালির সংগ্রামকে ঢেকে দিয়ে এটিকে একটি পাক-ভারত যুদ্ধে রূপ দিতে যেন সংগ্রামের প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়। তারা এটিকে ‘ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধ’ বলে চালিয়ে দেয়ার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল যেন যুদ্ধে হারলেও বাংলাদেশ স্বাধীন হতে না পারে। এই চক্রান্তেরই অংশ হয়ে রয়েছে অসংখ্য জানা-অজানা তথ্য। এমনই একটি ঘটনার নাম ‘দ্য গাজী অ্যাটাক’। যেটিকে বিবেচনা করা হয় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সর্বশেষ এবং সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত ঘটনা হিসেবে।

‘পিএনএস গাজী’ ছিল পাকিস্তান নৌবাহিনীর ব্যবহৃত অত্যাধুনিক সাবমেরিন। দক্ষিণ এশিয়ার নৌবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত সর্বপ্রথম সাবমেরিন ‘পিএনএস গাজী’ ছিল পাকিস্তানের শৌর্যবীর্যের প্রতীক ও চিরশত্রু ভারতের জন্য ভয়াবহ হুমকি। গাজীকে পাকিস্তান নেভী নৌবহরের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য রণতরী হিসেবে ‘ফ্লাগশিপ’ মর্যাদা প্রদান করে। ‘তড়িৎ-ডিজেল’ চালিত ডুবোজাহাজটি নিঃসন্দেহে তখনকার সময়ের অন্যতম সেরা যুদ্ধজাহাজ হিসেবে পরিচিত ছিল। ১৯৬৫ এর পাক-ভারত যুদ্ধে অসামান্য দক্ষতা প্রদর্শন করে গাজী অর্জন করে ‘সিতারা-ই-জুরাত’,  ‘তামঘা-ই-জুরাত’, প্রেসিডেন্ট পদক সহ মোট ১০ টি সামরিক সম্মান। ১৬০০ টন ওজনের ৯৫ মিটার দীর্ঘ ডুবোজাহাজটি টানা ৭৫ দিন ৪০০ ফুট গভীর পর্যন্ত ১১০০০ নটিক্যাল মাইল পরিভ্রমণে সক্ষম ছিল। পিএনএস গাজীর জন্ম ১৯৪৪ সালে, আমেরিকায়। ১৯৬৪ সালে সিকিউরিটি অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রাম এর আওতায় গাজীকে পাকিস্তানের কাছে হস্তান্তর করে কেনেডি প্রশাসন। আমেরিকার “ইউএসএস দিয়াবালো” এর নতুন নাম দেয়া হয় “পিএনএস গাজী”। গাজী শব্দের অর্থ ‘বীর’।

মুক্তিযুদ্ধের শেষভাগে যখন ‘ভারত-পাকিস্তান’ যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে তখন বাংলাদেশের বন্দর এলাকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এমতাবস্থায় ভারতীয় নৌবাহিনীর একমাত্র বিমানবাহী রণতরী ‘আইএনএস ভিক্রান্ত’ কে পূর্ব বঙ্গোপসাগরে মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয়। পাকিস্তান ইন্টেলিজেন্স এর কাছে খবরটি দৃষ্টিগোচর হবার পর ভিক্রান্তকে ঠেকানো আবশ্যক হয়ে পড়ে। কিন্তু বাংলাদেশ সীমানায় পাকিস্তান নেভীর যেসব যুদ্ধজাহাজ ছিল সেগুলো দিয়ে ভিক্রান্তকে ঠেকানো সম্ভব ছিল না। তাই তারা বাধ্য হয়ে গাজীকে প্রেরণ করে। তাছাড়া করাচী বন্দর থেকে পুরো আরবসাগর ঘুরে তিন হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে লক্ষ্যস্থানে পৌঁছার ক্ষেত্রে গাজীই ছিল সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য।

কমান্ডার জাফর মোহাম্মদ খানের নেতৃত্বে ৯২ জন নৌসেনার সমন্বয়ে ১৪ ই নভেম্বর গাজী যাত্রা শুরু করে ভিক্রান্ত এর অবস্থানকে লক্ষ্য করে। পাকিস্তান ইন্টেলিজেন্সের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ভিক্রান্তের সর্বশেষ অবস্থান ভারতীয় নেভাল ইস্টার্ন কমান্ড হেডকোয়ার্টার ঘাঁটি ‘বিশাখাপত্তম’। পিএনএস গাজী অগ্রসর হয় সেদিকে। লক্ষ্য আইএনএস ভিক্রান্তকে ডুবিয়ে বিশাখাপত্তম বন্দরের আশেপাশে মাইন ফেলে আসা, যেন কোন ভারতীয় যুদ্ধজাহাজ অগ্রসর হতে না পারে। কিন্তু গাজীর এই মিশন জেনে যায় ভারতীয় নেভাল ইন্টেলিজেন্স। তারা গাজী থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে পাঠানো একটি মেসেজ ইন্টারসেপ্ট করতে সমর্থ হয় যেখানে একপ্রকার লুব্রিক্যান্ট অয়েল এর কথা বলা হচ্ছে, যা কেবলমাত্র সাবমেরিন ও খনির শ্রমিকদের কাজে ব্যবহৃত হয়। এ থেকে তারা গাজীর আগমন সম্পর্কে নিশ্চিত হয়। কিন্তু কয়েকবার সার্চের পরেও এর অবস্থান নির্দিষ্ট করা যায়নি। আইএনএস ভিক্রান্তকে তাড়াতাড়ি বিশাখাপত্তম থেকে  সরিয়ে আন্দামানে নিয়ে যাওয়া হয় গাজীর চোখ ফাঁকি দিয়ে।

এদিকে ভারতীয় ইস্টার্ন নৌপ্রধান অ্যাডমিরাল কৃষ্ণন সিদ্ধান্ত নেন গাজীকে ফাঁদে ফেলে শিকারিকে শিকারে পরিণত করার। তিনি গাজীর কোড নেম দেন ‘কালীদেবী’। তারা এমন ভান করেন যেন ভিক্রান্ত তখনও বিশাখাপত্তমেই আছে। তিনি ভারতীয় নেভাল ডেস্ট্রয়ার ‘রাজপুত’ কে ভিক্রান্ত সেজে অভিনয়ের আদেশ দেন এবং সিকিউরিটি সাইলেন্স ভেঙে ভিক্রান্ত নাম ব্যবহার করে ভুয়া ম্যাসেজ দেন যেখানে একজন নৌসেনা তার অসুস্থ মায়ের খোঁজ খবর জানতে চাচ্ছে। ভুয়া মেসেজ দেন এই কারণে যেন ‘গাজী’ মেসেজটি ইন্টারসেপ্ট করে ‘ভিক্রান্ত’ এর অবস্থান বিশাখাপত্তম মনে করে। এদিকে ৩ রা ডিসেম্বর রাতে ইন্দিরা গান্ধী পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। রাজপুত মধ্যরাতে একটি অভিযানে বন্দর থেকে বের হয়ে আসছিল। রাজপুত ক্যাপ্টেন ঈন্দর সিং মাত্র আধা মাইল দূরে পানির মধ্যে অস্বাভাবিক আলোড়ন দেখতে পান। তার অভিজ্ঞ চোখ এটিকে সাবমেরিন বলে হুঁশিয়ারি দেয়। তিনি ঝুঁকি না নিয়ে দ্রুত ওই জায়গায় দুটি ডেপথ চার্জ ফেলে স্থান ত্যাগ করেন। প্রায় আধাঘণ্টা পর বিশাখাপত্তম উপকূলে প্রচণ্ড শব্দে বিস্ফোরণ হয়। বিস্ফোরণ এতটাই ভয়াবহ ছিল যে সমগ্র এলাকা কেঁপে ওঠে ও উপকূলীয় এলাকার বিভিন্ন বাসা-বাড়ির  জানালার কাঁচ ভেঙে যায়। তবে কেউই জানতো না আসলে কী হয়েছে। ২ দিন পর দুইজন জেলে সমুদ্রে পাওয়া কিছু উপকরণ (জাহাজের লগবই, লাইফ জ্যাকেট) দেখতে পেলে ভারতীয় নৌবাহিনী সেই স্থানে অভিযান চালায় এবং পিএনএস  গাজীর ধ্বংসাবশেষ দেখতে পায়। গাজীর ৯২ জন নৌসেনা সবারই মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। পতন হয় পাকিস্তান নেভীর অন্যতম সেরা যুদ্ধজাহাজের। যা ছিল বঙ্গোপসাগরে এখন পর্যন্ত একমাত্র সাবমেরিন ডুবি।

যদিও গাজী ধ্বংসের কৃতিত্ব পাকিস্তান কখনোই ভারতীয় নৌবাহিনীকে দেয়নি। বরং তারা ২০০০ সালে ‘পিএনএস গাজী’ নামে আরেকটি সাবমেরিন তাদের বহরে যুক্ত করে। তাদের দাবি পিএনএস গাজী অভ্যন্তরীণ বিস্ফোরণে ধ্বংস হয়, ভারতীয় ডেপথ চার্জে নয়। তারা দাবি করে সম্মুখভাগের টর্পেডো রুমের গোলযোগ অথবা নিজেদের ফেলা মাইনের আঘাত অথবা ব্যাটারি চার্জ হবার সময় হাইড্রোজেন বিস্ফোরণ অথবা ভারতীয়দের ফেলা ডেপথ চার্জের ওয়েভ শক এ মাইন বিস্ফোরণ কিংবা রাজপুত আক্রমণ ঠেকানোর সময় সমুদ্রতলের প্রতিক্রিয়ায় গাজী ধ্বংস হয়। যদিও রাজপুতের ডেপথ চার্জ ফেলার জায়গা ও গাজীর ধ্বংসাবশেষ একই স্থানে ছিল এবং গাজী থেকে উদ্ধার হওয়া ঘড়ির সময় ছিল রাত ১২ টা ১৫ মিনিট যা রাজপুতের ডেপথ চার্জ ফেলার সময়ের সাথে মিলে যায়। মজার ব্যাপার হলো এই গাজীই ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধে ভারতীয় যুদ্ধজাহাজ ‘আইএনএস ব্রহ্মপুত্র’ কে ডোবানোর দাবি করে যার কারণে গাজীকে করাচি বন্দরে বীরোচিত সংবর্ধনা দেওয়া হয়। যদিও সেই দাবি ছিল ভিত্তিহীন। কেননা সেইবার ব্রহ্মপুত্রের কোনো ক্ষতিই হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন নিজ খরচে গাজীকে উদ্ধার করতে চাইলেও ভারত অনুমতি দেয়নি।

তবে গাজী ধ্বংসের কারণ যাই হোক, গাজীর পতন যুদ্ধে নতুন মাত্রা যোগ করে। পাকিস্তান তাদের অনেক বড় শক্তি হারায়। ভারতীয় বিমানবাহী জাহাজ ‘ভিক্রান্ত’ বিনা বাধায় বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ করে এবং সেখান থেকে কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম বন্দরে প্রচুর বিমান হামলা চালায় তেমন কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই। যুদ্ধের মাত্র শেষ কয়েকদিনে পাকিস্তানের ছোট-বড় ২৪ টি জাহাজ ডুবিয়ে দেয় ভারতীয় নৌ-বাহিনী ও বাংলার নেভাল কমান্ডোরা। পিএনএস গাজীর পতন পাকিস্তানি বাহিনীর মনোবল ভেঙ্গে দেয়।  তারা আর কোন যুদ্ধজাহাজ পাঠাতে সাহস পায়নি। তাছাড়া গাজীর পতনে ভিক্রান্ত ও ভারতীয় নৌ-বাহিনী বঙ্গোপসাগরে একছত্র আধিপত্য বিস্তার করে। পাকিস্তানি হাই-অফিসিয়ালদের নৌপথে পাকিস্তান পালানোর পথ বন্ধ হয়ে যায়। তাছাড়া অন্যান্য দেশি-বিদেশি জাহাজ বঙ্গোপসাগরে ঢুকে পাকিস্তানকে সাহায্য করতে পিছপা হয়, একই সাথে পাকিস্তানিদের জাহাজের মাধ্যমে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। পাকিস্তানি বাহিনী বিপাকে পড়ে এবং আত্মসমর্পণের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়।

যদিও ইতিহাসের পাতায় গাজীর পতন এক অমীমাংসিত ঘটনা কিন্তু শিকারির শিকারে পরিণত হওয়া মুক্তিযুদ্ধে অনেকাংশে ভূমিকা রাখে।

তথ্যসূত্র-

১. উইকিপিডিয়া 

২. এডমিরাল এস এম নান্দা, ভারতীয় নৌবাহিনীর নেভাল স্টাফ প্রধান এর সাক্ষাৎকার

কমেন্ট করুন
শিক্ষার্থী | পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সেশনঃ ২০১৫-২০১৬

সায়েম শাফিন

সেশনঃ ২০১৫-২০১৬

0