প্রথমবার ভিডিয়ো বানিয়ে প্রথম হওয়া!

জীবন ছায়াপথে হাঁটতে হাঁটতে মানুষ কিছু নক্ষত্রের সাথে টোকা খায়। মানুষের জীবনের ছোট-বড় অর্জনগুলোকে নক্ষত্র বলা হলে খুব বেশি ভুল হবে না হয়তো বা। শুধু অর্জন না, কিছু মানুষ, কিছু আনকোড়া অভিজ্ঞতার নক্ষত্রও আজীবন মানসে আলো ছড়ায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যান বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর সেই নক্ষত্র জ্বলজ্বল করছে নাকি ফিকে হয়ে গেছে সেটাই বুঝতে পারছিলাম না। এমন সময়ই যেন দেবদূত হয়ে “কিইউএমএইচ স্ট্যাটিস্টিক্স ক্লাব” এর যাত্রা শুরু হলো, যেন পরিসংখ্যান নক্ষত্রের আলোর ছটায় আমার মত দিশেহারা মানুষেরা একটু স্বস্তি পায়।

প্রচন্ড উৎসুক হওয়ায় প্রায় প্রতিবার কিউএমএইচ স্ট্যাটিস্টিক্স ক্লাবের প্রতিযোগিতাগুলোতে অংশ নিলেও একবারও পুরষ্কার পাই নি। অবশ্য অংশগ্রহণের চেয়ে বড় পুরষ্কার আমার চোখে না থাকলেও ক্ষণিকের ভালো লাগা কিংবা অর্জনের ঝুলি খাঁ খাঁ করছিলো বলেই অপেক্ষা দীর্ঘ হচ্ছিলো। দীর্ঘ হচ্ছিলো অবিশ্বাসের বিশ্বাস করার দিনগুলি, একদিন হয়তো আসবে যেদিন কিউএমএইচসি থেকে আমার ঝুলিতেও একটু কিছু যুক্ত হবে।

ভীষণ ব্যস্ত জীবন দুম করে থমকে দেয় করোনা। ডিপার্টমেন্টের সাথে সকাল-দুপুর অনলাইন ক্লাস করা ছাড়া তেমন কোনো সম্পর্ক ছিলো না আমার। বন্ধুদের সাথে সেই প্রতিদিনকার চেনা মুহূর্ত, আড্ডা কোনোকিছুই আর এই লকডাউনে টিকে নেই। এমন সময় “বিশ্ব পরিসংখ্যান দিবস” উপলক্ষে কিউএমএইচসি কিছু প্রতিযোগিতা ছুড়ে দিলো শিক্ষার্থীদের মধ্যে।

দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী হওয়ায় ডেটা এনালাইসিস প্রতিযোগিতা আর ভিডিয়ো মেকিং প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের প্রথম কোটা পূর্ণ করে ফেললাম। প্রথমেই ভাবলাম ভিডিয়ো মেকিং যেহেতু কখনো করি নি, তাই সেটাতে ঝাঁপিয়ে পড়া খানিক বোকামি। তাই কোমড় বেঁধে ডেটা এনালাইসিসের জন্য মানুষ জোগাড় করতে লাগলাম। এমন সময় মুশফিক বললো, “ভিডিয়ো মেকিংয়ে নাম দিবি?” বললাম, “দেয়া যায় কিন্তু আমি তো ভিডিয়ো কখনো বানাই নাই।” মুশফিক বলল, “ওইটা আমার ব্যাপার। তুই টিমে আছিস কিনা বল।” আমি সবসময় বিশ্বাস করি সুযোগ পেলে সেটা হাতছাড়া করা উচিত না আর যত বেশি প্রতিযোগিতায় নাম দিব তত বেশি অর্জনের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। তাই সাত-পাঁচ না ভেবে লাফিয়ে পড়লাম ভিডিয়ো মেকিং প্রতিযোগিতায়ও। এরপর দল ভারী করার পালা। মুশফিক আর আমি মিলে মানুষ জোগাড় করতে করতে মোটমাট ছয় জনের একটা সৈন্যবহর তৈরি করে ফেললাম। মুশফিক, ঊর্মি, হুমায়ন, হিয়া আর রুহীকে সাথে নিয়ে কষতে বসলাম নীল নকশা, ভিডিয়ো মেকিং যুদ্ধে জেতার নীল নকশা।

তবে সৈন্যবহরের নিজেদের ভেতরকার যুদ্ধও খানিকটা কটমটে। প্রথমেই নাম নিয়ে ছোটখাটো যুদ্ধ। “অন্তিক অন্বয়” নাকি “হাই হোপ্‌স্‌”! আমি যুক্তির পর যুক্তি সাজিয়ে “অন্তিক অন্বয়” প্রতিষ্ঠা করতে চাইলেও “হাই হোপ্‌স্‌”-এর গ্রহণযোগ্যতা বেশি হওয়ার সুবাদে নাম হলো টিম হাই হো‌প্‌স্‌‌‌। সৈন্যবহরে দ্বিতীয় ঝড় আসলো ভিডিয়ো কোন ধাঁচের হবে এই নিয়ে। যেহেতু পরিসংখ্যান গুরুগম্ভীর তাই ফর্মাল-গুরুগম্ভীর একটা প্রেজেন্টেশনের গ্রহণযোগ্যতা বেশি পাবে বলেই মুশফিকের ধারণা ছিলো। কিন্তু আমার মন এতে সায় দিচ্ছিল না। কারণ গুরুগম্ভীর জিনিস আট মিনিট ধরে আমি নিজেই দেখব না। তবুও মাথায় কোনো আইডিয়া না থাকায় মুশফিকের নির্দেশনাই শুনছিলাম  আর ভাবছিলাম কী করা যায়। দুনিয়ার যত বিখ্যাত আইডিয়া বেশিরভাগই বোধ হয় স্বপ্নে নয়তো প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে জেনারেট হয়। এক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম নয়, প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে প্রকৃতি উল্টো সাড়া দিয়ে মাথায় আইডিয়াখানা টোকা দিয়ে গেলো! আইডিয়াটা হলো বন্ধুদের মধ্যে বিতর্ক মতন হবে, একদল পরিসংখ্যানের ব্যবহার নিয়ে বলবে আর আরেকদল পরিসংখ্যান নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা গুলোকে তুলে ধরবে। যেসব বিব্রতকর প্রশ্ন পরিসংখ্যানের সাথে জড়িত সবাইকে কমবেশি বিরক্ত করে, সেগুলো নিয়ে নাটক গোছের কিছু একটা করা যেতে পারে। সবাইকে বলতেই বাকি তিনজন সাদরে গ্রহণ করলেও বেঁকে বসলো মুশফিক আর রুহী৷ ওদের মনে হতে লাগলো বন্ধুদের মধ্যে আলাপচারিতার এই আইডিয়াটা হয়তো কাজী মোতাহার হোসেন ভবনের চার তলার মানুষদের তেমন একটা পছন্দ হবে না এবং আমরা যুদ্ধে হেরে যাবো। এত দ্বিধা-দ্বন্দ দূর করার জন্য জামী স্যারকে জিজ্ঞেস করলাম। জামী স্যারের কথা শুনে রুহী রাজি হলেও মুশফিককে রাজি করানো ছিলো দ্বিতীয় যুদ্ধের সবচেয়ে কঠিন এবং সময়সাপেক্ষ কাজ। পরের দিন মুশফিক ঠান্ডা মাথায় ভেবে রাজি হয়ে গেলো৷ আর যাত্রা শুরু হলো টিম হাই হোপ্‌স্‌-এর। ঠিক করা হলো যেসব ক্ষেত্রে পরিসংখ্যানের বিস্তার রয়েছে তার মধ্যে প্রধান পাঁচটিকে তুলে ধরা হবে। খেলাধুলা, বিজনেস এন্ড ইকোনমিকস, জলবায়ু পরিবর্তন, বায়োস্ট্যাটিস্টিক্স আর কৃষিতে পরিসংখ্যানের ব্যবহার এবং উপযোগিতা খুঁজতে নেমে পড়লো পাঁচজন।

এরপর খসড়া স্ক্রিপ্ট তৈরি করলাম। সবাই তাতে কিছু মাল-মশলা জুড়তেই বেশ একটা যুতসই স্ক্রিপ্ট তৈরি হয়ে গেলো। এবার সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং মুহুর্ত টিম হাই হোপ্‌সের। কেননা হুমায়ন ছাড়া প্রায় সবাই ক্যামেরার সামনে প্রথমবারের মত ভিডিয়ো বানাচ্ছি। মুশফিক সবাইকে দিকনির্দেশনা দিয়ে দিলো। ফ্যান বন্ধ করে, সুন্দর ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে পারলে বিছানা-চাদর নিয়ে ভিডিয়ো করা লাগবে। ক্যামেরা লেভেল করা আরেক চ্যালেঞ্জ, শেষমেশ দুইটা বই তার উপর জগ-গ্লাস দিয়ে কোনোরকম লেভেল করতে পেরেছিলাম। আর ওদিকে  হিয়ার ছোটভাই প্রথম ক্যামেরাম্যান হিসেবে তার যাত্রা শুরু করে। সবারই কমবেশি ক্যামেরা সামলানোর ঝামেলা হলেও শেষমেশ ভিডিয়ো করা হলো। স্ক্রিপ্ট ভুলে যাওয়ার খানিক বাতিক থাকলেও, সবাই আসলে প্রথম আধা মিনিটই ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে কথা বলেছি বাকিটা স্ক্রিপ্ট দেখে দেখে শুধু পড়ে গিয়েছিলাম কারণ সেখানে ইউটিউব থেকে কেটে কেটে মুশফিকের বানানো ভিডিয়ো দেখানো হয়েছিলো, তাই হিয়া আর রুহী ছাড়া কারোরই তেমন স্ক্রিপ্ট মুখস্ত করার ঝামেলা ছিলো না। তবুও ফ্যান বন্ধ করে একেকজন ঘেমে নেয়ে একাকার, একের পর এক শ্যুট করেছে নিখুঁত হওয়ার জন্য। প্রত্যেকের নির্দিষ্ট অংশটুকু ছাড়াও একটা এক্সট্রা ভিডিয়ো শ্যুট করতে হয়েছিলো৷ এক মিনিটের একটা এক্সপ্রেশন ভিডিয়ো, এটা করতে গিয়ে শুধু শুধুই হাসা কিংবা অস্বাভাবিকের স্বাভাবিক থাকা যে কতটা কঠিন সেটা ছয়জনই হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলাম। রুহী নাকি হিয়াকে সবসময় বলতো, “তুই তো মাশাল্লাহ ভালো নাটক করতে পারিস।” সেই নাটক করার ক্ষমতা যাচাই করতেই হিয়ার ভিডিয়ো মেকিংয়ে আসা। আর হুমায়নের ছোটকাল থেকে সালমান খান হওয়ার ইচ্ছা ছিলো। বলিউড বাদশাহ না হতে পারলেও এই ভিডিয়ো মেকিংয়ের খাতিরে ছোটখাটো স্ট্যাটিস্টিক্স বাদশাহ হতে পেরেছে সে তা বলাই বাহুল্য। আর ঊর্মি, মুশফিক, রূহী নেহায়েতই উৎসাহের ঠেলায় ভিডিয়ো মেকিংয়ে ঝাপ দিয়েছিলো। সবার ভিডিয়ো বানানো শেষ হলে মুশফিকের কাছে জড়ো করা হলো। ভিডিয়োগুলো কেটেকুটে জোড়া লাগিয়ে চারদিন ঘুম-খাওয়া বাদ্দিয়ে ঠায় বসে থেকে শেষমেশ দুর্দান্ত একটা ভিডিয়ো বানালো মুশফিক। কিন্তু শব্দ নিয়ে কিছু ঝামেলা হয়ে গেলো। সেটাকে ঠিক করতে নতুন একটা সফটওয়্যার ডাউনলোড করে ইউটিউব টিউটোরিয়াল দেখে শিখে এরপর ঠিকঠাক করতে হয়েছিলো মুশফিকের। পুরো ভিডিয়োটা বানানো শেষ হওয়ার পর  ছয়জনই বারবার দেখছিলাম, এত বেশি ভালো লাগছিলো নিজেদের কাছেই!

ভিডিয়ো সাবমিট করা হলো। টিম হাই হোপ্‌স্‌ বেশ আত্মবিশ্বাসী, তবুও একটু ভয় তো থেকেই যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিয়োটা আপলোড করতেই মুহুর্মুহু সাড়া পেলাম। দুই হাজার ছয়শোর উপরে ভিউস আর ঊনষাটটা শেয়ার দেখে আমাদের উচ্চাশা আরো বেড়ে গেলো। তবুও যুদ্ধে আমরা এখনো জিতি  নি। ২০ অক্টোবর, ২০২০ তারিখে বিশ্ব পরিসংখ্যান দিবসে ঘোষণা করা হবে বিজয়ী দলকে। সবাই ভেতরে ভেতরে উত্তেজনায় ফাটছি। তবে ২০ তারিখের আগের রাতে একটা উড়ো খবর আসলো, ফর্মাল ভিডিয়ো নাকি বেশি গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। হঠাৎ করেই টিম হাই হোপ্‌সের প্রত্যেকটা মানুষের মনে একধরনের হতাশার কালো চাদর ছেয়ে গেলো কারণ প্রত্যেকেই যতটা উৎসাহ নিয়ে নিজের সেরাটা ঢেলে দিয়ে কাজ করেছি  সেখানে এই কম্পিটিশনটা না জিতলে আমাদের “হাই হোপ্‌স্‌” যে মাটির তলায় গড়াগড়ি খাবে তা বলাই বাহুল্য।  ঊর্মি আর হুমায়ন ছাড়া কেউই তেমন পরিসংখ্যান দিবসের অনুষ্ঠানে অংশ নেয় নি, সবার মধ্যে ভীষণ কষ্ট কাজ করছিলো কি না! কিন্তু ঊর্মিই একমাত্র মানুষ যে শেষ পর্যন্ত সবাইকে একসাথে আগলে রেখেছিলো এবং চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করার আগে আগে ছয়জনকেই ভীষণভাবে মোটিভেট করে ওয়েবিনারে জয়েন করায়। আমি একটা ইন্টার্নশিপ করছিলাম তাই এমনিতেও বেশি একটা সময় ছিলো না হাতে। মুহুর্তের জন্য ঢুঁ মেরে দেখি অন্য একটা ভিডিয়ো চলছে। কথা ছিলো ওয়েবইনারে শুধু চ্যাম্পিয়ন ভিডিয়ো দেখানো হবে, তার মানে আমরা হেরে গেলাম! একটা সুক্ষ অপরাধবোধে ভুগছিলাম কারণ ইনফর্মাল ভিডিয়ো করার জন্য আমিই জোরাজোরি করেছিলাম বেশি৷ তবুও যে ভিডিয়োটা চলছিলো সেটা পুরোটা দেখলাম কারণ নিঃসন্দেহে তা সুন্দর ছিলো। এমন সময় কমেন্ট দেখলাম “কনগ্রেচুলেশনস টু রানার আপ টিম।” এই মুহুর্ত থেকে টিম হাই হোপ্‌সের প্রত্যেকেই আবার আশা করতে শুরু করলাম যুদ্ধ জেতার। এখনো সময় আছে! পরিশেষে যখন চ্যাম্পিয়ন ভিডিয়ো ওপেন করা হলো, সেই আনন্দটুকু আমাদের প্রত্যেকের গায়ে কাটা দিতে বাধ্য করেছে। প্রায় সবারই নতুন অভিজ্ঞতা, সেটা ভিডিয়ো মেকিং থেকে কিউএমএইচসির থেকে পুরষ্কার পাওয়া পর্যন্ত। কিন্তু টিম হাই হোপ্‌সের আশা-ভরসা তলানিতে গিয়ে ঠেকে নাই এটাই আমাদের জন্য সবচেয়ে আনন্দের ছিলো।

একটা দল হিসেবে যতটা চমৎকার হওয়া উচিৎ তার সবটুকুই টিম হাই হোপ্‌সের ছিলো। সবাই ভীষণ উদ্দীপনা নিয়ে কাজ করেছে এমনকি এই লেখাটা লেখার ক্ষেত্রেও প্রত্যেকে যেভাবে এগিয়ে এসেছে তা প্রশংসার দাবী রাখে। সবচেয়ে সুন্দর ব্যাপার ছিলো বোধ হয় কেউই কারোর মতের তেমন কোনো বিরোধিতা করে নি। যেভাবে কাজ ভাগ করে দেয়া হয়েছিলো, নির্দেশনা যেভাবে দেয়া হয়েছিলো সেসব কিছুই যতটা সম্ভব নিখুঁতভাবে করার চেষ্টা করেছে সবাই। আর শেষমেশ ঊর্মির পুরো টিমকে অন্ধকার থেকে তুলে আনার ব্যাপারটা টিম হাই হোপসের প্রত্যেককে টুকরা আনন্দের সাক্ষী হতে সাহায্য করেছে।

অবশেষে এক অপেক্ষার সমাপ্তি ঘটলো আমার। আর টিম হাই হোপ্‌সের প্রত্যেকের জীবন ছায়াপথে যুক্ত হলো নতুন এক নক্ষত্রের আলো, “বিশ্ব পরিসংখ্যান দিবস” এর ভিডিয়ো মেকিং চ্যাম্পিয়নশিপ!

কমেন্ট করুন

সামা জামিলা রহিম

সেশন: ২০১৮ - ২০১৯

0