পরকালেও আমাকে তোমার বন্ধু করে নিয়ো

স্যারকে প্রথম দেখি কিউএমএইচ স্ট্যাটিস্টিক্স ক্লাবের উদ্বোধনের সময়। সাদাসিধে পোশাকে ধীর-স্থির স্বভাবের একজন লোক। নবীনদের মধ্যে আমার মতো অনেকেই বোধ করি স্যারকে চিনতো না আগে থেকে। স্যার মাইক হাতে নেয়ার পরও রুমটা নীরব হয়নি– অনেকের করা ফিসফিস শব্দ একত্রে যেন কোলাহলের মত লাগছিলো। কিন্তু তাঁকে এক বিন্দু বিচলিত হতে দেখিনি। মাইক হাতে নিয়ে খুব শান্তভাবে কথা বলে যাচ্ছিলেন তিনি। আর আমি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম স্যারের দিকে। মনে মনে ভাবছিলাম, “এই লোককে আরো কাছে থেকে দেখতে হবে আমার; আরো জানতে হবে।”

তবে যতই মনে মনে কারো সান্নিধ্য লাভের আশা করি না কেন– স্বভাবত আমি বেশ লাজুক প্রকৃতির। সংকোচের কারণে তাই নিজে থেকে কখনো কারো কাছে এগিয়ে যেতে পারিনি। আমার মত লাজুকদের জীবনেও প্রেম আসে। প্রেমের ক্ষেত্রেও তারা নিজে থেকে আগায় না। তারা বসে থাকে, বসে অপেক্ষা করতে থাকে। প্রতীক্ষায় থাকে তার মনের মানুষটিই কোনো একদিন এগিয়ে আসবে সে দিনটার। বলা যায় আমিও প্রেমে পড়েছিলাম– স্যারের ধীরতার, স্থিরতার ও অকৃত্রিমতার। প্রথম দেখাতেই স্যারের ব্যক্তিত্বে যে অনন্যতা আমি অনুভব করেছি, তা যেন আমাকে তাঁর কাছে ডাকছিলো। পজিটিভলি ফটোট্যাক্টিক পতঙ্গের মত আমি আলোর মোহাচ্ছন্ন হয়ে ছিলাম। অপেক্ষা করছিলাম কখন স্যারের সান্নিধ্য পাবো আমি, কখন স্যারের সাথে একটু কথা বলতে পারবো। কিন্তু অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ হচ্ছিল। আর ধীরে ধীরে আমিও লাজুক স্বভাব ত্যাগ করে সুযোগ খুঁজছিলাম।

২০১৯-এর সেপ্টেম্বর মাস। ডিপার্টমেন্ট থেকে প্রথমবারের মত আয়োজন করা হচ্ছে স্ট্যাটিস্টিক্স ফেস্ট।  আমি অভাগা তখনো ক্লাবের আহ্‌বায়ক তসলিম স্যারের সাথে দেখা করতে পারিনি। ফেস্টের জন্য স্বেচ্ছাসেবী হলে স্যারের সাথে দেখা করার সুযোগ পাবো ভেবেছিলাম; সুযোগ খুঁজছিলামও। ফেস্টের এক সপ্তাহ আগে আমাদের ক’জনকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো কোমলপানীয়ের ব্যবস্থা করার। আর তারপর আমরা যেন কোমলপানীয়গুলো নিয়ে তসলিম স্যারকে বুঝিয়ে দেই। খুব আশা নিয়ে খুশিমনে অতগুলো কোমলপানীয়ের কেস নিয়ে চারতলায় উঠেছিলাম আমি। কিন্তু স্যার তখন ডিপার্টমেন্টে ছিলেন না। আশাহত হতে হয়েছিল সেবারও।

এরপর কেটে গেছে বেশ কয়েক মাস। সদ্য দ্বিতীয়বর্ষে উঠেছি।

একদিন বিকেলে ল্যাব ক্লাস শেষে জামী স্যারের কল পেলাম। স্যার বললেন একটু তসলিম স্যারের রুমে যেতে, তসলিম স্যার কথা বলবেন। আমি যত না অবাক তারচেয়ে বেশি খুশি হলাম। এতদিনের স্বপ্ন অবশেষে সত্যি হতে চললো। অবশেষে আমি স্যারের সামনে দাঁড়াবো। বেশি খুশি হয়ে গেলে আমি আবার উদ্ভট, অপ্রস্তুত আচরণ করি। নিজেকে সামলে নিলাম। তবে সেদিন বিশেষ কোনো কথা হলো না। ক্লাবের লোগো ডিজাইন করা ও ডুসডার পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে ক্লাবের কিছু কাজ নিয়ে কথা হলো। কাজ শেষে রুম থেকে বের হয়ে আমার হাতে ছিল দু’টি পাওয়া– প্রথমত, আমি স্যারের সাথে কথা বলতে পেরেছি; দ্বিতীয়ত, যে মানুষটার সাথে কথা বলার জন্য আমি মাসের পর মাস অপেক্ষা করে চলেছি, তিনি নিজে থেকেই আমাকে খুঁজে নিয়েছেন।

সেই থেকে অনেকদিন পর পর তসলিম স্যারের সাথে টুকটাক কথা হতো আমার। অনলাইন ক্লাসে আমার উপস্থিতি খুব একটা বেশি ছিল না। তসলিম স্যার সেটা জানতেন। স্যার আমাকে জিজ্ঞেস করতেন কোন ক্লাসে কী কী পড়েছি। আমি বলতে পারতাম না। স্বীকার করতাম যে আমি ক্লাসে অমনোযোগী। স্যার আমার কথায় কখনো নিরাশ হননি। শান্তভাবে সবসময় আমার পাশে থেকেছেন। কথা হলেই বলতেন, “সিহাম, ক্লাস কইরেন। অ্যাট লিস্ট বারি স্যারের ক্লাসটা মিস দিয়েন না।” পড়ালেখা বিষয়টাকে কখনো বোঝা হিসেবে দেখতে দেননি স্যার আমাকে। আমার হৃদয়ে শিক্ষক হিসেবে যতটা না ছিলেন তিনি, তারচেয়ে বেশি ছিলেন একজন বন্ধু হিসেবে। স্যার বলতেন,“আমি যখন আপনারে এই কথা কইতাসি তখন কিন্তু আপনার সাথে টিচার-স্টুডেন্ট সম্পর্ক নিয়া কইতাসি না বুইঝেন।” আমাকে অভয় দিয়ে যেতেন। অনুপ্রেরণা দিতেন আমাকে সবসময়। এই ইমোশনাল সাপোর্টটা আমার খুব প্রয়োজন ছিল সে সময়টায়। যেটা তখন তসলিম স্যারের থেকে না পেলে বোধ করি কারো থেকেই পেতাম না।

ছোট ছোট অসংখ্য স্মৃতির ভিড়ে একটি স্মৃতি মনে দাগ কেটে থাকবে চিরদিন।

পড়াশোনা নিয়ে স্যার যতই আমাকে অনুপ্রেরণা দিয়ে যান না কেন – আমার পড়ালেখার প্রকৃত অবস্থা আমি স্যারকে কখনোই বলিনি। অনেক বেশি ভালো লাগতো স্যারের মুখে জীবন সংক্রান্ত আলাপ-আলোচনা ও উপদেশ শুনতে। তাই সারাজীবন স্যারের চোখে খারাপ ছাত্রই থেকে যেতে চেয়েছিলাম। স্যার আমার যে দক্ষতার কথা জানতেন সেটা হলো গ্রাফিক ডিজাইন। হঠাৎ একদিন স্যার তাঁর ইমেইলে একটা কথা যোগ করলেন।

“I bet you have excellent skills in programming too. You should at least explore a bit about the track of ‘data-science’ …”

প্রোগ্রামিং-এ আমার আগ্রহ ছিল যখন স্কুলে পড়ি তখন থেকেই। তাই কিছুটা প্রোগ্রামিং পারি বলা চলে। কিন্তু সেটা আমার কথা বা কাজে স্যার জেনে যাবেন কোনোভাবে, এমনটা হওয়া সম্ভব নয়। আমি কখনোই স্যারকে এ বিষয়টি জানতে দেইনি। আমি বুঝতে পেরেছিলাম স্যার কথাটি বলেছিলেন পুরোপুরি আমার ওপর বিশ্বাস থেকে। আর স্যারের বিশ্বাসের মূল্য আমাকে দিতেই হতো। তখনই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে, আমি ‘ওয়ার্ল্ড স্ট্যাটিস্টিক্স ডে’- তে ডেটা অ্যানালাইসিস প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করবো, আর সেখানে জয়ী হয়ে স্যারকে দেখাবো। আমি তা পেরেছি। সেই মুহূর্তে ব্যর্থতার সাগরে নিমজ্জিত আমার জীবন আরো একবার নতুন করে জন্ম নিলো ইকারাস হয়ে সূর্যের দিকে উড়ে যেতে।

স্থিরচিত্ত এই মানুষটিকে আমি আর পেলাম না বেশিদিন। যিনি ফোনের অপর পাশে থাকলে মনে হতো সময় থেমে গেছে, যার সাথে কথা বলে মনে হতো আমার জন্য তিনি পৃথিবীর সব সময়কে তুচ্ছ করে রেখেছেন – এই ধীরস্থির মানুষটিই কেন জানিনা খুব তাড়াহুড়ো করে চলে গেলেন আমাকে রেখে। বিদায়যাত্রায় মুখখানাও দেখতে পারিনি স্যারের। শরিক হতে পারিনি জানাজার নামাজেও। আমি তো শুধু একজন শিক্ষককে হারাই নি। হারিয়েছি আমার বন্ধুকে। অথচ তাঁকে দিতে পারলাম না কিছুই, শুধু নিয়েই গেলাম সবসময়। চিরঋণী করে আমাকে ছেড়ে পরকালে চলে গেছেন বন্ধু আমার। সে বন্ধুর কাছে ক্ষমা চাইছি আমার এই লেখার মাধ্যমে।

আমাকে ক্ষমা করে দিয়ো।
পরকালেও আমাকে তোমার বন্ধু করে নিয়ো।

কমেন্ট করুন
শিক্ষার্থী | পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

0