এজেন্ট চন্দ্রপাল(সত্য-মিথ্যের চরিত্র)

ঘটনা ১.

শরীফ সাহেব হাতে একটা চিঠি নিয়ে বজ্রাহতের ন্যায় বসে আছেন। চিঠিটা এসে পৌঁছেছে দুপুর ১২টায়। চিঠিতে এলোমেলো কিছু লাইন ছাড়া আর কিছুই নেই।

কিন্তু এই চিঠির বিশেষত্ব শরীফ সাহেবের মতো হাতে গোনা কয়েকজন লোকই বুঝতে পারেন। কেননা সাধারণ স্কুলমাস্টার এর বাইরে তার আরো একটা গোপন পরিচয় আছে যা কেউ জানে না। আর তা হলো তিনি প্রাক্তন ডি.জি.এফ.আই এর গোয়েন্দা। ফেলে দিতে গিয়েও একটা চিহ্ন দেখে বুঝতে পারেন এটা সিক্রেট সার্ভিস-এরই চিঠি। আর এই চিঠি এক বিশেষ কালি অর্থাৎ পেয়াজের রস দিয়ে লেখা হয় যা একমাত্র দেখা যায় মোমবাতির আলোয় তার আগুনের উপর ধরলে। শরীফ সাহেব চিঠিটা আগুনের উপর ধরলেন।

চিঠিতে তাকে একটা কাজ দেয়া হয়েছে বয়সকালে এটা তেমন কঠিন না হলেও এতদিন পর ব্যাপারটা বেশ কঠিনই হওয়ার কথা তার জন্য। নিজের আরাম কেদারায় হেলান দিতে দিতে শরীফ সাহেব তার পরিকল্পনা সাজাতে শুরু করলেন।

ঘটনা ২.

সাল ১৯৯০, মে মাসের এক সুন্দর বিকেল: বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এফ এম ফজলুল কবীর নিজের অফিসে বসে আছেন চুপচাপ। একটা বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে তাকে কিন্তু এর ফলাফল কী হতে পারে আগে থেকে বুঝতে পারছেন না। মূল সমস্যার কারণ হলো ভারত। বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য শুরুতে ভারতের র’ এর অনেক এজেন্ট এর সাহায্য নিয়েছিলো বাংলাদেশ।  সমস্যা এরপর থেকে। বাংলাদেশ মাথা তুলে দাঁড়ানোর পর থেকে ভারতকে তাদের সিক্রেট এজেন্টদের সরিয়ে নিতে আহবান জানায়। প্রথমে অনেক গড়িমসি করলেও এক সময় এজেন্টদের অফিসিয়ালি সরিয়ে নেয় ভারত। কিন্তু গোপনে তাদের বেশ কিছু অজানা এজেন্ট আজও রয়ে গেছে এবং ধারণা করা হয় সরকারি অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এরা নানান সময়ে পাচার করে আসছে। ফলে কূটনীতিক কোনো চালেই আর পেরে উঠছে না বাংলাদেশ। এরই সমাধান নিয়ে আজ এসেছিলেন ডি জি এফ আই প্রধান মোঃ আব্দুস সাত্তার। সবাই তাকে S-47 বলেই চেনে। তিনি অসম্ভব মেধাবী এক ছেলের খোঁজ এনেছেন। সাথে কয়েক বছর মেয়াদী এক পরিকল্পনা যেখানে এই ছেলের সাহায্যে  তিনি ভারতের র’ এর ভেতরকার তথ্য জানতে পারবেন। কিন্তু ভরসা রাখতে পারছেন না কবীর সাহেব। ধরা পড়লে এই ছেলের কী হবে ভাবতেই বুক কেঁপে উঠছে তার। কিন্তু সামনে আর কোনো উপায়ও দেখছেন না কবীর সাহেব। “নাহ আর কিচ্ছু করার নেই” বড় একটা নিশ্বাস নিয়ে সামনে রাখা কাগজে সাইন দিলেন কবীর সাহেব। ঠেলে দিলেন ১৫ বছরের এক কিশোরকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে।

ঘটনা ৩.

সাল ২০১০: পুরো ভারতে আজ তোলপাড়। সকল মিডিয়ার প্রধান খবর- দীর্ঘ ১০ বছর ধরে চাকরি করে আসা আর শেষ ৫ বছর র’ এর প্রধান নাকি বাংলাদেশের সিক্রেট সার্ভিসের সদস্য। খবর চাউর হওয়ার পর থেকেই তিনি গায়েব। মূলত চন্দ্রপাল নামেই সবাই তাকে চিনতেন। এই বিশাল তথ্য সামনে আসে তার স্ত্রীর সাথে তার মনোমালিন্যের কারণে। তার স্ত্রী সব পরিচয় ফাঁস করে চিঠি লেখেন র’ এর অফিসে। চতুর চন্দ্রপাল এমনটা হবে আগেই বুঝতে পেরে ঘটনার এক সপ্তাহ আগে থেকেই গায়েব। র’ এর কর্তা ব্যক্তিরা সেই চিঠি হাতে পেয়েই সব এজেন্টদের দায়িত্ব দেন তাকে খুঁজে বের করতে। সাথে সাথে সিল করে দেয়া হয় দেশ থেকে বের হওয়ার সব রাস্তা। কিন্তু দীর্ঘ ৬মাস এও খোঁজ পাওয়া যায় নি। হুট করেই একদিন খবর আসে চন্দ্রপালকে দেখা গেছে কলকাতায়। মূলত চন্দ্রপালের বাড়িওয়ালা তাকে চিনতে পেরে টাকার লোভে পুলিশকে জানায় যেখান থেকে খবর চলে আসে র’ এর কাছে। বিশেষ অভিযান চালানো হয় চন্দ্রপালের বাসায়। একদম কাছাকাছি চলে এলেও শেষ পর্যন্ত তার নাগাল পায় নি এজেন্টরা। সবার চোখে ধুলো দিয়ে কর্পূরের মতো উবে যান তিনি। উলটো পুরো ঘটনা মিডিয়ার সামনে চলে আসে।

ঘটনা ৪.

শরীফ সাহেব জানেন তার কাজ খুব অল্প কিন্তু বেশ কঠিন। সেই চন্দ্রপাল আজ ফেরত আসবেন বাংলাদেশে। সব ঠিক থাকলে হয়তো বিমানে ভুয়া কাগজ দিয়ে চলা আসা যেতো কিন্তু শেষ সময়ে চন্দ্রপালের পরিচয় মিডিয়াতে চলে আসায় আর বৈধভাবে আসা সম্ভব নয়। কাজেই সীমান্ত পাড়ি দিয়েই আসতে হবে যেখানে বি এস এফ এর আস্তানা।

১১ জন ইয়াং এজেন্ট দু’দিন আগে তার সাথে দেখা করতে এসেছিলেন।  তাদের উপর নির্দেশ কোনো প্রশ্ন করা যাবে না শুধু শরীফ সাহেব এর কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে যেতে হবে।  

শরীফ সাহেব তাদের টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে ঘুরে এলেন। যুদ্ধের সময় এখানে পাকিস্তানি বাহিনী পাহারা দিতো।  তাদের নজর এড়াতে একটা ব্যবস্থা করেছিলো মুক্তিবাহিনী। মাটির নিচে সুরঙ্গ কিন্তু তার উপরে লোহার পাইপের আস্তরণ। শরীফ সাহেবের বাবা তাকে এই টানেলটা চিনিয়েছিলেন। ১১ জন ইয়াং অফিসারকে কাজ দেয়া হয়েছিলো সুরঙ্গে প্রাণ ফিরিয়ে আনার জন্য। এতো তাড়াতাড়ি এরা কাজ করবে শরীফ সাহেব ভাবতেই পারেন নি। “এবার শুধু সময়ের অপেক্ষা”, শরীফ সাহেব বাকিদের দিকে তাকিয়ে বললেন।

ঘটনা ৫.

চন্দ্রপাল ছাতুভাঙ্গা গ্রাম পেড়িয়ে সীমান্তের কাছাকাছি এক গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছেন। আজ হয়তো তার মুক্তির দিন অথবা জীবনের শেষ দিন। আর কিছু দূর এগুলেই টানেলে পৌঁছে যাবেন যার অন্যপ্রান্তেই বাংলাদেশের নিরাপদ সীমানা। কিন্তু টানেল পর্যন্ত যেতে ভারতীয় গার্ডের প্রথম নিরাপত্তা স্তরটা ভেদ করতে হবে। এই স্তরে তাকে চিনে ফেলার সম্ভাবনা নেই কেননা এখানে মাথামোটা ওয়াচম্যানগুলাই জোয়ান হিসাবে কাজ করে। মুল সমস্যা ২য় আর ৩য় স্তরে। এজন্যই অন্য প্রান্তের শরিফ সাহেব ভিন্ন রাস্তার ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু এক নাম্বারটাই পার হইতে পারলে হয়। “রক্তারক্তি আর ভালো লাগে না”- বলে সকল চিন্তা ঝেড়ে ফেলে হাঁটা শুরু করলেন চন্দ্রপাল। দশমিনিট হাঁটতেই পৌঁছে গেলেন বি. এস.এফ. এর ফারিতে। কেন যাচ্ছ? কোথায় যাচ্ছ? অবধারিত প্রশ্ন দুটি ধেয়ে এলো তার দিকে। “আজ্ঞে অই দেশে বউ এর বাচ্চা বিয়াইবো আইজকাই জরুর খবর আইছে। ভিন দেশে বিয়া করছি তো তাই জরুর যাওন লাগবো”, বলে নিজের চেহারাটা চাদর দিয়ে আরেকটু ভালো করে ঢেকে নিলেন চন্দ্রপাল। খুব বেশি সন্দেহের কিছু দেখলো না ভারতীয় জোয়ান এই দুই দেশের অনেকেই বিয়ে করে অন্য দেশে এভাবে রাত-বিরাতে নানা দরকারে চলাফেরা করে। “আচ্ছা  যাও”, বলে রাস্তা ছেড়ে দিলো জোয়ান। সামনে থাকা দুই সদস্যকেও ইশারা দিলো তাকে যেতে দিতে। চন্দ্রপাল চুপচাপ সামনে হেঁটে গিয়ে একটু বামে মোড় নিতেই পেছন থেকে চিৎকার- “আবে, শালা কই যাস তুই, অইদিকে কোন রাস্তা?” “সোজা দাঁড়া, হাত উপরে। মুখটা দেখি আবার তোর?” চন্দ্রপাল শুনেই দাঁড়িয়ে গেলেন আর হাত তুললেন।  “আস্তে আস্তে উল্টা ঘোর!” চন্দ্রপাল কথামতো উল্টো ঘুরলেন ঠিকই কিন্তু কেউ কিছু বোঝার আগেই তিনটা ছোট্ট ছোড়া তিনজন জোয়ানের গলায় বিধিয়ে দিলেন। স্কুল লাইফের নাইফ থ্রোয়িংটা কাজে লেগে গেলো বলে মুচকি হাসলেন তিনি। আর সময় নেই এবার দৌড়াতে হবে বলেই টানেলের দিকে দৌড় শুরু করলেন চন্দ্রপাল। অল্পসময়েই পৌঁছে গেলেন টানেলের মুখে আর সাথে সাথেই শুনতে পেলেন বিকট শব্দে বাজছে হুইসেল। “শালারা মরার আগেও আকাম কইরা রাইখা গেলো”, এই বলে একদলা থুথু ফেললেন মাটিতে। সবুজ ঘাসের আবরণ দিয়ে ঢাকা লোহার ঢাকনা খুলে ভেতরে ঢুকে গেলেন চন্দ্রপাল আর শেষবারের মতো দেখে গেলেন ২০ বছর কাটিয়ে দেয়া ভারতের আকাশ।

ঘটনা ৬.

কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে শরীফ সাহেবের। এতক্ষণ তো লাগার কথা নাহ। নাকি রাস্তাতেই কোনো বিপদ হলো। ভাবতে ভাবতেই শব্দ শুনতে পেলেন ঢাকনায় এক বিশেষ ভঙ্গিমায় ঠিক যেমনটা হওয়ার কথাছিলো সাথে সাথে ইশারা করলেন এক অফিসারকে ঢাকনাটা খুলে দেয়ার জন্য আর তার সাথেই বের হয়ে এলেন সেই বহু প্রতীক্ষিত চন্দ্রপাল। ইশারাতেই জানালেন তিনি প্রচুর ক্লান্ত। মৃদু হেসে শরীফ সাহেব অফিসারদের নির্দেশ দিলেন চন্দ্রপালকে বিশ্রামের জন্য নিয়ে যেতে।

ঘটনা ৭.

“যাবেন কই? চিঠিতে তো আর কিছু ছিলো না!” বাসস্টপে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন শরীফ সাহেব। “জীবনটাই তো কাটলো পরিকল্পনা ছাড়া এখন আর ভেবেই কী হবে। একটার পর একটা বাসে উঠবো যেখানে মন চাইবে নেমে গিয়ে কিছু একটা ব্যবস্থা করে নেবো।” স্মিত হেসে হাত নেড়ে গাড়িতে উঠে গেলেন চন্দ্রপাল। পেছন থেকে শরীফ সাহেব তাকিয়ে রইলেন সেই অসীম সাহসী নায়কের পানে যে তার পুরো জীবনটাই নিজের পরিচয় ছাড়া কাটিয়ে দিলো শুধু দেশের মায়ায়।

কমেন্ট করুন
শিক্ষার্থী | পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

0