বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা: একটি অসমাপ্ত গল্প

“এখনো কিছুসংখ্যক লোক, এত রক্ত যাওয়ার পরেও যে সম্পদ আমি ভিক্ষা করে আনি, বাংলার গরিবকে দিয়ে পাঠাই, তার থেকে কিছু অংশ চুরি করে খায়। এদের জিহ্বা যে কত বড়, সে কথা কল্পনা করতে আমি শিহরিয়া উঠি। এই চোরের দল বাংলার মাটিতে খতম না হলে কিছুই করা যাবে না। আমি যা আনব এই চোরের দল খাইয়া শেষ করে দেবে। এই চোরের দলকে বাংলার মাটিতে শেষ করতে হবে।“

– বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

        ভাবতে খুব অবাক লাগে, এই উপমহাদেশের দুইটি দেশ তাদের জাতির পিতাকে সহজ-স্বাভাবিক মৃত্যু দিতে পারেনি। মহাত্মা গান্ধী বা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো নেতা- যারা অবিসংবাদিত বলে সর্বজনবিদিত; তাঁদের মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে আপন দেশের আপন জনগণেরই এক অংশের হাতে। এদেশের জাতির জনককে কী নির্মমতার স্বীকার হতে হয়েছে তা আজ আর কারও অজ্ঞাত নয়। এক বুক স্বপ্ন নিয়ে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন তিনি। ঢেলে সাজাতে শুরু করেছিলেন যুদ্ধবিধ্বস্ত এই ভঙ্গুর দেশটাকে। গড়তে চেয়েছিলেন স্বপ্নের সোনার বাংলা। কতটা অগাধ বিশ্বাস ছিল তাঁর দেশের জনগণের প্রতি তা শাহাদুজ্জামানের ক্রাচের কর্নেল গ্রন্থের এই লেখাটির মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে-

“স্বাধীনতার পর পরই কলকাতা থেকে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় ঢাকায় এসেছিলেন শেখ মুজিবের সঙ্গে দেখা করতে। গেট দিয়ে সোজা চলে গেলেন বসবার ঘরে। শেখ মুজিব এলে সুভাষ বললেন: এ কেমন ব্যবস্থা? প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম, কোনো সিকিউরিটি নাই, আমার ব্যাগও চেক করল না কেউ। ওতে পিস্তলও তো থাকতে পারত।

শেখ মুজিব হো হো করে হাসেন: কী যে বলেন, আমার দেশের মানুষ আমাকে মারবে না।“

না, সেই বিশ্বাসের মর্যাদা বাঙালির রাখতে পারেনি। বাংলা মায়ের আলো বাতাসে বেড়ে ওঠা অতিথিপরায়ণ, উদারমনা এই বাঙালি জাতির কতিপয় জোয়ানের কী বোধোদয় হয়েছিল সেদিন কে জানে? যে মানুষটি দেশের জন্য আকুলপ্রাণ, নিজ দেশের মানুষের স্বার্থ রক্ষার্থে ৫৫ বছরের জীবদ্দশার প্রায় তের বছর কারাগারের নির্জন কুঠুরিতে কাটালেন তাঁকে স্বপরিবারে হত্যা করবার প্রয়োজন পড়ল! হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেলে যেমন সুন্দর একটি স্বপ্নের ইতি ঘটে তেমনি এক অসমাপ্ত উপন্যাসের ন্যায় অধরাই রয়ে গেছে সেই কাঙ্ক্ষিত সোনার বাংলা। নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে সোনার বাংলার সেই বিশ্বকর্মাকে।

নানা কারণে এ বছরটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গবন্ধুর জন্মের ১০১ বছর পূর্ণ হবে এই মাসে। এই করোনার মধ্যে কিছুটা অনাড়ম্বরভাবেই তাঁর জন্মশতবর্ষ পালিত হচ্ছে। এ বছর আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করতে যাচ্ছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার শতবর্ষ পূর্ণ হচ্ছে; আমাদের প্রিয় পরিসংখ্যান বিভাগ ৭০ বছর পূর্ণ করে ৭১-এ পা দিয়েছে। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর এই শুভ লগণে বাংলাদেশ আরও একটি সুখবর পেয়েছে। জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি দেয়ার চূড়ান্ত মনোনয়ন দিয়েছে। সম্পূর্ণ দেশের অর্থায়নে নির্মিত হয়েছে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেলের কাজ চলছে, কর্ণফুলি নদীর তলদেশে বহুলেইন টানেল নির্মাণের কাজ চলছে। মাথাপিছু আয় বেড়েছে, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন হয়েছে, শিশু ও মাতৃ মৃত্যুর হার কমেছে, গড় বয়স বেড়েছে। দেশে হারহামেশা নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় খোলা হচ্ছে। বেশ তো চলছে উন্নয়নের ধারা।

তাহলে আবার ‘অসমাপ্ত গল্প’ এরকম হেঁয়ালিমাখানো একটা শিরোনামে প্রবন্ধ লেখার অর্থ কী?

অর্থ এবং প্রয়োজন দুইটিই রয়েছে। কেননা এই উন্নয়নের ধারার পাশাপাশি এর ঠিক সমান্তরালে আরেকটি ধারা বয়ে চলেছে স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই। দুর্নীতিবাজদের কবল থেকে বাংলা মাকে রক্ষা যাচ্ছে না গত ৫০ বছর ধরেই। বঙ্গবন্ধু যে সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখেছিলেন তা অসাম্প্রদায়িক, দুর্নীতিমুক্ত, সমৃদ্ধ, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর দেশের রাজনীতিতে আমূল পরিবর্তন এসেছে। ঘন ঘন দৃশ্যপট পরিবর্তিত হয়েছে রাজনীতির। সেইসাথে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতাকে ভিত্তি করে রচিত সংবিধানের প্রভূত পরিবর্বতন করা হয়েছিল। ধর্মনিরপেক্ষতা সমর্থনকারী ধারাগুলোর বিলুপ্ত করা হয়েছিল। অবৈধভাবে দখলকৃত ক্ষমতাকে বৈধতা দেবার লক্ষ্যে নেয়া হয়েছিল ধর্মের আনুকূল্য। বাংলাদেশের নাম রাখা হয়েছিল ‘বাংলাদেশ ইসলামী প্রজাতন্ত্র’। তাই অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বাংলাদেশের অবস্থান এখন কেমন সেটি দীর্ঘ আলোচনার বিষয়। সে আলোচনা আপাতত মুলতুবি রইলো। এই আলোচনায় দুর্নীতির উপরে কিছুটা আলো ফেলা যাক।

বিভিন্ন দুর্নীতি সূচকে বাংলাদেশ বরাবরই শীর্ষে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) এর দুর্নীতি সূচক ২০২০ অনুযায়ী, ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৬তম। বালিশ-কেলেঙ্কারি বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গাড়িচালক কাণ্ডের মধ্য দিয়ে এ দেশের দুর্নীতির অবস্থা সহজেই অনুমেয়। স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করে বঙ্গবন্ধু দেশ গড়ার কাজে ব্রতী হয়ে প্রথমেই যে বাঁধার সম্মুখীন হলেন তা হলো জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকা এই দুর্নীতিবাজদের। তিনি বাইরের শত্রুদের তো কঠোর হৃদয়ে দমন করেছিলেন কিন্তু ঘরের শত্রুদের মোকাবেলার জন্য হয়ত মানসিকভাবে অতটা প্রস্তুত ছিলেন না। তাঁর প্রাণাধিক প্রিয় দেশের প্রশাসন আর রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে এমন লোভের সঞ্চার হবে তা তিনি হয়ত কল্পনাতেও আনতে চাননি। পরে তিনি যে এ ব্যাপারে বেশ হতাশ এবং অতিষ্ট হয়ে পড়েছিলেন; দুর্নীতিকে সমূলে উৎপাটন করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন তার প্রমাণ মেলে পরবর্তীতে দেওয়া বিভিন্ন ভাষণে। ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে দেওয়া ভাষণে তিনি উল্লেখ করেন,

“১৯৭১-এ আমি আহ্বান জানিয়েছিলাম প্রত্যেক ঘরে ঘরে পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে দুর্গ গড়ে তুলতে হবে। আজ ১৯৭৫-এ আমি আহ্বান জানাই প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুর্গ গড়ে তুলতে হবে।“

একই বছর ২১ জুলাই বঙ্গভবনে নবনিযুক্ত জেলা গভর্নরদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির অনুষ্ঠান উদ্বোধনকালে তিনি বলেন,

“চুরি, ডাকাতি, ঘুষ, দুর্নীতি রোধ করতে হবে- এটা ভালো করে জানবেন। সাবধান, আপনাদের সবাইকে আমি এসব বলে রাখছি এখানে। যারা এখানে আছেন, তাদের সবাইকে সাবধান করে রাখছি; আমি এই ব্যাপারে সেন্টিমেন্টাল হয়ে পড়েছি। ভাবছি কী করে এগুলো দূর করা যাবে। আমি একটা কাজের কথা বলি দুই বছর আগে। আর, এক বছর পরে তাতে হাত দিই। রিমেম্বার ইট। আপনারা জানেন, আমাকে ভালো করেন জানেন। আপনাদের কাছে আমার কথা রইল, যাদের আমি গভর্নর করেছি তারা করাপশন বন্ধ করুন।“

শেখ মুজিবের এক আহ্বানে একাত্তরে সশস্ত্র পাকবাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল নিরস্ত্র বাঙালি। পঁচাত্তরেও কি তারা ঝাঁপিয়ে পড়ত না? নিশ্চয় আরেকটা দুর্গ গড়ে তুলত বাঙালিরা তাঁদের ঘরের শত্রুদের মোকাবেলা করতে। কিন্তু সে সুযোগ আর দেয়া হল কোথায়? কী নির্মমতার স্বাক্ষী হলো ইতিহাস সেই দুর্গ গড়বার পূর্বেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ডঃ আবুল বারাকাত তাঁর ‘বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সমাজ কতদূর যেতো?’ নামক একটি প্রবন্ধে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে তথা তাঁর আদর্শ ও সামগ্রিক রাজনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন ঘটানো হলে বাংলাদেশ ২০১১ সালের মধ্যেই অর্থনৈতিক ও সামাজিক দিক থেকে উন্নতির কাঙ্ক্ষিত শীর্ষে অবস্থান করত। কথায় কথায় যে মালয়েশিয়ার উদাহরণ টানা হয়, সেই দেশটাকেও আমরা সামাজিক বৈষম্য সূচক সকল মানদণ্ডে ছাড়িয়ে যেতাম। সেই উন্নতি আর আলোর মুখ দেখেনি। বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে দুর্নীতি নির্মূল হতে যে আর বেশি দেরি হতো না সেটি নিঃসন্দেহ। তখন আর সোনার বাংলার সোনা মুষ্টিমেয় কয়েকজনের হাতে কুক্ষিগত হতো না- এর সুফল ভোগ করত সমগ্র দেশ। আজ দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা দেশের বাইরে পাচার করতে পারতো না এই অসাধু চক্র। সে সবই এখন শুধু আক্ষেপের বিষয়।

শুরুতে বঙ্গবন্ধুর যে উক্তিটি ব্যবহৃত হয়েছে, সেটি তিনি ১৯৭৩ সালের ৩ জানুয়ারি বরগুনায় দেয়া এক ভাষণে বলেছিলেন। সেখানে জাতির পিতা যে চোরদের কথা বলেছিলেন, আজ ৪৮ বছর পর সেই চোরদের কী অবস্থা? আমরা কি পেরেছি তাদের নিশ্চিহ্ন করতে? যদি না পারি তাহলে কেন পারিনি? যারা সারাজীবন মুজিব আদর্শের বিপরীতে অবস্থান করেছে তাদের কথা নাহয় বাদই দিলাম। যারা মুজিব আদর্শের বুলি আওরায়, যাদের মুজিব শ্লোগানে কান ভারী হয়ে আসে, তাদের একি হাল! আমার মুজিব তো এমন ছিলেন না। তিনি তো ছিলেন দুর্নীতি আর সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে এক হিমালয়। নিজের পকেট ভারীর রাজনীতি তো তিনি করেননি। ছাত্রসমাজ তথা যুবসমাজকে তাঁর আদর্শ লালন করতে হবে। ফাঁকা বুলি নয়, অন্তরে ধারণ করতে হবে। বাংলাদেশের ইতিহাসে ছাত্রসমাজের ভূমিকা এক বিস্ময়কর অংশ। ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ সব আন্দোলনেই ছাত্রদের ভূমিকা নেতৃত্বস্থানীয়। এই ছাত্রসমাজ কি দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারে না? তারা কি কখনও পারবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আরেকটা অভ্যুত্থানে ঘটিয়ে আমার বাংলাকে সোনায় মুড়িয়ে দিতে?

কমেন্ট করুন
শিক্ষার্থী | পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সেশনঃ ২০১৬-১৭

হরিপদ শীল

সেশনঃ ২০১৬-১৭

0