বাংলাদেশের ব্যাঙে প্রথমবারের মত ছত্রাকঘটিত রোগ সনাক্ত

বাংলাদেশের ব্যাঙের মধ্যে কাইট্রিডিওমাইোকসিস নামের একটি ছত্রাকঘটিত রোগের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। কাইট্রিড (Scientific name- Batrachochytrium dendrobatidis, সংক্ষেপে Bd) নামক ছত্রাক এই রোগ তৈরি করে। দেশীয় ব্যাঙের জন্য এটি মোটেও কোন ভাল খবর নয়। এই প্রাণঘাতী ছত্রাকের  কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ব্যাঙের অনেক প্রজাতি বিলুপ্ত হয়েছে এবং পপুলেশন কমে যাচ্ছে। যদিও এই রোগের আবিষ্কার গত শতাব্দীতে (১৯৯৮ সাল) হয়েছিল, আমাদের এশিয়া মহাদেশে এই ছত্রাক নিয়ে গবেষণা ২০০৭ সালের পর থেকে শুরু হয়। বাংলাদেশে ২০১৮ সালে  মোঃ মোখলেসুর রহমান এর নেতৃত্বে এই ছত্রাক নিয়ে কাজ শুরু করা হয় এবং ২০২১ সালে এর ফলাফল প্রকাশিত হয়। উল্লেখ্য, প্রধান গবেষক মোঃ মোখলেসুর রহমান প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর প্রভাষক এবং বর্তমানে Department of Anthropology, Durham University, United Kingdom এ পিএইচডি করছেন। এছাড়াও, এই গবেষণা টিমে ছিলেন হাওয়া জাহান, মোঃ ফজলে রাব্বী, মৌমিতা চক্রবর্তী এবং মোঃ সালাউদ্দিন।

প্রাথমিকভাবে গবেষকরা একটি রিভিউ গবেষণার মাধ্যমে বাংলাদেশে এই ছত্রাক সনাক্তের সম্ভাব্যতা বের করেন। এরপর কাইট্রিড ছত্রাক সনাক্তের জন্য দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা (sampling) শুরু করেন।

ছবিতে কাইট্রিডের নমুনা সংগ্রহের কৌশল দেখানো হয়েছে

দেশের সাত জায়গার বিভিন্ন রকমের আবাসস্থল থেকে ১৩৩টি সোয়াব স্যাম্পল সংগ্রহ করা হয় এবং প্রাণিবিদ্যা বিভাগের জেনেটিক্স ল্যাবে সনাক্তের জন্য PCR করা হয়। ১৩৩টির মধ্যে ২০টি নমুনা পজিটিভ আসে অর্থাৎ সনাক্তের হার হল প্রায় ১৫%। ১৮ প্রজাতির ব্যাঙ থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল এবং এর মধ্যে ৯ প্রজাতির মধ্যে সংক্রমণ পাওয়া যায়। এই ৯ প্রজাতির ব্যাঙের মধ্যে ৮টি প্রজাতির সংক্রমণ এশিয়াতে একদম নতুন। বিভিন্ন আবাসস্থলের মধ্যে বন থেকে সংগ্রহ করা নমুনাতে সংক্রমণের হার বেশি। Maximum entropy distribution modeling (এক ধরনের মডেলিং যেখানে নমুনা এবং আবহাওয়ার তথ্য দিয়ে সম্ভাব্য বিস্তৃতি জানা যায়)- এর মাধ্যমে কাইট্রিড ছত্রাকের সংক্রমণ এবং বিস্তার বাংলাদেশের পাহাড়ি এবং বনাঞ্চল এলাকায় বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হয়।

সাম্প্রতিক এই গবেষণাটি EcoHealth (IF 2.15, published by EcoHealth Alliance from Springer Nature) প্রকাশিত হয়েছে এবং গবেষণার ফলাফল দেখতে ক্লিক করুন এখানে…  https://link.springer.com/article/10.1007/s10393-021-01522-2   

ছবিতে নমুনা সংগ্রহের জায়গা এবং বাংলাদেশে কাইট্রিড এর সম্ভাব্য বিস্তৃতি দেখানো হয়েছে

যে সকল মহাদেশে উভচর জাতীয় প্রাণী পাওয়া যায় কাইট্রিড ছত্রাক সেই সকল মহাদেশে পাওয়া গেছে। অন্য কথায়, অ্যান্টার্কটিকা ব্যতীত প্রতিটি মহাদেশেই এই ছত্রাক পাওয়া যায়। এর উৎপত্তি কোথা থেকে তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। Weldon et al. (2004) এই ছত্রাকের উপস্থিতি ১৯৩৮ সাল থেকে সংরক্ষিত African Clawed Frog প্রজাতির মিউজিয়াম নমুনা থেকে সনাক্ত করেছিলেন। ১৯৯৮ সালে অস্ট্রেলিয়া থেকে প্রথম Berger et al. (1998) আবিষ্কার করেন। এখন পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের ৭০০ উভচর প্রজাতিকে সংক্রমণ করার প্রমাণ মিলেছে। Scheele et al. (2019) এর গবেষণা থেকে বলা হয়েছে যে গত ৩০ বছরে প্রায় ৫০১ প্রজাতির মারাত্মক ক্ষতি করেছে এই ছত্রাক এবং ৯০ প্রজাতির বিলুপ্তি সাধন করেছে। 

পরিবেশের মধ্য দিয়ে কীভাবে এটি প্রাকৃতিকভাবে চলাচল করে তার কোনও উপযুক্ত প্রমাণ নেই। তবে উভচর/ব্যাঙ ট্রেড করার মাধ্যমে এটি ছড়ায়। Bd সালামেন্ডারদের তুলনায় ব্যাঙকে বেশি সংক্রমণ করে বলে ধারণা করা হয় তবে সালাম্যান্ডারদের নিয়ে কম গবেষণা করা হয়েছে। সংক্রমণের তীব্রতাই আসল ব্যাপার। Vredenburg et al. (2010) দেখিয়েছেন যে Rana muscosa নামক প্রজাতিতে যখন ছত্রাকের স্পোর সংখ্যা প্রায় 10,000 অতিক্রম করে তখন মৃত্যু ঘটে। সংক্রমণের পর লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে ক্ষুধামন্দা, লেথারজি, পায়ের অস্বাভাবিক বিন্যাস, প্রয়োজনীয় রিফ্লেক্সের অভাব এবং ত্বক লাল হওয়া। Bd দ্বারা সংক্রমিত ব্যাঙের জন্য এখনও কোন নিরাময় আবিষ্কৃত হয়নি।

জীবনচক্রBd ল্যাবরেটরিতে ৪-২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এবং ৪-৮ পিএইচ এ বেশি সংখ্যাবৃদ্ধি করতে সক্ষম। এর জীবনচক্র দুটি পৃথক পর্যায় নিয়ে গঠিত, সংক্রমণক্ষম ফ্ল্যাজেলেটেড স্পোর এবং থ্যালাস। থ্যালাস এক বা একাধিক প্রজননক্ষম স্পোরানজিয়া উৎপন্ন করে এবং এরা স্পোর তৈরি করে। ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় একটি চক্র শেষ হতে ৪-৫ দিন সময় নেয়। স্পোরগুলো মুক্ত-জীবিত এবং পানির মধ্য দিয়ে তার লেজের মতো ফ্ল্যাজেলাম দিয়ে সাঁতার কাটতে থাকে, যতক্ষণ না এটি কোন উভচর প্রাণীর ত্বকের সাথে যুক্ত হয় । এরপরর, এটি ত্বকের কোষে প্রবেশ করে এবং পরবর্তীতে কোষের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে।

নির্দেশনা- যারা ব্যাঙ বা যেকোনো প্রাণী নিয়ে গবেষণা করেন তাদের প্রতি অনুরোধ থাকবে দয়া করে আপনার গবেষণার সময় (প্রাণী ধরা, ছেড়ে দেয়া, রেস্কিউ করা) প্রাণী মেইনটেইন করার গাইডলাইন মেনে চলবেন এবং এক জায়গার প্রাণী অন্য জায়গায় ছেড়ে দেয়ার আগে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিবেন। ব্যাঙের এই ছত্রাক বিস্তৃতি রোধে এক এলাকার ব্যাঙ কোনোভাবে যেন মানুষের মাধ্যমে অন্য এলাকায় না যায় তা খেয়াল রাখবেন।   

কমেন্ট করুন
ফিল্ড অফিসার | পদ্মা সেতু জাদুঘর

সেশনঃ ২০১২-২০১৩
প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মোঃ ফজলে রাব্বী

সেশনঃ ২০১২-২০১৩ প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

0