মাল্টাকান্ত চক্রবর্তী এবং কয়েকটি করোনা

আমি শ্রীযুক্ত কমলাকান্ত চক্রবর্তী। না মশাই, আপনি ভুল ভাবছেন। আমি ঠিক ওই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কমলাকান্তের দপ্তরের সেই আফিমখোর শ্রীযুক্ত কমলাকান্ত চক্রবর্তী নই। আমার পিতৃদেব শ্রীযুক্ত অধর চন্দ্র চক্রবর্তী বঙ্কিমবাবুর ‘কমলাকান্তের দপ্তর’ পাঠোত্তর কমলাকান্তের প্রতি এতটাই বিমোহিত পড়েছিলেন যে, তিনি তার সতের বছরের প্রচেষ্টায় ভূমিষ্ট একমাত্র পুত্র সন্তানের নাম কমলাকান্ত রাখতে দ্বিতীয় বার চিন্তা করেননি। তবে কিছুদিন পরেই তিনি এই চিন্তায় ব্যস্ত হয়ে পড়লেন যে, তার একমাত্র পুত্র সন্তানের হাল আবার কমলাকান্তের ন্যায় না হয়ে দাঁড়ায়। ওরকম একটা চরিত্র গল্পেই মানায় বটে- বাস্তবিকই ওরকম হলে তার দুর্ভোগের শেষ রবে না।

এ নামে আমার কোনো আপত্তি রইত না যদি না আমি স্কুলে প্রভূত হাসি-ঠাট্টার স্বীকার না হতাম। অতিসত্বর কমলাকান্ত- কমলা, কলাকান্ত, কলা ইত্যাদি নামে স্বমহিমায় ছড়িয়ে পড়তে লাগল চারিদিকে। ঐ বয়সের একটা ছেলের পক্ষে এ ছিল ব্রহ্মাণ্ডের জটিলতম সমস্যা। সমস্যাটা ঘনীভূত হতে হতে মাল্টায় গিয়ে পৌঁছুলো। কমলা দিনদিন দুর্লভ হতে শুরু করল, মাল্টা হতে থাকল সুলভ। সেইসাথে আমি কমলাকান্ত থেকে হতে থাকলাম মাল্টাকান্ত। কবে যে কমলাকান্ত নামটা পুরোপুরি মুছে গেল সেই ক্ষণটিই আর আলাদা করে চিহ্নিত করে রাখা সম্ভব হলো না। কাগজ-কলমে আমি অদ্যাবধি শ্রীযুক্ত কমলা চক্রবর্তী। তাতে কী আসে যায়? কমলাকান্ত নামটি বলে আমার পাড়ায় আপনি আমাকে খুঁজে পেয়ে দেখান দেখি?

বাবা অহেতুক আমাকে নিয়ে চিন্তা করে রক্তচাপের মাত্রা বাড়িয়েছিলেন। আফিম তথা কোনো নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণ তো দূরের কথা, স্পর্শও করিনি আজ পর্যন্ত। বড় হবার পর যখন জানলাম, ভাত পচিয়ে মদ তৈরি করা হয় তখন থেকে পান্তা ভাত খাওয়াটাও বাদ দিয়ে দিয়েছি।  বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সেই কমলাকান্তের ন্যায় এই আমি কমলাকান্ত অকর্মণ্যও নই। দুধের জন্য কোনো প্রসন্ন গোয়ালিনীর মুখাপেক্ষীও আমি নই। মাসে ভালো টাকা আয় করি। আর সেই টাকা দিয়ে ‘স্বর্ণকমল খাঁটি গরুর দুধ ঘর’ থেকে প্রতি সন্ধ্যায় পঁচিশ টাকায় ফুল এক গ্লাস দুধ খাওয়া থেকে কেউ আমাকে বিরত রাখতে পারে না। সর্বোপরি দুধপান করতে করতে, ‘খাঁটি গরুর দুধ’ নাকি ‘গরুর খাঁটি দুধ’ কোন শব্দটা অধিক গ্রহণযোগ্য, একান্ত মনে সে ভাবনাটি ভাবা থেকেও কেউ আমাকে বিরত রাখতে পারে না!!

সেসব দিন এখন স্মৃতির পাতায়। দিনগুলোর সম্ভবত বিশ্রামের প্রয়োজন ছিল, আমি বুঝতে পারিনি। বোধ করি আমারও বিশ্রামের প্রয়োজন ছিল। ভগবান তার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন করোনাকে পাঠিয়ে। করোনা শুরু হবার দুমাসের মাথায় চাকরিটা চলে গেছে। সে – গেছে ভালোই হয়েছে! বসের অতো প্যাঁনপ্যানানি কার সহ্য হয় বলুনতো মশাই? নিজে বসে বসে খেয়ে পেটটা বানিয়েছে গন্ধমাদন পর্বতের ন্যায় আর অন্যের সুখ গলার কাঁটা!

যাইহোক, এতো ভূমিকার প্রয়োজন ছিল না, যদি না আজ সন্ধ্যার এই ঘটনাটি ঘটতো। যে নাম নিয়ে এতো এতো বিড়ম্বনার স্বীকার সেই কমলাকান্তের দপ্তর বইখানা কখনও পড়ব না বলে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম। করোনায় কাজ নেই। ঘরের আর সব বই পড়াও শেষ। আমার মতো কাজপাগল লোকের হাতে কোনো কাজ নাই। এই নিয়ে পড়লাম মহা ঝামেলায়। শেষমেশ ঘরের পুরানো জিনিসপত্র ঘাঁটাঘাটি শুরু করলাম। সেই সময় হাতে এসে পড়লো ঐ অলুক্ষণে বইখানা। ভাবলুম পড়েই ফেলি। বিড়াল গল্পখানা অব্দি পড়ে গেলাম রান্নাঘরে, আলুসেদ্ধ-ভাত চাপবার জন্যে। যা সঞ্চয় আছে তা দিয়ে এর চেয়ে বেশিকিছু আর জুটছে এর আজকাল। তা নিয়ে অবশ্য আমার কোনো আক্ষেপ নেই। সে যাকগে, ভাত চাপিয়ে যেই পূনর্বার বইখানা মেলেছি পড়ব বলে ওমনি দেখি তিনখানা করোনা। এ যেন আমি কমলাকান্ত বঙ্কিমবাবুর কমলাকান্তের ন্যায় দিব্যকর্ণ এবং সেই সাথে দিব্যচক্ষু প্রাপ্ত হলাম। করোনাকে সামনে পেলে আচ্ছা করে কেলিয়ে দিতাম এই চিন্তাটি কদিন ধরে অন্তরে উঁকি দিচ্ছিল। সুযোগ যখন পেয়েছি আজ আচ্ছা করে দেয়া যাক তাহলে।।।

  • এ কী তান্ডব শুরু করেছো তোমরা বল দিকি?
  • সেকি। আমরা তান্ডব শুরু করেছি নাকি। হাসালে মাল্টা বাবু। তোমরা- এই মনুষ্যজাতি পৃথিবীতে কী তান্ডবনৃত্য চালাচ্ছো তা বোধ করি তোমার দৃষ্টিগোচর হয় না? প্রকৃতি তো সেজন্যই আমাকে তৈয়ার করেছে। কতই আর সে সহ্য কর বলো?
  • তাহলে বেছে বেছে মারতে। নিরপরাধ মানুষ যে শাস্তি পাচ্ছে বিনা দোষে তার বেলায় তোমার কী বিচার?
  • ও আচ্ছা, মানুষ বুঝি আমি একা মারছি। আর তোমরা বুঝি সকলে ভাই ভাই। আমি না হয় নির্বোধ ভাইরাস। তোমরা তো নিজেদের সৃষ্টির সেরা বলে দাবি কর। তোমাদের একি হাল!
  • ভাই ভাই নয় তো কী? সৃষ্টির সেরা নয়তো কী?
  • তুমি তো দেখি মহা গর্দভ হে ভায়া। কমলাকান্তের দপ্তর পড়া দেখে ভাবলাম যাক এর সাথে অন্তত দুটো কথা বলা যায়।
  • ভাষা সংযত কর।
  • সে না হয় করলাম। কিন্তু তোমরা কি আমার চাইতেও নিষ্ঠুর নও? নিজেই বিচার করে দেখ দেখি। তোমরা নকল পিপিই আনলে, নকল মাস্ক আনলে। সেটা আসল ভেবে কোনো ডাক্তার মারা গেলে সেই দায়ভারও কি আমার? আচ্ছা ঠিক আছে, এই ভারও না হয় আমি আমার কাঁধেই বহন করলাম। কিন্তু এই যে গরীবদের ঘর বানিয়ে দিতে গিয়ে কীসব ছাইপাশ বানালে, ভেঙ্গে ভেঙ্গে পড়ছে বছর-ছমাস না যেতেই। এই ঘরচাপা খেয়ে যদি কেউ মরে তাহলে সেটার দায়ভারও কি আমার? নাকি গরীব মরলে কিছু যায় আসে না? এই যে সেদিন এতগুলো মানুষ পুড়ে মরলো, সেটা কি আমার ভুলে নাকি তোমাদের? এতক্ষণে কী বল?
  • দেখ, এসব দুর্ঘটনা। তুমি যে মারছো আর এসবে মানুষ মরছে তাতে বিস্তর ফাঁরাক আছে।
  • ফাঁরাক! ফাঁরাক আছে বৈকি। তোমরা দোষ করবার আগেই ফন্দিফিকির গুছিয়ে রাখো যে ধরা পড়লে কী বলবে। আমার আর সে সুযোগ কোথায়? যত দোষ করোনা ঘোষ!

তর্কে হেরে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল দেখে  করোনা তিনটিকে এই বলে ক্ষান্ত করার প্রয়াস করলাম যে,

  • দেখ, এইসবে তো আমার বিন্দুমাত্র হাতও নেই। আমি নির্বিবাদী মানুষ। অনেক ঝামেলা ইতোমধ্যে বাঁধিয়ে ফেলেছ তুমি ধরণীতে। এবার দুগ্‌গা দুগ্‌গা বলে কেটে পড়ো দেখি।
  • তোমার হাত নেই বলছো? তুমি যে চুপি চুপি এসব দেখে ধুর শালা বলে এড়িয়ে গেলে তাতে তোমার আর দোষ কোথায়?
  • অতো কথায় কাজ নেই। ভাতে-ভাত বসিয়েছি, খেতে চাইলে খেয়ে ফোটো তো বাবা এখান থেকে। ইতোমধ্যে অনেক ক্যালোরি খরচা করা হয়েছে তোমাদের পেছনে!
  • ওসব খেয়েই তো আজ এই অবস্থা তোমার। বরং কিছুদিন আফিম খাও, তাতে করে যদি তোমার বুদ্ধি একটু খোলে।

এই বলে করোনা প্রস্থান করল। আমার মাথা চক্কর দিতে আরম্ভ করেছে। ভাত আর আজকে খাওয়া হয়ে উঠবে না। কী কুলক্ষণে যে বইটা হাতে নিয়েছিলাম! করোনার শেষ কথাটা মাথায় বাজছে বারবার। ‘বরং কিছুদিন আফিম খাও, তাতে করে যদি তোমার বুদ্ধি একটু খোলে।’ এই লকডাউনে আফিম পাব কোথায়? এই যে হ্যাঁ, আপনাকেই বলছি মশাই, আপনার কাছে কি একটু আফিম হবে? খেয়ে একটু পরীক্ষা করে দেখতাম আর কী যে বুদ্ধির আরেকটু খোলতাই হয় কিনা!

কমেন্ট করুন
শিক্ষার্থী | পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সেশনঃ ২০১৬-১৭

হরিপদ শীল

সেশনঃ ২০১৬-১৭

0