লবণ মিছিল

এক

১৬ মার্চ, ১৯৩০ সাল। রবিবার।

ছুটির দিনগুলোতে সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) আনিসুর রহমান সকালের নাস্তা করেন ন’টায়। এরপর চায়ের কাপ হাতে নিয়ে সাপ্তাহিক ‘ঢাকা প্রকাশ’-এর পাতায় মনোনিবেশ করেন। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না।

    যা ভেবেছিলেন তাই, পত্রিকার বড় অংশ জুড়ে গান্ধীজীর ‘লবণ সত্যাগ্রহ’-এর খবর। ঠিক চারদিন আগে আহমেদাবাদের সবরমতি আশ্রম থেকে ৭৮ জন ‘সত্যাগ্রহী’কে সাথে নিয়ে ৬১ বছর বয়সী গান্ধীজী গুজরাটের সাগর-তীরের ‘ডান্ডি’ গ্রামের উদ্দেশ্যে অভিযাত্রা শুরু করেছেন। প্রতিদিন ১০ মাইল করে পথ অতিক্রম করছেন তাঁরা। সে হিসেবে ২৪১ মাইলের এ অভিযাত্রা ২৪ দিনে শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। হাজার হাজার মানুষ এই ‘ডান্ডি মার্চ’-এ অংশ নিচ্ছেন। ডান্ডির সাগরজল থেকে লবণ বানিয়ে গান্ধীজী ব্রিটিশদের তৈরি করা ‘লবণ আইন’ ভাঙবেন।

    মুচকি হাসলেন এসআই আনিস। ‘ঢাকা প্রকাশ’ পত্রিকার নীতি তার খুব পছন্দ। এরা ব্রিটিশ সরকারের দালালী করে না, আবার আন্দোলনকারীদের পক্ষও নেয় না। দালাল পত্রিকাগুলো পড়লে মনে হয় গান্ধীর এই অভিযাত্রায় শুধু ৭৮ জন ‘সত্যাগ্রহী’ অংশ নিচ্ছেন, সাধারণ জনগণের কোন অংশগ্রহণ এখানে নেই। আবার, গান্ধীর অহিংস আন্দোলনের সমর্থক পত্রিকাগুলো পড়লে মনে হয়, ভারতবর্ষের সব মানুষ চাকুরিতে ইস্তফা দিয়ে বা ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করে ‘মহাত্মা গান্ধী’র এই অভিযাত্রায় যোগ দিয়েছেন। এসব পত্রিকা ‘ঢাকা প্রকাশ’-এর মতো শুধু ‘লবণ আইন’ লেখে না, লেখে ‘কুখ্যাত লবণ আইন’।

    আনিসের ব্যক্তিগত নীতিও অনেকটা ‘ঢাকা প্রকাশ’-এর মতো। ব্রিটিশদের চাকুরি করলেও ‘দালালি’ বলতে যা বোঝায় তা করেন না তিনি – ধরে আনতে বললে বেঁধে আনেন না। এটা ঠিক, সাদা সাহেবরা পেছনে  দাঁড়িয়ে হুকুম করলে গান্ধীর অহিংস নীতির সমর্থক সত্যাগ্রহীদেরকেও লাঠিপেটা করতে তিনি দেরি করেন না (লোভনীয় চাকুরিটা বাঁচাতে  হবে তো), কিন্তু সাদা সাহেবরা আশেপাশে না থাকলে আন্দোলনকারীদেরকে তিনি কিছুই বলেন না, যদি না তারা ভাঙচুর শুরু করে।

    যেসব নেতা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আন্দোলনের পক্ষপাতী, যেমন কলকাতার সুভাষচন্দ্র বা চিটাগং-এর সূর্যসেন, যারা ‘বন্দে মাতরম’ এর পাশাপাশি ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ শ্লোগান দেন, তাঁরাও গান্ধীজীর এই লবণ আন্দোলনে সক্রিয় সমর্থন দিচ্ছেন। পুলিশ প্রশাসনে তাই অস্থিরতা চলছে। ঢাকায় যদিও আন্দোলনের প্রকোপ একটু কম, তারপরও এসআই আনিসের কাজের চাপ বেড়ে গেছে।

    দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে পত্রিকার পাতা থেকে চোখ তুললেন তিনি। “খোলা আছে” বলে হাঁক ছাড়লেন। কনস্টেবল বিশ্বনাথকে ঘরে ঢুকতে দেখে অবাক হলেন। আজ তো রবিবার!

    “আদাব স্যার। ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশনের কাছে বাইশ-তেইশ বছর বয়সের একটা ছেলের লাশ পড়ে আছে। গত রাতে কোন এক সময়ে বুকে ছুরি মেরে খুন করা হয়েছে।” এমনভাবে কথাগুলো বললেন বিশ্বনাথ, যেন মুখস্ত করতে করতে এখানে এসেছেন।  

    আনিসের কপালে চিন্তার রেখা ফুটলো। আন্দোলনের মধ্যে খুন-খারাবি ভাল লক্ষণ নয়। হত্যাকান্ডটা রাজনৈতিক হয়ে থাকলে তো কথাই নেই, পরিস্থিতি সামলানোই দায় হয়ে পড়বে। ব্যক্তিগত শত্রুতা হয়ে থাকলেও ঝামেলা- অল্প লোকবল নিয়ে খুনের তদন্ত করবেন, নাকি লবণ আন্দোলন ঠেকাবেন?

    “লাশের কাছে কে আছে?” জানতে চাইলেন তিনি।

    “সুব্রত স্যার আর মতিন।”

    এএসআই সুব্রত আর কনস্টেবল মতিন – দু’জনই কাজের মানুষ। একটু নিশ্চিন্ত হয়ে ইউনিফর্ম পরতে শুরু করলেন আনিস।

দুই

লাশটা পড়ে আছে ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশন (অফিসিয়ালি ঢাকা রেলস্টেশন) থেকে কিছুটা পূর্বদিকে, নওয়াবপুর রোডের কাছাকাছি। পরনে গাঢ় নীল প্যান্ট, রক্তমাখা সাদা শার্ট। পায়ে জুতো বা স্যান্ডেল নেই, কিন্তু পায়ের পাতায় কোন ময়লাও নেই। তার মানে, খুন করার পর জুতো বা স্যান্ডেল পা থেকে খুলে নেয়া হয়েছে। কাজটা খুনি করলো, না অন্য কেউ?

    এএসআই সুব্রত সেনের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন আনিস। একটা মৌখিক রিপোর্ট আশা করছেন।

    “ভিকটিমের বয়স বাইশ-তেইশ বছর হবে,” বললেন সুব্রত। “উচ্চতা পাঁচ ফিট চার। ওজন আনুমানিক ১৩০ পাউন্ড। পরিচয় এখনও জানা যায়নি। ডান হাতের বুড়ো আঙুল, তর্জনী আর মধ্যমার নখের গোড়ায় কলমের কালির চিহ্ন। তারমানে ডানহাতি লেখাপড়া জানা ছেলে। রেলওয়ের-“

    “হিন্দু না মুসলিম?” সুব্রতকে থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন আনিস। মনে মনে একটু বিরক্ত তিনি। পরিচয় জানতে না পারলে লাশ সৎকার করা নিয়ে বাড়তি ঝামেলা পোহাতে হবে। সবাই কেন পরিচয়পত্র সাথে নিয়ে ঘোরে না?

    “এখানেই সমস্যা, স্যার,” একটু বিব্রত ভঙ্গিতে বললেন সুব্রত। “প্যান্টের বোতাম খোলাই পেয়েছি। ভিকটিমের ধর্ম বোঝার কোন উপায় খুনি রাখেনি। সামনের অংশটুকু কেটে নিয়ে গেছে।”

    আনিসের বিরক্তি চরমে পৌঁছালো। সব রাগ গিয়ে পড়লো লাশের উপর। এই অপদার্থটা, খোদার খাসী বা ঈশ্বরের পাঁঠা যাই হোক, মরার আর জায়গা পেলো না? হঠাৎ একটা চিন্তা মাথায় আসতেই হকচকিয়ে গেলেন আনিস। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়ে গেলো নাকি? হিন্দু-মুসলিম দূরত্ব দিন দিন বাড়ছে। কোন কোন অঞ্চলে পরিস্থিতি বিস্ফোরনোম্মুখ। যে কোন সময়ে এসব অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হতে পারে। কিছু মুসলিম আর হিন্দু নেতা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন, কিন্তু কোন কাজ হবে বলে মনে হচ্ছে না। দুই সম্প্রদায়ের এই দূরত্বের কারণেই মুসলমানদের একটা বড় অংশ লবণ সত্যাগ্রহে সক্রিয় সমর্থন দিচ্ছেন না।

    নাহ্‌, এটা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার অংশ নয়, ভাবলেন আনিস। যেসব উগ্র মুসলিম বা হিন্দু ধর্মীয় উন্মত্ততায় খুনখারাবি করে, তারা সাধারনত: ভিকটিমের ধর্ম-পরিচয় গোপন করার চেষ্টা করে না। বরং ‘শত্রুপক্ষের’ কতগুলো লোককে হত্যা করতে পারলো, সেটাই তাদের ‘বিজয়’-এর সূচক।

    তারমানে, এমন কেউ খুনটা করেছে, যার সাথে ভিকটিমের শত্রুতার কথা এলাকার সবাই জানে। লাশের পরিচয় গোপন রাখাই হত্যাকারীর বাঁচার একমাত্র উপায়।

    প্যান্টে কোন রক্ত নেই। তারমানে, খুন করার বেশ কিছু সময় পরে হয়তো খুনি আবার ফিরে এসে ভিকটিমের অঙ্গচ্ছেদ করেছে, তাই কোন রক্তপাত হয়নি।

    “রেলওয়ের কথা কি যেন বলছিলেন?” জিজ্ঞেস করলেন আনিস।

    “রেলওয়ের এক কর্মচারী, যে আজ থানায় গিয়ে লাশের খবর দিয়েছে, গতকাল সকালে নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা ট্রেন থেকে একে নামতে দেখেছে। তবে লাশের কাছে ট্রেনের টিকেট পাওয়া যায়নি। পাওয়া গেছে এই টিকেট।” বাদামী রঙের এক টুকরো কাগজ এগিয়ে দিলেন সুব্রত।

    ‘মুকুল সিনেমা হল’-এর গতকালের টিকেট। সন্ধ্যা ছয়টার শো। রিয়ার স্টল।

    আনিসের জানা আছে মুকুল সিনেমা হলে এখন ‘রাধারানী’ চলছে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা থেকে তৈরি নির্বাক চলচ্চিত্র। হল মালিকের আমন্ত্রণে গত পরশু তিনি সিনেমাটি দেখে এসেছেন।

    ভিকটিম কি গতকাল সন্ধ্যায় সিনেমাটি দেখেছে? সেক্ষেত্রে খুনটা হয়েছে রাত ন’টার পর। কিন্তু, খুনি পুলিশকে ধোঁকা দেয়ার জন্য সিনেমার টিকেট ভিকটিমের পকেটে রেখে থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে খুনটা হয়েছে রাত ন’টার আগে। কোনভাবে যদি খুনির পরিচয় বের হয়ে পড়ে, খুনি দাবী করতে পারবে, খুন তো হয়েছে রাত ন’টার পর, যখন আমি অমুক জায়গায় অমুকের সংগে ছিলাম।

    “রেলওয়ের ঐ কর্মচারী কেমন ধরনের লোক?” আনিসের কন্ঠে সন্দেহ।

    “ওর নাম হানিফ। কয়েক বছর ধরে এখানে চাকুরি করছে। মতিনের পরিচিত (হাত দিয়ে কনস্টেবল মতিনকে দেখালেন সুব্রত), বিশ্বস্ত লোক। এখন পর্যন্ত তাকে সন্দেহ করার মত কিছু পাওয়া যায়নি।”

    আনিসের নির্দেশে কনস্টেবল মতিন লাশের শরীর থেকে রক্তমাখা শার্টটি পুরোপুরি খুলে ফেললেন। লাশটি ভালো করে পরীক্ষা করতে শুরু করলেন আনিস। হৃৎপিন্ড বরাবর একটাই গভীর ক্ষতচিহ্ন। ছুরি জাতীয় কোন অস্ত্রের আঘাতে খুনটা করা হয়েছে। ছুরিটা হৃৎপিন্ডের ডান পাশ দিয়ে ঢুকে কোনাকুনিভাবে বাম দিকে গেছে। তারমানে, খুনি বাহাতি। ভিকটিমের পরিচয় জানতে পারলে খুনিকে বের করা খুব কঠিন হবে না। পরিচয় জানার কোন সূত্রই কি নেই?

    আনিসের হঠাৎ মনে হলো, গোপন পকেট আছে কি না নিজে একবার চেক করা দরকার। লাশের দিকে এগিয়ে গেলেন তিনি । কোমর থেকে শুরু করে পা পর্যন্ত প্রতি বর্গইঞ্চি জায়গা তন্ন তন্ন করে খুঁজলেন। মতিনের কাছ থেকে শার্টটা নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখলেন। কিছুই নেই!

    আনিস শার্টটা পরীক্ষা করছিলেন দুই হাতে কলারের দুই প্রান্ত ধরে। তার কাছে কলারটা একটু বেশী পুরু মনে হচ্ছিলো। ভাল করে পরীক্ষা করতেই তিনি বুঝলেন, কলারের দুই প্রান্ত মাঝের অংশের চেয়ে বেশী পুরু। আরও লক্ষ্য করলেন, দু’টি প্রান্তেরই নীচের দিক হাতে সেলাই করা। বাম দিকের সেলাই খুলে ভিতরে হাত দিতেই একটা কাগজের টুকরো হাতে ঠেকলো। বের করে আনতেই দেখা গেল একটা একশ রুপির নোট, লম্বালম্বিভাবে দু’ভাজ করা। রাজা পঞ্চম জর্জের ছবি-সম্বলিত এ ধরনের নোট ১৯২৩ সাল থেকে ছাপানো হচ্ছে। এত টাকা ছেলেটি সাথে রাখলো কেন?

    কলারের ডান প্রান্তে আর একটা একশ রুপির নোট আশা করছিলেন আনিস, কিন্তু বের হলো এক টুকরো সাদা কাগজ। তাতে ‘লবণ মিছিল’ নামের একটি ছড়া লেখা:

সমতলী, পাহাড়ি,
অনাহারী, আহারী,
যুবক বা প্রৌঢ়,
শ্যামলা বা গৌর,
ধনী আর নিঃস্ব,
গুরু কিবা শিষ্য –
ভুলে যাও কী ছিলে,
চলে এসো মিছিলে।


মুসলিম, হিন্দু,
এক থেকো কিন্তু,
ব্রাহ্মণ, শুদ্র,
কেউ নও ক্ষুদ্র,
শিয়া আর সুন্নি,
পাপী কিবা পুন্যী –
ভুলে যাও কী ছিলে
লবণের মিছিলে।

    ব্রিটিশদের চাকুরি করা এসআই আনিস হঠাৎ করে গান্ধীজীর ‘লবণ সত্যাগ্রহ’-এর গভীরতা বুঝতে পারলেন।

    প্রথমদিকে আরও অনেকের মত তিনিও হেসেছেন। লবণ একটা আন্দোলনের বিষয় হলো? সাদা সাহেবরাও বিষয়টিকে হাল্কাভাবে নিয়ে ছড়া কেটেছে, “গান্ডি, গোয়িং টু ডান্ডি।”

    কিন্তু, লবণ এমন একটা বস্তু, যা সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে প্রিয়। একজন ভারতীয় কেন লবণ তৈরি করতে পারবে না? বাড়ির পাশে সাগরের জলে লবণ থাকতেও কেন তাকে বেশী দামে ব্রিটিশ লবণ কিনতে হবে?

    কাগজটির উল্টোপাশে তাকাতেই সচকিত হলেন আনিস। লেখা আছে, ‘লিটন হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সকাল দশটা।’ চট করে ঘড়ি দেখলেন তিনি। অলরেডী দশটা দশ। তারিখ যদিও লেখা নেই, কিন্তু আজ সকাল দশটার কথাই এখানে বলা হচ্ছে মনে হলো তাঁর। গতকালের ঘটনা হয়ে থাকলে কাগজটি আবার কলারের মধ্যে স্থান পেতো না। যদিও দেরি হয়ে গেছে, তবু লিটন হলে গিয়ে দেখা যাক, ভাবলেন আনিস। কোন রুম নম্বর লেখা নেই, তবু যাওয়া দরকার। সুব্রতকে বললেন পোস্ট মর্টেমের জন্য লাশটা মিটফোর্ড হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে। তারপর দ্রুত পা বাড়ালেন।

তিন

কয়েক মাস আগে ঢাকায় পোস্টিং হলেও পূর্ববঙ্গের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়টি এখনও ভাল করে দেখা হয়নি আনিসের। একবার শুধু কার্জন হলের পাশ দিয়ে হেঁটে এসেছেন। তবে পত্র-পত্রিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক খবর তিনি পড়েছেন। এই তো বছর চারেক আগে নোবেলজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এখানে একটি কনফারেন্সে যোগ দিতে এসেছিলেন। জগন্নাথ হলের ম্যাগাজিনের জন্য ‘এই কথাটি মনে রেখো’ কবিতাটি লিখেছেন তিনি, যা পরে গান হিসেবে সমাদৃত হয়েছে। পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক সত্যেন বোসের নাম শুনলে দেশের সব মানুষের মাথা শ্রদ্ধায় নত হয়ে আসে। এমন কি সাদা সাহেবরা পর্যন্ত এই অধ্যাপকদেরকে ঘাঁটাতে সাহস করেন না।

    কিন্তু, এই মুহূর্তে চরম বিরক্তি নিয়ে ঢাকা হলের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন আনিস। লিটন হলের খোজ করাতে একজন ছাত্র এদিকে পাঠালো- কিন্তু, এখানে একটাই বিল্ডিং, লাল রং-এর, যার গেটে ‘DACCA HALL’ লেখা রয়েছে।  

    সাড়ে দশটা বেজে গেছে। গেটে কাউকে দেখা যাচ্ছে না। ছুটির দিনে দারোয়ানও ডিউটি ফাঁকি দিচ্ছে বোধ হয়।

    তেইশ-চব্বিশ বছর বয়সের একটা ছেলেকে হলের গেট দিয়ে বের হতে দেখা গেল। ভদ্র গোছের চেহারা, তবে ছাত্র নয় বলে মনে হচ্ছে। ছাত্ররা আজকাল শার্ট-প্যান্ট পরছে, এই ছেলেটি পরে আছে ধূতি-পাঞ্জাবি। পুলিশ দেখে একটু অবাক হলো ছেলেটি। হাতের ইশারায় তাকে কাছে ডাকলেন আনিস।

    “আমি লিটন হলের খোঁজ করছি। একজন ছাত্র এদিকে দেখিয়ে দিলো। কিন্তু, এটা তো ঢাকা হল।”

    “লিটন হলে তো কেউ থাকে না,” একটু অবাক হয়ে বললো ছেলেটি। “ঢাকা হলের ছাত্রদের কমন রুম, লাইব্রেরী- এসবের জায়গা না থাকায় বছর পাঁচেক আগে লিটন হলটি বানানো হয়েছে।”

    আনিসের মনে পড়লো, পত্রিকায় খবর ছাপা হয়েছিলো, এদেশের তখনকার গভর্নর লর্ড লিটন তার নামে নির্মিত অ্যাসেম্বলি হলটি উদ্বোধন করেছিলেন।

    “ঢাকা হলের এক্সটেনশনকে লিটন হল নাম দেয়া কি ঠিক হলো? লোকজন তো কনফিউজড হবে, আমি যেমন হয়েছি।”

    “তা ঠিক বলেছেন। কিন্তু লিটন হল নাম দেয়ায় ফান্ড পেতে সুবিধা হয়েছে।” একটু হেসে বললো ছেলেটি। আনিসও হাসলেন। “আপনি তো এখানকার অনেক কিছুই জানেন দেখছি। আপনার পরিচয়?”

    “আমার নাম মধু। মধুসূদন দে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় জন্মলগ্ন থেকেই সেন্ট্রাল বিল্ডিং-এর কাছে একটা ক্যান্টিন চালাই, মানে, বাবার ক্যান্টিন দেখাশোনা করি- আমার বয়স যখন পনেরো তখন থেকে।”

    “সেন্ট্রাল বিল্ডিংটা কোথায় বলুনতো?”

    “ঐ যে খেলার মাঠটা দেখছেন (হাত বাড়িয়ে পশ্চিম দিকে একটা বড় মাঠ দেখালেন মধু), এর দক্ষিণ পাশেই সেন্ট্রাল বিল্ডিং আর মুসলিম হল। আমার ক্যান্টিনও ওখানে।”

    “মুসলিম হলের জন্য নতুন বিল্ডিং হচ্ছে না? পেপারে পড়েছিলাম বোধ হয়।”

    “হ্যাঁ। মুসলিম ছাত্রদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। আগে হাতে গোনা কয়েকজন ছিল, এখন চারশ’রও বেশি। মোট ছাত্রের তিন ভাগের এক ভাগই মুসলিম। তাই পলাশীর কাছে নতুন বিল্ডিং হচ্ছে। নামটাও বড় হচ্ছে। ‘মুসলিম হল’ হয়ে যাচ্ছে ‘সলিমুলাহ মুসলিম হল’।”

    মধুকে ধন্যবাদ জানিয়ে আনিস ঢাকা হলের উত্তর পাশে লিটন হলের দিকে এগোলেন।

চার

এগারোটা বাজে। প্রায় পনেরো মিনিট ধরে  ‘LYTTON HALL’-এর গেটের কাছে দাঁড়িয়ে আছেন আনিস। এমন একটা জায়গা বেছে নিয়েছেন, যাতে হলের ভিতর থেকে তাকে দেখা না যায়।

    একটু বোকা বোকা লাগছে তার। সিভিল ড্রেসে থাকলে ভাল হতো। যার সাথে ভিকটিমের দেখা করা কথা ছিল, সে এতক্ষণ অপেক্ষা করে থাকলেও পুলিশ দেখে নিশ্চয়ই কিছু বুঝতে না দিয়ে সরে পড়েছে বা পড়বে। সিভিল ড্রেসে থাকলে আরেকটা সুবিধা হতো- কোন ঝামেলা ছাড়াই দোতলায় কমনরুমে (মধুদার কাছ থেকে শোনা) ঢুকে ‘নারায়নগঞ্জের দীপেনকে খুঁজছি’ বা এই জাতীয় কিছু একটা বলে ছাত্রদের সাথে আলাপ শুরু করতে পারতেন। হয়তো আলাপের মধ্য দিয়ে কিছু একটা বের হয়ে আসতো।

    ইউনিফর্ম থাকায় প্রভোস্ট স্যারের অনুমতি না নিয়ে হলে ঢোকা ঠিক হবে না। অনুমতি নিয়েও বা লাভ কী? পুলিশ হিসেবে ছাত্রদেরকে জিজ্ঞাসা করতে হবে ফর্মাল প্রশ্ন। কী ধরনের ফর্মাল প্রশ্ন করবেন তিনি? ভিকটিমের নাম-ঠিকানা কিছুই তো জানেন না।

    আনিস সিদ্ধান্ত নিলেন, আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করবেন। এর মধ্যে কাউকে দেখে যদি সন্দেহ হয়, তার সাথে আলাপ শুরু করবেন। তা না হলে প্রভোস্ট স্যারের অনুমতি নিয়ে ফর্মাল জেরা শুরু করবেন। আগে ছাত্রদেরকে বলে নিবেন, লবণ-আন্দোলনের সাথে সংশি­ষ্টতা পেলেও তিনি কাউকে গ্রেফতার করবেন না, বা কারও নাম রিপোর্টে লিখবেন না। দরকার হলে প্রভোস্ট স্যারের সামনে তিনি এই কথা দিবেন, যাতে তা ছাত্রদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়। তারপর ‘লবণ মিছিল’ ছড়াটি শুনিয়ে ছড়াকারের মৃত্যুর খবর দিবেন (খুন হয়েছে তা প্রথমে বলবেন না), ছড়াকারের নাম-ঠিকানা কারও জানা আছে কিনা তা জিজ্ঞাসা করবেন। এখন আরও পনেরো মিনিট অপেক্ষা করে দেখা যাক।

    আকাশী শার্ট আর বাদামী প্যান্ট পরা একজন ছাত্র লিটন হলের ভেতর থেকে বের হয়ে গেটে দাঁড়ালো। এদিক ওদিক তাকানোর ধরন দেখে বোঝা গেল কাউকে খুঁজছে সে। আনিসকে দেখে একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেলো। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে সামনের গাছগুলির দিকে তাকিয়ে রইলো।

    আনিস ছেলেটির দিকে এগিয়ে গেলেন। ছেলেটি প্রথমে একটু ইতস্তত: করলেও পরে মনস্থির করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। সে যদি লবণ-মিছিলের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়েও থাকে, মাত্র একজন পুলিশ দেখে ঘাবড়ে যাবার কোন কারণ নিশ্চয়ই নেই। তাছাড়া, সংশ্লিষ্টতার প্রমাণই বা কোথায়!

    “আমি সাব-ইন্সেপেক্টর আনিসুর রহমান। আপনার সংগে একটু কথা বলতে পারি?”

    “বলুন।” ছেলেটির কন্ঠে সতর্কতা।

    “আপনার পরিচয়?”  

    “আমি সৈকত মিত্র। ‘সংস্কৃত ও বাংলা’ বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষ অনার্সের ছাত্র।”

    “আপনি কি কারও জন্য অপেক্ষা করছেন?”

    “কেন জানতে চান বলুন তো,” সৈকতের পাল্টা প্রশ্ন।

    ছেলেটি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ কোনটাই বলেনি, লক্ষ্য করলেন আনিস।

    “দশটায় কারও আসার কথা ছিল?” জানতে চাইলেন তিনি।

    সৈকত একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেলো। চট করে সামলে নিলো, কিন্তু কিছু বললো না। আনিস মোটামুটি নিশ্চিত হলেন, এর সাথেই ভিকটিমের দেখা করার কথা ছিল। আলোচনা এগিয়ে নেয়ার স্বার্থে ছেলেটাকে অভয় দেয়া দরকার।

    “দেখুন, আমি শুধু খোঁজখবর নিতে এসেছি। দরকারি কিছু তথ্য পেলে আমার উপকার হয়। যার কাছ থেকে সাহায্য পাবো, তাকে কোন ঝামেলায় ফেলতে চাই না।”

    “ঠিক আছে,” বললো সৈকত। ‘তবে, আমাকেও একটা তথ্য দিন তো। এখানে যার আসার কথা ছিলো, তাকে কি গ্রেফতার করা হয়েছে?”

    “না, খবর অন্য রকম। এর বেশি বলার আগে আমি নিশ্চিত হতে চাই, আমরা দু’জনে একই ছেলের কথা বলছি কি না। ঠিক আছে?”

    “ঠিক আছে,” বললো সৈকত।

    “আপনার বাড়ি কোথায়?”

    “মুন্সিগঞ্জ। একই এলাকায়। ওর কি কিছু হয়েছে?”

    “ওর চেহারার বর্ণনা দিন তো।” সৈকতের বর্ণনার সাথে ভিকটিমের চেহারা মিলে গেল।

    “ওর নাম কী?” জানতে চাইলেন আনিস।

    “আসাদ আহমেদ।”

    “ছড়া-কবিতা লিখতো?”

    “হ্যাঁ, অনেক ভালো লেখে –” হঠাৎ চমকে উঠলো সৈকত। উৎকন্ঠিত হয়ে জানতে চাইলো, “লিখতো বললেন কেন? কী হয়েছে ওর?”

    দুঃসংবাদটি সৈকতকে দিলেন আনিস। চেষ্টা করেও ছেলেটি চোখের জল আটকাতে পারলো না। ‘লবণ মিছিল’ ছড়াটি পড়ে ওর কান্না আরও বেড়ে গেলো।

    ওকে একটু ধাতস্থ হবার সময় দিলেন আনিস। তারপর ধীরে ধীরে প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো ওর কাছ থেকে জেনে নিলেন। টুকরো টুকরো তথ্যগুলো জোড়া দেয়ার পাশাপাশি সৈকতের ধারণা আর নিজের যুক্তি ব্যবহার করলেন। সব মিলিয়ে ঘটনা দাঁড়ালো এরকম:

    আসাদের বাড়ি মুন্সীগঞ্জের রামপালে। বছর দুয়েক আগে সৈকতের সঙ্গে ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়ট পাশ করে সে। কিন্তু, এর পর পরই ওর বাবা মারা যাওয়ায় মা আর ছোট ভাইকে দেখাশুনার ভার পড়ে ওর উপর, প্রাতিষ্ঠানিক পড়া বন্ধ হয়ে যায়। বাবার জমিজমা রক্ষণাবেক্ষণের পাশাপাশি মুন্সিগঞ্জের ‘জগদ্ধাত্রী নাট্যমঞ্চ’-এর পরিচালনায় ভূমিকা রাখতো সে।

    গতকাল খুব ভোরে মুন্সিগঞ্জ থেকে পায়ে হেঁটে রওয়ানা দেয় আসাদ। নারায়নগঞ্জ পৌঁছে দশটার ট্রেন ধরে সে ফুলবাড়িয়া স্টেশনে নামে আনুমানিক এগারোটায়। সারাদিন ব্যক্তিগত কিছু কাজেই হয়তো ব্যস্ত ছিলো (সেরকমই জানিয়েছিলো সৈকতকে)। কিছুদিন আগে জানতে চেষ্টা করেছিল ‘রাধারানী’ কবে মুক্তি পাবে, তাই অনুমান করা যায় গতকাল সে সিনেমাটি দেখেছে। রাতে কোথায় থাকার প্লান ছিলো, তা সৈকত জানে না – ওর সাথে দেখা করার কথা ছিলো আজ সকাল দশটায় – আসতে দেরি হচ্ছিল বলে প্রতি পনেরো মিনিট পর পর নিচে নেমে দেখে যাচ্ছিলো সৈকত। ‘লবণ সত্যাগ্রহ’-এর  সাথে সংহতি জানিয়ে ঢাকায় একটা বড় মিছিল বের করার পরিকল্পনা ছিলো আসাদের। সে উদ্দেশ্যেই ‘লবণ মিছিল’ ছড়াটি লেখা। নতুন কোন ছড়া বা কবিতা লিখলে সৈকতকে আগে পড়িয়ে ওর মতামত নিয়ে পরে অন্যদেরকে শোনাতো সে। ছড়াটি কমপক্ষে হাজারখানেক কপি ছাপিয়ে বিলি করার ইচ্ছা ছিলো তার।

পাঁচ

আসাদের লাশ মুন্সিগঞ্জে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। ছড়া লেখা কাগজটি আবার সৈকতের হাতে দিলেন আনিস, কাগজের উল্টোপাশে আসাদের বিস্তারিত ঠিকানা লিখে দিতে অনুরোধ করলেন। লক্ষ্য করলেন, সৈকত ডান হাতেই ঠিকানা লিখছে। যদিও প্রথম থেকেই ওকে খুনি মনে হয়নি, তবে এবারে আরও নিশ্চিত হলেন আনিস।

    “এলাকার কারও সাথে আসাদের ব্যক্তিগত শত্রুতা ছিলো?” জানতে চাইলেন তিনি।

    “মুন্সিগঞ্জ শহরে আসাদের বাবার কিছু জমি ছিলো। উনি মারা যাবার পর মোবারক নামের এক গুন্ডা প্রকৃতির লোক জমিটা দখল করার চেষ্টা করেছিলো, তবে এলাকায় আসাদের জনপ্রিয়তা আর প্রভাবের কারণে সুবিধা করতে পারেনি।”

    “লোকটা কি বাহাতি?” আনিসের কন্ঠে উত্তেজনা।

    “আপনি জানলেন কী করে?” অবাক হয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলো সৈকত।

    মুচকি হাসলেন আনিস, কোন উত্তর দিলেন না। লিটন হলে আসাটা সব দিক দিয়ে ফলপ্রসূ হয়েছে। পোস্ট-মর্টেম শেষ হলে বিকালের ট্রেনে লাশ পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। মুন্সিগঞ্জের পুলিশকে নির্দেশ পাঠাতে হবে সন্দেহভাজন হিসেবে মোবারককে গ্রেফতার করার জন্য।

    সৈকতকে ধন্যবাদ জানালেন আনিস, হাত বাড়ালেন ‘লবণ মিছিল’ লেখা কাগজটি নেয়ার জন্য।

    একটু ইতস্তত: করছে সৈকত, কাগজটি দিচ্ছে না।

    “ছড়াটা তো আপনার দরকার নেই,” বললো সৈকত। “আসাদের ঠিকানাটা অন্য একটা কাগজে লিখে দিই?”

    আনিস বুঝতে পারলেন, বন্ধুর লেখা ছড়াটি হাতছাড়া করতে চায় না ছেলেটি। হয়তো ছড়াটা ছাপিয়ে বিলি করে বন্ধুর শেষ ইচ্ছা পূরণ করতে চায়।

    “কাগজটা খুনের সাক্ষ্যপ্রমাণের অংশ। আমার রিপোর্টে এটার কথা উলে­খ করতে হবে। অন্য সব সাক্ষ্যপ্রমাণের সাথে অফিসে জমা দিতে হবে।”

    একজন তরুণ ছড়াকারের জীবনের শেষ ছড়াটি সরকারি ফাইলে বন্দি হবে, কখনও আলোর মুখ দেখবে না – একথা চিন্তা করে আনিসের মনেও একটা কষ্টের অনুভূতি তৈরি হলো। কিন্তু, তাঁর কিছু করার নেই। সুব্রত, কালাম আর বিশ্বনাথও এই কাগজের কথা জানে। রিপোর্টে এর উল্লেখ না করে বা জব্দ তালিকায় এটা জমা না দিয়ে কোন উপায় নেই।

    “ঠিক আছে, নিয়ে যান,” বললো সৈকত। “এক মিনিট। শেষবারের মতো ছড়াটা একটু পড়ি।”

    খুবই মনযোগ দিয়ে ছড়াটা পড়তে শুরু করলো সৈকত। পড়তে যেটুকু সময় লাগার কথা, তার চেয়ে বেশি সময় নিচ্ছে ও। আনিস হঠাৎ বুঝতে পারলেন, ছড়াটা মুখস্থ করছে ছেলেটি।

    ব্রিটিশ সরকারের বেতনভোগী একজন পুলিশ অফিসার হিসেবে এই মুহূর্তে আনিসের দায়িত্ব হলো ছেলেটিকে বাধা দেয়া। ছড়াটি মুখস্থ করতে না দেয়া। কারণ, সৈকত এ ছড়াটি মুখস্থ করতে পারলে কাল-পরশুর মধ্যে এর শত শত কপি দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়বে। লবণ আন্দোলন নতুন মাত্রা লাভ করবে।

    গত কয়েকদিন ধরে আনিসের প্রধান কাজই ছিলো এই লবণ আন্দোলন দমন করা। কিন্তু, চেষ্টা করেও আনিস ছেলেটিকে কিছু বলতে পারলেন না। ‘লবণ মিছিল’-এর সরল আবেদন তার মনে ঘুরপাক খেতে লাগলো।

    আনিস জানেন ছড়াটি জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে তাকে সাদা সাহেবদের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। যে ছড়াটি লাশের শার্টের কলার থেকে তিনি উদ্ধার করলেন, সেটা কখন কিভাবে আন্দোলনকারীদের হাতে পৌঁছালো? যদিও এর একটা যুক্তি দাঁড় করানো যায় এভাবে, ছড়াটির আরও একটি কপি হয়তো আসাদ মুন্সিগঞ্জের কোন বন্ধুর কাছে রেখে এসেছিলো – এই যুক্তি ধোপে টিকবে কি? একটু দুশ্চিন্তায় পড়লেন আনিস।

    যা থাকে কপালে। গান্ধীজীর আহবানে সাড়া দিয়ে বেশ কয়েকজন সরকারি চাকুরিজীবি ইতোমধ্যে চাকুরি ছেড়েছেন, আর তিনি এটুকু ঝুঁকি নিতে পারবেন না? আসাদের জীবনের শেষ ছড়াটি আলোর মুখ দেখুক। শত কন্ঠে এই প্রতিভাবান ছড়াকারের নাম উচ্চারিত হোক, ভাবলেন আনিস। “বন্দে মাতরম,” মনে মনে বললেন তিনি।

(শেষ)

১. সে সময় কোনো বাংলা দৈনিক পত্রিকা ছিলো না। “ঢাকা প্রকাশ” ছিলো সর্বাধিক প্রচারিত সাপ্তাহিক (প্রচার সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার)।
২. “মুকুল” সিনেমা হলের বর্তমান নাম “আজাদ”।
৩. বর্তমানে যেখানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ, সেখানেই ছিলো সেন্ট্রাল বিল্ডিং, মুসলিম হল আর মধুর ক্যান্টিন।
৪. “LYTTON HALL” এর নাম পরিবর্তন করা হয়নি, তবে কেউ এখন এই নাম ব্যবহার করে না। সবাই বলে “শহীদুল্লাহ হল অফিস”।
৫. মুন্সিগঞ্জের “জগদ্ধাত্রী নাট্যমঞ্চ” ১৯০০ সালের কিছু আগে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আজও টিকে আছে।
কমেন্ট করুন

প্রাক্তন শিক্ষার্থী

পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সেশনঃ ১৯৮৩ - ৮৪

জাফর আহমেদ খান

প্রাক্তন শিক্ষার্থী পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেশনঃ ১৯৮৩ - ৮৪

0