আড়াল

আমি শাহেদ। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। চুপচাপ বসে আছি। আমার দুই স্ত্রী আমার সামনে বসা! প্রথম স্ত্রী রূপা- অন্তঃসত্ত্বা, দ্বিতীয় স্ত্রী কাজল। রূপা এসবের কিছুই জানে না। জানা সম্ভব না। কিন্তু এরা দুজন একসাথে! কীভাবে? তাও আবার একটা রেস্তোরাঁয়! আমাদের তিনজনের এক সাথে পারিবারিক সালিশে দেখা হলেই বোধহয় ভালো হতো। তিনজনের অস্বস্তিকর নীরবতা ভালো লাগছে না। বরং রূপার বাবার চিৎকার চেঁচামেচি ভালো লাগতো। ঘড়ি দেখলাম আধা ঘণ্টা হয়ে গেছে, ওয়েটার এসে খাবার দিল। দুটো কফি, একটা জুস। জুসটা হাত বাড়িয়ে নিল রূপা। জুসটা চুপচাপ খেয়ে নিল। তারপর সে নীরবতার বরফ গলিয়ে বলে গেল, সময়মতো ডিভোর্স লেটার পেয়ে যাবে। বলে চলে গেল। অথচ কাল রাতেও ঘুমাতে দিচ্ছিলো না। এক হাতে জড়িয়ে ধরে বলছিলো আমাকে ছেড়ে যাবে না তো? আমি সরিয়ে দিয়ে বলেছিলাম। কী আকার হয়েছে তোমার খেয়াল আছে? সরো, ভীষণ গরম লাগছে! আর আজ এত সহজে মুক্তি? কয়দিন আমার কথার ঝাঁঝে সে ডায়েট করে বাচ্চার ওজন কমিয়ে ফেলে ডাক্তারের বকুনিও খেয়েছিল।
বাবা মা রূপাকে ভীষণ ভালোবাসে। কিন্তু রূপা আমাকে প্লট সাজানোর সময় দিল না, বাসায় ম্যানেজ করার। আমি বাচ্চাটাও চাইনি। ও জেদ করে বাচ্চা রাখলো। যদিও বিয়ের তিন বছর পর বাচ্চা না নিতে চাওয়ার আমার তেমন শক্ত কোনো কারণ ছিল না। ভালো চাকরি করি, রূপাও পাশের একটা স্কুলে চাকরি করে৷ আমার বাবা-মায়ের সম্পত্তি একেবারে কম না। তাই আমার আপত্তি ধোপে টেকেনি। আর মা তো জানার পর রাজরানী করে রেখেছিল ওকে। আমি সময় দিতাম না। বাবা বা ছোট ভাইয়ের সাথে ডাক্তার দেখাতে যেত, মা সাথে যেত সবসময়। এমন মাথায় করে রাখা মানুষ হঠাৎ এভাবে চলে গেলে, বাসায় কী অবস্থা হবে কে জানে৷ কিন্তু বাসায় ফিরে আমি তো অবাক। আমার ঘরে রূপার যা কিছু ছিল একদম গায়েব। আমি যেন ব্যাচেলর। মা, বাবা কেউ কোন কথা বলছে না। খাবার খেতেও কেউ ডাকেনি। কাজলকে বিয়ে করাটা আমার অপরাধ ছিল, কিন্তু তাই বলে নিজের বাবা মা বুঝবে না? আমি কি কারণ ছাড়া বিয়ে করেছি? রূপা ভালো মেয়ে নিঃসন্দেহে, কিন্তু স্ত্রী হিসেবে ভীষণ নিরুত্তাপ। বিয়ের আগে তার জীবনে নাকি কেউ ছিল না। আমিই প্রথম পুরুষ! হাস্যকর!

মাস খানেক পর,
মা বাবা একটু স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। রূপার সাথে কোন যোগাযোগ নেই। ঐ বাচ্চা নিয়েও আমার কোন আগ্রহ নেই। কাজলের সাথে সবকিছু আগের মতো চলছে। সময় পেলেই লং ড্রাইভ, রিসোর্টে রাত্রিযাপন। ভীষণ ভালো কাটছিল। হঠাৎ অফিসে নতুন গুঞ্জন। নতুন জয়েন করা এক ছেলে- নাম ফাহাদ, বসের ভাগনে, বিদেশ থেকে পড়ে এসেছে। তাকে নাকি প্রমোশন দিয়ে ইউএস পাঠানো হবে৷ ব্যস্‌! শুরু হয়ে গেছে মেয়েদের লাইন! অথচ এতদিন জানতাম প্রমোশনটা আমিই পাচ্ছি। আমার পারফরম্যান্স খারাপের দিকে যাচ্ছে। হঠাৎ কী করে সবকিছু বদলে গেল বুঝলাম না। কাজল আগেই ফিরত, কখনো এক সাথেই ফিরতাম। আমাদের বিয়ের ব্যাপারটা অফিসে এখনো গোপন করেছি, বস আর তার স্ত্রী রূপাকে দেখেছে আমাদের বিয়েতে, ভালো গিফট দিয়েছে, দাওয়াত করে খাইয়েছেন। হুট করে বৌ বদলে গেলে মুশকিল হতো। আর বস কাজলকে খুব একটা পছন্দ করেন না। ও নাকি কাজ ফাঁকি দেয়! ওর মতো আগুন সুন্দরীর জন্য সব জায়েজ। সেটা বস বুঝবেন কীভাবে?
আজ কাজল একটু বেশিই দেরি করছে। কল দিয়ে দেখলাম, ফোন সুইচড অফ। ও ফিরল বারোটার কিছু পর, বারান্দায় ছিলাম আমি, গাড়িটা চিনতে একদম ভুল হলো না! ফাহাদের গাড়ি!
চাবি দিয়ে দরজা খুলতেই আমি গালির তুবড়ি ছোটালাম। কাজল এসে ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে বললো, আমি তোমার বৌ রূপা না যে সব অন্যায় মাথা পেতে নিয়ে তোমার মতো জানোয়ারের মন পেতে সন্তানের মা হবো। বলে ওয়াশরুমে চলে গেল।
তাই তো! রূপার খবর নেওয়া হয়না, অনেকদিন। প্রায় এক ঘণ্টা পর কাজল বের হলো গোসল আর রাতের রূপচর্চা সেরে, বাথরোব পরা, ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে সেরাম মাখছে। মোহনীয় সুগন্ধি ভাসছে রুম জুড়ে। আমি এগিয়ে ওর ঘাড়ে আলতো করে ঠোঁট বুলাতেই ভয়ংকর এক ধাক্কা দিল। এক রাতে আর নিতে পারবে না সে! সে রূপা না, যে তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষায় থাকে, আমাকে পেতে! রূপচর্চা শেষে বিছানায় চলে গেল। আমাকে চোখের ইশারায় শাসন করে গেল, যেন না ঝাঁপিয়ে পড়ি ওর উপর। আমি তখনও ওর ধাক্কা খেয়ে মেঝেতে বসা। মনে পড়ল, বহু রাত এভাবে মেঝেতে বসে থাকত রূপা।
সবকিছু থেকে একটু ব্রেক নিতে বাসায় গেলাম। গিয়ে খুবই অবাক। বাবা, মা, ভাই কেউ বাসায় নেই। জানলাম ওরা হাসপাতালে, রূপার কাছে গেছে। মেয়ে হয়েছে। আমার কোন আগ্রহ নেই। হামিদা খালাকে খাবার দিতে বললাম, খেয়ে ঘুমাতে গেলাম৷ আমার ঘর আজ আমার কাছেই অচেনা লাগছে। বাবা একটা ড্রিম ক্যাচার এনেছিল, ওটা ঝুলতো আমার মাথার কাছে দেয়ালে। শরীরে মসলার গন্ধ অসহ্য লাগে বলার পর থেকে গোসল করেই কাছে আসত রূপা। কিন্তু ওর শরীরে সেই মাদকতা ছিল না। উঠে বারান্দায় গেলাম। এখানে মিনি বাগান ছিল রূপার। এখানে বসে কত বিকেল কাটিয়েছে। কত তারা গুনেছে। সেই চেয়ার টেবিল নেই। বাকিরা ফিরেছে। বাবা মায়ের রুম থেকে শব্দ আসছে৷ রাসেল ফেরেনি নাকি? ওর রুম এখনো অন্ধকার।
পরদিন সকালেও রাসেলের দেখা পেলাম না, অফিসে চলে গেলাম। কাজল আর ঐ ফাহাদ সাহেবের মেলামেশা নিতে পারছিলাম না। ছুটি নিয়ে বাড়ি এলাম। দেখি বিশাল আয়োজন। আমি খুব অবাক। রূপাকে এরা ওয়েলকাম হোম জানাচ্ছে! আরও সাতদিন পর হাসপাতাল থেকে ছুটি পাবে রূপা। মা বাবা বাজারের লিস্ট আর বাড়ি সাজানো নিয়ে তুলকালাম করছে, তার চেয়ে আমি অবাক রাসেলকে দেখে, সে রাত জেগে এসে এখন প্ল্যানিং এ অংশ নিয়ে কোনমতে খাওয়া গোসল সেরে আবার হাসপাতালে দৌড় দিল। কী হচ্ছে এসব!
সাতদিন বাদে জানলাম। রূপা এই বাড়িতে আসছে, রাসেলের বাগদত্তা হয়ে! আমার সাথে ডিভোর্সের আইনি জটিলতা শেষ হলেই তারা বিয়ে করছে৷ রাসেলের এত বড় সর্বনাশ আমি হতে দিতে পারিনা। ও আমাকে এড়িয়ে চলে। বহু কষ্টে একটা বৃহস্পতিবার রাতে ওর সাথে কথা বলার সুযোগ পেলাম। বাবা মা তাদের পৌত্রী দেখতে রূপার বাপের বাড়ি গেছে।

  • দেখ রূপার সমস্যাগুলো তোর জানা উচিত।
  • কী সমস্যা?
  • আরে বুঝিস না? মাত্রই বাচ্চা হলো। আর তোর কি পাত্রীর অভাব পড়েছে? তুই আমার চেয়ে বহুগুণে সুদর্শন। মনে আছে, স্কুলে লাইন লেগে যেত মেয়েদের, তোর সাথে বন্ধুত্ব করার জন্য?
  • পাত্রী খুঁজিনি আমি, জানিনা অভাব আছে কিনা।
  • মানে ভেবে দেখ। ম্যান টু ম্যান কথা বলি। আমি ওর কাছে একদম সুখ পাইনি!
  • আচ্ছা!
  • এরপরও তুই ওকে বিয়ে করবি?
  • ভাইয়া, মা যেদিন প্রথম বললো আমিও আকাশ থেকেই পড়েছিলাম। ভাইয়ের ছেড়ে দেওয়া স্ত্রী বলে না, আমি তাকে প্রেয়সীর দৃষ্টিতে কখনো দেখিনি, আমার চোখে তার জন্য সম্মানজনক স্থান ছিল, তোর দেয়া অপমান আর স্ট্রেসে যখন মেয়েটা একা একা লড়ছিল, বাচ্চার ক্ষতি যাতে না হয় তার জন্য চিকিৎসা নিচ্ছিল, হাজারবার সুই ফুটিয়েছে হাসিমুখে, তখন আমি ধীরে ধীরে তাকে বন্ধুর স্থান দিয়েছি, ওর প্রতিটি লড়াইয়ে না পারলেও যথাসম্ভব চেষ্টা করেছি যত্নে রাখার, বুঝেছি ও আগলে রাখার মতো অমূল্য। ওটিতে নেওয়ার আগে যখন ও আমায় দেখতে চাইল, আমি ওর হাত ধরে ভরসা দিলাম আমি আছি! ঠিক বিশ মিনিট বাদে কাপড়ে মোড়া তুলোর বলটা যখন আমার দিকে পিট পিট করে চাইলো, আমি বুঝলাম এই মেয়ে আমার, ভিতরে আমার স্ত্রী ভালো আছে আস্বস্ত করলেন সিস্টার, সত্যিই ভীষণ ভালো লেগেছে আমার কথাটা শুনে৷ মনে হয়েছে আমিই বাবা হয়েছি।
  • আবেগ দিয়ে জীবন চলেনা।
  • রূপা চলে যাওয়ার পর বাসা কেমন ফাঁকা হয়ে গেল, বাবা মা লজ্জায় মুখ দেখাতে পারতেন না। পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয় স্বজনরা যা নয় তা বলে গেছে। রূপাকে দেখতাম শান্ত দীঘির মতো, ওর গভীর শান্ত চোখে আরও গভীর দুঃখ সযত্নে লুকিয়ে ও হাসিমুখে কথা বলতো৷ বাবা মায়ের লজ্জার ব্যাপারটা বুঝতো, তাদের কখনো অপমান করেনি, ছোট করেনি।
  • তুই পাড়া প্রতিবেশীর জন্য এমন একটা মেয়ে বিয়ে করবি?
  • আমি শুধু পরিস্কার ধারণা পেতে চেয়েছিলাম তুই রূপার কাছে ফিরতে চাস কিনা। আমি ভাই হয়ে তোদের মধ্যে দেয়াল তুলে দিতে চাই না। কিন্তু দেয়াল তুই আগেই তুলেছিস, আমি হয়তো তা একটু মজবুত করে দিলাম, আর কী!
  • আমি কীভাবে এসব মেনে নেব? রূপা রাজি এই বাড়িতে আসতে?
  • আপাতত আমার অফিসের কাছে ভাড়া বাড়িতে ওঠার প্ল্যান আছে। মা, বাবা রাজি হবেন কিনা জানিনা! বাচ্চাটাকে এক মুহূর্ত চোখের আড়াল করতে চায় না মা।
  • ওহ! প্ল্যানও করা হয়েছে? কতদিনের মেলামেশা? মেয়েটা তো তোর তাই না? তাই সহজেই বিয়েতে রাজি? কতদিন চলছে আমাকে ঠকিয়ে, হ্যাঁ?
  • সিনক্রিয়েট করিস না। তুই খুব ভালো করে জানিস এসব সত্যি না। আর ভাইয়ের দাবি নিয়ে আমার সামনে কোনোদিন দাঁড়াবি না।

রাসেল উঠে চলে গেল। ওর চোখে দেখলাম এক রাশ ঘৃণা। আমি তো ওর ভালো চেয়েছি৷

সেদিনের পর আমি বাড়ি যাইনা মাস খানেক হলো। ডিভোর্স সম্পন্ন হয়েছে। ফাহাদের ইউএস যাওয়ার ডেট এসেছে। কাজল খুব ভেঙে পড়েছে। বলা বাহুল্য, ফাহাদ কাজলের সাথে সিরিয়াস ছিল না। আমি আর কাজল বাকি কলিগদের সাথে ফাহাদকে সি অফ করতে এসেছি। ফিরতি পথে আমি কাজলের হাতটা ধরতে চাইলাম। কাজল হাত না ধরলেও আমার সাথেই ফিরলো। রাতে আবার আগের মতো আমরা ঘনিষ্ঠ হলাম। অবাক কান্ড! কাজলে কোন মাদকতা নেই! নিরুত্তাপ কাজল শুধু পাথরের মূর্তির মতো পড়ে আছে! ওর চোখে জল গড়িয়ে পড়ছে! আমিও উৎসাহ হারিয়ে সরে গেলাম। নিজেকে সামলে ওর দিকে তাকালাম, ডিম লাইটের মোহময় আলোয় সেই আকর্ষণীয় পেলব শরীর, এতটুকু বাড়তি মেদ নেই, তাহলে কী নেই? প্রেম? নাকি কোন আড়াল নেই? দুজন দুজনের মতো খোলামেলা যা খুশি করে গেছি। মাদকতার জন্য বোধহয় একটু আড়াল প্রয়োজন। ভেজা চোখে নিরাভরণ শরীরে উঠে বসে কাজল। লাইট জ্বালিয়ে দেয়।

  • শাহেদ, আমার মা এই একই ভুল করেছিল। টাকা আর সফলতার পিছনে একাগ্রচিত্তে লেগে থাকতো। যেকোনো কিছুর বিনিময়ে হাসিল করেছিল আমার বাবাকে। বিরাট ব্যবসায়ী, তোমরা এক নামে চিনবে। কিন্তু তার ভরভরন্ত সংসার, সন্তান ছিল। মাকে কোনোদিন সম্মান দেয়নি ও বাড়িতে। বাবার লাশ অব্দি আমরা শেষ দেখা দেখিনি। অথচ বাবার অধিকাংশ রাত আমার মায়ের কাছে কাটতো। জানের হুমকি দিয়ে শহর ছাড়া করলো বাবার সন্তানেরা। মা খুব চেয়েছিল আমি লেখাপড়া করি, শিক্ষিত হয়ে স্বাবলম্বী হই। কিন্তু স্কুলেই ছেলেরা আমার রূপের আগুনে মুগ্ধ। সামান্য চোখের ইশারায় আমি অনেক কিছু করাতে পারি। শুরু হলো পথভ্রষ্ট জীবনের পথে পা বাড়ানো। তোমার উপর নজর ছিল শুরু থেকেই, প্রমোশনের কথা কানে যেতেই টার্গেট করি, তুমি ঠিক তখনই পরিবারের পছন্দে বিয়ে সেরে ফেলেছ৷ বাকি গল্প তোমার জানা।
  • তোমাদের কে জানালো?
  • আমিই রূপাকে জানিয়েছি। তোমার-আমার কিছু আপত্তিকর ছবি, ভিডিও পাঠিয়েছিলাম। কারণ, আমি আমার মায়ের মতো পরিচয়হীন হয়ে মরতে চাইনি।

শাহেদ কাজল চুপচাপ দুইদিকে মুখ করে ঘুমানোর চেষ্টা করছে। শারীরিক-মানসিক কোনো রহস্য আর অবশিষ্ট নেই। এখন শুধু জীবনের নিয়মে জীবনযাপন করতে হবে।

কমেন্ট করুন
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.