খুশির ঈদ

নাহার বড় পাতিলটা নামিয়ে ধুয়ে রাখবেন কিনা ভাবছেন। পুরো বাড়ি পরিস্কার করা শেষ। উঠান অব্দি ঝকঝকে করে ফেলেছেন।শুধু রান্নার সরঞ্জাম আর কাটাকুটির জিনিসপত্র পরিস্কার করা হয়নি। লাগবে কিনা তিনি জানেন না। ঈদের দশদিন বাকি। ছেলে দুটোও আসার ফুরসত পাচ্ছে না। ভার্সিটিতে ছুটি, কিন্তু ছাত্র পড়ায়, সেখানে ছুটি নেই! রিমি একাই উঠানে বসে কি যেন করছে। ক্লাস ফাইভে পড়ে, ভার্সিটি পড়ুয়া ভাইদের চোখের মণি। দরজায় শব্দ পেয়ে এগিয়ে গেলেন নাহার, মেয়ে দরজা খুলে দিয়েছে, ওদের বাবা এসেছেন ।
• এতক্ষণে এলে?
• দোকানে আজ বেশ ভীড় ছিলো।
• আলহামদুলিল্লাহ।
• বেচা বিক্রি ভালো হয়েছে আজ, খেতে দাও, একটু গড়িয়ে আবার যাই।
• বাবা,এবেলা না গেলে হয়না? রিমি এসে বায়না জুড়েছে।
• না রে মা, ঈদ চলে এসেছে, মানুষ আনাজপাতি কিনছে।
• আমরা কিনবো না?
• যা পানি দে তোর বাবাকে, আমি ভাত বাড়ছি, মুখ হাত ধুয়ে এসো মেয়ের বায়না থামিয়ে দেন নাহার।

মেয়েটাকে হাজার বুঝিয়েও লাভ হয়না। কুরবানি কেনার টাকা থাকলে তো কিনেই ফেলত! ভাত বেড়ে, সবজি আর ডাল আলাদা বাটিতে তুলে খাবার টেবিলে দেন নাহার৷ মেয়ে প্লেট আর পানি দিয়েছে। গামছা এগিয়ে দিয়েছে, বাবার খুব যত্ন করে মেয়েটা।

• বুঝলে নাহার কারো কাছে ভাগ পেলাম না, এদিকে একটা ছাগল কিনবো কিনবো করে..….!
• সাকিব, রাকিব আসুক, ওরা ভালো বুঝে যা করার করবে, তুমি এই শরীরে হাটে যেও না।
• হাটে গিয়েছিলাম কামরান সাহেবের সাথে, উনি পাঁচ লাখের গরু কিনলেন।
• উনার তো টাকার পাহাড়।
• হ্যা তা আর বলতে, রিমিকে খেতে দিয়েছ?
• ও স্কুল থেকে এসেই খেয়েছে।
• রাকিব সাকিব কবে আসবে কিছু বলেছে?
• না আর বললো কখন? কাল কাল করে তো সাত দিন গেলো।
• ওদের উপর দিয়ে তো কম গেলো না।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবেন নাহার। বছর দুই আগে হঠাৎ কারখানায় অজ্ঞান হয়ে গেল শফি সাহেব। সহকর্মীরা দ্রুত হাসপাতালে নিল। হৃদরোগ ধরা পড়লো, ছেলে দুটো রাতের ট্রেনে বাড়ি এলো, তারপরের ঘটনা খুব দ্রুত ঘটলো, এ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে হৃদরোগ ইন্সটিটিউটে নিয়ে যাওয়া হলো, আরো কিছু পরীক্ষা করে জানা গেলো, রিং ( স্টেন্ট) পরাতে হবে। লাখ টাকার ব্যাপার। ছেলে দুটো আবার বাড়ি গেল, কারো কাছে ধার পাওয়া যাচ্ছিলো না। তখন দেবদূতের মতো হাজির হলেন কামরান সাহেব। উনি টাকা ধার দিতে রাজি হলেন। টাকা নিয়ে ছেলেরা ফিরে এলো, অপারেশন হলো, বেশ কিছুদিন ভর্তি থাকতে হলো, অবস্থা বিশেষ ভালো ছিলো না। অবশেষে আল্লাহর অশেষ কৃপায় ফিরে এলেন শফি সাহেব। সেই বছর কোন ঈদ ছিলো না তাদের। গ্রামে গিয়ে ফসলী জমি বিক্রি কেন্দ্র করে শফি সাহেবের ভাইদের সাথেও আর সম্পর্ক ভালো নেই। জমি বিক্রি করে টাকা শোধ করে, কিছু টাকা দিয়ে বাজারে দোকান দেওয়া হলো, এটাও কামরান সাহেবের বুদ্ধি। দোকান চলছে মোটামুটি। মেয়েটা সরকারি স্কুলে পড়ে, ছেলে দুটো কিছু টাকা পাঠায়, চলে যায়। কিন্তু বড় খরচে মুখ শুকিয়ে যায়৷

• কি হয়েছে নাহার? সেই কখন থেকে ভাত নাড়াচাড়া করছ?
• না কিছু না, চোখের পানি মুছে ভাত মুখে দেন নাহার।
• মা তুমি কাঁদছ? রিমি এসে জিজ্ঞেস করে।
• তোর বাবাকে চা দে, চিনি কম দিবি।
• একটু চিনি দিস রে মা! এক কাজ কর চা তিন কাপ বানা, সবার কাপে দুই চামচ করে চিনি
• আরে রিমি চা খাবে নাকি?
• খাক আমাদের সাথে

স্ত্রীর মন খারাপের কারণ জেনেও নিরুপায় শফি সাহেব। দোকানে অনেক রাত অব্দি ক্রেতা আসছে। কাছে রেল স্টেশন, ব্যাগ হাতে মানুষ বাড়ি যাচ্ছে, চেনা কেউ সালাম দিয়ে হাসিমুখে দুকথা বলছে, লজেন্স চিপস কিনছে। সাকিব, রাকিব আসছে না। এত চাপ এই ছেলে দুটোর মাথায়, দোকানে আরো কিছু টাকা হলে জিনিস উঠানো যেত, কিন্তু তাই বলে ছেলেরা ঈদ করবে না বাবা মায়ের সাথে? পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে ছেলের নম্বরে ডায়াল করেন,
• আসসালামু আলাইকুম বাবা।
• ওয়ালাইকুম আসসালাম। তোমরা কবে বাড়ি আসছ? তোমাদের মা কাঁদছে তোমাদের জন্য!
• আহা কান্নাকাটির কি আছে? আমরা কোন ঈদ তোমাদের সাথে করেছি?
• না তা করনি।
• তাহলে? আমরা আসবো ইন শা আল্লাহ।

ফোন রেখে দোকান বন্ধ করে বাড়ির পথ ধরেন শফি সাহেব। বাড়িটা গলির একদম শেষ মাথায়। এটা তার পৈতৃক ভিটা। গ্রামের জমি কম নিয়ে এটা নিয়েছিলেন ছেলেদের লেখাপড়া করাবেন বলে৷ সেই সামান্য জমিও হাতছাড়া হলো তার চিকিৎসায়। বড্ড অসহায় লাগে তার৷ তার মেয়ের মায়াভরা মুখ, স্ত্রীর অপেক্ষমান চোখ, কিন্তু তিনি অপারগ। পুরো গলিতে কুরবানির পশু বেঁধে রাখা, শফি সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে এগিয়ে গেলেন বাড়ির দিকে। বাড়ির পিছনে মজা পুকুর। কুরবানির পরও বহুদিন দুর্গন্ধ ভোগ করতে হয়৷ মানুষ সব বর্জ্য গর্ত করে মাটি চাপা না দিয়ে ঐ পুকুরে ফেলে। আর ভয়াবহ দুর্গন্ধ হয়। রাকিব, সাকিব অনেক চেষ্টা করেছে, কিন্তু মানুষকে বোঝাতে পারেনি। গলিতে সবার কুরবানির পশু বাধা আছে। সারাদিনে বহুবার দেখা হয় এদের সাথে। খড়, ভুষি, কাঁঠাল পাতার ঢিবি বানিয়েছে, বাচ্চারা সকাল সকাল এসেই খাওয়াতে শুরু করে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাসায় কড়া নাড়েন শফি সাহেব। নাহার জেগেই ছিলেন। খুলে দিলেন দরজা। স্ত্রীর চোখেমুখে বিষন্নতা। খাবার টেবিলে দেওয়া ছিলো, শফি সাহেব হাতমুখ ধুয়ে খেতে বসলেন। নাহার পাশে বসলেন। তিনি দুপুরের মতোই ভাত নাড়াচাড়া করছেন।

• তুমি রিমির সাথে খেয়ে নিলেই পারো, কেন অপেক্ষা করো? এই যে ক্ষুধা মরে গেছে।
• না কিছু হয়নি, তুমি খাও। ছেলেদের সাথে কথা হলো?
• হ্যা ঐ এক কথা আসছি, আসবো!

আর কথা হয়না। খাওয়া সেরে একটু বই পড়েন শফি সাহেব, খেয়েই চট করে শুতে পারেন না, সমস্যা হয়। নাহার টুকটাক রান্নাঘরে কাজ সেরে আসেন শুতে। হাদিসের বইয়ে ধৈর্য্য নিয়ে পড়ছেন শফি সাহেব। ধৈর্য্য ধরে রাখাটা খুব কষ্টের। কাল দোকানের টাকা থেকেই একটা কিছু কিনে ফেলবেন ঠিক করলেন। এভাবে স্ত্রী, কন্যার মনমরা মুখ আর দেখতে পারছেন না।

পরদিন সকালে দোকানে গিয়ে, সবার বকেয়া শোধ করে দেখেন ,অনেক ক্রেতার খাতায় অনেক বাকি। অথচ তিনি তো জিনিস বাকিতে আনেন না। চিন্তার ভাজ পড়ে কপালে। রিমির মুখটা সারাদিন ভাসে মানসপটে।

ঈদ চলেই এলো। আরাফার দিন। রোজা আছেন শফি সাহেব আর নাহার। ইফতার করে, চায়ের কাপ হাতে বসেছেন বারান্দায়। মেয়েটা ভিতরে মোমের আলোয় গল্প বই পড়ছে! সে গল্পের বইয়ের পোকা। কারেন্ট নেই। হঠাৎ দরজায় শব্দ। নাহার উঠতে গেলে শফি সাহেব নিজে দরজা খোলেন। দেখেন দরজায় রাকিব, সাকিব আর ওদের হাতে একটা দড়ি!
• এই রিমি দেখে যা কে এসেছে?
• আসসালামু আলাইকুম মা, বাবা।
• ওয়ালাইকুম আসসালাম বাবা ভিতরে আয়।
দুজন ব্যাগ কাধ থেকে নামায়। ছাগলটা ভিতরে আনে। রিমি খুশিতে হাত তালি দিতে থাকে। পরশু তাদের খুশির ঈদ।

কমেন্ট করুন

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.