সেপ্টেম্বর 27, 2026

আমি ঘরকুনো মানুষ। অতএব “স্মৃতি অক্টোবরের” ৪৫৫ নম্বর রুমটাকে নিজের সেকেন্ড হোম বানাতে সময় লাগল না। দুপুরের পর সেই যে ডিপার্টমেন্ট থেকে আসি, তারপর বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে করতে বিকেল গড়িয়ে পড়ে। বরাবরই বিকেলে প্রাতঃভ্রমণ করাটা আমার অভ্যেস। প্রাতঃভ্রমণ বলছি এই কারণেই যে ‘প্রাতঃ’ বলতে যেটাকে বোঝায়—বোধ করি ব্রহ্মমুহূর্ত—করুণাময় ব্রহ্মের আশীর্বাদে না ঘুমটুকু ভাঙে, আর না ভ্রমণ করা হয়। অতএব সায়াহ্নকালীন ভ্রমণটুকুকেই আমি প্রাতঃভ্রমণ বলে থাকি।

সে সব যাক, অবান্তর কথা বলি যতসব। তবুও বিকেলের পরে সেকেন্ড হোমে আর মন টেকে না। অক্টোবরের ছাদে যাই একটু একাকী সময় কাটাতাম, কিন্তু আজকাল সেখানেও তালা দিয়ে ছাদ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বন্ধ করার কারণ হলো—কদিন আগেই এক যুবক কিংবা পুরুষ দশতলা ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়েছে। অতএব ছাদ বন্ধ থাকলে লাফানোর উপায় থাকে না।

আমি ভাবি, যার প্রাণভ্রমরটা বেরোনোর জন্য এত উৎসুক হয়ে আছে, সামান্য বন্ধ ছাদ তাকে কীভাবে আটকাবে? প্রাণের পিপাসা যারা মিটিয়ে ফেলেছে, সে তুমি ছাদই বন্ধ করো কিংবা দৃঢ় শৃঙ্খলে হাত-পা বেঁধে রাখো—মহাসমারোহে যাত্রা তার আটকাতে কেউ পারবে না।

অগত্যা আমাকে হাঁটতে বেরোতেই হয়। বড়জোর মলচত্বর দিয়ে ফুলার হয়ে আবার সেই কামরায় এসে পড়ে থাকি। মাঝে মাঝে কিসের একটা উদাস ভাবনা এসে মনটাকে খানিকটা বিমূঢ় করে দেয়, তখন দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি। রাস্তায় অনেক কিছুরই আনাগোনা হয়, কিন্তু ঐ ঘরকুনো স্বভাব বলে আর চোখের দৃষ্টি খুব বেশি মহান নয় বলে সবটা নজরে পড়ে না। রাস্তায় যানবাহনের হুইসেল আর একটানা সাইরেন শুনে মনে হয়—আমার মতো এটাই বোধ হয় ঢাকা শহরের দীর্ঘশ্বাস।

সেদিন সন্ধ্যার পর টিএসসিতে গিয়েছি। রাজুতে প্রতিদিন কিছু না কিছু একটা জটলা করে আন্দোলন চলতে থাকে। তারই পাশে চা-সিগারেটের দোকানে হয়তোবা কতক সেই আন্দোলন উপভোগ করে, না হয় নিজস্ব ভাবনার খেয়ালে ডুবে থাকে। আজও সেই রাজুতেই ছাত্রদের মশাল মিছিল চলছে। আমার এসবের প্রতি ভ্রুক্ষেপ কম, কেননা আন্দোলনটা আজকাল কাঁদা-ছেঁটা-ছিটির মতো হয়ে গেছে। আগেই বলেছি, আমি ঘরকুনো মানুষ—এত ঝামেলা সইবে কেন?

রাস্তায় অসম্ভব রকমের যানজটের আওয়াজ, রাজুতে নেতাদের চিৎকার, চায়ের দোকানে জনস্রোতের মধ্যখানে আমিও একটুখানি জায়গা দখল করে বসে আছি। এরই মধ্যে দৃষ্টি গেল একটা মানুষের ওপর—ঝাঁকড়া চুল, মিশকালো চেহারা, হাতে একটা দোতারা আর গলায় একটা কাগজ ঝোলানো। তার নাম আবদুর রহমান না কি, স্পষ্ট মনে নেই। তবে কাগজের লেখাটা এরূপ, “আমি দরিদ্র শিল্পী। খুব কষ্টে আমার সংসার চলে। আমার গান শুনে ভালো লাগলে আমার যৎসামান্য অর্থ প্রদান করবেন।”

এই নাট্যমঞ্চে তার গান কে শুনবে আর কেই বা টাকা দেবে—তা ভেবে পেলাম না। আমি বললাম, “মামা, শুরু করো দেখি।”

ভাঙা-ভাঙা গলায়, মোটা কণ্ঠে সে গান শুরু করল। বাইরের হুইসেল আর তার গলার চড়া আওয়াজ মিশিয়ে যতটুকু শুনলাম, মন্দ হয় না। আরেকটা গাওয়ার হুকুম দিলাম—পরে মনে হয়েছিল, অনুরোধ করা উচিত ছিল। পেটে দায় থাকলে কে আর এত গায়ে মাখে? অতএব আপত্তি ছাড়াই শোনালো।

গলা মেলাতে ইচ্ছে হয়েছিল, কিন্তু সংকোচ আর মুখচেরা অভ্যাস আমার লজ্জাটুকু আর গলাতে পারেনি। কিন্তু একটি খুব সুন্দর ফুটফটে বাচ্চা মেয়ে, হাতে ফুল জড়িয়ে, খালি গায়ে হাত-পা নাচালো। “ইনক্রিমেন্ট” শব্দটা পুঁজিবাদী, কিন্তু ঐ মুহূর্তে মনে হলো একেই বুঝি ইনক্রিমেন্ট বলে!

তারপর সেই যৎসামান্য অর্থ দেওয়ার বেলায় মনে হলো—নিজের কাছে যা যৎসামান্য আছে, তাতে বড়জোর একটা পুরি আর এক কাপ চায়ের ব্যবস্থা চলতে পারে। কিন্তু সংসার চালাতে কত লাগে—সেটাও জানা নেই। পাশের যে বন্ধুটি ছিল, তার মানিব্যাগটা জোর করে জব্দ করে, আরও কিছু মিলিয়ে মোটে ৪০ টাকা তার ঝোলায় দিলাম। অন্ধকারে আলোছায়ার যতটুকু মুখটা দেখলাম—শুভ্রতা ছিল, সুতরাং খুশি অবশ্যই হয়েছে।

বন্ধুটির মুখের দিকে আর তাকাইনি। ফেরার পথে, এই ধূলিময় ফুটপাত থেকে যতটুকু আকাশের দিকে তাকানো যায় তাকালাম। ঢাকা শহরের এই একটা জিনিসই আমার মন কেড়েছে—তা হলো রাতের পরিষ্কার আকাশ। মনে হয় গাঢ় নীল ফ্রেমের ওপর সাদা সাদা মেঘগুলো উড়ে বেড়াচ্ছে। পরে বুঝলাম, ও হলো নির্ঘুম শহরের চোখের আলো—এত তেজ যে দূরের আকাশটা অবধি প্রতিফলিত হয়।

হলে একটু বাঁকা পথে ফিরলাম। পথটা যে খুবই বাঁকা, এমনটা নয়—ঐ শহীদ মিনার ধরে ডানে একটু টার্নটুকু। ব্যাস! আমার সেকেন্ড হোম। ফুটপাত নিয়ে অনেক কথা সেদিন বলেছি। আজও যৎসামান্য বলেই ক্ষমা চাইছি।

সেই ফুটপাতেই এক ভদ্রলোক ভিক্ষুক বসেন। সকাল, বিকেল, সন্ধ্যা—যখনই যাই দেখি, ঐ মোড়ের এক কোণায় তিনি পড়ে থাকেন। “ভদ্রলোক” বললাম এজন্য যে—অনেক ভিখারি দেখেছি, চেয়ে-চিন্তে নিজের অসহায়ত্ব যত গুণ বেশি প্রকাশ করা যায়, তাই দিয়ে মানুষের কাছে হাত পাতে। খুব বেশি কঠোর না হলে অনেকেই কড়িকড়া ছুড়ে দেন। তবে এই লোকটার মধ্যে একটু ভদ্রলোক-স্বভাব আছে।

একটা তিনকোণা সাদা টুপি পরে, সেই যে পথের ধারে বসবে—মানুষজনের চলন-ফেরনে আল্লাহ-নবীর দোহাই দিয়ে গলা ভাঙাতে দেখিনি। বড়জোর মুখের দিকে চেয়ে হাসে—আর কিছুই বলে না। হয়তোবা চোখের দিকে তাকিয়ে ভেতরের কথাটুকু বলতে চায়—“আমিও ঘরকুনো মানুষ, এই রাস্তাই আমার সেকেন্ড হোম। খুব বেশি জবরদস্তি ভালো লাগে না। দুটি দয়া হয় তো দাও।”

আমি অনেকদিন খেয়াল করেছি, কিন্তু কাছে গিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করার প্রবৃত্তি হয়নি। কিন্তু আজ সেই বন্ধুর মানিব্যাগ থেকেই পাঁচ টাকা ডাকাতি করে ওর হাতে দিলাম। দেখলাম, ঝিমোচ্ছে। টাকাটা হাতে দেওয়াতেই সেই অমলিন হাসি দিয়ে আমার চোখে তাকাল। প্রথমে মনে হলো বোবা। কোথায় থাকে জিজ্ঞেস করাতে বলল—এই ফুটপাতেই।

এর বেশি কী জিজ্ঞেস করা যায় মাথায় এল না। দুপুর থেকেই আকাশটা মেঘলা ছিল, তাই কিছুক্ষণ আগের পরিষ্কার আকাশও মুখ কালো করতে সময় লাগল না। চরচর করে বৃষ্টি নামবে—কি এক দৌড়ে নিজের “সেকেন্ড হোম”, অর্থাৎ জগন্নাথে ফিরে গেলাম। মনে হলো—ভদ্রলোক ভিক্ষুক আর আবদুর রহমানকে জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল—

“এই রাস্তাটা তোমাদের ফার্স্ট হোম, না সেকেন্ড হোম?”

শিক্ষার্থী | পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
Facebook
Threads
LinkedIn
Telegram
X
Reddit
Email
WhatsApp