সেপ্টেম্বর 21, 2026

উপসম্পাদকীয় – অক্টোবর ২০২৫

মার্কিন প্রেসিডেন্টের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপ বাস্তবায়নে ঐকমত্যের খবরটি আপাতত এক ঝলক স্বস্তির বাতাস এনেছে। এই বহু আকাঙ্ক্ষিত সমঝোতা, যেখানে জিম্মি ও বন্দীদের বিনিময়ের সাথে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার শুরু হওয়ার কথা, তা দুই বছর ধরে চলা গাজার নরকযাত্রায় একটি ক্ষণিকের যতিচিহ্ন। কিন্তু, এই স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলার আগেই আমাদের দেখতে হচ্ছে এর পেছনে ফেলে আসা ধ্বংসস্তূপের ভয়াবহতা।

আজ গাজা শুধু একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত ভূখণ্ড নয়; এটি মানবতার এক বিশাল সমাধি। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ এবং জেনোসাইড স্কলারদের মতে, সেখানে যা ঘটেছে, তা ‘জাতিগত নিধন’-এর সমতুল্য। ইসরায়েলের নির্বিচার হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন কমপক্ষে ৬৭ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি, আহত হয়েছেন প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার। কিন্তু সংখ্যার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই হামলায় গাজার জীবনধারণের প্রায় প্রতিটি উৎস ধ্বংস করা হয়েছে। হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়, পুরো জনপদ, ৯০ শতাংশের বেশি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে  বা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনের নিচে চাপা পড়ে আছে জীবিত ও মৃত মানুষের আশা, স্বপ্ন, আর ভবিষ্যৎ। এই ধ্বংসলীলা একটি সমাজের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার সুচিন্তিত প্রচেষ্টা।

শারীরিক ধ্বংসের চেয়েও মারাত্মক যে ক্ষতি, তা হলো দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ট্রমা। ইসরায়েলি হামলায় গাজার প্রতি পাঁচটি শিশুর মধ্যে চার শিশুই হতাশা ও ভয় নিয়ে জীবনযাপন করত। আজকের শিশুরা দেখছে তাদের পরিবার, বন্ধু ও বাড়িঘরের বিলীন হয়ে যাওয়া। আর সেটার জন্য শোক প্রকাশের মুহূর্তটুকুও তাদের জোটেনি। এটি এমন এক ক্ষত, যা একটি প্রজন্মকে চিরদিনের জন্য বয়ে বেড়াতে হবে।

যুদ্ধবিরতির পরবর্তী চ্যালেঞ্জটি ভয়াবহ। জাতিসংঘের অনুমান, গাজাকে আবার বাসযোগ্য করে তুলতে কমপক্ষে ১৫ বছর সময় লাগতে পারে এবং এজন্য ৫০০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ প্রয়োজন। কিন্তু এই পুনর্গঠনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে ইসরায়েলের অবৈধ অবরোধ, যা নির্মাণসামগ্রীর প্রবেশ আটকে দেবে। গাজার বিশেষজ্ঞ আজমি কেশাওয়ি যেমনটা বলেছেন, ‘পুনর্গঠনের ইচ্ছা থাকাই যথেষ্ট নয়,’ প্রয়োজন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক চাপ। পাশাপাশি, ট্রাম্পের পরিকল্পনার একটি শর্ত হামাসের ক্ষমতা ত্যাগ, যা গাজাকে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার মুখে ঠেলে দিতে পারে। হামাস চলে গেলে নিরাপত্তা শূন্যতা তৈরি হবে, যা অপরাধী গোষ্ঠী ও দলাদলির জন্ম দেবে। ফাতাহ এবং হামাসের পুরোনো গোষ্ঠীগত সংঘাতের পুনরুত্থানের আশঙ্কাও প্রবল, যা পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকে নস্যাৎ করে দেবে। ইসরায়েল যদি ফাতাহর নির্বাসিত কর্মকর্তাদের ফিরিয়ে এনে হামাস-সমর্থকদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক কর্মকাণ্ড উসকে দেয়, তবে শান্তি নয়, উল্টো নতুন সংঘাতের বীজ বোনা হবে।

এই প্রাথমিক চুক্তি তাই একটি সমাপ্তি নয়, বরং আরও কঠিন একটি সূচনা। যুদ্ধবিরতির আলোয় দাঁড়িয়ে এখন সম্মিলিতভাবে প্রশ্ন করার সময়- এই বিপর্যয়ের জন্য দায়ী কারা? এই ধ্বংসের মূল যে কারণ, দখলদারিত্ব, তার অবসান না ঘটিয়ে এবং ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে স্বীকৃতি না দিয়ে কি কোনো স্থায়ী শান্তি সম্ভব?

শিক্ষার্থী | পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সেশন: ২০১৯-২০

Facebook
Threads
LinkedIn
Telegram
X
Reddit
Email
WhatsApp

আরও লেখা সমূহ