অক্টোবর 16, 2026

উপসম্পাদকীয় – অক্টোবর ২০২৬

দেশ এক ধরনের অস্থির সময় পার করছে। পারস্পরিক সহনশীলতা, শ্রদ্ধাবোধ পরমতসহিষ্ণুতার ঘাটতি ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রত্যাশিত উন্নতি হচ্ছে না। রাজনীতি ও সমাজে চলছে নানা পরিবর্তন ও টানাপোড়েন। তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটও মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। এর মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া ও মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা আরও বাড়াচ্ছে।

এই পরিস্থিতির মধ্যে কুমিল্লায় পরপর দুটি হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কেউ কেউ এসব ঘটনার পেছনে অভিভাবকত্ব বা প্যারেন্টিংয়ের ঘাটতিকে দায়ী করছেন, আবার কেউ নানা যুক্তিতে ঘটনার ব্যাখ্যা দাঁড় করাচ্ছেন। সন্তানদের নৈতিকতা, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধ গড়ে তুলতে পরিবারের ভূমিকা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্যারেন্টিংয়ের ঘাটতি কোনো হত্যাকাণ্ডের অজুহাত হতে পারে না। হত্যা, দিন শেষে, হত্যাই। অপরাধের সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

এমন এক সময়ে সামনে আসছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা। কয়েক বছর আগেও দুর্গাপূজাকে অনেকেই ধর্মীয় পরিচয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে সর্বজনীন উৎসবের আবহে উপভোগ করতেন। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের অংশগ্রহণ, পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময় এবং আনন্দ ভাগাভাগি ছিল এই উৎসবের অন্যতম সৌন্দর্য। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে উৎসবকে ঘিরে এক ধরনের বিভাজন ও সংশয় লক্ষ করা যাচ্ছে। ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ এই বহুল প্রচলিত ধারণাটিও যেন কোথাও কোথাও প্রশ্নের মুখে পড়ছে। ফলে অনেকের মনে তৈরি হচ্ছে অস্বস্তি ও উদ্বেগ।

এই উদ্বেগ দ্রুত দূর হবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা। ধর্মীয় পরিচয় যার যার, কিন্তু নিরাপত্তা, মর্যাদা ও শান্তিপূর্ণভাবে উৎসব পালনের অধিকার সবার। একটি অসাম্প্রদায়িক ও সম্প্রীতিময় বাংলাদেশে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা যেন নির্বিঘ্নে, নিরাপদে ও আনন্দের সঙ্গে দুর্গাপূজা উদ্‌যাপন করতে পারেন, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্ব এবং সাধারণ নাগরিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। বিভাজনের পরিবর্তে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, অবিশ্বাসের পরিবর্তে আস্থা এবং বিদ্বেষের পরিবর্তে সহমর্মিতার চর্চাই পারে উৎসবের প্রকৃত আনন্দ ফিরিয়ে আনতে। আমরা আশা করি, এই উদ্বেগ দ্রুত দূর হবে এবং সরকার, প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা নিরাপদে ও আনন্দের সঙ্গে দুর্গাপূজা উদ্‌যাপন করতে পারবেন।

এত উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মে এগিয়ে চলে। শরতের শুভ্রতা পেরিয়ে আসছে হেমন্ত; মাঠে মাঠে পাকা ধানের সোনালি আভা নিয়ে আসবে নতুন ফসলের বার্তা। নবান্নের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক কৃষক, শ্রমিকসহ সর্বস্তরের মানুষের জীবনে। নতুন ফসলের প্রাচুর্যের পাশাপাশি নিশ্চিত হোক কৃষকের ন্যায্য প্রাপ্তি ও সাধারণ মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা। হেমন্তের কোমলতা ছড়িয়ে পড়ুক আমাদের মনেও। বিভাজন ও বিদ্বেষের বদলে প্রতিষ্ঠিত হোক মানবিকতা, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। অস্থিরতা কাটিয়ে মানুষ ফিরে পাক স্বস্তি ও আশার আলো। শুদ্ধ হোক আমাদের মন। বাংলাদেশ সবার জন্য শান্তি, সম্প্রীতি ও আনন্দের সোনার বাংলা হয়ে উঠুক।

সদস‍্য, সম্পাদনা পর্ষদ, প‍্যাপাইরাস

প্রাক্তন শিক্ষার্থী

পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সেশন:১৯৯৯-২০০০

Facebook
Threads
LinkedIn
Telegram
X
Reddit
Email
WhatsApp

আরও লেখা সমূহ