সেপ্টেম্বর 17, 2026

পরীক্ষা চলছে। একে তো জীবনের কঠিন পরীক্ষা, তার ওপর আবার যুক্ত হয়েছে ডিপার্টমেন্টের উপদ্রব।

​রুটিন অনুযায়ী পরীক্ষাটা হওয়ার কথা ছিল ২৫ তারিখ, কিন্তু পিছিয়ে গেল পরের মাসের ৮ তারিখে। রাইসা এতে দারুণ খুশি। সারা বছর বইয়ের সাথে তার আদায়-কাঁচকলায় সম্পর্ক, তাই ৬ আর ৭ তারিখের ছুটিটাকে সে সদ্ব্যবহার করার মহাপরিকল্পনা করে ফেললো। কিন্তু পরিকল্পনা আর বাস্তবের মধ্যে যোজন যোজন দূরত্ব। আজকে ৭ তারিখ দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চললো, অথচ রাইসা এখনো পড়ার টেবিলে বসার সাহস সঞ্চয় করে উঠতে পারেনি।

​হঠাৎ তার রুমমেটের ‘বেধড়ক’ পড়াশোনা দেখে রাইসার টনক নড়ল। অন্তত মান-সম্মানটুকু নিয়ে এই রুমে টিকে থাকতে হলে একটু বই খোলা দরকার। ল্যাপটপে স্লাইড ওপেন করে সে বরাবরের মতোই একটা জরুরি ‘আফসোস কর্মসূচি’ পালন করল, কেন সে দুদিন আগে পড়তে বসেনি! এই হতাশা পর্ব শেষে যখন সে পড়ায় মন দিলো, দেখল মাথার ভেতরটা মরুভূমির মতো খাঁ খাঁ করছে, কিছুই ঢুকছে না।

​রাইসার জীবনে অসহায়ত্বের দুটো নির্দিষ্ট স্তর আছে:

​লেভেল-১: সে জানে, সে নিজেকে উদ্ধার করতে পারবে। কিন্তু উদ্ধার হওয়ার আগ পর্যন্ত তাকে অসহায়ত্বের অভিনয় করতে হবে। এরপর নিজেকে উদ্ধার করে নিজেই নিজের ওপর মুগ্ধ হবে।

​লেভেল-২: সে কিছুই জানে না। 

​আজ রাইসা লেভেল-২ এ। আর এই স্তরে গেলেই কেন জানি তার অয়নকে মনে পড়ে। মনে হয়, অয়ন সব সমস্যার সমাধান করে দেবে (যদিও অয়ন আজ পর্যন্ত একটা সমস্যারও সমাধান করতে পারেনি)।‌ মাসখানেক আগে রাইসা নিজেই ঘোষণা দিয়েছিল যে, অয়নের সাথে সে আর কক্ষনো কথা বলবে না।

​কিন্তু ইগো বনাম পরিস্থিতির যুদ্ধে আজ ইগো ধরাশায়ী। অন্তত বিশ বার চ্যাটবক্স থেকে ইনবক্সে যাতায়াত করার পর, আত্মসম্মানের শেষ বিন্দুটি বিসর্জন দিয়ে সে অয়নকে একটা মেসেজ পাঠাল: “…”

​রাইসার ধারণা ছিল, এই তিনটা ডটের অর্থ অয়ন টেলিপ্যাথির মাধ্যমে বুঝে ফেলবে। অয়নও বেকার,  সাথে সাথে সিন করল।

​অয়ন: তোমার মাথার আবার কি হলো? নাকি আবারও আমাকে ‘ইউজ’ করার ইচ্ছা জেগেছে?

রাইসা: ইউজই করব। বোর হচ্ছি।

অয়ন: কী হয়েছে বলো? লাইফ কেমন যাচ্ছে?

রাইসা: কাল পরীক্ষা, কিচ্ছু পারি না। লাইফ নিয়ে হতাশ। আচ্ছা অয়ন, তোমার কি মনে হয় জীবনের কোনো নির্দিষ্ট ফাংশন আছে, যাকে গ্রাফে আঁকা যায়?

​অয়ন কিছুক্ষণ চুপ থেকে লিখল, “লাইফের ফাংশন দিয়ে কী হবে? তোমার মনে হয় খিদে পেয়েছে। দুপুরে খেয়েছো কিছু?”

​রাইসা: আমি একটা সিরিয়াস ফিলোসোফিক্যাল কথা বলছি, আর তুমি এসব বিরক্তিকর প্রশ্ন করছো কেন?

অয়ন: আচ্ছা বাবা, বলো। তোমার মহান দর্শন শুনি।

​রাইসা: আমার মনে হয়, জীবনের ফাংশনের সেকেন্ড ডেরিভেটিভ সবসময় নেগেটিভ হওয়া উচিত। প্রত্যেকের জীবনে কিছু ‘ইনফ্লেকশন পয়েন্ট’ থাকে, এমন কোনো ঘটনা যা জীবনকে হুট করেই বদলে দেয়। সেই পয়েন্টে সেকেন্ড ডেরিভেটিভ হয়ে যায় শূন্য। এরপর কারো ডাউনফল শুরু হয়, কেউ হয়তো সফলতার যাত্রা শুরু করে, গ্রাফ উপরে উঠতে থাকে। সেকেন্ড ডেরিভেটিভ নেগেটিভ হলে লাইফ সেই ডাউনফল থেকে ঘুরে দাঁড়ায়। ইনফ্লেকশন পয়েন্টটাই হয়ে যায় তার লোয়েস্ট পয়েন্ট, যেখান থেকে উত্তরণ শুরু। তবে হ্যাঁ, লাইফকে হতে হয় কন্টিনিউয়াস ফাংশন। অনেকে ইনফ্লেকশন পয়েন্টেই থেমে যায়, কিন্তু জীবন কি এতই প্রেডিক্টেবল?

​অয়ন: বুঝলাম। তোমার কাল ম্যাথ পরীক্ষা। এত থিওরি না পড়ে ঘুমাও যাও। লাইফ আর ম্যাথ এক না, রাইসা।

রাইসা: ধুর! কাল ম্যাথ পরীক্ষা না। ওটা কয়েকদিন আগেই দিয়েছি। যা শিখব তা কি জীবনে প্রয়োগ করব না? কাল স্ট্যাটিসটিক্স পরীক্ষা। আজ কোরিলেশন পড়ছিলাম। তুমি কি জানো জীবনেও কোরিলেশন অ্যাপ্লাই করা যায়?

​অয়ন: কীভাবে?

রাইসা: আমাদের চারপাশের মানুষের সাথে আমাদের সম্পর্কই কোরিলেশন। ইম্প্রেশন ভালো হলে পজিটিভ, খারাপ হলে নেগেটিভ, আর পাত্তা না দিলে জিরো কোরিলেশন। ভালো থাকতে হলে সবার সাথে কোরিলেশন জিরো রাখা উচিত। আচ্ছা, বলো তো আমাদের সম্পর্কটা এখন কোন গ্রাফে আছে?

​অয়ন: আমাদের মধ্যে কোনো কোরিলেশনই নেই।

রাইসা: আছে। একটা দ্বিমাত্রিক কোরিলেশন। তোমার দিক থেকে এটা ইন্ডিপেন্ডেন্ট মানে জিরো, কিন্তু আমার পার্সপেক্টিভ থেকে এটা চরম নেগেটিভ।

অয়ন: আমার কী মনে হয় জানো? তোমার দ্রুত ডাক্তার দেখানো দরকার।

​রাইসা: হুম, এজন্যই আমারটা নেগেটিভ। তোমার একটা নতুন নাম পেয়েছি। f'(Ayon) < 0।

অয়ন: আর কিছু?

রাইসা: আমার মনে হয়, তোমার সাথে কথা বললেই আমি ইনফ্লেকশন পয়েন্টের দিকে এগিয়ে যাই। যেদিন আমাদের কোরিলেশন ঠিক জিরো হবে, সেদিন আমি আমার টার্নিং পয়েন্টে থাকব, সেকেন্ড ডেরিভেটিভ হবে নেগেটিভ। 

ম্যাসেজটা পাঠিয়ে রাইসার মনে হলো সে লেভেল ২ থেকে লেভেল ১ এ চলে এসেছে। ল্যাপটপটা বন্ধ করার আগে অয়নের শেষ মেসেজটা স্ক্রিনে ভেসে উঠলো, “বেশি রাত জেগে ফিলোসোফি না ঝেড়ে ঘুমাও।”

রাইসা হাসলো। সে এখন নিশ্চিন্তে ঘুমাবে। কারণ, পরীক্ষা তো আসবে যাবে, কিন্তু একবার চোখ থেকে ঘুম চলে গেলে তাকে ফিরিয়ে আনা কঠিন।

শিক্ষার্থী | পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
Facebook
Threads
LinkedIn
Telegram
X
Reddit
Email
WhatsApp