(১)
ইংরেজিতে একটা কথা আছে: ‘Bad luck comes in threes’ – অর্থাৎ, বিপদ যখন আসে, পর পর তিনটা আসে। সামিউল হক-এর জীবনে কথাটি সত্যি হলো। প্রথম বিপদ, মাস তিনেক আগে কার অ্যাক্সিডেন্টে তার ডান পা ভাঙলো। অল্প বয়সে হাত-পা ভাঙলে তাড়াতাড়ি জোড়া লাগে, কিন্তু সামিউলের বয়স তেতাল্লিশ। পুরো এক মাস তিনি হাসপাতালে কাটালেন। এরপর তাকে বাসায় আনা হলেও এখন পর্যন্ত বেড রেস্টে থাকতে হচ্ছে।
সামিউলের স্ত্রী আফিয়া গত তিন মাস ধরে নিরলসভাবে স্বামীর সেবা করে যাচ্ছেন। তিনি চোখ ধাঁধাঁনো সুন্দরী হলেও অহংকারী নন। বয়স আটত্রিশ, তবে দেখে মনে হয় ত্রিশ-বত্রিশ। সামিউলের সৌভাগ্য, আফিয়া স্বামী-অন্ত:প্রাণ। পতিসেবার পাশাপাশি তিনি সামিউলের এক্সপোর্ট- ইমপোর্ট ব্যবসারও খোঁজখবর রাখছেন। তবে, ব্যবসা দেখাশোনার জন্য ম্যানেজার রয়েছে, বিশ্বস্ত লোক।
সামিউলের দ্বিতীয় বিপদ, গত কয়েকদিন ধরে তার জ্বর, কাঁপুনি, জয়েন্ট পেইন আর মাথা ব্যথা। বাসা থেকেই ব্লাড স্যাম্পল নিয়ে টেস্ট করে দেখা গেছে ম্যালেরিয়া।
আফিয়ার পরিচিত (ওর এক বান্ধবীর ঘনিষ্ঠ) ডক্টর মুশফিক ওদের বাসায় এসে সামিউলের চিকিৎসা করছেন। তিনি সলিমুল্লাহ মেডিকেলের সহযোগী অধ্যাপক, মেডিসিনে এম.এস.। ম্যালেরিয়ার জন্য তিনি প্রেসক্রাইব করেছেন কুইনিন সালফেট ৩২৪ এমজি ক্যাপসুল – দুটো করে খেতে হবে দিনে তিনবার, সাতদিন। আপাতত ৩০টা ক্যাপসুলের একটা বোতল কেনা হয়েছে। শেষ হলে আবার কেনা হবে।
সামিউলের তৃতীয় বিপদ, গত পরশু (সোমবার) বিকেল থেকে তার অসহনীয় পেট ব্যথা শুরু হয়েছে। সন্ধ্যায় ডক্টর মুশফিক আবার এসে রোগী দেখলেন। সাধারণত তিনি কারও বাসায় গিয়ে চিকিৎসা করেন না। কিন্তু, আফিয়াকে কেউ না করতে পারে না। পেট ব্যথার জন্য প্রেসক্রাইব করা হলো মরফিন সালফেট (এক্সটেন্ডেড রিলিজ) ২০ এমজি ক্যাপসুল– একটা করে খেতে হবে প্রতিদিন রাতে। সোম আর মঙ্গলবার রাতে মরফিন খেয়ে অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলো। মঙ্গলবার রাতে ডাক্তার এসে রোগী দেখে সে কথাই বললেন।
বুধবার রাত নয়টায় আফিয়া সামিউলকে প্রথমে খাওয়ালেন মরফিন ক্যাপসুল। এরপর কুইনিনের বোতল থেকে দুটো ক্যাপসুল বের করে হাতে নিয়ে তাকিয়ে দেখলেন বোতলে আর সাতটা ক্যাপসুল আছে। আফিয়ার খটকা লাগলো। হাতের ক্যাপসুল দুটো খাওয়ালে কুইনিন খাওয়ানো হবে মোট চারদিন – চার ছয়ে চব্বিশটা ক্যাপসুল। বোতলের গায়ে লেখা ৩০ ক্যাপসুল – বিদেশি ভালো ঔষধ কোম্পানী কখনোই ভুল করে ৩১টা ক্যাপসুল দিয়ে দিবে না। তাহলে ৬টা ক্যাপসুল বাকি থাকার কথা, বোতলে ৭টা ক্যাপসুল কেন?
আফিয়া নিশ্চিত, কখনও ভুল করে সামিউলকে দুটোর বদলে একটা ক্যাপসুল খাওয়াননি। তিনি প্রত্যেকবার বোতল থেকে দুটো ক্যাপসুল বের করে আগে বোতলের মুখ বন্ধ করেছেন। এরপর একটা একটা করে ক্যাপসুল স্বামীকে খাইয়েছেন। যদি ধরে নেয়া হয়, কোনও এক বেলা ঔষধ খাওয়াতে তিনি ভুলে গেছেন, তাহলে বোতলে ৮টা ক্যাপসুল থাকবে। বেজোড় সংখ্যক ক্যাপসুল থাকা অসম্ভব!
‘কী ভাবছো?’ জানতে চাইলেন সামিউল।
‘কিছু না,’ বলে ঔষধ খাওয়াতে ব্যস্ত হলেন আফিয়া।
রাত এগারোটার দিকে দেখা গেল সামিউলের কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে, ঠোঁট নীলচে হয়ে গেছে আর চোখের মনি অনেক ছোট হয়ে গেছে। ডক্টর মুশফিককে কল দিলেন আাফিয়া, কিন্তু তিনি কল ধরলেন না।
একটু পরে দেখা গেল সামিউলের শ্বাস নেয়ার হার অনেক কমে গেছে। ছোট খালার ছেলে শাহেদকে কল দিলেন আফিয়া– ছেলেটা ঢাকা মেডিকেল কলেজে ফিফথ ইয়ারে পড়ে। সবকিছু শুনে শাহেদ বললো, ‘আমি এখনই আসছি, আপু। আপনি রেডি হন, দুলাভাইকে হাসপাতালে নিতে হবে।’ বিশ মিনিটের মধ্যে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে হাজির হলো শাহেদ। কিন্তু, সামিউলকে হাসপাতালে নেয়ার পথেই তিনি কোমায় চলে গেলেন।
ডাক্তারদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে রাত তিনটায় সামিউল মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন। একই সাথে তিনি সব বিপদের ঊর্ধ্বে উঠে গেলেন।
(২)
‘আপু, ডাক্তারদের ধারণা মরফিন ওভারডোজের কারণে দুলাভাইয়ের মৃত্যু হয়েছে।’
শাহেদের কথা শুনে চমকে উঠলেন আফিয়া। বললেন, ‘মরফিন ওভারডোজ হলো কীভাবে? মাত্র ২০ এমজি মরফিন দেয়া হয়েছে প্রতি রাতে।’
‘তা তো বলতে পারছি না। তবে, ডাক্তাররা বলছেন, মরফিন ওভারডোজ কেইসে পোস্ট মর্টেম করার নিয়ম আছে।’
আপত্তি জানাতে গিয়ে জানালেন না আফিয়া। সামিউলের মৃত্যুর সঠিক কারণ জানতে তারও ইচ্ছে হলো।
পরদিন বিকেলে পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট পাওয়া গেল। সামিউলের পাকস্থলীতে পাওয়া দ্রব্যগুলোর কেমিক্যাল অ্যানালাইসিস করে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, সামিউল ৩০০ এমজি-এর বেশি কুইনিন আর ৩৩০ এমজি-এর বেশি মরফিন সেবন করেছিলেন।
মরফিন ওভারডোজ নিশ্চিত হওয়ায় হাসপাতাল থেকে পুলিশে খবর দেয়া হলো। পুলিশ আফিয়া, শাহেদ আর ড. মুশফিককে কিছু গতানুগতিক প্রশ্ন করলো। কুইনিনের বোতলের বাকি ক্যাপসুলগুলো আর মরফিন ক্যাপসুলগুলো চেক করে তারা সন্দেহজনক কিছু পেলো না। বোতলে ৬টার বদলে ৭টা কুইনিন ক্যাপসুল কেন, তা নিয়ে তারা মাথাই ঘামালো না। দায়সারা তদন্ত করে রিপোর্ট দিলো, ভুলবশত অতিরিক্ত মরফিন সেবনে সামিউলের মৃত্যু হয়েছে।
আফিয়ার মনে খটকা রয়ে গেল। প্রতিদিন প্রতিবেলা সামিউলকে ঔষধ খাইয়েছেন তিনি নিজে। অতিরিক্ত মরফিন ওর শরীরে গেল কীভাবে? সামিউলের ডান পায়ে প্লাস্টার করা ছিলো, হাঁটাচলা শুরু করেননি বলে ক্রাচও কেনা হয়নি। তাই সামিউলের পক্ষে টেবিল পর্যন্ত হেঁটে গিয়ে নিজে ঔষধ খাওয়া সম্ভব ছিলো না। তা ছাড়া, হিসেবের চেয়ে ঔষধ কম পাওয়া যায়নি, বরং একটা কুইনিন ক্যাপসুল বেশি পাওয়া গেছে।
সামিউলের মৃত্যুর মাসখানেক পর একদিন ডক্টর মুশফিক আফিয়ার সাথে দেখা করতে এলেন। এ কথা সে কথার পর তিনি আসল প্রসঙ্গ তুললেন।
‘আফিয়া, আপনি জানেন আমি আপনাকে অনেক পছন্দ করি। আমার বয়স প্রায় পঁয়তাল্লিশ হলো, নানা ব্যস্ততায় এখনও বিয়ে করা হয়নি। আর, –’
‘মুশফিক ভাই, আমি এখনই এসব নিয়ে ভাবতে চাই না –’
‘দ্যাটস ও.কে.। আপনি আরেকটু সময় নিবেন, এটাই স্বাভাবিক। আর একটা কথা, আপনাকে কেমন করে বলবো বুঝতে পারছি না –’
‘দ্বিধার কিছু নেই, মুশফিক ভাই। বলে ফেলেন। সামিউলের ট্রিটমেন্ট বাবদ কিছু টাকা পাওনা হয়েছে আপনার, এই তো?’
‘ছি ছি, কি যে বলেন। প্রায় দু’বছর ধরে আমি আপনাদের ফ্যামিলি ফ্রেন্ড। সামান্য ট্রিটমেন্টের জন্য টাকা নিবো? কিন্তু, একটা বড় অংকের টাকার ব্যাপার আছে –’
‘মানে?’
‘সামিউল ভাই এগারো মাস আগে আমার কাছ থেকে পঁচিশ লাখ টাকা ধার নিয়েছিলেন।’ বলতে বলতে টি টেবিলের উপরে রাখা বাদামি রঙের বড় খাম থেকে একটা ঋণের চুক্তিপত্র বের করে আফিয়ার হাতে দিলেন ডক্টর মুশফিক।
তিন পৃষ্ঠার ঋণ চুক্তিপত্রটি মনোযোগ দিয়ে পড়লেন আফিয়া। লেখা রয়েছে, ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ডক্টর মুশফিকের কাছ থেকে সামিউল পঁচিশ লক্ষ টাকা নগদ গ্রহণ করেছেন। সুদের হার বার্ষিক শতকরা ১০। সুদসহ সম্পূর্ণ টাকা ফেরত দেয়ার জন্য এক বছর সময় দেয়া হয়েছে, অর্থাৎ আর এক মাস সময় হাতে আছে। প্রতি পৃষ্ঠায় সামিউলের স্বাক্ষর রয়েছে।
আফিয়া হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন দেখে মুশফিক বললেন, ‘আপনি দুশ্চিন্তা করবেন না। টাকার জন্য আমি ব্যস্ত হচ্ছি না। আপনার এত বড় একটা বিপদ গেল। সামিউল ভাই না থাকায় ব্যবসাতেও নিশ্চয়ই ঝামেলা যাচ্ছে। টাকাটা দু’চার মাস পরে দিন, কোনও সমস্যা নেই। কোনও সুদও দিতে হবে না। দু’চার মাস পর শুধুমাত্র আসল টাকাটা দিলেই চলবে, আমি কোনও সুদখোর মহাজন না–’
‘সামিউল হঠাৎ এতগুলো টাকা ধার নিতে গেল কেন?’ জানতে চাইলেন আফিয়া।
‘আমি তো বলতে পারবো না। তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। শুধু বললেন, ব্যবসায়ে কিছু ঝামেলা হয়েছে।’
আফিয়া কিছু না বলে টি টেবিলের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
‘যদি অনুমতি দেন আরেকটা কথা বলি,’ মুশফিক বললেন।
‘বলুন।’
‘এই মুহূর্তে না হোক, পরে যদি পজিটিভলি চিন্তা করেন– বিয়ের কাবিন পঁচিশ লক্ষ টাকা করা যেতে পারে। তাহলে আর টাকা নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকে না।’
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আফিয়া বললেন, ‘চুক্তিপত্রের একটা কপি কি পেতে পারি?’
‘অবশ্যই। আমি একসেট ফটোকপি নিয়ে এসেছি আপনার জন্য।’
ড. মুশফিক চলে যেতেই আফিয়া কল দিলেন সামিউলের বন্ধু ব্যারিস্টার জহিরকে। বিশ মিনিটের মধ্যে জহির এসে হাজির হলেন।
‘দরকারি কাজ ফেলে চলে এসেছেন, জহির ভাইয়া?’
জহির আমতা আমতা করে বললেন, ‘না।’
‘এমন করলে তো বিপদে আপদে আপনাকে কল দিতে পারবো না,’ মৃদু হেসে বললেন আফিয়া।
‘তেমন কোনও কাজ ছিলো না, ভাবী। আমার নিজের চেম্বার তো, জুনিয়ররা সব কাজ করে। আমি শুধু মাঝে মাঝে হাইকোর্টে মুভ করি। এবার বলেন কী জন্য ডেকেছেন?’
সামিউলের অসুস্থতা থেকে শুরু করে ঋণের চুক্তিপত্র পর্যন্ত সবকিছু খুলে বললেন আফিয়া।
চুক্তিপত্রটি ভালো করে পরীক্ষা করলেন জহির। প্রত্যেক পৃষ্ঠায় একশ’ টাকার নন-জুডিসিয়াল স্ট্যাম্প, তিন পৃষ্ঠায় মোট তিনশ’ টাকার স্ট্যাম্প। প্রত্যেক পৃষ্ঠার উল্টোপাশে ভেন্ডরের স্বাক্ষর, সিল আর তারিখ রয়েছে (১১ মাস আগের তারিখ, যে তারিখে স্ট্যাম্প কেনা হয়েছে)। ঠিকমত নোটারাইজ করা।
‘চুক্তিপত্রটা জেনুইন মনে হচ্ছে। কিন্তু, সামিউলের টাকার দরকার হলে তো আগে আমাকে বলার কথা ছিলো।’
‘আমিও অবাক হয়েছি।’
‘আপনি কী চান? চুক্তিপত্রটা ভুয়া কিনা যাচাই করি?’
‘হ্যাঁ, ভাইয়া।’
‘যদি জেনুইন হয় তাহলে কী করবেন? মুশফিককে বিয়ে করবেন?’
‘প্রশ্নই ওঠে না।’
‘কেন?’
‘লোকটার চরিত্র ভালো না। সামিউল যখন বেড-রিডেন, তখন লোকটা আমার ঘনিষ্ঠ হবার চেষ্টা করেছে। হয়তো ভেবেছে, আমি সামিউলের বিকল্প খুঁজছি। ডাক্তার হিসেবে সে ভালো বলে আমি তখনই তাকে বিদায় করিনি। তবে, তার সামনে খুব একটা যেতাম না। আগে নিজের হাতে চা-নাস্তা দিতাম, পরে কাজের বুয়াকে দিয়ে পাঠাতে শুরু করেছি।’
‘ঠিক আছে, আমি দেখবো চুক্তিপত্রটা জেনুইন কিনা।’
‘আরও একটা বড় কাজের জন্য আপনাকে ডেকেছি।’
‘কী কাজ?’
‘আমার ধারণা, সামিউলকে ড. মুশফিক খুন করেছে।’
জহির অবাক হয়ে আফিয়ার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
আফিয়া বললেন, ‘কিন্তু, আমি বুঝতে পারছি না কীভাবে সে মরফিন ওভারডোজটা দিয়েছে। তাকে খুনি প্রমাণ করার কাজে আপনি আমাকে সাহায্য করবেন, প্লিজ।’
(৩)
পরদিন সকালে চেম্বারে গিয়ে ব্যারিস্টার জহির আফিয়ার কাছে শোনা ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ বিচার- বিশ্লেষণ করতে শুরু করলেন।
আফিয়া তাকে দায়িত্ব দিয়েছেন দুটো– ড. মুশফিক খুনি কিনা তা যাচাই করা, আর চুক্তিপত্রটি ভুয়া কিনা তা নির্ধারণ করা। জহির ভেবে দেখলেন, দুটো কাজের যে কোনও একটা করতে পারলে অন্যটা করা সোজা হয়ে যায়। যেমন, মুশফিককে খুনি প্রমাণ করা গেলে সবাই ধরেই নিবে চুক্তিপত্রটি ভুয়া, কারণ মুশফিক যদি সত্যিই সামিউলকে ২৫ লক্ষ টাকা দিতেন, তাহলে টাকা ফেরত পাওয়ার আগে নিশ্চয়ই তাকে মেরে ফেলতেন না।
আবার, চুক্তিপত্রটি যদি ভুয়া প্রমাণ করা যায়, তাহলে খুনের পরিষ্কার মোটিভ পাওয়া যায়। সামিউল বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই ভুয়া চুক্তিপত্র দেখিয়ে তার কাছ থেকে টাকা আদায় করা যেতো না, আফিয়াকে বিয়ে করার চেষ্টাও করা যেতো না।
তবে, জহির বুঝতে পারছেন, শুধু একটা অপরাধ প্রমাণ করাও অনেক কঠিন হবে। চুক্তিপত্রটির এক সেট ফটোকপি করে তিনি তার সবেচেয়ে স্মার্ট জুনিয়র, অ্যাডভোকেট কামালকে দিলেন। জহির তাকে বুঝিয়ে দিলেন চুক্তিপত্রটি যাচাই করার জন্য কী কী করতে হবে।
অ্যাডভোকেট কামাল প্রথমে গেলেন চুক্তিপত্রের স্ট্যাম্প বিক্রেতা ভেন্ডরের কাছে। দেখা গেল, লোকটির খাতায় ১১ মাস আগের নির্দিষ্ট তারিখে স্ট্যাম্প ক্রেতা হিসেবে ড. মুশফিকের নাম ঠিকানা লেখা আছে। তবে, অনেক টাকা ঘুষ দিয়েও এটা করা যায়।
এরপর কামাল গেলেন নোটারি পাবলিকের কাছে। তিনি তারিখ অনুযায়ী তার শেলফে খুঁজে চুক্তিপত্রের এক সেট ফটোকপি বের করে কামালকে দেখালেন (তার এখানেই চুক্তিপত্রটি নোটারাইজ করা হয়েছিলো, তাই তার কাছে কপি রয়েছে)। কামাল তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ঋণদাতা আর ঋণগ্রহীতা দুজনই কি আপনার সামনে স্বাক্ষর করেছে?’
তিনি বললেন, ‘অবশ্যই।’
কামাল জানেন, কথাটা মিথ্যা হবার সম্ভাবনা বেশি। সাধারণত সব পক্ষ সিগনেচার করার পর কোনও একজন গিয়ে ডকুমেন্টটা নোটারাইজ করিয়ে আনে। কিন্তু, নোটারি পাবলিককে কোর্টে মিথ্যাবাদী প্রমাণ করা প্রায় অসম্ভব।
চুক্তিপত্রে দুজন সাক্ষীর নাম, ঠিকানা আর স্বাক্ষর রয়েছে। এক এক করে তাদেরকে খুঁজে বের করে কথা বললেন কামাল। এরপর ডায়েরিতে নোট করলেন: “দুজন সাক্ষীই ড. মুশফিকের ঘনিষ্ঠ (যদিও দুজনের একজন হওয়ার কথা ঋণগ্রহীতা সামিউলের পক্ষের সাক্ষী)। ২ নং সাক্ষী (মোবাশ্বের আলি) এর সাথে সামিউলের পরিচয় ছিলো (দু’ একদিন কথা হয়েছে)– প্রয়োজনে একে জেরা করলে কিছু তথ্য পাওয়া যেতে পারে।”
এখন বাকি থাকলো সবচেয়ে কঠিন কাজ– চুক্তিপত্রে সামিউলের স্বাক্ষর আসল না নকল তা যাচাই করা। নকল যদি পাকা হাতে করা হয়, তাহলে বড় বড় এক্সপার্টরাও ধরতে পারে না। ফটোকপি দেখে নকল স্বাক্ষর বোঝা আরও কঠিন– অনেক সূক্ষ্ম রেখা ম্যাগানিফাইং গ্লাস দিয়ে অরিজিনাল কপিতে দেখা যায়, যা ফটোকপিতে ধরা পড়ে না।
আনঅফিসিয়ালি চাইলে ড. মুশফিক অরিজিনাল কপি দিবেন না– এক্সপার্ট দিয়ে এটা যাচাই করাতে হলে মামলা করতে হবে।
এদিকে চেম্বারে বসে ব্যারিস্টার জহির সামিউল হত্যার ঘটনা রি-কনস্ট্রাক্ট করার চেষ্টা করছেন। ঘুরে ফিরে তার চিন্তা কুইনিনের বোতলে এসে হোঁচট খাচ্ছে। এক পর্যায়ে মনে মনে ‘ফার্স্ট থিং ফার্স্ট’ বলে তিনি কর্মচারীকে দিয়ে কুইনিন সালফেট ক্যাপসুলের তিনটা বোতল কিনে আনলেন। প্রত্যেকটা বোতলের ক্যাপসুল সংখ্যা গুনে দেখলেন, কোনও ব্যতিক্রম নেই, প্রত্যেকটা বোতলে ৩০টা ক্যাপসুল।
আফিয়া যেভাবে বোতল থেকে এক সঙ্গে দুটো ক্যাপসুল বের করার বর্ণনা দিয়েছেন, তাতে সন্দেহ নেই, বোতলে ৬টা ক্যাপসুল থাকার কথা। যেহেতু বোতলে ৭টা ক্যাপসুল ছিলো, তাই সিদ্ধান্ত নেয়া যায়, বাড়তি একটা ক্যাপসুল (কুইনিন ফেলে দিয়ে মরফিন দিয়ে পূরণ করে) বোতলে রাখা হয়েছে। কাজটি করার সুযোগ ছিলো ড. মুশফিক আর আফিয়ার। যেহেতু আফিয়া নিজেই কুইনিনের বোতলের দিকে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন, আর মুশফিক ২৫ লক্ষ টাকার চুক্তিপত্র নিয়ে এসে হাজির হয়েছেন যেই টাকার কথা আর কেউ জানে না– বোঝা যাচ্ছে মুশফিক হত্যাকারী। কিন্তু, বুঝতে পারা আর কোর্টে প্রমাণ করা এক কথা নয়।
একমাত্র উপায় হলো ক্রস-এগজামিনেশন (জেরা)। কাজটি সহজ হবে না, কারণ ড. মুশফিক খুবই চালাক লোক। অনেক আগে থেকে প্ল্যান করে গুছিয়ে কাজ করেন তিনি।
অ্যাডভোকেট কামালকে জহির দায়িত্ব দিলেন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে মামলার আর্জি তৈরি করতে। স্বাক্ষর দিতে আফিয়া চেম্বারে এলো। জহির তাকে বললেন, ‘এখন থেকে এই ঘটনা নিয়ে কেউ কিছু জানতে চাইলে বলবেন “নো কমেন্ট’’– সাংবাদিক হোক, আত্মীয়-স্বজন হোক আর যেই হোক। এক পর্যায়ে কোর্ট পিবিআই (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন)-কে তদন্তের দায়িত্ব দিতে পারে। পুলিশ আপনাকে ডাকলে আপনি আমাকে সাথে নিয়ে পুলিশের কাছে যাবেন।’
(৪)
পিবিআই তদন্ত করে তেমন কিছু পেলো না। শুধু লিখলো, “কুইনিনের বোতলে মরফিন-পূর্ণ একটি ক্যাপসুল রাখা হয়েছিলো বলে প্রতীয়মান হয়। কাজটি করার সুযোগ ছিলো দু’জন ব্যক্তির: (১) মামলার বাদী আফিয়া সিদ্দিকা (২) ভিকটিমের চিকিৎসক ড. মুশফিকুর রহমান।”
চুক্তিপত্রে সামিউলের স্বাক্ষর প্রসঙ্গে পিবিআই লিখেছে, “আলোচ্য চুক্তিপত্রে সামিউল হক স্বাক্ষর করেছেন বলে প্রতীয়মান হয়, তবে নিঃসন্দেহ হওয়া সম্ভব হয়নি।”
অবশেষে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে আসামীকে জেরা করার দিনটি এলো। আগের দু’দিন ধরে নিজেকে তৈরি করেছেন ব্যারিস্টার জহির। ম্যালেরিয়া, কুইনিন সালফেট, মরফিন সালফেট আর মরফিন ওভারডোজ নিয়ে নানা লেখা পড়েছেন তিনি।
আফিয়ার সামনে জহির ব্যর্থ হতে চান না। এছাড়া, রিপোর্টার আর টিভি ক্যামেরায় কোর্টরুম সয়লাব হয়ে গেছে। সারা দেশের মানুষ এই জেরার খুঁটিনাটি জানতে পারবে।
জেরার শুরুতে ডক্টর মুশফিকের নাম-ঠিকানা, পেশা নিয়ে কিছু গতানুগতিক প্রশ্ন করলেন জহির। এরপর আসল কথায় এলেন।
‘ড. মুশফিক, আপনার প্রফেশনাল ওপিনিয়নে কীভাবে মিস্টার সামিউল হকের মৃত্যু হয়েছে?’
‘ঢাকা মেডিকেলের ডেথ সার্টিফিকেটে লেখা হয়েছে মরফিন ওভারডোজ,’ বললেন মুশফিক।
‘আমি তো ঢাকা মেডিকেলের ওপিনিয়ন জানতে চাইনি। আপনি সলিমুল্লাহ মেডিকেলের একজন সহযোগী অধ্যাপক, সামিউলের চিকিৎসক। আপনার ওপিনিয়ন কী?’
‘মরফিন ওভারডোজের কোনও কারণ আমি খুঁজে পাচ্ছি না। আমি জানতে পেরেছি মৃত্যুর আগে মি. সামিউল কোমায় চলে গিয়েছিলেন– মরফিনের কারণে কোমায় গেলেন, নাকি কিডনির সমস্যার কারণে, তা অনেক সময় বোঝা যায় না।’
‘সামিউলের কি কোনও কিডনি প্রবলেম ছিলো?’
‘আমার জানা নেই। হয়তো ছিলো, কেউ জানে না।’
‘যা কেউ জানে না, সেটা আমরা ধরে নেবো কেন? পোস্ট-মর্টেম রিপোর্টে তো মাত্রাতিরিক্ত মরফিন পাওয়ার কথা বলা হয়েছে।’
‘কিছু মরফিন পাওয়া স্বাভাবিক, কারণ আমি মি. সামিউলকে প্রতি রাতে ২০ এমজি মরফিন প্রেসক্রাইব করেছি। হয়তো পোস্ট-মর্টেমে মরফিনের পরিমাণ লিখতে ভুল করেছে।’
জহির বুঝতে পারছেন, কেন মুশফিক মরফিন ওভারডোজের দিকে যেতে চাইছেন না। মরফিন ওভারডোজ প্রতিষ্ঠিত হলে দায়ী ধরা হবে মুশফিক অথবা আফিয়াকে। যেহেতু আফিয়া বাদী, সন্দেহটা মুশফিকের দিকেই যাবে।
জহির বললেন, ‘ঢাকা মেডিকেলের পোস্ট-মর্টেম রিপোর্টে ভুল হয়েছে ধরে নিবো? তাহলে কুইনিনের বোতলে এক্সট্রা ক্যাপসুল কীভাবে ব্যাখ্যা করবো?’
‘মানে?’ মুশফিকের কণ্ঠে বিস্ময়।
‘বোকা সাজবেন না।–’
‘অবজেকশন, ইওর অনার,’ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন আসামী পক্ষের উকিল। ‘আমার ক্লায়েন্টকে অপমান করা হচ্ছে।’
‘দু:খিত, ইওর অনার,’ বললেন জহির। ‘কিন্তু, পি.বি.আই. রিপোর্ট কি শুধু আমরা বাদীপক্ষ দেখেছি? আসামী পক্ষকেও কপি দেয়া হয়েছে। তারপরও, সবার সুবিধার্থে আমি ব্যাখ্যা করছি। কুইনিনের বোতলে মরফিন ভর্তি একটা ক্যাপসুল রাখা হয়েছে। সামিউলকে কুইনিন সালফেট ৩২৪ এমজি ক্যাপসুল যদি দু’টো খাওয়ানো হতো, তাহলে পরিমান দাঁড়াতো ৬৪৮ এমজি, আর মরফিন সালফেট-এর পরিমান থাকতো ২০ এমজি। পোস্ট-মর্টেম রিপোর্টে উল্লেখ করা পরিমাণ এর ধারে কাছেও না। এবার, একটা কুইনিন সালফেট-এর বদলে মরফিন সালফেট ধরে হিসাব করুন– সেক্ষেত্রে কুইনিন খাওয়ানো হয়েছে ৩২৪ এমজি, পোস্ট-মর্টেমে এসেছে ৩০০ এমজি-এর বেশি। মরফিন খাওয়ানো হয়েছে ৩২৪ এমজি + ২০ এমজি, অর্থাৎ ৩৪৪ এমজি, পোস্ট-মর্টেমে এসেছে ৩৩০ এমজি-এর বেশি। দেখেন হিসাব কীভাবে মিলে যাচ্ছে। ডক্টর মুশফিক এখনও বলার চেষ্টা করছেন পোস্ট-মর্টেম রিপোর্ট ভুল।’
ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব ভ্রু কুঁচকে মুশফিকের দিকে তাকালেন।
‘ঠিক আছে,’ বললেন মুশফিক, ‘মরফিন ওভারডোজে মি. সামিউলের মৃত্যু হয়েছে ধরে নিলাম। কিন্তু, আমাকে কেন সন্দেহ করা হচ্ছে? আমার তো ওভারডোজ দেয়ার সুযোগ ছিলো না।’
‘সুযোগ ছিলো কিনা দেখা যাবে। ডক্টর মুশফিক, আপনি তো সাধারণত কারও বাসায় গিয়ে চিকিৎসা করেন না। সামিউলের বাসায় গিয়ে কেন ট্রিটমেন্ট করলেন?’
‘তারা আমার বহুদিনের ফ্যামিলি ফ্রেন্ড–’
‘তার মানে, মিসেস আফিয়ার অনুরোধ আপনি ফেলতে পারেননি?’
‘হ্যাঁ, তাই।’
‘কিন্তু, ঘটনার আগের দিন, মঙ্গলবার রাতে আপনি ওদের বাসায় গিয়েছিলেন কেন? কেউ তো অনুরোধ করেনি।’
‘নিশ্চয়ই মি. সামিউল বা মিসেস আফিয়া যেতে বলেছিলেন–’
‘অবশ্যই না। আপনাকে সাবধান করছি, চাইলেই মোবাইলের কল রেকর্ড চেক করা যাবে।’
একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেলেন মুশফিক। সামলে নিয়ে বললেন, ‘ভালো করে মনে আসছে না। হয়তো কাছে পিঠে ছিলাম, ভাবলাম রোগীর অবস্থা দেখে আসি। আগের দিনই তো মরফিন প্রেসক্রোইব করেছিলাম।’
‘ফোন করেও তো খোঁজ নিতে পারতেন। যাই হোক, দেখা যাচ্ছে মরফিন ক্যাপসুল কুইনিনের বোতলে রাখার সুযোগ আপনার ছিলো।’
‘কিন্তু, পুরো সময়টাতে মিসেস আফিয়াও তো রোগীর কাছে ছিলেন।’
অবাক হওয়ার ভান করলেন জহির। বললেন, ‘আপনি কি বলতে চান মিসেস আফিয়া আপনার জন্য চা-নাস্তা বানাতে যাননি?’
আমতা আমতা করে মুশফিক বললেন, ‘অল্প কিছুক্ষণের জন্য হয়তো তিনি গিয়েছিলেন–’
ম্যাজিস্ট্রেটকে উদ্দেশ্য করে জহির বললেন, ‘ইওর অনার, ফর দ্য রেকর্ড, ড. মুশফিক বিনা অনুরোধে মঙ্গলবার সামিউলদের বাসায় গিয়েছিলেন এবং কুইনিনের বোতলে মরফিন ক্যাপসুল রাখার সুযোগ পেয়েছিলেন।’
(৫)
এবার প্রসঙ্গ চেঞ্জ করলেন ব্যারিস্টার জহির। ঋণ চুক্তিপত্র নিয়ে গতানুগতিক কিছু প্রশ্ন করলেন মুশফিককে। তারপর বললেন, ‘২৫ লক্ষ টাকা আপনি নগদ দিতে গেলেন! যদি ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করে দিতেন, তাহলে তো আমাদের মনে কোনও সন্দেহ থাকতো না।’
‘মি. সামিউল নগদ টাকা দিতে বার বার অনুরোধ করেছেন।’
‘টাকা দরকার হলে সামিউলের তো আপনার কাছে যাওয়ার কথা না। আপনার সাথে তার সম্পর্ক সেই পর্যায়ের না। তার তো আসার কথা আমার কাছে। আমি আপনার মতো সুদ চাইতাম না।’
‘দেখুন, টাকাটা ধার না দিয়ে ব্যাংকে রাখলে তো আমি সুদ পেতাম –’
‘২৫ লক্ষ টাকা আপনি ব্যাংক থেকে কবে তুলেছেন?’
‘১০ লক্ষ টাকা ব্যাংক থেকে তুলেছি। বাকি ১৫ লক্ষ টাকা আমার কাছে নগদ ছিলো।’
‘এত টাকা আপনার কাছে নগদ ছিলো! কোথায় পেলেন?’
‘অনেক দিন ধরে রোগীদের ভিজিট জমেছে। ব্যাংকে রাখা হয়নি।’
‘ড. মুশফিক, কোর্ট অর্ডার নিয়ে আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টের লেনদেনের রেকর্ড জোগাড় করা হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, আপনি যেই দশ লাখ টাকা তোলার কথা বলছেন, সেটা তোলা হয়েছে চুক্তিপত্রের তারিখের ১৭ দিন আগে। সেই টাকার সাথে চুক্তিপত্রের সম্পর্ক থাকার কথা না।’
‘লোন দেয়া নিয়ে কয়েকদিন ধরে আমাদের মধ্যে কথা হচ্ছিলো–’
‘কথা ফাইনাল হওয়ার আগেই আপনি টাকা তুলে রেডি হয়ে বসে ছিলেন? লোন দেয়ার জন্য খুব উদগ্রীব ছিলেন দেখা যায়!’
‘আপনি যা খুশি ভাবতে পারেন।’
‘আপনি কি অন্য কাউকে কখনও সুদে টাকা ধার দিয়েছেন?’
‘আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে আমি এক সুদখোর মহাজন। আমি টাকার থোড়াই কেয়ার করি। মিসেস আফিয়াকে জিজ্ঞাসা করে দেখুন, আমি সব টাকা তাকে দিয়ে দিতে চেয়েছি।’
‘তা চেয়েছেন, তবে বিয়ের কাবিন বাবদ। যদি লোন এগ্রিমেন্ট ভুয়া হয়ে থাকে–’
‘অবজেকশন, ইওর অনার,’ বললেন আসামী পক্ষের উকিল। ‘লোন এগ্রিমেন্টকে উনি ভুয়া বলতে পারেন না।’
‘ইওর অনার, আমি লোন এগ্রিমেন্টকে ভুয়া বলি নাই। আমি বলতে চেয়েছি, “যদি” লোন এগ্রিমেন্ট ভুয়া হয়ে থাকে, আর এই টাকা কাবিন হিসাবে মিসেস আফিয়াকে দেয়া হয়, তাহলে কৈ-এর তেলে কৈ ভাজা হবে।’
কোর্টরুমে হাসির রোল পড়ে গেল।
তবে, জহির একটু দুশ্চিন্তায় পড়লেন। লোন এগ্রিমেন্টটা ভুয়া প্রমাণের জন্য খুব শক্ত কোনও যুক্তি দাঁড় করানো যাচ্ছে না।
কিছুটা অন্যমনস্ক-ভাবে লোন এগ্রিমেন্টটা হাতে নিতেই হঠাৎ করে জহিরের মাথায় একটা আইডিয়া এলো। তিনি এগ্রিমেন্টের তিনটি পৃষ্ঠায় সামিউলের দেয়া তিনটি স্বাক্ষর খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন। এক পর্যায়ে ‘পেয়েছি’ বলে তিনি ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের দিকে তাকালেন।
‘ইওর অনার, লোন এগ্রিমেন্ট- এ যে তিনটি স্বাক্ষর সামিউলের বলে দাবি করা হচ্ছে, সেই স্বাক্ষরগুলো হুবহু এক। একদম হানড্রেড পারসেন্ট সেইম।’
‘হোয়াট আর ইউ টকিং অ্যাবাউট? একই লোকের স্বাক্ষর এক রকম হবে না?’
‘না, ইওর অনার। ড. মুশফিকের যে তিনটি স্বাক্ষর রয়েছে, সেগুলোর একটার সাথে আরেকটার কিছুটা হলেও পার্থক্য রয়েছে। একজন মানুষ যদি কয়েকটা স্বাক্ষর দেয়, মোটামুটিভাবে মিল থাকলেও কিছু না কিছু পার্থক্যও থাকে। সব মানুষের ক্ষেত্রে এটা সত্যি। কিন্তু সামিউলের তিনটা স্বাক্ষর হানড্রেড পার্সেন্ট সেইম। বোঝা যাচ্ছে, একটা স্বাক্ষর জোগাড় করে সেটা ট্রেসিং করে তিন জায়গায় তিনটা স্বাক্ষর বসানো হয়েছে। প্রয়োজনে ট্রেসিং করে নিশ্চিত হওয়া যেতে পারে।’
ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব হাত বাড়িয়ে চুক্তিপত্রটি চাইলেন। কিছুক্ষণ খুঁটিয়ে দেখে জহিরের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আই থিংক ইউ আর রাইট।’
ড. মুশফিকের মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেল।
‘ইওর অনার,’ জহির যোগ করলেন, ‘চুক্তিপত্রটি যেহেতু ভুয়া প্রমাণিত হয়েছে, তাই খুনের পরিষ্কার মোটিভ পাওয়া যাচ্ছে। সামিউল বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই ভুয়া চুক্তিপত্র দেখিয়ে তার কাছ থেকে টাকা আদায় করা যেতো না, মিসেস আফিয়াকে বিয়ে করার চেষ্টাও করা যেতো না।’
‘পয়েন্ট টেকেন। আপাতত ড. মুশফিকের জামিন বাতিল করা হলো। উনাকে গ্রেফতার করার নির্দেশ দেয়া হলো।’
(৬)
বেইলি রোডের ‘ক্যাফে অপিয়াসে’ লাঞ্চ সেরে আফিয়া আর জহির কফি খাচ্ছেন। অ্যাডভোকেট কামাল চেম্বারে চলে গেছেন। চেম্বারের সবার জন্য স্পেশাল লাঞ্চের ব্যবস্থা করতে বলেছেন জহির।
কফি মগে একটা চুমুক দিয়ে আফিয়া বললেন, ‘আমার একটা প্রশ্ন আছে। মুশফিক যখন মরফিন ক্যাপসুল বোতলে রাখলেন, একটা কুইনিন ক্যাপসুল কেন বের করে নিলেন না? তাহলে তো ক্যাপসুলের সংখ্যা নিয়ে আমার মনে খটকা লাগতো না।’
‘আমার ধারণা, প্রথম সুযোগে সে চট করে মরফিন ক্যাপসুলটা বোতলে রেখেছে, কারণ ওটাই তার মূল উদ্দেশ্য। এরপর, যেহেতু ক্যাপসুলগুলো দেখতে এক রকম, কোনও ক্যাপসুল সে বের করতে যায়নি, কারণ তাতে মরফিন ক্যাপসুলটাই বের হওয়ার কিছুটা সম্ভাবনা ছিলো।’
একটা কথা ভেবে আফিয়ার মুখটা হঠাৎ ম্লান হয়ে গেল। তিনি বললেন, ‘ভেবে দেখেছেন, জহির ভাইয়া– আমি নিজের হাতে আমার স্বামীকে বিষ খাইয়েছি।’ বলতে বলতে কেঁদে ফেললেন আফিয়া।
‘এইভাবে নিজেকে দোষ দেয়া আপনার ঠিক হচ্ছে না।’
‘আমি যখন বোতলে ৭টা ক্যাপসুল কেন তা চিন্তা করছি, সামিউল বলেছিলো “কী ভাবছো?”– তখন যদি আমি ব্যাপারটা খুলে বলতাম– ও তো আপনার মতোই তীক্ষ্ণ বুদ্ধির লোক ছিলো। হয়তো খটকা লাগলে ও সেই ওষুধ খেতো না। বলতো, নতুন বোতল নিয়ে আসো।’
‘নিজেকে এভাবে কষ্ট দিবেন না প্লিজ।’ চোখের পানি মুছতে একটা টিস্যু আফিয়ার দিকে এগিয়ে দিলেন জহির।
‘আমার নিজের কথা থাক। আপনার খবর কী? ভাবী আর ছেলের কথা ভুলতে পারছেন না?’
‘কাল ওদের ডেথ অ্যানিভার্সারি। কবর জিয়ারত করতে যাবো।’
‘আমি আপনার সাথে যাই?’
‘ঠিক আছে।’
(শেষ)
প্রাক্তন শিক্ষার্থী
পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সেশনঃ ১৯৮৩ - ৮৪
- জাফর আহমেদ খানhttps://www.thepapyrus.org/author/%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%ab%e0%a6%b0-%e0%a6%86%e0%a6%b9%e0%a6%ae%e0%a7%87%e0%a6%a6-%e0%a6%96%e0%a6%be%e0%a6%a8/বৃহস্পতিবার, জানুয়ারি 1, 2015
- জাফর আহমেদ খানhttps://www.thepapyrus.org/author/%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%ab%e0%a6%b0-%e0%a6%86%e0%a6%b9%e0%a6%ae%e0%a7%87%e0%a6%a6-%e0%a6%96%e0%a6%be%e0%a6%a8/বৃহস্পতিবার, জানুয়ারি 1, 2015
- জাফর আহমেদ খানhttps://www.thepapyrus.org/author/%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%ab%e0%a6%b0-%e0%a6%86%e0%a6%b9%e0%a6%ae%e0%a7%87%e0%a6%a6-%e0%a6%96%e0%a6%be%e0%a6%a8/বুধবার, জুলাই 1, 2015
- জাফর আহমেদ খানhttps://www.thepapyrus.org/author/%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%ab%e0%a6%b0-%e0%a6%86%e0%a6%b9%e0%a6%ae%e0%a7%87%e0%a6%a6-%e0%a6%96%e0%a6%be%e0%a6%a8/বুধবার, জুলাই 1, 2015
- জাফর আহমেদ খানhttps://www.thepapyrus.org/author/%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%ab%e0%a6%b0-%e0%a6%86%e0%a6%b9%e0%a6%ae%e0%a7%87%e0%a6%a6-%e0%a6%96%e0%a6%be%e0%a6%a8/বুধবার, এপ্রিল 17, 2019












