কিছুদিন ধরেই গরম আর আর্দ্রতায় বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। সেদিন সকাল থেকেই আকাশের রং বদলে যেতে লাগল। মেঘে ঢাকা আকাশ, হালকা শীতল বাতাস আর আসন্ন বৃষ্টির গন্ধ– সবকিছু মিলিয়ে প্রকৃতি এত সুন্দর হয়ে উঠেছিল, যা ভাষায় বলা যাবে না। না পুরো রাত, না দিন। এমন দিনগুলো শুধু অনুভব করার জন্য, বলার জন্য নয়। ক্লাস শেষ করে প্রতিদিনের মতো রিকশায় করে বাসায় আসছিলাম। রিকশায় বসে বাতাস ভেদ করে যাচ্ছিলাম। এই অনুভূতিটা প্রতিবছরই আসে– তবুও কত নতুন! বৃষ্টির আগের এই সময়টা অসম্ভব সুন্দর। রাস্তায় মানুষ, কোলাহল কমে যায় এবং একটা নরম শীতলতার ছোঁয়ায় সবকিছু ডুবে যায়। ইচ্ছে হয় এই মুহূর্তটাকে যদি সারা জীবনের জন্য থামিয়ে রাখা যেত!
বাড়িতে পৌঁছে আমি কয়েকবার দরজার বেল বাজালাম, কিন্তু কেউ দরজা খুলল না। বুঝলাম মা ছোট ভাইকে কোচিং থেকে আনতে গিয়েছে। সেদিন ব্যাগে অতিরিক্ত চাবিও ছিল না। কিছু করারও নেই! তাই কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বিরক্ত হয়ে সিঁড়িতেই বসে পড়লাম। বাড়িতে বিদ্যুৎও ছিল না। ধীরে ধীরে বিল্ডিংটা অন্ধকার হয়ে আসছিল। বিল্ডিংটা একটু পুরোনো কাঠামোর– আধুনিকতার ছোঁয়া কম। এমন কিছুটা গন্ধও ছিল যা শুধু ঢাকা শহরের পুরোনো বাড়িতেই পাওয়া যায়।
সিঁড়িতে প্রায় ১০–১৫ মিনিট অপেক্ষা করার পর আর ভালো লাগছিল না। মনে হচ্ছিল, এই বাড়িতে কেউই থাকে না। একটি অদ্ভুত নীরবতা পুরো বাড়িটিকে ঘিরে রেখেছে। হঠাৎ মনে হলো, এইভাবে বসে থাকার চেয়ে ছাদে গিয়ে দাঁড়ালে আকাশের সৌন্দর্যটা আরও ভালোভাবে অনুভব করা যাবে। বিল্ডিংটা ছিল ছয় তলা। আমি প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে ছাদের দিকে এগোতে লাগলাম।
ছাদে পৌঁছে গেটের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। গেটটা ছিল পুরোনো, ভারী এবং লোহার তৈরি। আমি যখন এক-দুই পা করে করে সামনে এগোলাম, হঠাৎ করেই জোরে বাতাস এল। বাতাসটা খুব অস্বাভাবিকভাবে জোরে মনে হচ্ছিল। সেই ঝড়ো হাওয়ায় লোহার গেটটা সজোরে শব্দ করে উঠল এবং মুহূর্তের মধ্যে গেটের ধারটা এসে আমার পায়ের সাথে লাগল। গেটের ধার এতটাই তীক্ষ্ণ ছিল যে আমার পা গভীরভাবে কেটে গেল। তীব্র ব্যথা এক মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ল। রক্ত বের হতে শুরু করল এবং আমার পায়ের পেছনের অংশ রক্তে ভিজে গেল। ব্যথা এতটাই বেশি ছিল যে আর দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে মাটিতেই বসে পড়লাম।
কিছুক্ষণ সেখানেই বসে রইলাম, ব্যথা কমার অপেক্ষায়। তারপর মনে হলো, এভাবে বসে থাকলে চলবে না। এখান থেকে বের হতে হবে। চারপাশের বাতাসটা যেন একটু ভারী লাগছিল। অদ্ভুত একটি অনুভূতি হচ্ছিল– যেন এই ঘটনাটা কেবল একটি দুর্ঘটনা ছিল না। আমি জানতাম, এটা আসলে আমার কল্পনা। হয়তো এত রক্ত বের হওয়ার কারণে মাথাটা একটু ঘুরছিল। তাই এমন অদ্ভুত চিন্তা মাথায় আসছিল। আরও অদ্ভুত লাগছিল এই কারণে যে, সেই হঠাৎ ঝড়ো বাতাসটার পর আর কোনো বাতাসই ছিল না, যেন সেই একটিই ছিল– হঠাৎ এসে আবার হঠাৎই থেমে গেছে। সবকিছু মিলিয়ে জায়গাটা আমার কাছে অস্বস্তিকর লাগতে শুরু করল।
তারপর হঠাৎ একটি পুরোনো গল্প মনে পড়ে গেল, এই ছাদকে ঘিরেই। গল্পটা মূলত আমাদের বাসায় যিনি কাজ করতেন, তার মুখেই শুনেছিলাম। কিন্তু গুরুত্ব দেইনি। শোনা যায়– এই বাড়িটি যখন তৈরি হচ্ছিল, তখন একজন শ্রমিক নাকি ছাদ থেকে পড়ে মারা গিয়েছিল। তাই এই ছাদে মানুষ খুব বেশি যায় না। এমনকি ছাদের উপর একটি ছোটো রুমও আছে, থাকার জন্য। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, কেউ চেষ্টা করেও বেশিদিন টিকে থাকতে পারেনি। যারা থেকেছে, একই কথা বলেছে– কেমন যেন ভারী উপস্থিতি জায়গাটিকে ঘিরে আছে। আমাদের এক পুরোনো দারোয়ানও একবার এমনই একটি গল্প বলেছিল। সে নাকি ছাদে কিছু একটা জিনিস দেখেছিল আর শুধু বলছিল, “ওই জায়গাটা ভালো না।” তারপরের দিন থেকে সে আর কাজ করতে আসেনি।
চারপাশটা কেমন এক অদ্ভুত ভয়ে ভরে গেল। এক মুহূর্তের জন্যও এখানে থাকার সাহস ছিল না। আমি দ্রুত ছাদ থেকে নামতে শুরু করলাম। পা কেটে যাওয়া ব্যথা থাকলেও সেটা ভাবার সময় ছিল না। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে মনে হচ্ছিল, পেছনে যেন ছাদের দরজাটা ধীরে ধীরে নড়ে উঠল। আমি আর পেছনে তাকাইনি। বারবার নিজেকে বোঝাতে চেষ্টা করছিলাম–”সবই কল্পনা, সত্যি নয়”। তবুও সিঁড়ি পেরোতে গিয়ে শুধু একটি কথাই মাথায় ঘুরছিল–”যদি এসব সত্যি হয়?”
- Fatema Jamal Aparajitahttps://www.thepapyrus.org/author/fatema-jamal-aparajita/বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর 11, 2025








