আগস্ট 11, 2026

পথ হারাবো বলেই এবার

“আর কত? তোর কি কাজ শেষ হয় না রে? ড্রাইভ কর ব্যাটা।”

“আরেকটু বন্ধু। সামনে পাম্প পেলেই আমি ড্রাইভ করব, সত্যি,” বলল অখিল।

আমি জানি, এই যাত্রায় সে আর চালকের আসনে বসবে না। সম্ভবত নতুন কোনো অনুরাগের সন্ধান পেয়েছে সে; যাকে ইদানীং ‘টকিং স্টেজ’ বলে পরিচয় দেয়।

গাড়ি ছুটছে ঢাকার অভিমুখে। এখন ঘড়ির কাঁটায় সন্ধ্যা সাতটা বেজে ত্রিশ। গোধূলিলগ্ন পেরিয়ে অন্ধকার গাঢ় হচ্ছে। দিগন্তের আহ্বানে রক্তিম আভাকে কুর্নিশ জানিয়ে ধাবমান আমার শুভ্র টয়োটা প্রিমিও আমাকে নিরাশ করবে না বলেই বিশ্বাস। কুমিল্লায় তার বিশাল উদরপূর্তি করিয়েছিলাম, তাই আশা রাখি আমায় শান্তিতেই গন্তব্যে পৌঁছে দেবে।

কোথায় গিয়েছিলাম বলতে তো ভুলেই গেলাম। গিয়েছিলাম কক্সবাজার— হ্যাঁ, ঠিকই শুনছেন, কক্সবাজার। বর্ষাকালে এই জায়গার চেয়ে সুন্দর হয়তো কোথাও পাবো না। আমি ছোট থেকে বর্ষা প্রেমিক; বর্ষার প্রতিটি বিন্দুর সাথে আমার বোঝাপড়া দারুণ। সমুদ্রের পাড়ে হাঁটতে হাঁটতে আমি আমার গাহন ভিজিয়েছি, যা আমার প্রিয় কাজের মধ্যে অন্যতম। হয়তো একটু জ্বর আসবে, আসুক না— সেই জ্বরকেই না হয় আপন করে নেব, যেমনটা আপন করে নিয়েছি এই জীবনের কিছু মুহূর্তকে।       

সামনের লুকিং গ্লাস টি ঘুরিয়ে পেছনে দেখলাম। রাহুলের কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়েছে আশা; আশার পাশেই স্লিপিং পিলোর ওপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে সন্ধ্যা। সন্ধ্যার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম।

“সামনে তাকিয়ে চালা। যাকে দেখছিস সে ঘুমাচ্ছে,” বলে হাসল অখিল।

“ধুর, যাতা বলিস না তো! আমার মোবাইলটা আনলক করে গাড়ির সাথে কানেক্ট কর।”

“কিরে ভাই, তোর মোবাইলে তো সব পুরোনো গান। এইগুলো শুনবি?”

“হ্যাঁ, এগুলোই শুনব। তুই না শুনলে এসে ড্রাইভ করবি।”

অগত্যা অখিল প্লেলিস্টটি ছেড়ে দিল। কিছু কালজয়ী গান মনে দাগ কেটে দেয়; সেই দাগের ক্ষত কখনোই শুকোতে চায় না। শুকোতে হয়তো দিতেও চাই না।

প্রথম গানটির কি মধুর সুর! হাজার তারার ভিড়ে  আমরা পাঁচ পথিক— রাতের শোভা আর পথের যাত্রী।

“ঘুম ঘুম চাঁদ, ঝিকিমিকি তারা এই মাধবী রাত                                                                                       আসেনি তো বুঝি আর
জীবনে আমার…

কি আজব, তাই না? ঠিক আছে, আমি ‘স্মার্ট শাফল’ দিয়ে রেখেছি— তবুও সে কী করে বুঝল মায়াভরা রাতে আমার গাড়িতে মায়াবিনী সন্ধ্যা! সন্ধ্যা নিঃসন্দেহে মায়াবিনী। অন্ধকার এই পথে বাইরে থেকে আসা রাস্তার বাতিগুলো যখন তার গালে আলতো করে ছোঁয়া দিয়ে চলে যাচ্ছিল, তখন অপরূপা মায়াবিনীই লাগছিল তাকে। 

সন্ধ্যার সাথে বেশি দিনের পরিচয় না আমার, এইতো কেবল ছয় কি সাত মাস হবে। পরিচয় হয় মূলত আশার মাধ্যমে। আশা হলো আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম বন্ধু, যার সাথে এই চার বছরে যুদ্ধ, আনন্দ, বেদনা— সবই ভাগ করেছি। দেখে ভালো লাগছে যে তার পাশে তার জীবনসঙ্গী রাহুল আছে। রাহুল ভালো ছেলে; অন্তত আমার মন বলে সে ভালো ছেলে। এইতো গত জানুয়ারিতেই বিয়ে হলো তাদের। আর আমার পাশের সিটে আছে অখিল। তার পরিচয় নিয়ে আর কী বলব! সে আমার শুরুর দিকের বন্ধু, যার সাথে দুঃখ, আনন্দ আর বেদনাবিধুর সব মুহূর্ত ভাগ করেছি।

“নিঝুমসন্ধ্যায়
পান্থ পাখিরা
বুঝিবা পথ ভুলে যায়…
কুলায় যেতে যেতে
কী যেন কাকলী
আমারে দিয়ে যেতে চায়”

তখন ইনানীর অপরূপ শোভায় নিজেদের বিমোহিত করছিলাম। যতদূর দেখতে পাই— বারিধির অপার্থিব সৌন্দর্য আর পাখির কলতান। উত্তর দিক থেকে বাতাস এসে বারবার ঝাপটা দিচ্ছিল আমার গায়ে। সেই দূরে একটা ভাঙ্গা সাম্পানের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তোলায় ব্যস্ত নবদম্পতি; আর একটু পেছনেই ছায়াঘেরা অরণ্যের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আধখাওয়া সিগার হাতে নিয়ে ফোনে কাকে যেন ইচ্ছেমতো ঝাড়ছে অখিল। আরেকটু দূরেই দেখতে পেলাম সন্ধ্যাকে। সমুদ্রের বুক থেকে ধেয়ে আসা ছোট ছোট ঢেউকে পরম আনন্দে নিজের পায়ের সাথে আলিঙ্গন করতে দিচ্ছে। আমিও কেন যেন অধীর আগ্রহে দেখছিলাম দৃশ্যটি; মনে হচ্ছিল যেন সব সময়ই দেখতে থাকি। একটু সামনেই  বালু খুঁড়ে মাটি থেকে  বের হয়ে এল একটা লাল কাঁকড়া । আমি চেনা রাস্তায় অচেনা অনুভূতি নিয়ে এগিয়ে গেলাম ঢেউ গুলোকে জড়িয়ে নিতে। বেজে উঠলো প্রিয় একটি সুর—

সুরে সুরে বাঁধা আছে
তোমারই মায়ার তানে,
অনুরাগ রাগে তান
বেঁধেছি গো বারে বারে…”

আচমকা জানালার গ্লাসের ওপর দু-এক ফোঁটা বৃষ্টি পড়া শুরু হলো। আমাদের কাঁকড়া বিচে ঘোরার দিনটিতেও এমন বৃষ্টি হচ্ছিল। ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি; প্রত্যেকটা ফোঁটায় আনন্দ উপচে পড়ে আমাকে ভিজিয়ে দিচ্ছিল। বৃষ্টির সময় গাছের নিচে দাঁড়ালে যখন পাতায় ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি পড়ে, তখন যে শব্দ হয়—সেই শব্দেই যেন আমার এত পথ পাড়ি দিয়ে এখানে আসা সার্থক। সত্যিই সার্থক!

কাঁকড়া বিচে দাঁড়িয়ে উত্তাল সমুদ্রের পানে তাকিয়ে ঠিক করেছিলাম— এবার আমি প্যারাসেলিং করবই। বর্ষার আকাশের কারণে এবারও আমার প্যারাসেলিং করা হলো না। পরের বার করার আশায় মেরিন ড্রাইভে কিছুক্ষণ গাড়ি চালালাম।

রাতের সমুদ্র অন্য রকম, একদম অন্য রকম। মনে হয় যেন দূর থেকে আনন্দের ভাণ্ডার নিয়ে দাঁড়িয়ে তার সম্পূর্ণ সম্পদ ঠেলে দিচ্ছে কোনো বিশ্বজয়ী নাবিক। আর আমাকে বলছে আমি যেন প্রতিটি আনন্দের বিন্দুকে নিজের মধ্যে নিয়ে নেই। এক রাতে আমি বেরিয়েছিলাম কিছু কেনাকাটা করার জন্য। সাথে বেরিয়েছিল সন্ধ্যাও, তারও কিছু কেনাকাটা বাকি ছিল। আশা আর রাহুল আগেই বেরিয়েছিল; পথে তাদের সাথেও দেখা হয়ে যায়। চারজন রাতের মেঘলা আকাশের নিচে ঘুরেছিলাম, পথেপ্রান্তে সুদূর পরিকল্পনা করে হোটেল রুমে ফিরে এসেছিলাম। প্রতিটি মুহূর্ত মনে করার মতো, মনে গেঁথে রাখার মতো। 

যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারে উঠলাম। কিছুক্ষণ পরেই অখিল নেমে গেল, তার বাসা সায়েদাবাদ। বিদায় দেওয়ার বেলায় সবাই গাড়ি থেকে নামল। তাকে বিদায় দিয়ে আমরা আবার পথ চললাম। আশা এবং সন্ধ্যা— দুজনের বাসাই রামপুরা; তাই তাদের নামানোর উদ্দেশ্যে বনশ্রী হয়ে রামপুরা গেলাম। এই পথ বেছে নেওয়ার কারণ হচ্ছে— এই পথেই আমার প্রিয় একটি চায়ের দোকান। আমরা চারজন নেমে প্রিয় চা পান করলাম এবং যা জানতে পারলাম তা হলো, সামনের আগস্টেই নাকি সন্ধ্যার বিয়ে। অনেক কম সময় পেয়েছে প্ল্যানিং করার, কারণ তার পারিবারিক বন্ধু এবং বাগদত্তা সেপ্টেম্বরেই দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। আমাদের তার বিয়েতে থাকতেই হবে। আমরা সবাই অভিনন্দনে ভাসিয়ে দিলাম এবং আমি  আরও এককাপ চা খেয়ে আবার গাড়ি চালানো শুরু করলাম।  

যাত্রা শেষ। আশা, রাহুল, সন্ধ্যা—সবাই নেমে গেল। যাওয়ার আগে আশা ব্যাগ ভর্তি কিছু উপহার আমার হাতে ধরিয়ে একটু গালমন্দ করে চলে গেল। আর সন্ধ্যা একরাশি হাসি নিয়ে বিদায় নিল; যাওয়ার সময় বলে গেল, “অনেক ধন্যবাদ, আবার দেখা হবে।” আমিও একগাল হাসি দিয়ে বিদায় দিলাম।

গাড়িতে আর কেউ নেই। খিলগাঁও ফ্লাইওভারের সেই চিরচেনা আলোর নিচ দিয়ে ছুটে চলছি। কিছু সুন্দর মুহূর্ত পুঁজি করে, কিছু প্রিয় আবেগকে বুকে টেনে নিয়ে আর জীবনের সার্থকতাকে স্মরণ করে ছুটে চলেছি তীব্র গতিতে।

চলে এলাম সেই বাঁকে— খিলগাঁও ফ্লাইওভারের সেই পরিচিত বাঁক। এই বাঁকেই আমার চাচা বলতেন, “ধীরে চালা এখানে, সব সময় ব্রেক দিবি।” কিন্তু আহা আফসোস! এই বাঁকেই তো আজ থেকে প্রায় দু-বছর আগে অতিরিক্ত গতির কারণে ছিটকে গিয়ে গাড়িসহ ফ্লাইওভার থেকে নিচে পড়ে যাই।

গাড়ির স্পিকারে তখনও বেজে চলছিল প্রিয় আরেকটি গান—

“পথ হারাবো বলেই এবার,
পথে নেমেছি …”

শিক্ষার্থী | পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
Facebook
Threads
LinkedIn
Telegram
X
Reddit
Email
WhatsApp

আরও লেখা সমূহ