সময়টা ক্যালেন্ডারের হিসেবে ২০২৫ এর মে মাস। সায়েন্স ফ্যাকাল্টির ছেলে – মেয়েদের কাছে এই সময়টা সোনায় সোহাগা একটা সময়। বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানকোষের ভাষায় যাকে ভদ্র ভাষায় পিএল বলা হয়। সোনায় সোহাগা বলার কারণ হলো তখন বাংলা বর্ষপঞ্জির হিসেবে একে তো বর্ষাকাল তার উপর ক্লাস, প্রেজেন্টেশন আর ল্যাবের প্যারা নেই। অনেকটা মেঘ না চাইতেই জল পেয়ে ফেলার মতো। পিএল এর পর শুরু হয় ঈদের ছুটি। তাই এই মাসটাতে হলগুলোতে অনেকটা আমেজই থাকে বলা চলে, কারণ পাহাড় কিংবা সমুদ্রে দাপিয়ে বেড়ানোর মোক্ষম সময় মে মাস। আবার নিউমার্কেটের কেনাকাটা হয়ে নাজিরাবাজারের ভোজ তো আছেই।
প্রথম বর্ষের পিএল এ কি ভেবে যেনো হলেই থেকে গেলাম। বাড়ি যাওয়ার সাধ হলো না। কারণটা অবশ্য নতুন নতুন হল এ উঠার সাথে কিছু নতুন বন্ধুদের সাথে অতি দ্রুতই সখ্যতা গড়ে উঠায়। আমি তখন থাকি শামসুন নাহার হলের অনার্স বিল্ডিং এর ৪৪৩ নম্বর রুমে। প্রভোস্ট অফিসের ঠিক পেছনের ভবনেরই চার তলায়৷ মাঝখানে এক লম্বা করিডোর। করিডোরের একদম পূর্বদিকেই ৪৪৩ নম্বর রুম। রুমের পাশ থেকেই প্রভোস্ট বাংলো, টিএসসির অনেকটা অংশ আর মেট্রো স্টেশনের লাল হলুদ বাতিগুলো জ্বলজ্বল করতো। আমার বেড ছিলো ৪৪৩ এর একদম দক্ষিণ দিকে। বেড থেকেই পরমাণু শক্তি কমিশন এর গেইট আর জগন্নাথ এর রবীন্দ্র ভবন দেখা যেতো। সেদিন বৃষ্টিতে কাকভেজা হয়ে নিউমার্কেটের গাউছিয়া, চন্দ্রিমা, চাঁদনীচক আর নীলক্ষেতের বুক মার্কেটের অলিগলি ঘুরে বেড়িয়ে হলে ফিরতেই ঘড়ির কাটায় ৯টা ৫০ মিনিট। একটু বৃষ্টি হলেও আবহাওয়া তখনও ঠান্ডা হওয়ার নাম গন্ধ নেই। ভ্যাপসা গরমে পুরো হাঁসফাঁস করার মতো অবস্থা। সেদিন ছিলো সম্ভবত পূর্ণিমা তিথি। চাঁদের আলোয় পুরো আকাশ চকচক করছিলো । জানালার পাশের ধারের বড় আমলকী গাছের ছায়া এসে পড়ছিলো মাথার কাছে। ঘুম না আসায় কি ভেবে যেনো রুম থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে মিড বিল্ডিং এর মাঠে চলে আসলাম। মিড বিল্ডিং এর ঠিক মাঝখানে একটা মাঝারি টাইপের কদম গাছ আছে৷ পাশেই কিছু বেঞ্চিতে তখনো বৃষ্টির জল চুইয়ে পড়ছে৷ ঠিক পেছনেই নিচ তলার রিডিং রুম আর ডাইনিং স্পেস। ঈদের ছুটি এগিয়ে আসায় অনেকেই হল ছাড়তে শুরু করেছে। পূর্ণিমার আলোয় সবকিছু দিব্যি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। বেঞ্চি থেকে ওঠে রিডিং রুম এর সরু গলি পার হয়ে চলে আসলাম বটতলায়। এক্সটেনশন বিল্ডিং এর সামনের মাঠে অনেকগুলো গাছ একসাথে কিম্ভূতকিমাকার হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জাম, কেছুয়ানুডুজা, কৃষ্ণচূড়া, কাঠবাদাম, বহেরা, মেহগনি অনেকগুলো গাছ একসাথে। কংক্রিটের কয়েক মিটার চওড়া পাটাতনে হলুদ বাগানবিলাস ও ছড়িয়ে আছে। তার পাশেই দোতলার লাইব্রেরি। ঘড়িতে ১২ টা ০৪ মিনিট কিন্তু তখনো মিটমিট করে আলো জ্বলছে লাইব্রেরিতে। সিঁড়ি বেয়ে ওঠে রীতিমতো স্তব্ধ হওয়ার উপক্রম। একটা মানুষ তো দূরের কথা মাছির অস্তিত্ব ও ঠাহর করা যায় না। এইখানে আগে আসা হয়নি। তবে যথেষ্ট আগ্রহ আর কৌতূহল কাজ করতো বরাবর দোতলার লাইব্রেরি নিয়ে৷ একটা একটা আলমারি পুরনো – নতুন বইয়ে ঠাসা যার বেশিরভাগ হলের মেয়েদের রেখে যাওয়া আর কিছুটা হল কমিটির তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণে। চোখে পড়ে একটা তাক এ ১৯৯৯-২০০০ সেশন মার্কার দিয়ে লেখা যার অর্থ এই তাক এর বইগুলো ২৫ বছর পুরনো আবাসিক মেয়েদের রেখে যাওয়া স্মৃতির ধারক। ২০২৫ সেই হিসেবে রজত জয়ন্তী এই বইগুলোর। আনমনে একটা বই হাতে নিয়ে ধুপ করে বসে পড়ি ডেস্কে। একনাগাড়ে কতক্ষণ পড়লাম বেমালুম ভুলেই বসলাম। চোখ আটকালো ২৪ নম্বর পেইজে একটা ছোট্ট চিরকুটে এসে। নীল খামে মোড়ানো অত্যন্ত সুন্দর একখান চিরকুট। চিরকুটের লেখাগুলো হুবহু তুলে ধরছি
প্রিয় রুবি,
বড় অসময়ে আসলে তুমি, আরও কয়েক শতাব্দী আগেও তো আসতে পারতে। তাহলে হয় তো সক্রেটিসকে বিষ পানে মরতে হতো না। নীল নদের পাড়ে আনমনা তোমায় দেখে দর্শন চর্চা ছেড়ে প্রনয় কাব্যের সাধন করতো, গোপন চিরকুটে প্রেম বার্তা লিখে চুপিসারে পাঠাতো শিষ্য প্লেটোর হাতে। হয়তো ভিঞ্চির বিশ্বসেরা চিত্রটা আর বিমূর্ত থাকতো না। হয়তো তোমায় দেখে অতীত ভুলতো হেরোডোটাস, ইতিহাস ছেড়ে ভবিষ্যতের হাজারো জল্পনা-কল্পনা সাজাতো তোমায় নিয়ে। হয়তো তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে একে একে তিন করতো পিথাগোরাস, চৌকাকারে বৃত্ত আঁকতো জ্যামিতির খাতায়। কিন্তু কি দূর্ভাগ্য দেখো, তুমি জন্মালে এসে আমার সময়ে যে শূন্য হাতে তোমায় নিজের করতে চলে এলো। যাই হোক পরশু ক্লাসে পাশের চেয়ারে জায়গা রেখো। জানোই তো আমি সর্বদাই শেষ সময়ে নোঙর করা মানুষ।
ইতি ,
কমজোর পকেটের মুহিত ,
সার্জেন্ট জহরুল হক হল,
১৪০৫ বঙ্গাব্দ, ০৫/০৬/১৯৯৮
সেদিনের পর চিরকুটের মুহিতকে আমি অগণিতবার খোঁজার চেষ্টা করেছি। সেই হলের বর্তমান ও প্রাক্তন অনেকের কাছেই কিন্তু কোথাও খোঁজ মেলেনি। মনের মধ্যে কৌতূহল ছিলো রুবি আর মুহিতকে নিয়ে। ২৫ বছর পর কোথায় আছেন রুবি আর মুহিত। ২৫ বছর আগের যেই সুন্দর অনুভূতি স্মৃতিবদ্ধ হয়ে আছে আজও দোতলার লাইব্রেরির এক বইয়ে, সেই অনুভূতিতে বাঁধা পড়া যুগলের মিষ্টি স্মৃতির উপাখ্যান। তারমধ্যে গত হয়ে গেলো প্রায় বছরখানেক। আমি ব্যস্ত হয়ে পড়লাম নিজের জীবনে। ক্লাস, ল্যাব, টিউশন, ইনকোর্স সবমিলিয়ে জীবন যায় যায় অবস্থা। অবকাশ করারও যেনো সময় নেই। একদিন হুট করেই একটা টিউশনের অফার পাই ইস্কাটনে। লেডিস ক্লাব এর অপজিটে সরকারি কোয়ার্টারের দ্বিতীয় তলায়। ছিমছাম গোছানো বাসা। অত্যন্ত মার্জিত এবং গোছানো একেকটা রুম। বেলকনিতে হরেক রকম বাহারি গাছ আর ড্রয়িংরুমের সোফার পাশে বিরাট বুক শেলফ। বাঙালি সংস্কৃতির ছোঁয়া যেনো উপচে পড়ছে। সাধারণ লোকচক্ষুর চাহনিতে কোনো কমতি থাকার কথা নাহ। ভেতর থেকে ৪৬/৪৭ বছর বয়স গড়নের ভদ্রমহিলা এসে বসলেন। “আমার মেয়ের জন্যই টিচার খুঁজছি। আসলে আমরা একমাস হলো বাংলাদেশে শিফট হয়েছি। ওর বাবা ইউরোপের একটি দেশে কূটনীতিক হিসেবে ছিলেন। সম্প্রতি সরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি প্রজেক্ট ওর বাবার দায়িত্ব পড়ায় তড়িঘড়ি করে আমাদের দেশে আসা। আর হ্যা আমার নাম রুবি পারভীন। তোমার বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্রী ছিলাম। ১৯৯৩-১৯৯৪ সেশনে ইকোনমিক্স এ ভর্তি হয়েছিলাম,” বলছিলেন ভদ্রমহিলা। তুমি কাল থেকে পড়াতে এসো৷ চা আর খানিকটা গালগল্প শেষে বিদায় নেয়ার মুহূর্তে উনাদের বাসার সদর দরজার নেমপ্লেটে এসে একরকম হকচকিয়েই গেলাম। কাঠের প্লেটে খোদাই করে লেখা – Here lives Rubi and Muhit with Arora
নিউ ইস্কাটন রোডের ফাঁকা রাস্তায় তখন শেষ বিকেলের মৃদু আলো এসে উপচে পড়ছে৷ আমি একমনে হেঁটে চলছি আর ভাবছি পৃথিবীটা গোল তাই বলে এতো কাকতালীয় কিছু ঘটতে পারে! আমার মনে পড়ছে শেল সিলভারস্টেইনের বিখ্যাত বিষাদময় বাক্য – There are no happy endings. নাহ নাহ এই গল্পে বিষাদের ব্যাপ্তি ছিলোনা কারণ রুবি আর মুহিতের গল্পে There are happy endings. কমজোর পকেটের মুহিত সত্যি সত্যি জায়গা পেয়েছিলেন; শুধু তার পাশের চেয়ারে নাহ বরং রুবির জীবনেও তিনি জায়গা পেয়েছেন।
- ফারিয়া তাবাসসুম মেহরিনhttps://www.thepapyrus.org/author/%e0%a6%ab%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%af%e0%a6%bc%e0%a6%be-%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b8%e0%a6%b8%e0%a7%81%e0%a6%ae-%e0%a6%ae%e0%a7%87%e0%a6%b9%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%a8/বৃহস্পতিবার, অক্টোবর 10, 2024
- ফারিয়া তাবাসসুম মেহরিনhttps://www.thepapyrus.org/author/%e0%a6%ab%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%af%e0%a6%bc%e0%a6%be-%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b8%e0%a6%b8%e0%a7%81%e0%a6%ae-%e0%a6%ae%e0%a7%87%e0%a6%b9%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%a8/বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর 12, 2024
- ফারিয়া তাবাসসুম মেহরিনhttps://www.thepapyrus.org/author/%e0%a6%ab%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%af%e0%a6%bc%e0%a6%be-%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b8%e0%a6%b8%e0%a7%81%e0%a6%ae-%e0%a6%ae%e0%a7%87%e0%a6%b9%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%a8/বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি 13, 2025
- ফারিয়া তাবাসসুম মেহরিনhttps://www.thepapyrus.org/author/%e0%a6%ab%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%af%e0%a6%bc%e0%a6%be-%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b8%e0%a6%b8%e0%a7%81%e0%a6%ae-%e0%a6%ae%e0%a7%87%e0%a6%b9%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%a8/শুক্রবার, এপ্রিল 18, 2025
- ফারিয়া তাবাসসুম মেহরিনhttps://www.thepapyrus.org/author/%e0%a6%ab%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%af%e0%a6%bc%e0%a6%be-%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b8%e0%a6%b8%e0%a7%81%e0%a6%ae-%e0%a6%ae%e0%a7%87%e0%a6%b9%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%a8/বৃহস্পতিবার, মে 8, 2025












