সেপ্টেম্বর 11, 2026

মফস্বল শহর থেকে যারা এইচএসসি শেষ করেই কোচিং করার জন্য ঢাকায় আসে তাদের বেশিরভাগ অংশের কাছে ফার্মগেটের কনকর্ড টাওয়ার একটা চিরচেনা জায়গাই বলা চলে অনেকটা। এদের বেশিরভাগ অংশের থাকার জায়গা হিসেবে জোটে ২ নম্বর গেট দিয়ে ঢুকে মণিপুরী পাড়া কিংবা রাজাবাজারের গিঞ্জি গলির চারপাশে গড়ে ওঠা হোস্টেলগুলো। আমার হোস্টেল ছিলো মণিপুরী পাড়ায়। ভিআইপি হোস্টেল। পাঁচতলাবিশিষ্ট ভবনের দোতলা থেকে টপ ফ্লোরে মেয়েরা থাকতো। নিচতলায় থাকতেন কেয়ারটেকার। মেয়েদের বেশিরভাগ অংশই এডমিশন ক্যান্ডিডেট। টপ ফ্লোরের জানালার পাশের সিটটাই পড়লো আমার। আমার ঢাকায় প্রথম থাকার জায়গা বলতে টপ ফ্লোরের এই সিটটা। একটা অচেনা শহর, কত অচেনা মানুষ আর একটা দোদুল্যমান স্বপ্ন। এক বস্তা বই ও একটা ছোট কাপড়ের ব্যাগ নিয়ে ঢাকায় আমি যেদিন প্রথম আসি, শহরের প্রত্যেক ইঞ্চি ধূলিকণায় সবে অক্টোবরের প্রথম বৃষ্টি আঁচড় কাটছে। দিনের বেলা কনকর্ড টাওয়ারের সপ্তম তলায় ক্লাস করতাম। ক্লাসের জানালায় উঁকি দিয়ে পুলিশ বক্সের উপর দিয়ে, ফ্লাইওভার  দিয়ে হাজার হাজার গাড়ির দিব্যি ছুটে চলা দেখতাম। আর রাতে এসে ভিআইপি হোস্টেল এর ছাদে বসে দেখতাম আকাশ। দেখতাম পূর্ণিমা তিথিতে  আকাশের চাদরে একটা ছোট্ট আলোর পিন্ড কি নিদারুণ মনোরঞ্জন করে বেড়াতো৷ মণিপুরীপাড়ায় ২ নম্বর গেটের বা দিকের লেনে কয়েকটা খ্রিস্টান বাড়ি আছে৷ এই বাড়িগুলোর অধিকাংশ ফাঁকাই বলা চলে। যে দু-চারটে লোকে লোকারণ্য সেগুলো আসলে কারোরই স্থায়ী আবাস নাহ। আমাদের মতোই সাময়িক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য এক ডাল থেকে অন্য ডালে এসে বাসা বাঁধা আরকি। শহরে তখন নভেম্বরের হালকা শীতের পদচারণা।দক্ষিণ দিকের জানালা দিয়ে হিমেল হাওয়া এসে বসে আমার ছোট রুমে। ছাদ থেকে দূরদূরান্ত পর্যন্ত প্রকান্ড একেকটা বাড়ি দেখা যেতো। ঠিক যেমন দেখা যেতো বাড়ি ৬৯/২, লেন নম্বর : ০৪, ঢাকা- ১২০৫। অফ হোয়াইট রঙের বাড়ি। ডিসোউজাদের বাড়ি নামে পরিচিত ছিলো। ক্রিস্টাল ডিসোউজা ছিলেন বাড়ির মালিক৷ একটা মিশনারি স্কুলে পড়াতেন।স্বামী মারা গেছেন অনেক আগেই। পুত্রকন্যারা সবাই সুদূর অস্ট্রেলিয়ায় থাকেন। এখন এই বাড়িতেই অবসর সময় পার করছেন। ছাদের চার কিনারায়  ভদ্রমহিলা কামিনী গাছ অত্যন্ত যত্নের সাথে  লাগিয়ে রেখেছেন। এতো সাবেকী আর সেকেলে  রুচির খুব প্রশংসাই করতাম বলা চলে৷ নাহলে আজকাল বাড়ির ছাদে কামিনী মানুষ খুব কম লাগায়৷ প্রতিদিন গোধূলিবেলা ক্রিস্টাল ছাদে আসতেন। সাথে একটা ফ্লাস্কে করে আনতেন গ্রিন টি আর ল্যাক্সাস বিস্কিট। অনেকটা আন্দাজ করেছিলাম ভদ্রমহিলার ডায়াবেটিস আছে। উনি ছাদে এসেই গাছগুলোতে আলতো করে হাত বোলাতেন, পানি দিতেন। নিজের সন্তানদের যেভাবে কেউ আগলে রাখে ঠিক সেভাবেই পরম মমতায় গাছগুলোকে ছুঁয়ে দিতেন। উনার কামিনীর গন্ধ এসে জুড়ে থাকতো আমাদের ছাদেও। পাশাপাশি দুটো ছাদ। রেলিঙের এপাশ থেকে আমি প্রতিদিন একই সময়ে ক্রিস্টালকে দেখতাম। কখনো পায়চারী করতে, তো কখনো সাদা শিফন শাড়ী পরে একটা রকিং চেয়ারে দোল খেতে খেতে রক্তিম আকাশ দেখতেন। ক্রিস্টাল আর আমার এই একটা জায়গায় অনেক মিল ছিলো। আমরা দুজন বড্ড আকাশপ্রেমী মানুষ। আমি দেখতাম একজন ষাটোর্ধ ভদ্রমহিলা কি সুন্দর শেষ বিকেলে ঘর থেকে বের হয়ে ছাদে আসতেন। নিজের সন্তানতুল্য গাছগুলোতে পানি দিতেন। আবার ঘরে ফিরে যেতেন। কৌতুহলবশত একদিন আমি উনাকে রেলিঙের এপাশ থেকে  জিজ্ঞেস করেই বসলাম আচ্ছা আপনার ছাদে এতগুলো কামিনী গাছ কেনো?  প্রত্তুতরে উনি যা বললেন তার মর্মার্থ এই যে, উনার স্বামী জোসেফ ডিসোউজা কামিনী গাছ  অনেক ভালোবাসতেন। আট বছর আগে জোসেফ কার এক্সিডেন্টে গত হয়েছেন। কামিনী গাছে ফুল ফুটলে উনার মনে হয় প্রয়াত জোসেফের স্মৃতি যেনো চারদিকে সুভাস ছড়িয়ে মুগ্ধ করছে। ক্রিস্টাল আমাকে জিজ্ঞেস করে বসেন আমার প্রিয় ফুল কী? কিছু না ভেবেই আমি বলে ওঠলাম ক্যামেলিয়া। ক্রিস্টাল জিজ্ঞেস করলেন এতো ফুল থাকতে ক্যামেলিয়া কেনো? আমি বলেছিলাম  এই ফুলটা ঠিক আমাদের মানুষের মতো৷ আমরা মানুষ সারাজীবন যেভাবে ছায়া খুঁজে বেড়ায় ক্যামেলিয়া ঠিক তেমনি৷ কড়া রোদ এরা সহ্য করতে পারেনা৷ ছায়ায় বেড়ে ওঠলে বহুবছর ঠিকে থাকে। এভাবেই ব্যস্ত শহরের রেলিঙের দুপাশে গড়ে ওঠতে থাকলো এক নবীন ও প্রৌঢ়া মহিলার সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত সম্পর্ক।আমরা দুজন সকালে একসাথে হাঁটতে বের হয়। ভ্যান থেকে বেছে বেছে শীতকালীন তাজা শাকসবজি কিনি। ক্রিস্টালের কোনদিনের তরকারিতে কতটুকু লবণ কম হয়েছে, কোনদিনের খাবারটা মুখে লাগার মতো সবকিছু নিমিষেই আমি ঠিক করে দেই। ২৫  ডিসেম্বরে বড়দিনে ক্রিস্টালের বানানো স্ট্রবেরি কেক চেখে দেখি। এভাবেই চার নম্বর লেনের ৬৯/২ এর বাড়িটিতে আমার আনাগোনা বাড়তে থাকে।ক্রিস্টাল হয়ে ওঠলেন এ অচেনা শহরে আমার প্রথম অভিভাবক।

চলে যায় কয়েকমাস। সময়টা তখন ২০২০ এর মার্চ মাস। পৃথিবী জুড়ে করোনা পেন্ডামিক। করোনার কড়াল গ্রাসে আশেপাশে এতো মৃত্যুর ছড়াছড়ি। সরকার বাধ্য হয় লকডাউনে যেতে৷ পারিবারিক চাপে আর এডমিশন এক্সামগুলো পিছিয়ে যাওয়ায় আমি হোস্টেল ছেড়ে চলে আসার প্রস্তুতি নেই।যাবার আগে  ক্রিস্টালের সাথে একবার  দেখা করা দরকার ভেবে আমি চলে যায় তার বাড়ি। কেয়ারটেকার দরজা খুলে দিলেন। আমি বসে আছি ক্রিস্টালের ড্রয়িং রুমে। সিড়িঁ দিয়ে নেমে এসে ক্রিস্টাল আমাকে দেখে রীতিমতো হকচকিয়ে উঠে রেগে কেয়ারটেকারকে ধমকানো শুরু করলেন

“ মিলিন তোমাকে না বলেছি অচেনা লোকদের বাড়িতে ঢুকতে না দিতে। বাইরের লোকদের না জানিয়ে ড্রয়িং রুম অব্ধি নিয়ে এসেছো।”

ক্রিস্টালের এই দুই লাইন আমাকে এতো বিদ্ধ করে বসে যে আমি রাগে অভিমানে সদর দরজা দিয়ে বের হয়ে আসি৷ পেছন ফিরে আমি কারণ জিজ্ঞেস করার প্রয়োজনটাও বোধ করিনি কেনো আসলে উনি আমার সাথে এমন অসহনীয় আচরণটা সেদিন করেছিলেন। আমি ঢাকা ছেড়ে চলে আসি আমার নিজের শহর বাগেরহাটে। মাঝখানে কেটে যায় দেড় বছর। করোনা পেন্ডেমিকের পর সবকিছু স্বাভাবিক হওয়া শুরু করলে সরকার স্কুল, কলেজ খোলা শুরু করার ঘোষণা দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সুবাদে আমি পার্মানেন্টলি আবার চলে আসি সেই ঢাকায় শিফট হতে। সবকিছু স্বাভাবিক নিয়মেই চলতে থাকে। ২০২৩ সালের ২৫ ডিসেম্বরের বড়দিনে বিকেলবেলা ক্রিস্টালের স্মৃতি অনেক নাড়া দেয়ায় আমার মনে হলো সময় করে ফার্মগেইট আমার যাওয়া দরকার। দুবছর পূর্বে রাগে অভিমানে ক্রিস্টালের আমার সাথে এমন ব্যবহারের কারণটা আমি পেছনেই ফেলে চলে এসেছিলাম। অফ হোয়াইট রঙের বাড়িটি ঠিক আগের মতোই আছে। বদলায়নি একটুকুও। টিপটিপ পা ফেলে যাব কি যাবনা মনস্থির করতে না পেরে বেল দিয়েই বসি দরজায়৷ মিনিট দেড়েক পর মিলিন সাহেব এসে দরজা খুলে দিলেন।

 “আপনি এতদিন পর! কোথায় চলে গিয়েছিলেন? আর আসেন নি যে এ বাসায়?”

 আমি শান্ত হয়ে বসে বল্লাম, “জ্বি ঢাকা ছেড়ে দিয়েছিলাম। ”

“আচ্ছা আপনি বসুন আমি চা করে আনি।”

“ জ্বি না আমি আসলে চা খাবোনা। আপনি একটু আপনার সিস্টারকে ডেকে দিবেন? উনার একটা শিফনের শাড়ী আমার কাছে রয়ে গিয়েছিলো। সেটা ফেরত দিতে এসেছি।”

“কি বলেন!  আপনি জানেন না? সিস্টার তো আটমাস আগে হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন”; মিলিন বললেন।

আমি হকচকিয়ে ওঠলাম।  চলে আসার মুহূর্তে মিলিন হুট করে আবার রাস্তা আটকে বল্লেন

“আপনাকে সেদিন  একটা কথা বলা হয়নি।সিস্টার অ্যালজেইমার পেশেন্ট ছিলেন।কার এক্সিডেন্টে সিস্টার বেঁচে গিয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু উনার মস্তিষ্কের আঘাতের কারণে অনেক স্মৃতি মুছে যেতো। ভুলে যেতেন অনেককিছু, মনে রাখতে পারতেন না। আর উনি ভাবতেন আপনি একদিন আসবেন তাই আপনাকে দেয়ার জন্য একটা জিনিস দিয়ে গেছেন আমাকে। একটু অপেক্ষা করুন, আমি নিয়ে আসছি।”

পরক্ষণেই মিলিন  একটা ক্যামেলিয়ার গাছ নিয়ে হাজির হলেন। “ নিন, এটা আপনার। আপনাকে দিতে বলেছিলেন উনি।”

আজ ২৫ ডিসেম্বর ২০২৩, সন্ধ্যা সাতটা। ঠিক সন্ধ্যা সাতটায় ৬৯/২, লেন নম্বর : ০৪ এর বাড়ির ছাদে অনেকগুলো  সাদা কামিনী ফুল ফুটে শুভ্রতা ছড়াচ্ছে। ঠিক সন্ধ্যা সাতটায় ৯০৬৮ কি.মি দূরে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে ক্রিস্টালের পরিবার একসাথে ডিনার শেষ করছেন। ঠিক সন্ধ্যা সাতটায় ৬৯/২, লেন নম্বর : ০৪ এর বাড়ি থেকে প্রায় ১.৫ কি.মি দূরে ক্রিস্টাল ও জোসেফ একে অপরকে জড়িয়ে নি:শব্দে শুয়ে আছেন। ঠিক সন্ধ্যা সাতটায় ৬৯/২, লেন নম্বর : ০৪ এর বাড়ি থেকে প্রায় ৪.২ কি.মি দূরে রবীন্দ্র সরোবরে একদল ছেলে গিটার বাজিয়ে গান ধরেছে,

“তুমি যে গিয়াছ বকুল-বিছানো পথে,

নিয়ে গেছ হায়— একটি কুসুম আমার কবরী হতে।”

সন্ধ্যা সাতটায় ঠিক ৪ কি.মি দূরে আমার খোলা বারান্দায় ক্যামেলিয়া গাছটির দিকে তাকিয়ে আমি ভাবছি কয়েকশো কোটি মানুষের পৃথিবীতে ৬৯/২, লেন নম্বর : ০৪ অফ হোয়াইট রঙের বাড়িটির এক অ্যালজেইমার পেশেন্ট ক্রিস্টাল ডিসোউজা নামের কেউ মনে রেখেছিলেন আমার প্রিয় ফুল ক্যামেলিয়া।

Dear readers we know it’s not relevant enough to look back the last chapters or last pages of a book but sometimes it’s relevant to look back. To let go off our angers, our judgements,our grudge.Who knows we might change the ending?  As you know we humans are fragile enough to realize hardly when the last goodbye is………

শিক্ষার্থী | পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
Facebook
Threads
LinkedIn
Telegram
X
Reddit
Email
WhatsApp

আরও লেখা সমূহ