ঘন ঘন ভূমিকম্পে জনমনে উদ্বেগ: প্রস্তুতিহীন ঢাকা কি বিপর্যয়ের মুখে?
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ঘন ঘন ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় রাজধানীর মানুষের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রতিটি কম্পনের পরই সামাজিক মাধ্যমে অতি–প্রচারণা, কল্পিত পূর্বাভাস ও নানা গুজব ছড়িয়ে পড়ছে। অথচ বৈজ্ঞানিকভাবে এখনো আগাম ভূমিকম্পের সঠিক সময় বা মাত্রা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশ সক্রিয় ভূমিকম্প অঞ্চলে অবস্থিত। গবেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে বড় ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, কিন্তু কখনহবে-তা কেউ বলতে পারে না। তাই আতঙ্ক নয়, উপযুক্ত প্রস্তুতিই আমাদের বাঁচার একমাত্র পথ। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে – আমরা ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় এখন পর্যন্ত কতটা প্রস্তুত?
- ঢাকা-এক প্রস্তুতিহীন মহানগর
ঢাকা বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ শহর, কিন্তু নিরাপত্তা অবকাঠামো ও ঝুঁকি-প্রস্তুতিতে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকাদের মধ্যে। অনেক ভবন নির্মিত হয়েছে যথাযথ বিল্ডিং কোড অনুসরণ না করে, আবার কোথাও ব্যবহৃত নির্মাণসামগ্রীর মান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে। এসব অবকাঠামো বড় ভূমিকম্প মোকাবিলায় কতটা সক্ষম? ঢাকার কয়েকটি দুর্বলতার দিকে আলোকপাত করা যাক-
- সংকীর্ণ রাস্তাই সবচেয়ে বড় দুর্বলতা
বড় ভূমিকম্প হলে ঢাকার দীর্ঘদিনের অগোছালো নগরায়ণ উদ্ধার কাজকে প্রায় অসম্ভব করে তুলবে। পুরান ঢাকার সরু গলি, মোহাম্মদপুর-মিরপুরের ঘিঞ্জি ব্লক, বস্তি এলাকায় এলোমেলো ঘরবাড়ি-এসব জায়গায় দুর্ঘটনার পর উদ্ধার দল সহজে পৌঁছাতে পারবে না। একটি বড় ভূমিকম্প হলে যত প্রাণহানি ঘটবে, তার বড় অংশ হয়তো ঘটবে উদ্ধার–বিলম্বের কারণে।
- অগ্নিকাণ্ডের ফলে আরেক বিপর্যয়ের সম্ভাবনা
ঢাকার ভবনগুলোর গ্যাস লাইন, বৈদ্যুতিক তারের বিশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা ভূমিকম্পের সঙ্গে সঙ্গে অগ্নিকাণ্ড ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। পুরান ঢাকা ও বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে থাকা পুরনো আবাসিক ভবনগুলোতে এটি সবচেয়ে বড় হুমকি। অর্থাৎ একটি ভূমিকম্প আসলে ধ্বস ও আগুন-দুই বিপর্যয়ই একসঙ্গে ঘটতে পারে।
- ঘরহীন লাখো মানুষ কোথায় আশ্রয় নেবে?
ভূমিকম্পের সময় মানুষ খোলা জায়গায় সমবেত হয়- এটাই বৈজ্ঞানিকভাবে নিরাপদ পথ।
নেপালে ২০১৫ সালে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ ভূমিকম্পের পরের অবস্থা আমার দেখার সুযোগ হয়েছিল। ঘরহীন মানুষকে দীর্ঘদিন অস্থায়ী তাঁবুতে বসবাস করতে দেখেছি। কিন্তু ২ কোটি মানুষের ঢাকায় এতো খোলা জায়গা কোথায়?
- গুজব নয়-সঠিক তথ্য প্রচার জরুরি
প্রতিটি কম্পনের পর সামাজিক মাধ্যমে এমন পোস্ট ছড়ায়, যেন বড় ভূমিকম্প “আজ রাতেই” হবে। এসব মনগড়া তথ্য শুধু আতঙ্কই তৈরি করে না, বরং শহরের মানুষকে যুক্তিহীন, অপ্রস্তুত ও ভুল প্রতিক্রিয়ায় ঠেলে দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেকোনো পোস্ট দেখলেই তা শেয়ার করার পূর্বে যাচাই করা জরুরি। গুজব না ছড়ানোও আমাদের সামাজিক দায়িত্ব। সামাজিক মাধ্যমে থেকে জ্ঞান আহরণ না করে বৈজ্ঞানিক তথ্য, সরকার বা আবহাওয়া/ভূতত্ত্ব সংক্রান্ত সরকারি সংস্থার নির্দেশনার উপর ভরসা রাখতে হবে।
- শেষ কথা
গত কিছুদিনে ঘটে যাওয়া ঘন ঘন কম্পনে মানুষ উদ্বিগ্ন; কিন্তু এ উদ্বেগের চেয়ে বড় বিপদ হলো- ঢাকার প্রস্তুতিহীনতা। ঢাকাকে টিকিয়ে রাখতে হলে বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে বাস্তবায়নকরতে হবে। তাছাড়া,উদ্ধার সক্ষমতা যুগোপযোগী করা, খোলা মাঠ, সেফ-জোন ও জরুরি সমাবেশস্থল বাড়ানো, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ পুনর্বিন্যাস প্রকল্প বাস্তবায়ন, গুজব নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মিত জনসচেতনতামূলক প্রচার করা জরুরি।
ভূমিকম্প একটি প্রাকৃতিক ঘটনা-এটি থামানো আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু সামান্য প্রস্তুতিহীনতা লাখো মানুষের জীবন কেড়ে নিতে পারে। গত একমাসে ঘটে যাওয়া ছোট ছোট ভূমিকম্প আমাদের ভয় দেখাচ্ছে, নাকি আমাদের অব্যবস্থাপনাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে? এর উত্তর খুঁজতে এখনই দায়িত্বশীল পদক্ষেপ জরুরি।
সদস্য, সম্পাদনা পর্ষদ, প্যাপাইরাস
প্রাক্তন শিক্ষার্থী
পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সেশন:১৯৯৯-২০০০
- কাজী আজাদ উজ জামানhttps://www.thepapyrus.org/author/%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%9c%e0%a7%80-%e0%a6%86%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%a6-%e0%a6%89%e0%a6%9c-%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%a8/বৃহস্পতিবার, মার্চ 14, 2024
- কাজী আজাদ উজ জামানhttps://www.thepapyrus.org/author/%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%9c%e0%a7%80-%e0%a6%86%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%a6-%e0%a6%89%e0%a6%9c-%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%a8/বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি 13, 2025
- কাজী আজাদ উজ জামানhttps://www.thepapyrus.org/author/%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%9c%e0%a7%80-%e0%a6%86%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%a6-%e0%a6%89%e0%a6%9c-%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%a8/বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি 12, 2026










