কাজী ও আমি – অথবা সবাই

১৮৯৭ ও ১৯৯৭, কাজী মোতাহার হোসেন আর আমার জন্মসাল। মধ্যিখানে পুরোপুরি ১০০ বছরের ফারাক। এই দীর্ঘ সময় পরিবর্তন এনেছে মানুষের জীবনযাত্রায় – বলতে গেলে অনেক কিছুতেই। ঘরে ঘরে হয়ত বিদ্যুৎ এসেছে,  মানুষের হাতে হাতঘড়ি আর পায়ে জুতার রকমারি বাহার বেড়েছে। কিন্তু সহজ-সরল সে গ্রামীণ জীবনধারা কি আদৌ এ শত বছরে একেবারে পাল্টে গেছে? সেই হাঁটু-কাঁদা মাড়িয়ে স্কুলে যাওয়া; স্কুল থেকে ফেরার সময় মাঝপথে বৃষ্টি, আর সেই বৃষ্টিতে বইপত্র ভিজিয়ে বাড়ি ফেরা; পুকুরে বেহিসেবি ঝাপাঝাপি করার জন্য মায়ের সেই লাঠি হাতে তাড়া করা; আবার সন্ধ্যাবেলা শেয়ালের ভয় দেখিয়ে সেই মায়েদেরই বাচ্চাদের ঘুম পাড়ানির চেষ্টা, সেই ঘুমপাড়ানির গান শুনিয়ে:

খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো
বর্গি এলো দেশে।
বুলবুলিতে ধান খেয়েছে
খাজনা দেবো কিসে?
ধান ফুরোলো, পান ফুরোলো
খাজনার উপায় কী?
আর কটা দিন সবুর কর
রসুন বুনেছি।

        তারপর ঝড়ের দিনে বাগানে বাগানে গিয়ে আম কুড়ানো, পুকুরের জলে মাথা ডুবিয়ে বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ শোনার মজা – আর হ্যাঁ ইচ্ছে করে কাঁদায় আছাড় খেয়ে অনেকদূর পর্যন্ত পিছলে যাওয়া। সেই সুখের একটা বিপরীত দিক অবশ্যি রয়েছে। ঘরের টিনের চালের ফুটো দিয়ে জল পড়া আর সেসব জায়গায় থালাবাসন, পাতিল এসব দেয়ার তাড়া। আবার ঝড়ে যদি ঘরের টিন উড়িয়ে নিয়ে যায় তাহলে একটু ঝক্কি পোহাতে হয় বৈকি। তাছাড়া মাটির ঘরে গর্ত থেকে সাপ বের হওয়া, দরজা খোলা রেখে কোথাও যাওয়ার জন্য কুকুরে ভাত-তরকারি সব খেয়ে নেয়া এসব ব্যাপার তো গা-সওয়া। শীতে খড়-পাতা জড়ো করে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়া, গাছিরা খেজুর গাছ থেকে রসের কলস পেড়ে নিয়ে যাওয়ার পর সেখানে দইয়ের খুঁটি টাঙানো এগুলো তো আছেই।

        কাজী মোতাহার হোসেন এর জীবনের এমনি একদিনের ঘটনা – মামাবাড়িতে মাছ রান্না হচ্ছিল। মোতাহার হোসেন তখন সবে হামাগুড়ি দেয়া শিখেছেন। হামাগুড়ি দিয়ে সোজা রাঁধা মাছের গরম হাঁড়িতে হাতের কব্জি দিলেন ঢুকিয়ে। তারপর যা হওয়ার কথা তাই হল – সেই পোড়া দাগ নিয়ে কাটাতে হল জীবনের শেষ অব্দি। আর আমিও যখন মোতাহার হোসেন এর মত ঐ বয়সী তখন, হামাগুড়ি দিয়ে ঘর-আঙ্গিনা-বারান্দা সব একাকার করে ফেলি। সন্ধাবেলা নতুন কড়াইয়ে মাছ ভেজে রেখে মা গেছেন হাঁস মুরগি ঘরে তুলতে। হাঁসের পেছনে ছুটতে গিয়ে পড়ে গেলাম কড়াইয়ের ঐ ফুটন্ত তেলে। ব্যস দুই হাঁটুর একটু উপরে ক্ষত নিয়ে ঘুরছি এখনো।

        আরেকবারের ঘটনা। মধুমাস। চারদিকে আমকাঁঠালের মেলা। মনের সুখে মামার দেয়া নতুন চাকু দিয়ে আম খাচ্ছিলেন মোতাহার। বারবার চাকু চেয়ে বিরক্ত করছিলো ছোট ভাই আতাহার। দুএকবার ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলেন। কিন্তু আবার সেই একই প্যানপ্যান। কতই আর সহ্য করা যায়। ছোটভাইয়ের হাতে বসিয়ে দিলেন এক কোপ। তারপর গিয়ে লুকালেন ঘরে মাচার ওপর রাখা এক চালের ডোলের ওপর। গ্রীষ্মের এই আমের স্মৃতি বোধ হয় গ্রাম বাংলার শৈশবের এক অতি পরিচিত চিত্র। শৈশবে আমিও গাছে উঠতে ভয় পেতাম। একদিন মামাতো ভাই গাছের মগডালে বসে দিব্যি আম খেয়েই যাচ্ছে। বললাম, আমাকে একটা আম দে। দেয় না। গাছ থেকে নামার সাথেই ব্লেড দিয়ে মাথাটা দিলাম চিরে। আমার কি দোষ!? তাও ভয় লাগে তো! লুকালাম গিয়ে গোয়াল ঘরে।

        কাজী মোতাহার হোসেনেরবাবা পলো, খালুই (মাছ ধরে রাখার জন্য বাঁশ দিয়ে তৈরি ঝুড়ি বিশেষ) বানাতে পারতেন। বাবা পলো দিয়ে মাছ ধরতেন আর ছোট্ট মোতাহার খালুই নিয়ে পিছে পিছে যেতেন। মোতাহার হোসেন এর মত আমিও ছোটবেলায় দেখেছি আমার দাদাকে পলো, খালুই, বাঁশের তৈরি আরো কত কী বানাতে! আর বাবা ভালো জাল বুনতে পারতেন। প্রতিদিন রাতে পলো আর টর্চ লাইট হাতে মাছ ধরতে বেরুতেন। আমি পিছনে খালুই হাতে দাঁড়িয়ে থাকতাম এই তো বছর তিনেক আগেও।

        সেনগ্রামের মাইনর স্কুলে পড়বার সময়ের ঘটনা। একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে কাজী দেখেন এক ছেলে ডোবার ধারে পথের ওপর মলত্যাগ করছে। রাগ চড়ে গেলো মাথায়। লাথি দিয়ে ছেলেটাকে ফেলে দিলেন ডোবায়। আর আমার ঘটনা কী বলি, প্রাইমারিতে পড়ি তখন। কী একটা কথা জানতে চাইলাম, বলল না মেয়েটা। টিফিন পিরিয়ডে দাঁড়িয়ে ছিলো পুকুর পাড়ে। পিছন থেকে দিলাম আস্তে করে এক ধাক্কা। তারপর দৌড় দিয়ে আবার সেই গোয়াল ঘরে।

        স্বপ্নে উড়তে পারতেন মোতাহার। ডানা না থাকলেও শুধু হাত নেড়েই উড়তেন স্বপ্নে। উড়ে গিয়ে পড়তেন কখনও আমডালে আবার কখনো বাঁশঝাড়ে। আবার কখনো হুমো বুড়ির তাড়া খেয়ে তেঁতুল বা হিজল গাছের কোটরে লুকাতেন কখনও কখনও। আমিও স্বপ্নে এখনো মাঝে মাঝে উড়ে বেড়াই। কিন্তু ওড়া শুরু করতে হয় একটা বেশ উঁচু জায়গা থেকে লাফ দিয়ে। তারপর দুহাত দিয়েই বাকিটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি বৈকি! ওনারও এমনটা হতো কিনা কে জানে?

        বিজ্ঞ এ পরিসংখ্যানবিদ ছোটবেলায় গ্রামের লোকজনের কাছে খুব মেধাবী ছাত্র আর ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু সেই তাকেই সাংসারিক মানুষ হিসেবে একেবারে গর্দভমার্কা বলে লোকজন জানত। বড় হবার পর সাংসারিক জীবনে কেমন ছিলেন সেটা আর এ লেখায় টানতে চাইছি না। আর আমার বেলায় কী অবস্থা বলি তবে। শুধু গ্রামেই না আশপাশের কয়েক গ্রামের লোকজনের কাছে আমি একই সাথে ভালো ছাত্র আর মানুষ বলে পরিচিত; আর সাংসারিক মানুষ হিসেবে? মা বলতেন, “তোর বিয়ে করার দরকার নাই কখনও!” ইদানীং অবশ্য বলেন না। কি জানি সাংসারিক জ্ঞান কিছু বেড়েছে বোধহয়।

        কুষ্টিয়া স্কুলে থার্ড ক্লাসে (৮ম শ্রেণি) পড়বার সময়ের ঘটনা। একজন শিক্ষককে নিয়ে ঠাট্টা করার অপরাধে ক্লাসশুদ্ধ সবাই হেডমাস্টার শ্রী গোপাল চক্রবর্তীর হাতে মার খেয়েছিল; যদিও এ ঘটনায় মোতাহার হোসেনের বিন্দুমাত্র দোষ ছিল না। আর এটাই ছিল তাঁর প্রথম শাস্তির অভিজ্ঞতা। পরে অবশ্য মাস্টারমশাই সবাইকে নিমন্ত্রণ করে পেট পুরে সন্দেশ রসগোল্লা খাইয়েছিলেন। আমি যখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি তখন মোহাম্মদ আব্দুর রশিদ স্যার সবে স্কুলে জয়েন করেছেন প্রধান শিক্ষক হিসেবে। স্যার এখনো আছেন স্কুলে। একদিন এক বন্ধুর অপরাধে ক্লাসের সবাই পিটুনি খেলাম। প্রাইমারিতে অনেক পিটুনি খেয়েছি, কিন্তু হাইস্কুলে পাওয়া এটাই আমার প্রথম আর শেষ শাস্তি। কিন্তু কই!? স্যার তো আমাদের দাওয়াত দিয়ে খাওয়ালেন না। আর একটা মজার ব্যাপার হচ্ছে, গোপাল মহাশয় আর রশিদ স্যার উভয়েই ক্লাসে ইংরেজি পড়াতেন।

        উপরের ঘটনাগুলো কি ফরিদপুর ও কুষ্টিয়ার আলো-বাতাসে বড় হওয়া কাজী মোতাহার হোসেন আর তার থেকে একশ বছর পরে প্রায় আড়াইশো কিলোমিটার দূরে জন্ম নেয়া আমার; নাকি আমাদের মতো নিবিড় গ্রামীণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা সকলের?

কমেন্ট করুন
শিক্ষার্থী | পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সেশনঃ ২০১৬-১৭

হরিপদ শীল

সেশনঃ ২০১৬-১৭