বছরে কমপক্ষে একটি প্রেজেন্টেশন কেন নয়?

সেপ্টেম্বর ২৩, সকাল ৯.৩০। সামান্য ভয় আর শঙ্কার সাথে অনেকখানি উৎসাহ আর উত্তেজনা মিশিয়ে শুরু হলো গ্রুপ-৩ এর প্রেজেন্টেশন। সবার মনে ভয় একটাই- প্রেজেন্টেশনের ভাষা ইংরেজি। ইতোমধ্যে গ্রুপ-১ ও গ্রুপ-২ যথাক্রমে ১৬ ও ১৮ তারিখে প্রেজেন্টেশন দিয়ে ফেলেছে। তাই স্বভাবতই আমাদের গ্রুপের উপর চাপ তুলনামূলকভাবে বেশি। ইমামা পরিচিতি অংশটুকু বেশ ভালোভাবেই উতরে গেলো। এবার লিটারেচার রিভিউ এবং মেথোডোলজি অংশ আমার ঘাড়ে। একে তো স্লাইড তৈরি শেষ করে ঘুমিয়েছি ভোর ৫ টার দিকে তার উপরে জিরো প্র্যাকটিস্‌। ওই যে, ডেডলাইনে কাজ করার বদ-অভ্যাস। যাই হোক, একটা ডকুমেন্টারি দেখানোর মধ্য দিয়ে আমার অংশ শুরু করলাম। তারপর বেশ অ্যাঁ-ঊ করতে করতে দায়িত্বটুকু সম্পন্ন করলাম।

আমরা ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থীরা আমাদের স্যামপ্লিং টেকনিক-II এর কোর্স শিক্ষক ড. ফারজানা আফরোজ ম্যামের পর্যবেক্ষণে চার দলে বিভক্ত হয়ে প্রত্যেক দুই দল আলাদা আলাদাভাবে একটা করে টপিক (travelling behavior & gadget using) নিয়ে কাজ করি। রিসার্চ পেপার টাইপ একটা কিছু দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছি চার দলই। হ্যাঁ, প্রচুর ভুল-ত্রুটি হয়েছে, প্রচুর প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে চার দলকেই; কিন্তু শিখেছিও প্রচুর। সারাবছর থিওরি মুখস্থ করা- হোক সেটা বুঝে বা না বুঝে, ল্যাব এ বসে বইয়ের প্র্যাক্টিকাল সমস্যার সমাধান করার সাথে বাস্তবে ডেটা সংগ্রহ করে সেটা নিয়ে কাজ করার মধ্যে যে বিস্তর ফাঁরাক এটুকু আমরা বেশ ভালোভাবেই টের পেয়েছি। আর তার চেয়েও বেশি যেটা মনে হয়েছে সেটা হচ্ছে প্রেজেন্টেশনের প্রয়োজনীয়তা। মনে হয়েছে প্রতি বছর কমপক্ষে একটা প্রেজেন্টেশন থাকা অনেকটাই জরুরি।

বেশ উৎসব উৎসব একটা আমেজে আমাদের চার দলের প্রেজেন্টেশন দেয়া শেষ হয়েছে। সবাই ফরমাল জামাকাপড় পড়ে আসা, প্রেজেন্টেশন শেষে ফটো উঠানো, সেলফি তোলা এসব যেন একটা উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি করেছিল সেদিন ক্লাসে। কাজ করার সময় দলের সদস্যরা পরস্পরের সাথে প্রচুর ঝগড়া করেছি, তর্ক করেছি কিন্তু শেষমেশ অন্তরঙ্গতা বেড়েছে বহুগুণ।

সকাল ৮ টা থেকে বিকেল ৪ টা পর্‌যন্ত ক্লাস। তারপরে টিউশনি, ফেইসবুকিং, ইউটিউবিং এসবের পরে খুব সামান্যই সময় হাতে থাকে সকলের। উপরন্তু প্রেজেন্টেশন, এসাইনমেন্ট এর মতো কাজ হয়তো সিজিপিএ-৪.০০ পাওয়া শিক্ষার্থীর কাছেও বোঝা বই কিছু নয়। কিন্তু এসবের প্রয়োজনীয়তা কি তাতে বিন্দুমাত্রও কমে যায়? কমে না, বরং একঘেয়ে পড়াশোনায় একটু বিরতি, একটু উত্তেজনা যোগ করতে মনে হয় প্রেজেন্টেশনটা ভালোই কাজে দেয়।

১ম বর্ষ, ২য় বর্ষের শিক্ষার্থীরা প্রেজেন্টেশনে আহামরি কিছু করে ফেলবে সেটা মনে করার কোনো দরকার নেই। হয়তোবা শুধুমাত্র আশপাশ থেকে তথ্য নিয়ে সেগুলাই বিশ্লেষণ করা ওই বছরের পড়াশোনাকেই কাজে লাগিয়ে। এতে করে কয়েকটা উপকার হচ্ছে- ত্বাত্তিক পড়াশোনাকে বাস্তবের সাথে সংযোগ করানো, সহপাঠীদের মধ্যে অন্তরঙ্গতা বৃদ্ধি, শিক্ষকদের সাথে ধনাত্মক মিথস্ক্রিয়া বৃদ্ধি। এগুলোর মাঝে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ যেটা সেটা হচ্ছে পাবলিক স্পিকিং এর মতো স্কিল

ডেভেলপ্‌মেন্টে এই বছরের একটা করে প্রেজেন্টশেনেই সন্দেহাতীতভাবে অদূর ভবিষ্যতে অনেক কাজে দেবে।

যুগের সাথে তাল মিলিয়ে শিক্ষাপদ্ধতির যে পরিবর্তন আনা জরুরি সেটা অনস্বীকার্য । এবং পরিবর্তন আসছেও। এটা প্রশংসার দাবিদার যে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা আমাদের বিভাগের সিলেবাসের পরিবর্তন ঘটানো হয়েছে দুবছর আগে। কিন্তু প্রেজেন্টেশন বা প্রোজেক্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারগুলো চার বছরে মাত্র একবার, শুধুমাত্র ৪র্থ বর্ষে- কেন? কেন প্রত্যেক বছর কমপক্ষে একবার করে নয়?

কমেন্ট করুন
শিক্ষার্থী | পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সেশনঃ ২০১৬-১৭

হরিপদ শীল

সেশনঃ ২০১৬-১৭