তথ্যগণিত

বাংলাদেশের ইতিহাসে শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক,  গবেষক ও বুদ্ধিজীবী হিসেবে যে কয়জনের নাম উঠে আসে তার মধ্যে অধ্যাপক ড. কাজী মোতাহার হোসেন এর নাম উপরের সারিতে অবস্থান করে। বাংলাদেশে পরিসংখ্যানের প্রবাদপুরুষ কাজী মোতাহার হোসেন এদেশকে পরিচয় করিয়েছেন পরিসংখ্যানের সাথে।

কাজী মোতাহার হোসেন ৩০ জুলাই ১৮৯৭ সালে কুষ্টিয়ায় জন্মগ্রহন করেন। তিনি ১৯১৫ সালে ডিস্টিংশনসহ প্রথম বিভাগে এন্ট্রান্স (এসএসসি) ১৯১৭ সালে প্রথম বিভাগে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পূর্বেই ঢাকায় এসে ভর্তি হন ঢাকা কলেজে। ১৯১৯ সালের ঢাকা কলেজ থেকে পদার্থবিজ্ঞানে অনার্সসহ বি.এ. ডিগ্রি এবং ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে এম.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন। চার ভাই-বোনের মধ্যে সবচেয়ে বড় ছেলে মোতাহার হোসেনের পারিবারিক অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। তবে তার তুখোড় মেধার কারণে স্কলারশিপ পেয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াটা খুব একটা কষ্টকর হয়নি। ১৯৩৮ সালে ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিক্যাল ইনস্টিটিউট থেকে পরিসংখ্যানে ডিপ্লোমা করেন। যুগপৎভাবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে এম.এ. ডিগ্রী লাভ করেন । ১৯৫১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিসংখ্যানে পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেন। তার গবেষণার বিষয় ছিল ‘Design of experiments’। তিনি তার ডক্টরাল থিসিসে ‘Hussain Chain Rule’ নামে নতুন তত্ত্বের অবতারণা করেন। তিনি পদার্থবিজ্ঞান, গণিত ও পরিসংখ্যানে প্রচুর জ্ঞান রাখতেন।

১৯২১ সালে তার এম.এ. পরীক্ষার রেজাল্টের আগেই অধ্যাপক জি.এইচ. ল্যাংলী তাকে পদার্থবিজ্ঞানের ডেমনস্ট্রেটর হিসেবে নিয়োগ দেন। ১৯২৩ সালে একই বিভাগে সহকারী প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ পান। চাকরির সুবাদে তিনি সত্যেন বোসের সান্নিধ্য লাভ করেন। সত্যেন বোস কাজী মোতাহার হোসেনকে খুব স্নেহ করতেন। তিনি মাঝেমধ্যে তার বিভাগের প্রভাষকদের পরীক্ষা করতেন। এমন কিছু অংক করতে দিতেন যা দেখতে সহজ কিন্তু করতে গেলে সমস্যায় পড়তে হয়। একদিন সত্যেন বোস ৭/৮ টি অংক দিয়ে সবাইকে পরের সপ্তাহের মধ্যে সমাধান করতে বললেন। কাজী মোতাহার হোসেন এক রাতেই সবগুলো সমাধান করে ফেললেন। পরদিন সত্যেন বোসকে এগুলো দেখালে তিনি হতবাক হয়ে যান। তিনি বলেন, “তুমি তো ম্যাথম্যাটিকস এ অনেক ক্লিয়ার। তোমার স্ট্যাটিসটিকস পড়া উচিত। তুমি কি পড়বে?”

কিন্তু তখন মোতাহার হোসেনের মাসিক বেতন না পেলে সংসার চলবে না শুনে সত্যেন বোস তাকে প্রতি মাসের বেতনসহ ছুটির ব্যবস্থা করেন এবং নিজে পি.সি. মহলানবিশের কাছে নিয়ে যান। মহলানবিশ ছিলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত পরিসংখ্যানবিদ। সত্যেন বোস মহলানবিশকে বলেন, “ছেলেটি খুবই ভাল। তাকে আমার ছোট ভাই হিসেবে গণ্য করবে। দেখবো কতটুকু স্ট্যাটিসটিকস শিখাতে পারো”। মহলানবিশের কাছেও কাজী মোতাহার হোসেন প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন তাঁর মেধার জোরে। মহলানবিশের আদেশ ছিল কাজী মোতাহার হোসেন যত বই চায়, লাইব্রেরিয়ান যেন তা দেয়। যদিও অন্য ছাত্ররা তিনটির বেশি বই নিতে পারত না। পরিসংখ্যানের উপর পড়াশুনা শেষে ১৯৪৮ সালে নিজ উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সংখ্যাতত্ত্ব ও তথ্যগণিত’ বিষয়ে এম.এ. কোর্স চালু করেন। যা ‘পরিসংখ্যান বিভাগ’ নামে স্বীকৃত হয়। পরিসংখ্যান বিভাগে ১৯৫১ সালে রিডার হিসেবে যোগ দিয়ে ১৯৫৪ সালে অধ্যাপক পদে উন্নীত হন। ১৯৬১ সালে অবসর নিলেও ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত ‘সুপারনিউমেরারি অধ্যাপক’ হিসেবে কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখেন। ১৯৬৪ সালে ‘পরিসংখ্যান গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট’ প্রতিষ্ঠিত হলে প্রথম পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে  ‘ইমেরিটাস অধ্যাপক’ এবং ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ সরকার ‘জাতীয় অধ্যাপক’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। কাজী মোতাহার হোসেন তাঁর কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ অনেক সম্মাননায় ভূষিত হন। শিক্ষা ও গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ‘সিতারা-ই-ইমতিয়াজ’ পদক ও ‘ডিএসসি’ ডিগ্রী অর্জন করেন। বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদান রাখায় ‘বাংলা একাডেমি পুরস্কার’, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যায় অবদানের জন্য ‘স্বাধীনতা পদক’ লাভ করেন। ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধেও ছিল তাঁর বলিষ্ঠ ভূমিকা।

বাংলাদেশের পরিসংখ্যানের দিকনির্দেশক ড. কাজী মোতাহার হোসেন পরিসংখ্যানকে বলতেন ‘তথ্যগণিত’। তিনি ‘তথ্যগণিত’ নামটিই ‘স্ট্যাটিসটিকস’ কে বাংলায় প্রকাশ করতে অধিক গ্রহণযোগ্য বলে মনে করতেন। এ নামে তিনি একটি বইও লিখেন। ড. কাজী মোতাহার হোসেনের হাতে গড়া এদেশের পরিসংখ্যান পরিবারের সকল সদস্যই তথ্যগণিতের সাথে এগিয়ে যাক। বাংলার এ প্রবাদপুরুষের প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা।

তথ্যসূত্র-

১.ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজ–সরদার ফজলুল করিম।

২.বাংলাপিডিয়া

৩.উইকিপিডিয়া

কমেন্ট করুন
শিক্ষার্থী | পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সেশনঃ ২০১৫-২০১৬

সায়েম শাফিন

সেশনঃ ২০১৫-২০১৬

0