সুন্দরবনের ডাক

জীবনটা যখন কৃত্রিমতার আবরণে খুব বেশি আবৃত থাকে তখন চারপাশটাও তদ্রূপ মনে হতে শুরু করে। জীবনের রঙ্গমঞ্চের পাক্কা অভিনেতাদের সাথে একই জমিনে বাস করতে গিয়ে একটা সময় কংক্রিটের এই চার-দেয়ালের মাঝে প্রাণবায়ুর অভাবজনিত অনুভূতি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। প্রতিদিনের সমাজতাড়িত অভিনয়কে নির্বাসনে পাঠিয়ে নিজেকে তখন জীবনের ভিন্ন অথচ চিরন্তন স্রোতের তাড়নায় ভাসিয়ে দিতে ইচ্ছে করে। সময় আর সুযোগে দুয়ে দুয়ে চার হলে এই স্রোতকে উপেক্ষায় মাড়িয়ে যাওয়া লোক হয়তো খুব কমই আছে।

আমাকেও একদা এমন কালগঙ্গার স্রোতের সম্মুখে পড়তে হয়। জীবনের রূঢ় বাস্তবতার উপর পর্দা লাগিয়ে কিছুটা সময় ঐ স্রোতের শীতল জলে গা এলিয়ে না দিয়ে পারিনি। পরার্থপরতার বিসর্জন উৎসবে মাতোয়ারা এই সময়ের প্রেক্ষাপটে ঐদিনগুলো একটু বেশী ব্যতিক্রম ছিল। সমাজবাস্তবতার কুটিল রূপের আড়ালে গ্রামের নৈসর্গিক পটে যে অদৃশ্য মমত্ববোধের ছলাকলা সরলভাবে বিছিয়ে রাখা আছে, সেটার ধারণা অপেক্ষা বাস্তবিক রূপ ঢের বেশী ছিল।

সুতারখালী

কিভাবে এই গ্রামের নাম এরূপ হলো সেটার ইতিহাস জানা নেই। তবে এমন অনুমান করতে অসুবিধা নেই যে কোনো একসময়ে সুন্দরবন সংলগ্ন এই ভূখণ্ডের সুতার গণ কোনো দুর্যোগহেতু এই অঞ্চল ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। যাইহোক, নিজের বিভাগীয় শহরের এক বন্ধুর নিমন্ত্রণে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়।

বর্ণনার সুবিধার জন্য ওর একটা ছদ্মনাম দেওয়া চাই। দোলন।

দোলনের বেড়ে ওঠা খুলনায় শহরে হলেও পৈত্রিক নিবাস সুতারখালীতে। বেড়াতে যাওয়ার যদিও মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল সুন্দরবনে ঢুঁ মারা কিন্তু ওখানে পৌঁছানোর একদিনের মাথায় সেটা কার্যত গৌণ হয়ে ওঠে আমার কাছে।

নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের টার্ম ব্রেকের ছুটিতে বাড়ি আসি। তখনই এই লোভনীয় সুযোগ পেয়ে যাই, ইলেক্ট্রিসিটির ছোঁয়া বর্জিত একটা গ্রামে কয়েকটা দিন থাকবার। পাশেই সুন্দরবন। সব মিলিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে নিজের সবচেয়ে কাছের বন্ধুকে বলি। প্রথমে রাজি থাকলেও, যাওয়ার আগের দিন সে তার অপারগতার কথা জানিয়ে দেয়। যদিও তার এমন “অপারগতা”-এর কারণ এবং পূর্ব অভিজ্ঞতা আমার জানা আছে। তাই সেই বিষয়ে আর অবতারণায় নাইবা গেলাম। অগত্যা আমাকে একাই রওনা দিতে হলো দু-একদিনের থাকবার প্রস্তুতি নিয়ে। বাসে করে গিয়ে প্রথমে দ্বিগরাজ বাজারে নামতে হলো। ওখান থেকে দোলন এবং ওর পরিবার এবং আর এক বান্ধবী ছিল, তাদের সাথে টমটম (তিনচাকার যান) এ করে প্রথমে পশুর নদীর ঘাট অবধি গেলাম। তারপর নদী পার হলাম ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে। এই নদীকে আঞ্চলিক ভাষায় পসোর/ফসোরও বলা হয়ে থাকে। নদী সোজা সুন্দরবন অভিমুখে চলে গিয়ে সাগরে গিয়ে মিশেছে। এই নদীর স্রোতের প্রাবল্য সাঁতার জানা মানুষের মাঝেও যেকোনো মুহূর্তে ভীতির সঞ্চার ঘটাতে সক্ষম। নদীর ওপারে কাঁচাপাকা কিছু পথ পাড়ি দিতেই সামনে আরেক নদী। নাম ভদ্রা। তবে বাস্তবিক অর্থে কতটা ভদ্রতার ছিটেফোঁটা আছে সেটা যথেষ্ট প্রশ্নবিদ্ধ ব্যাপার! যেকোনো ঝড় সাইক্লোনের প্রাক্কালে বাণ ডেকে তাণ্ডবনৃত্য চালান ইনি তীর সংলগ্ন লোকালয়ে। ভদ্রা নদীও ইঞ্জিনের নৌকায় পাড়ি দিতে হলো। নৌকায় মানুষ ছাড়াও গৃহকর্মের জন্য রড, বাজার সামগ্রী, কয়েকটা ছাগল সহ আরো কিছু অমানুষ গোত্রীয় প্রাণী ছিল। যদিও বর্তমানের প্রেক্ষাপটে অমানুষেই বরং ঢের বিশ্বাস করা যায় দুপেয়ে মানুষ অপেক্ষা। সে যাইহোক, বলছিলাম ভদ্রা নদীর কেচ্ছা। আচার আচরণে ভদ্র না হলেও, এর কূল ঘেঁষে মানুষ বসতি গেড়েছে। একসময় এসবই সুন্দরবনের ভোগে ছিল। তবে মানুষের প্রজনন বৃদ্ধি পাওয়ায় ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এই ছোট্ট ভূখণ্ডে যে জিনিসটার সবচেয়ে বেশী উচ্ছেদ ঘটেছে সেটা এই বৃক্ষরাজি। পৃথিবীর অন্যতম ম্যানগ্রোভ বনের তকমা কাগজে কলমে পেলেও সেটার আক্ষরিক গুরুত্বের দৃশ্যত কোনো কার্যক্রম সাধারণ জনগণের চোখে পড়েনা। বরং মানুষ নামের দস্যু তার নগ্ন কিন্তু দৃপ্ত পদচারণ করেই চলেছে বনের ভিতরে ক্রমাগত উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা বজায় রেখে। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় বেতনভোগী রক্ষকরা তখন কি করে সেটা জনগণের কাছে এক রহস্য! যাহোক, গন্ধমাদন বয়ে এনে কোনো লাভ নেই।

ভদ্রা নদী পার হচ্ছিলাম। ঘাটহীন নদীর বাঁকে বাঁকে দু-একজন করে হাত তুলছিল আর নৌকা ভিড়িয়ে তাদের নৌকায় তুলছিল নৌকার মাঝি। দক্ষিণাঞ্চলে নদনদী বিধৌত এলাকায় বেড়ে ওঠার সুবাদে খেয়া পার হতে হয়েছে বিভিন্ন জায়গায়। তবে এমন ব্যাপার অন্য কোথাও চোখে পড়েনি। এখানে খেয়ার মাঝির অর্থনৈতিক চাহিদা অপেক্ষা মানবিক তাড়নাকেই আমি খুঁজে পেয়েছি।

ইতিমধ্যে আমরা আমাদের গন্তব্যে পৌঁছলাম। ভাটার কারণে জলের স্তর অনেক নীচে নেমে যাওয়ার দরুন চরের কাদা ডিঙিয়েই ঘাটে উঠতে হলো। নদীর পাড়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে দোলনের জেঠা মহাশয় আর ওর বাবা অপেক্ষা করছিল আগে থেকেই। অপরিচিত হিসেবে নিজেকে অনাকাঙ্ক্ষিত মনে হচ্ছিল নিজের কাছেই। পরবর্তীতে উনাদের আন্তরিকতার আঁচে নিজেকে মানিয়ে নিতে কোনো রকম বেগ পেতে হলো না। দোলনের মা বাবা দুজনেই খুলনাতে থাকেন। উনার জেঠা গ্রামের বাড়িতে থেকেই পৈত্রিক সম্পত্তির দেখভাল করেন। এমন অজপাড়া-গাঁয়ে থাকলেও উনার আধুনিকতার বেশভূষা উনার উন্নত রুচিবোধকে সামনে এনে দেয়। জেঠা অবিবাহিত হওয়ায় দোলনের এক দাদা-বৌদি ওখানে থেকে যাবতীয় কাজকর্ম করে থাকে। দোলনের সেই দাদা কাজের জন্য দিনের বেলায় বাড়ি থাকেনা। বাড়িতে গিয়েই তাই বৌদির সাথে প্রথমে পরিচয় হলো। খুব হাসিখুশি কাজপাগল গ্রামের মেয়ে। দুই সন্তানের জননী দোলনের সেই বৌদি। মেয়েটা ছোট আর ছেলেটা গ্রামের স্কুলে যায়। খুব লাজুকতার সাথে গ্রাম্য দুরন্তপনার একটা আবছায়া লুটোপুটি খায় ঐ বাচ্চা ছেলেটার মুখে। একজন পুরোদস্তুর অপরিচিত আগন্তুক হিসেবে যেমনটা বিব্রতকর অবস্থায় পড়া উচিত একটা সভ্য সমাজে, এখানে তার লেশমাত্র নেই। বরং সহাস্যে পরিবারের সদস্যের মতোই দিলখোলা আলাপ করেছে পরিবারের মোটামুটি সবাই।

দোলনের গ্রামের বাড়িটার অবস্থানগত বর্ণনা দিতে গেলে প্রথমেই চোখে পড়বে গোলপাতার ঘর। গোলপাতা মানে গোলপাতাই! ঘরের বেড়া থেকে ঘরের ছাউনি পর্যন্ত। আশেপাশের সব ঘরই এই আদলে তৈরি। বাড়ির পাশেই যে সুন্দরবন সেটা বাড়ির গঠনগত বৈশিষ্ট্যই প্রকাশ করে ফেলে। বাড়ির পেছনে পুকুর আর সামনে উঠান। চারপাশে ফলের গাছ আছে কিছু। উঠানজোড়া ধান আর বিচুলি বোঝাই দেওয়া। চারদিকে যেদিকে তাকানো যায় দিগন্ত বিস্তৃত ধানক্ষেত। এতকিছু বলার মাঝে দুইটা চরিত্রের কথা এখনো বলা হয়নি। সেটা হলো দোলনের মামা আর দোলনের এক দূর সম্পর্কের বোন। দ্বিগরাজ বাস স্ট্যান্ড থেকে বাকি পথে ওরাও সহযাত্রী ছিল। দোলনের মামা বেশ ভাল ছেলে, যদিও বয়সে দোলনের চেয়েও ছোট। ওদের সাথে খুলনাতেই থাকে। দোলনের ঐ দূরসম্পর্কের বোনও খুলনার বাসিন্দা। কিন্তু তার বাহ্যিক সৌন্দর্যের আড়ম্বরে মেকি চিন্তার ভারে ভেতরে যে মা ভবানী বাসা বেধেছে তা বেশ বোঝা গেল প্রথম আলাপেই। সেদিন অপরাহ্ণে নদীর পাশ দিয়ে চলে যাওয়া মাটির রাস্তা ধরে হাটতে বের হলাম। সাথে দোলন এবং ওর সেই মামা আর বোনও ছিল। সন্ধ্যা নামার খানিক পরে পৌঁছলাম ফরেস্ট ঘাটে। নদীর অশান্ত জলরাশির ছলাৎ ছলাৎ শব্দের সাথে দূর থেকে থেমে থেমে ভেসে আসা জলযানের শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ ছিলনা আশেপাশে। নিস্তব্ধতা গ্রাস করেছিল ফরেস্ট ঘাটের ঐ জেটি আর তার আশেপাশের এলাকাকে। বুনো মশার দৌরাত্ম্যে সেখানে স্থির ভাবে দাঁড়িয়ে থাকাই যেন দায়। তার মাঝে দোলনরা গুনগুন করেই গান ধরলো। পূর্ণিমা তিথি না হলেও আকাশে যে বাঁকা চাঁদের আলোর ধারা ঠিকরে পড়ছিল সেটায় আশেপাশের জিনিস এমনি নদীর ঐ পাড়ের সুন্দরবনের ঘন জঙ্গল দেখতেও খুব বেশি কষ্ট হয়না। বনের ভিতর থেকে গাছপালার নির্যাসমিশ্রিত বুনো হাওয়ার ঢেউ গুলো নদীর জলের সাথে পাল্লা দিয়েই যেন বারেবারে আমাদের ছুঁয়ে যাচ্ছিল। আর তার সাথে সাথে ভেতরে বয়ে যাচ্ছিল পাওয়া না-পাওয়ার হিসাবে সদা অসন্তুষ্ট অজ্ঞাতকুলশীল সেই সত্তা। এভাবে অনেকটা সময় কাটানোর পর ফিরে আসি আমরা। আসবার পথে ঐ গায়ের ভিতর হাতে গোনা কিছু দোকান নিয়ে একটা গুচ্ছ বাজারের মতো আছে, সেখানে দোলন নিয়ে গেল আমাদের। ওখানে এক মহিলা গজা (মিষ্টি জাতীয় খাবার) বানিয়ে বিক্রি করছে। কুপি জ্বালিয়ে তার ছোট্ট দোকানটাকে আলোকিত করে রেখেছে ক্রেতার অপেক্ষায়। গরম গরম গজা খাওয়ার আলাদা রকম মজা আছে। ছোট বেলায় এই খাবারটা অনেক খাওয়া হয়েছে। বয়সের সাথে অন্যান্য জিনিসের পরিবর্তনের পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন এসেছে। তবে কিছু খাবারের আবেদন আজও বহালতবিয়তে আছে।

ফেরার পথে দোলন ওর পরিচিত এক বাড়িতে নিয়ে গেল আমাদের। সামর্থ্য অনুযায়ী আপ্যায়ন করলো আমাদের। ওদের আপ্যায়নের ডালা, নিজেদের অন্দরমহলের দুর্ভিক্ষের কথা যেন চোখে আঙুল তুলে দেখিয়ে দিতে চায়। বিচরণশীল বিত্ত বৈভবের প্রাচুর্যের ঘোরে পড়ে স্থির ‘আমি’-কেই জানতে পারিনা আমরা। জীবনভর বয়ে নিয়ে বেড়ানো এই সত্তাটার বিষয়ে শূন্য জ্ঞান নিয়ে দিনান্তে যখন মহাপ্রস্থানের অপেক্ষায় বসে থাকি, তফাতে সম্পদের বোঝাই তখন হয়তো মুচকি হেসেই আমাদের বোকামির সমাপ্তি টানে। যাইহোক, বাড়ির বয়স্ক মহিলা তার গল্পের ঝুলি নিয়ে বসলো আমাদের শোনাবে বলে। তবে এটা কোনো কল্পনার জালে বোনা ছেলেভোলানো গল্প নয়। জীবনের পরতে পরতে অলঙ্ঘনীয় বাস্তবতার সাথে যে সখ্যতা গড়ে তুলতে হয়েছিল তার কিয়দংশই তুলে ধরলো মহিলা। বন আর নদীর তীরবর্তী বাসিন্দা হওয়ার দরুন যেসব অলঙ্ঘনীয় পরিণতি কে সাদরে বরণ করা ছাড়া তাদের আর উপায় থাকেনা সেসব দিয়েই শুরু করলো। ঘটনার পরম্পরায় সুন্দরবন এর কোল ঘেঁষে বিস্তীর্ণ এই জনপদে ঘূর্ণিঝড় ‘আইলা’র যে তাণ্ডব তার কিছু চিত্র তুলে ধরতে লাগলেন আমার উদ্দেশ্যে। দীর্ঘ দুই বৎসর তাদেরকে গৃহহীন হয়ে নদী আর লোকালয়ের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া উঁচু মাটির রাস্তায় রাত্রিযাপন করতে হয়েছে! খোলা আকাশের নিচে সারাদিন থাকতে হতো। তাদের আর্থিক অবস্থা তাদের এমন জীবনাচরণে কখনো তাদের বাধ্য করেনি; করেছে সর্বনাশী ‘আইলা’। প্রতিটা সন্ধ্যায় একসাথে সবগুলো কুপি যখন জ্বলে উঠতো প্রতিটা তাঁবুতে। দীর্ঘ রাস্তার উপর তাদের এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আলোক পুঞ্জি গুলোর ঝলকানি ঠিকরে পড়তো নদীর জলে। নদীতে চলমান নৌযান থেকে কোনো ভ্রমনার্থীর কাছে এই দৃশ্যগুলো সেলুলয়েডে আটকিয়ে রাখার মতো মনে হলেও ভুক্তভোগীদের কাছে এই অভিজ্ঞতা পার্থিব নরকের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। উনি তখনো বলেই চলেছে উনাদের সেই যুদ্ধজয়ের কাহিনী!তবে শ্রোতাকূলে খেয়াল করলাম হাই তুলতে শুরু হয়েছে। কিন্তু সেসবে উনার বলার আগ্রহে বিন্দুমাত্র ভাটা পড়লোনা। তাই বাধ্য হয়ে নিজেকেই মেকি আগ্রহ দেখাতে হলো। স্রষ্টা এদের মন দিয়েছে অনির্দিষ্ট সীমার পরিধি এঁকে। তবে সম্পদের মালিকানার বেলায় প্রকৃতির ভারসাম্য নীতি এদেরকে বস্তুগত সম্পদ থেকে বঞ্চিত করে রেখেছে অসীম সীমার ছোট্ট এক কোণায়! আমাদের আকাঙ্ক্ষার উঁচু দেয়ালটা যখন স্বপ্ন বোঝাই করে তার উচ্চতা বাড়াতে থাকে, সুখ নামের অনুভূতি অলীক হয়েই আটকে পড়ে যায় দেয়ালের অন্য পাশটায়। তবে এদের বেলায় সেই অবস্থার অবতারণা কখনোই ঘটেনা। দিনভর কাজ করে দিনান্তে পেট পুরে খাবার জুটে গেলে আর কিছু চাওয়ার মতো জিনিসই এদের অবশিষ্ট থাকেনা। তাই এই পার্থিব ভ্রমণে মিছে আকাঙ্ক্ষার দেয়াল তুলবার প্রতিযোগিতার মাঝে এরা জীবনের সফলতা খুঁজে না। সুখটাকে আঁকড়ে ধরে এই ভ্রমণের ইতি টানতেই বরং এরা অধিক পছন্দ করে।

রাতে খাওয়াদাওয়া শেষে দোলনের মামা আর আমি এক রুমেই ঘুমালাম। বাইরে শীতের প্রকোপ ততটা না হলেও রাতে বেশ শীত পড়তে শুরু করে। ভেবেছিলাম একখানা কাঁথা জুটে গেলেই রাত কাটিয়ে দেওয়া যাবে। কিন্তু নিজের ভাবনা অপেক্ষা বাস্তবতা বেশ অনুকূলে ছিল। ধবধবে সাদা লেপেই শীতের রাতটা কাটানো গেল। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দোলনের গলার আওয়াজ শুনতে পেলাম বিছানায় থেকেই। আমার দেখা মানুষ গুলোর মাঝে খুবই সরল মনের কুটিলতা বর্জিত একজন সে। সকালে একটু হাঁটাহাঁটি করার পর সকালের খাওয়াটা শেষ করা হল। ওদের নিজেদের গাছ থেকে ডাব খাওয়া হল। দুপুর নাগাদ পুকুর থেকে মাছ ধরা হলো জাল দিয়ে। নিজেও সামিল হলাম সেই মাছশিকারিদের সাথে। জাল চালনায় সিদ্ধহস্ত না হলেও মাঝারি আকারের গলদা চিংড়ি ধরে ফেললাম। অতঃপর ঐ ঘোলা জলেই দুপুরের স্নান সেরে নিলাম। দুপুরে খাওয়া কোনো রকমে শেষ করেই সবাই বের হলো। সুন্দরবনের ভিতরে যাওয়ার জন্য দোলনের বাবা একটা ট্রলার রিজার্ভ করে রেখেছে আগে থেকেই। ঘাটে সবার পৌঁছানোর পর ট্রলার রওনা দিল। বনের ধার ঘেঁষে চলতে লাগলো আমাদের ট্রলার। বনের ভিতর কিছু বানর ব্যতীত আর কিছুই চোখে পড়লো না। যদিও আগে থেকেই জানতাম যে ট্রলার নিয়ে বনের খুব ভিতরে যাচ্ছি না, তাই হরিণ কিংবা বাঘের দেখা আশা করিনি। ফিরে এলাম সন্ধ্যা নাগাদ।

আকাশে সেদিন পূর্ণিমার ঝর্না না নামলেও যতটা আলো ছিল সেটা একটা মায়াবী পরিবেশের সাজসজ্জার জন্য পর্যাপ্ত ছিল। উঠানে বিছানো ধান ছাড়ানো বিচুলির উপর বসে পড়লাম দোলন আর ওর সমবয়সী মামা আর বোন সহ বাড়ির ছোটরা। ওদের হাজারো অণুগল্পের আবডালে হারিয়ে গিয়েছিলাম নিজের ছোটবেলার ধূলা কালির তলে চাপা পড়া শৈশবের ঐ দিনগুলোতে। শীতের প্রথম দিকে যখন বিদ্যালয়ের বার্ষিক পরীক্ষার পর দীর্ঘ সময়ের ছুটি মিলতো তখন নিজের কাজিনরা শহর থেকে গ্রামে বেড়াতে আসতো। বছরে এই সময়টার জন্য আমরা ছোটরা বিশেষ করে মুখিয়ে থাকতাম। তারপর পূর্ণিমার রাত নামলে উঠানে বিছিয়ে রাখা বিচুলির ভিতর লুকোচুরি খেলতাম ওদের সাথে আর রাতভর সারা শরীর বিচুলির সংস্পর্শ পাওয়ায় প্রচুর চুলকাতো। তবে খেলার নির্মল আনন্দের কাছে এই অযাচিত পীড়নকে নিতান্তই লঘু বলেই মনে হতো। সময়ের ব্যাপ্তিতে আজ এগুলো স্মৃতির কুঁড়েঘরকে জাপটে ধরে আছে। যে যার মত ব্যস্ত সবাই। অনেকে দেশান্তরি হয়ে গেছে পরম সুখের আশায়। শৈশবটাও ফাঁকি দিয়েছে। তবে মরচে ধরা নিউরনের অনুরণনে মাঝে মাঝে এরা ঝলসে ওঠে ইলেক্ট্রিসিটি শূন্য এমন নিস্তব্ধ লোকালয়ের অচেনা পরিবেশে। আর আগত ভবিষ্যতের নতুন হাইওয়ের সাথে শৈশবের সেই কাঁচা রোডটার মাঝে ফিডার রোডের কাজটা সেরে দেয় ঠিক এভাবেই!

রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে উঠানের জটপাকানো মেলার ঝুড়ি বারান্দায় এসে জেঁকে বসলো। লুডু খেলায় পারঙ্গম না হলেও বাধ্য হয়ে বসতে হলো। তবে দোলনের হারের কারণে খেলাটা একটা চাপা অসন্তোষেই শেষ হলো।

পাশের ওর এক পিসির বাড়িতে গল্পের আসর জমলো। শীতের রাতে লেপের নিচে বসে বেশ একটা আয়েশি ভাব নিয়ে ওর পিসির থেকে তার এলাকার অমীমাংসিত কিছু অতিপ্রাকৃত গল্পের ঢেউ গুনতে লাগলাম আমরা। নিজেদের মধ্যে বিচরিত এমন কিছু ঘটনাও বলে ফেললো অনেকে। কুপির আলোর ঔজ্জ্বল্যে আলোকিত ঘরে বসে এমন সব ভৌতিক গল্পে যতটা না ঘটনার যৌক্তিকতা প্রমাণে মন সায় দেয়, ঢের বেশী ইচ্ছে হয় নির্লিপ্ততার সাথে সেটা উপভোগ করা। ব্যক্তিজীবনে ভৌতিক এবং ট্রাজেডি এই দুধরণের জিনিস যতটা মানুষ এড়িয়ে যেতে ইচ্ছে করে, বিনোদনের পর্যায়ে এলে ঠিক ততোটাই ক্ষুধার্ত মনে গলাধঃকরণ করতে চায়। এটাই হয়তো মানব মনের স্বভাবগত বৈপরীত্য।

কাল সকালেই আমার এই সংক্ষিপ্ত বনবাসের পর্দা টানতে হবে। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগমুহূর্তে এটা ভাবতেই ভিতর থেকে অন্তরাত্মা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। ইচ্ছে হচ্ছিল আর কিছু দিনের জন্য থেকে যেতে। ব্যাপারটা বাস্তবতা বিবর্জিত সেটা নিজে বুঝলেও নিজের অপরিণত সত্ত্বা ঠিক মানতে চাইছিল না। পঙ্কিলতা আর শ্রেণীবৈষম্যের আদলে রচিত অস্থিচর্মসার এই সমাজব্যবস্থায় ছুটতে ছুটতে হঠাৎ এই খেয়ার দেখা!বেশ খানিকটা সময় স্বস্তির হাওয়ায় ভেসে ভেসে খেয়া যখন ঘাটে ভিড়ল, যাত্রার সংক্ষিপ্ততা এই পেয়ে হারানোর পীড়নকে ক্ষুধিত করে তুলছিল সর্বতোভাবেই।

বাস তখন ছেড়ে দিয়েছে। দু’দিনের স্মৃতিগুলো নিজে থেকেই আউড়ে যাচ্ছিল ভেতরের নিয়ন্ত্রণহীন সেই জিনিসটা। সেই ঠাকুরবাড়ির ঘাট, সেই সূতারখালী, সেই ফরেস্ট ঘাট, সেই পূর্ণিমার আলোয় ছেয়ে থাকা দিগন্তের শেষ সীমার ধানক্ষেত। মাত্র তো দুইদিন! চলে আসবার সময় মনে হচ্ছিল অনেক কিছুই পেয়েছিলাম এই দু’দিনে আবার সবকিছু বিসর্জনও দিয়ে আসছি ভদ্রার ঐপাড়ে।

কমেন্ট করুন
প্রাক্তন শিক্ষার্থী | সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, চুয়েট

0