অধিকার

•পোলা লইয়া কি না খাইয়া মরবি রোজি?

বলে কমলা খালা, এই গ্রামের বুজুর্গ মহিলা, ঢাকায় নাকি তার ছেলেরা থাকে, অনেক জানাশোনা, অনেককে কাজ দিয়েছে। পিচিক করে পানের পিক ফেলে উঠানেই। আমারে দুইডা পান দে। রোজি দুটো পান এনে দেয়। একটা মুখে পুরে কমলা, আরেকটা আঁচলে গিট দেয়৷

•কী কন? রোজি উত্তর দেয়।

•আমার কতা হোন৷ ঢাকা চল। ঐখানে অনেক কাম আছে, তর ভাই, ভাবি কয়দিন টানব? তাগো পোলাপান আছে।

•আমার পোলা কই থাকব? আমারে ছাড়া থাকব কেমনে?

•পোলা এইহানে থাউক, ট্যাকা জমাইয়া, ঘর লইয়া পোলারে নিয়া যাইও, ভাইরে ট্যাকাও দিও।

•আইচ্ছা, আমি ভাইজানের লগে বুঝি…

•না না, এত লোক জানাজানি করন যাইব না, বাসাবাড়িতে অহন মানুষ রাখা নিষেদ, পুলিশ ধরব।

•তাই?

•হ!

•আইচ্ছা কাউরে কমু না।

•কাইল বিহান বেলা চৌরাস্তায় খাড়ায় থাইক, আমি আইসা নিয়া যামু, কাউরে কইছ না, কাক পক্ষী যেন ট্যার না পায়।

•আইচ্ছা।

রোজি কমলা খালার কথা সম্পূর্ণ বিশ্বাস করলো। অকালে স্বামী হারিয়ে, একমাত্র ছেলে রতনকে বুকে নিয়ে ভাইয়ের ঘরে উঠেছে । ভাবি মানুষ ভালো। কিন্তু ভাইয়েরও অভাবের সংসার৷ কমলা খালা মাঝে মাঝেই আসে। পান চিবায় আর বিভিন্ন কথা বলে।

রোজিকে পাত্তা দিতে নিষেধ করেছে ভাবি। হয়তো চান না, সে ঢাকায় যাক। ভাইজান মেয়েদের বাইরে কাজ করা পছন্দ করে না। হয়তো সে জন্য ভাবি নিষেধ করেছিল।

ভোরে কমলা খালার সাথে চৌরাস্তা দেখা করে রোজি। তার জমানো টাকায় টিকিট কেনা হয়। জীবনে প্রথম  ট্রেনে উঠলো রোজি। বিয়েতে শুধু বাসে উঠেছে। তাছাড়া নৌকা, রিকশা, ভ্যান ছাড়া কিছুতে চড়েনি। কোনদিন ঢাকার চেহারাও দেখেনি।

ট্রেনে উঠতেই একটা অপরিচিত হাত পরিকল্পিত ভাবে ঘুরপাক খাচ্ছিল তার নিতম্বে।  সিট ভাড়া দেয়নি যারা তারা দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। থেকে থেকে শরীরের উপর ঝুঁকে পড়ছে। নামতে গিয়েও ছোঁয়াছুয়ির হাত থেকে বাঁচতে পারেনা রোজি। এরা কারা? এত নোংরা কেন? ঢাকায় নেমে প্রথম যেটা ভয় পায় রোজি সেটা হলো মানুষ। এত এত মানুষ।

স্টেশন থেকে রিকশা দূরত্বে একটা বাসায় খালা দিয়ে এলো। বেতন কত, কী কী কাজ এসব কিছুই রোজির সাথে আলাপ হলো না। কমলা খালা বললো টাকা সে মাসে মাসে বাড়ি দিয়ে আসবে। রোজি বলতে চাইল তার কী দরকার, বিকাশ দিয়ে পাঠালেই হয়। কিন্তু কিছু বলার সুযোগ সে পেলো না।

বাসার মহিলা ঘরের সব কাজ করিয়ে নেন, নিজে হাতও লাগান না। তাতে রোজির সমস্যা নেই। মাসে মাসে ভাই টাকা পেলেই হলো।

ক্লাস ফাইভ পাস সে, মাসের হিসাব রাখতে জানে টুকটাক ইংরেজিও পড়তে পারে। ক্যালেন্ডারে খেয়াল করে। মাস পার হয়ে যায়। খালা আর আসে না। মহিলাকে জিজ্ঞেস করে,

•আফা খালা তো আইলো না আমার ট্যাকাডা?  আমার ছুটো পোলা আছে।

•টাকা কমলা এককালীন ছয়মাসের জন্য  নিয়ে গেছে।

•কই আমারে কিছু কয় নাই, আর আমি পোলারে দেখবার যামু।

•এসব হবে না। এজন্যই আমি পুরো টাকা দিয়ে দিয়েছি, এসব বায়না চলবে না। যাও নিজের কাজ করো। মহিলা ধমকে ওঠে।

আরো মাস খানেক চলে গেল, খালা এলো না। মহিলার ছেলে এলো হোস্টেল থেকে। কলেজে পড়ে। মহিলা সকালে বেরিয়ে যায়, রাতে ফেরে, পুরোটা সময় ছেলে গেমস খেলে। আর বিচ্ছিরি গন্ধের কী যেন খায়। মাঝে মাঝে তার বয়সী আরো ছেলেরা আসে। অন্য সময় পুরো দিন তালা বন্দি থাকত রোজি। আজ প্রথম তাকে সিগারেট কিনতে পাঠিয়েছে ছেলেটা। টাকাও দিয়েছে। রোজি দোকানদারকে একটা ফোন করতে দিতে অনুরোধ করে। দোকানদার পকেট থেকে ফোন বের করে দেয়। ভাইয়ের নম্বর মুখস্থ ছিল। অনেক বার কল দেওয়ার পরও ভাই রিসিভ করলেন না। দোকানদার কোন টাকা নিলেন না। সিগারেট দিয়ে বিদায় দিলেন। খুব মনকষ্ট নিয়ে ফেরে রোজি।

দুপুরের কাজ সেরে অন্যদিনের মতো রান্নাঘরের মেঝেতে একটু শরীর এলিয়ে দেয় রোজি। ঘুম ভাঙল একটা অপরিচিত হাতের ছোঁয়ায়। হাতটা তার হাত দুটো চেপে ধরে, মুখটা ঝুকে আসছে তার উপর !  চিৎকার করতেই অসম্ভব জোরে এক চড় খায় সে। তার মনে হচ্ছে চোয়ালের হাড় যেন ভেঙ্গে গেল। ব্যথায় চারিদিক অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু মেয়েলি প্রতিরোধ সে করে যাচ্ছে। এক পর্যায়ে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় ছেলেটা। চাপাতি দিয়ে গলা কাটার ভঙ্গি করে চলে যায়। মহিলা আসে রাতে। গালের দাগ দেখে মহিলা তাকেই গালাগাল করে।

পরদিন সকালে মহিলা বেরিয়ে যায়।

ছেলের ঘুম ভাঙতে দেরি আছে। দরজার চাবির ছেলের ঘরে আছে৷ কোথায় আছে রোজি জানে। ঘর ঝাড়ু দেওয়ার ভঙ্গি করে চাবিটা বের করে আনে। তালা খুলে এক কাপড়ে বেরিয়ে পড়ে৷ তাকে যেতে দেখে দোকানদার ডাক দেয়,

•আপা আপনার ফোন আসছিল। আপনার ভাইয়েরা আপনাকে অনেক খুঁজেছে। পুলিশ  নাকি নিখোঁজ মানে নাই। তাই মামলা নেয়নি। আপনি গ্রামে ফিরে যান। এরা মানুষ ভালো না। আমি কাল বলতে চাইছিলাম, কিন্তু অনেকে স্বেচ্ছায় কাজ করে। আমারো তো কাজ করে খেতে হয়। তাই কিছু বলিনি।

•আমি গেরামেই যামু । স্টেশনের রাস্তাটা যদি কইয়া দিতেন ?

•আমি রিকশা ডেকে দিচ্ছি। মুখ ঢেকে নেন। কিছু নাই আপনার কাছে?

•না, আমি এক কাপড়ে বাইর অইছি।

•আচ্ছা আল্লাহ ভরসা, আপনি এই টাকা কয়টা রাখেন। বিপদে কাজে লাগবে।

•আমি ফেরত দিমু কেমনে?

•আপনার ভাইয়ের কাছে আমার নম্বর আছে। ওতেই বিকাশ আছে । আর আমি আপনাকে সাহায্য করছি। ফেরতের চিন্তা করা লাগবে না । পৌঁছে একটা কল দিলেই হবে।

•আল্লাহ আপনার ভালো করুক। চোখ মোছে রোজি।

রোজি ছয় মাস পর ভাইয়ের দুয়ারে৷

ভাইরা খুঁজে খুঁজে এখন আশা ছেড়ে দিয়েছে। তারা কিছুতেই বাসায় জায়গা দিবে না। গ্রামে নানা বাজে কথা ছড়িয়েছিল কমলা খালা। খালার সাহায্যে নাকি রোজি কোন ছেলের সাথে ঢাকায় গিয়ে সংসার পেতেছে!

•কমলা খালা আমারে বেঁইচা আইছিল কামের বেডি কইরা।

•গেরামে কেউ মানবো?

•ভাইজান পায়ে পড়ি, আমারে মাফ কইরা দাও, খালা আমারে বুজাইছে, আমি কাম করমু, ঘর নিমু, পোলারে সাথে লইয়া যামু, পোলা আমার ইশকুল যাইবো… ভাইজান…  ভাইজান গো! উঠানে গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদে রোজি। পুরো গ্রাম এক হয়েছে তামাশা দেখতে। কেউ কেউ লাত্থি দিয়ে তাড়াতে বলছে, কেউ কেউ বলছে উলঙ্গ করে পুরো গ্রাম ঘুরাতে!

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়, আঙিনায় পড়ে থাকে রোজি। রোজির ছেলেও তার কাছে আসে না। সেও এ কদিনে কম কথা শোনেনি। রাতে ভাবি এলো ভাতের থালা আর পানির গ্লাস নিয়ে। রোজি ভাবির পা জড়িয়ে ধরে।

•আরে কী করো? 

•ভাবি বিশ্বাস করেন, ভাবি আমি কামের বেডি আছিলাম।

•আস্তে তুমার ভাই হুনলে আমার খবর আছে। ভাত খাও, সারাদিন দানাপানি পড়ে নাই।

•।। আমার গলা দিয়া কিছু নামব …

•শুনো মাইয়া, অখন শক্ত অইতে হইব। হ্যারা মাইনা নিব না মাইনে? বাপ বাপ কইরা মানতে হইব।

•কী কও  ভাবি?

•হ! ঠিকই কই।

•হ্যারা যদি কাইলও এইহানে ফালায় রাহে, কইবা এই জমিন তোমারও।

•কী কন?

•আল্লায় আমাগো মাইয়াদেরও হক দিছে, হক আদায় কইরা, মায়ে পোলায় থাহ।

•ভাইজান গো কাছে জমিন নিমু?

•না নিয়া কী করবা? খাইয়া লও আমি যাই। কলপাড়ে পেলেট গেলাস রাইখা আইসো। এইখানে রাইখ না।

#

ফজরের আজান পড়ল, ঠায় বসা রোজি। কান্নার দমকে শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছে। বড় ভাই নামাজ পড়ার জন্য মসজিদে গেল। ফিরে এসে রোজির সামনে দাঁড়ায়।

•তুই কেন গেছিলি, কার লগে গেছিলি, তর লগে কি অইছে আল্লাহ পাক ভালো জানেন, আমার তরে শাস্তি দেওনের একতিয়ার নাই। যা করলাম গেরামের মাইনসের জন্য করলাম। আয় ভিতরে আয়। তর পোলার কাছে গিয়া শুইয়া পড়। তর ভাবি উঠলে গরম ভাত খাইস।

•ভাইজান….

•যা যা ভিতরে যা।

(সমাপ্ত)

কমেন্ট করুন
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ

0