বুক রিভিউঃ আদর্শ হিন্দু-হোটেল

বইয়ের নাম: আদর্শ হিন্দু-হোটেল
লেখক: বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
বইয়ের ধরন: সামাজিক উপন্যাস 
প্রকাশকাল: ১৯৪০

মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড় তা উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র হাজারি ঠাকুরকে দেখেই বোঝা যায়। হাজারি ঠাকুর একজন বাস্তববাদী, সহজ সরল এবং সৎ প্রকৃতির মানুষ। যার বয়স পঁয়তাল্লিশোর্ধ হওয়া সত্বেও তিনি তার স্বপ্ন বাস্তবায়নে অবিচল। রাঁধুনি হিসেবে তার অনেক নামডাক। গ্রাম বা শহর থেকে যারাই ভ্রমণে বা কোনো কাজে রানাঘাট আসতো সবাই তার হাতের রান্না খেতো। হাজারীও বেচুঁ চক্রবর্তীর হোটেলকে অনেক ভালোবাসতো যার কারণে অনেক ভালো বেতনের চাকরি রেখে বারবার বেচুঁ চক্রবর্তীর হোটেলে কম বেতনের চাকরিতে ফিরে আসতো। রানাঘাট শহরে বেচুঁ চক্রবর্তীর বিখ্যাত হোটেলে রাঁধুনির কাজ করতে থাকা অবস্থাতেই তিনি স্বপ্ন দেখতেন নিজের একটা হোটেল খোলার।  অবশেষে তার চেষ্টা সফল হয়। দৈনন্দিন জীবনে নানা উপেক্ষা, অপমান সহ্য করেও তিনি কখনও কারো সাথে খারাপ আচরণ করেননি এবং পরবর্তীতে তার কাজের মাধ্যমে তিনি তার উৎকৃষ্ট জবাব দেন, যা তার চরিত্র থেকে অন্যতম একটি শিক্ষা।

উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র হাজারী ঠাকুর ছাড়াও আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য চরিত্র রয়েছে, পদ্ম ঝি তাদের মধ্যে অন্যতম। তিনিও হাজারীর মতো বেচুঁ চক্রবর্তীর হোটেলে কাজ করতেন। বেচুঁ চক্রবর্তী পদ্ম ঝির সব কথা অন্ধের মতো বিশ্বাস করতেন। পদ্ম ঝির আচরণের একটা বিশেষ দিক ছিল সবসময় হাজারীর পেছনে লাগা। অকারণেই সে হাজারীকে অপমান করতো। হাজারীকে অপমান করার বিন্দুমাত্র সুযোগও সে হাত ছাড়া করে না। অবশ্য উপন্যাসের শেষ দিকটায় এসে সে তার ভুল বুঝতে পারে।

আরেকটি উল্লেখযোগ্য চরিত্র হলো গ্রামের সহজ সরল বিধবা মেয়ে কুসুম। কুসুম হাজারীকে পিতার মতো সম্মান করতো। গ্রামীণ নারীদের মমতার ছোঁয়া উপলব্ধি করা যায় কুসুম চরিত্র থেকে। অতশীও কুসুম চরিত্রের বিশেষণে বিশেষায়িত। সে হাজারীর গ্রামের এক ধনী পরিবারের মেয়ে। সেও হাজারী ঠাকুরকে তার পিতার মতো শ্রদ্ধা করে। হাজারী হোটেল খোলার জন্য তাকে টাকা দিয়ে সাহায্যও করেছিল সে।

এছাড়াও উপন্যাসে টেপী (হাজারীর মেয়ে), বংশী, মতি চাকরসহ আরও বেশ কয়েকটি চরিত্র বিদ্যমান।

“আদর্শ হিন্দু-হোটেল” একটি সামাজিক উপন্যাস হওয়া সত্ত্বেও জীবনের  কঠিন সত্যকে সহজ ও সাবলীলভাবে তুলে ধরে। স্বপ্ন পূরণে লক্ষ্যে অবিচল থাকতে হয় তার বাস্তব উদাহরণ হাজারী। শত বাঁধা বিপত্তি আসবেই কিন্তু লক্ষ্য থেকে কোনোভাবেই পিছু হটা যাবে না। আদর্শ হিন্দু-হোটেল পাঠককে স্বপ্ন পূরণের অনুপ্রেরণা দেয়। জীবনে যত বাঁধাই আসুক সৎ থাকলে ও সততার সাথে কাজ করলে সফলতা অবশ্যম্ভাবী।

উপন্যাসটি আরো একটি কঠিন এবং দুঃখজনক সত্যকে মানব সমাজের সামনে নিয়ে আসে সেটা হলো অর্থ-সম্পদের প্রভাব। হাজারী অবস্থাসম্পন্ন হওয়ার পর তার প্রতি পদ্ম ঝির আনুগত্যের বহিঃপ্রকাশ তারই উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

পরিশেষে বলা যায় যে- “আদর্শ হিন্দু-হোটেল” বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক অনবদ্য সৃষ্টি যা অবস্থা অনুযায়ী মানবসমাজের আচরণ এবং বাস্তব জীবনের নানামুখী দিক সম্পর্কে পাঠক মনে অনেক অনুভূতির সূত্রপাতঘটাতে সক্ষম। বইটি পড়লে সেগুলো সম্পর্কে পাঠকের ধারণা আরো স্বচ্ছ হবে।

কমেন্ট করুন
শিক্ষার্থী | পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়