জীবন, সময় ও ভাবনা

অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ -আমাদের সবার জীবনের আবশ্যিক অংশবিশেষ, আমরা চাইলেই এর কোনোটাকেই বাদ দিতে পারিনা। কিন্তু আমরা কি তিনটি অংশকেই সমান গুরুত্ব দিই? তিনটি অংশ নিয়েই কি আমরা সমান ভাবে ভাবি?

-না, কারণ আমরা সবাই বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে এতটাই চিন্তিত থাকি যে, তার মধ্যে অতীত নিয়ে ভাবার সময়ই পাইনা। আমরা বর্তমান আর ভবিষ্যৎ নিয়ে যতটা ভাবি, তার এক তৃতীয়াংশ ও ফেলে আসা অতীত কে নিয়ে ভাবিনা, এই যতটুকু সময় আমরা আমাদের কাছে গুরুত্বহীন এই বিষয়টার জন্য ব্যয় করি এটাও বা কেন করি? ভেবে দেখেছেন কখনও!

তার আগে জানার বিষয় হলো, এই যে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর সময়টুকু ফেলে আসা অতীতকে নিয়ে ভাবি কখন? আমরা কখন বেশি স্মৃতিচারণ করি? সুখী থাকলে নাকি জীবন নিয়ে হতাশা বা অস্বস্তিতে ভুগলে? কখন বেশি অতীতের কথা মনে পড়ে?

আমি বলবো আমরা যখন আমাদের জীবন নিয়ে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ি তখনই আমরা স্মৃতিচারণ করি। কিন্তু কেন? কেন আমরা খুশি থাকলে অতীতের কথা ভাবিনা?

আসলে বর্তমান নিয়ে সুখে থাকলেই যে একদম ই আমরা স্মৃতিচারণ করিনা, অতীত নিয়ে ভাবিনা ঠিক সেটা নয়। অবশ্যই তখনও আমাদের ফেলে আসা অতীত মনে পড়ে কিন্তু সেটা তীব্র হয়না। কারণ,  আমরা মুহুর্তের সাময়িক সুখ নিয়েই ভালো থাকতে পছন্দ করি। সাময়িক সুখ নিয়েই আমাদের কৌতুহল বরাবরই বেশি। আমরা ভাবি এই তো সুখে আছি, থাক না ফেলে আসা সব কিছু, আমরা কেন আমাদের অতীত নিয়ে এতো স্ক্রাপিং? কেন অতীত কে আমরা একবারে ভুলে যেতে চাই! অতীত কি শুধুই কষ্টকর স্মৃতিতে পুর্ণ?

কিন্তু কোনো সময়ই তো শুধু কষ্ট বা শুধু আনন্দে পুর্ণ থাকেনা। সুখ-দুঃখ, আনন্দ-কষ্ট নিয়ে আমাদের জীবনের প্রতিটা অধ্যায়, কিছু কষ্টের জন্য অনেক আনন্দকে প্রত্যাখ্যান করা উচিত নয় বোধ হয়।

আমরা সবাই জানি যে অতীত কখনোই ফিরে আসবেনা, কিন্তু আমরা কি এটা জানি যে অতীত আমাদের সব থেকে বড় শিক্ষক? অতীতে করা ছোট ছোট ভুল গুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে সেগুলো শুধরে নিলে আমাদের বর্তমান সুন্দর হয়, সবসময় উচিত সেই ভুলগুলোর যেন পুনরাবৃত্তি না হয়, আমরা কি সেটা করি? করিনা। আমরা বর্তমান এ সুখের দেখা পেলেই সব ভুলে যায় কিন্তু পরক্ষণেই আবার আগের ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটাই। আবার কিছু মানুষ সেই অতীত কে নিয়েই পড়ে থাকে, তারা যে ভবিষ্যৎ এ ভালো কিছু করতে পারে সেটা ভাবেনা। সেটাও উচিত নয়, আমাদের কিছু অতীতকে ভুলে যাওয়া উচিত, তাহলে প্রশ্ন আসবে কেন আমরা অতীত কে ভুলে যাবো!

“আমেরিকার একজন ব্যাক্তি ৩০$ দিয়ে সিনেমার টিকেট কিনলেন তার নিজের এবং তার স্ত্রী এর জন্য। তারা সিনেমা দেখা শুরু করলে কিছু সময় পর সিনেমাটি ভয়ানক হতে থাকলো, তখন ব্যক্তিটি তার স্ত্রী কে বললেন চলো আমরা ফিরে যাই কিন্তু তার স্ত্রী না মত করে বললেন যে, ৩০$ কেন ফালতু নষ্ট করবো”

এখন ভাবুন তো, একদিকে ৩০$ আর অন্যদিকে তাদের ভয় আর ভালো না লাগা, এখন তারা কোন টা কে গুরুত্ব দিবেন?

অবশ্যই তাদের উচিত বাড়িতে চলে যাওয়া। যেটা চলে গেছে সেটা তো আর ফিরবেনা। কিন্তু সিনেমা টা দেখলে তাদের সময় নষ্ট, মুড নষ্ট আর তার সাথে নিজেদের ভয় সব কিছু মিলিয়ে বর্তমান ক্ষতির কথা চিন্তা করে তাদের ফিরে যাওয়ায় উচিত। আমরা একটু বাস্তব জীবনে আসি, ধরুন আপনি কোনো একটা ব্যবসায়ে অনেক টাকা বিনিয়োগ করেছেন বেশ অনেক মাস যাবত, কিন্তু এখনও কোনো লভ্যাংশ আসেনি সেখান থেকে, আপনি বুঝতে পারছেন সেটা থেকে কোনো লভ্যাংশ আপনি পাবেন না, তবুও কি সেখানে বিনিয়োগ করা চলমান রাখবেন? অবশ্যই না।

এটাকে বলে “Sunk cost fallacy”

আমরা যখন আমাদের কোনো কিছু ক্ষতির দিকে যাচ্ছে জেনেও বিনিয়োগ করতে থাকি তখন এটা আরও ভয়ানক হয়ে ওঠে, এবং ব্যাপার টা এমন হয়ে ওঠে “Dealing with a lost cause”

এজন্য একবারে অতীতের কিছু নিয়ে পড়ে থাকাও ঠিক নয়। ভুল ত্রুটি থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমান জীবন কে সুন্দর এর প্রচেষ্টা করতে হবে।

এবার আসি ভবিষ্যতের বিষয় টা নিয়ে, আমাদের বেশিরভাগ মানুষ ভবিষ্যৎ নিয়ে এতটাই চিন্তিত যে ভবিষ্যতের জন্য বর্তমানটাকে অসুন্দর করে তুলি, কিন্তু আমরা কেও জানিনা আমাদের ভবিষ্যৎ এ কি আছে। কাল ই আমাদের জীবনে কি হবে আমরা জানিনা সেখানে তো অদূর ভবিষ্যৎ! অথচ আমরা মরীচিকার পিছনে ছোটার মতো ভবিষ্যতের পিছে ছুটে বেড়াই, সেটাও নেহাত অর্থহীন বলা যায় না কারণ আমরা সবাই চাই আগামী দিনগুলোকে সুন্দর নিশ্চিত করতে। কিন্তু সেটার জন্য বর্তমান কে তিতকুটে করা কি উচিত?

কখনোই না, যেমন অতীত কে ভুলে সাময়িক সুখে মেতে ওটা ঠিক নয়, যেমন কোনো ভুলে ভরা অতীত কে নিয়ে পড়ে থাকা উচিত নয়, তেমনিভাবে ভবিষ্যৎ নামক মরীচিকার পিছনে ছুটতে যেয়ে বর্তমান কে বিভীষিকাময় করা উচিত নয়।

“Yesterday is history, tomorrow is mystery, Today is a gift of god, which is why we call it ‘The present’

আমাদের উচিত জীবনের এই তিনটি অংশকেই সমান গুরুত্ব দেয়া, একটার জন্য অন্যটাকে নষ্ট করার কোনো প্রয়োজন নেই। জীবনে সব কিছু নিয়ে খুশি থাকাটাই আসল কথা। আমরা সব কিছু যেমন বাদ দিবোনা তেমন খারাপ গুলোকে ধরে বসে থেকে জীবনের সুন্দর মুহুর্তগুলো নষ্ট করবোনা। তাহলেই আমাদের জীবন সুন্দর হবে।

কমেন্ট করুন
শিক্ষার্থী | ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

প্যাপাইরাসের অনলাইন সংস্করণের ৪র্থ বর্ষপূর্তি

প্রতিযোগিতাটি শুধুমাত্র পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের জন্য