অক্টোবর 16, 2026

অ্যাশেজ সিরিজ— খেলা নাকি যুদ্ধ?

ক্রিকেটে এমন কিছু প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে, যার ইতিহাস শুধু মাঠের রান, উইকেট কিংবা জয়ের হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আর সেই গল্পেরই সবচেয়ে বিখ্যাত অধ্যায়ের নাম— ‘দ্য অ্যাশেজ’।

যাকে, ক্রিকেট তো বটেই, সব খেলারই শ্রেষ্ঠতম প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসাবে বলা যায়।

গল্পের শুরু উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে। তখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আজকের মতো এত বিস্তৃত ছিল না। ক্রিকেটের জন্মস্থান ইংল্যান্ডের ক্রিকেটীয় আধিপত্যও ছিল বেশ শক্তিশালী। ১৮৮২ সালের ২৯ আগস্ট, লন্ডনের দ্য ওভালে এমন কিছু ঘটে গেল, যা খেলাকে সাধারণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে নিয়ে গেল আরো অনেক উঁচুতে।

সেবার ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মাত্র ৮৫ রানের লক্ষ্য পেয়ে খুব সহজেই অস্ট্রেলিয়া ম্যাচটি জিতে যায়। ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় ইনিংস শেষ হয়ে যায় মাত্র ৭৭ রানে। অস্ট্রেলিয়ার এই জয় ইংলিশ ক্রিকেটে যেন এক ধরনের ধাক্কা হয়ে আসে। ইংল্যান্ডের বিখ্যাত পত্রিকা ‘The Sporting Times’ তখন রসিকতা করে একটি ‘শোকবার্তা’ প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, “ইংলিশ ক্রিকেট মারা গেছে এবং তার দেহ দাহ করে ছাই অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে যাওয়া হবে।”

এই ‘ছাই’ থেকেই জন্ম নেয় ক্রিকেটের অন্যতম কিংবদন্তি শব্দ— The Ashes।

এর পরের ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া সিরিজকে ঘিরেই ‘অ্যাশেজ’ নামটি স্থায়ী হয়ে যায়। ১৮৮২-৮৩ মৌসুমে অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত সেই সিরিজে, ইংল্যান্ড তিনটি ম্যাচের মধ্যে দুটি জিতে সিরিজ ২-১ ব্যবধানে নিজেদের করে নেয়। ইংলিশ অধিনায়ক আইভো ব্লাই অস্ট্রেলিয়া সফর শেষে দেশে ফেরার সময় ‘The Ashes’ ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এরপর থেকেই অ্যাশেজ হয়ে উঠে দুই দেশের ক্রিকেটীয় মর্যাদার প্রতীক।

তবে অ্যাশেজের সঙ্গে যে ছোট্ট টেরাকোটা, urn বা ছাইদানি জড়িয়ে আছে, তার গল্পটিও বেশ আকর্ষণীয়। ১৮৮২-৮৩ সফরের পর মেলবোর্নের এক সামাজিক অনুষ্ঠানে আইভো ব্লাইকে একটি ছোট urn উপহার দেওয়া হয়। কথিত আছে, এতে একটি বেল পোড়ানোর ছাই রাখা হয়েছিল। এই ছোট্ট পাত্রটিই পরবর্তীকালে ‘অ্যাশেজ urn’ নামে কিংবদন্তি হয়ে ওঠে।

মজার ব্যাপার হলো, অ্যাশেজের আসল urn সাধারণত মাঠে বা বিজয়ী দলের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে দেওয়া হয় না। এটি বর্তমানে ইংল্যান্ডের মেরিলেবোন ক্রিকেট ক্লাবের (MCC) জাদুঘরে সংরক্ষিত। দুই দলের মধ্যে সিরিজ জয়ের প্রতীক হিসেবে এখন যে ট্রফি দেওয়া হয়, সেটি মূল urn-এর প্রতিরূপ।

সময়ের সঙ্গে অ্যাশেজ কেবল একটি ক্রিকেট সিরিজ থাকেনি; এটি হয়ে উঠেছে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটীয় সংস্কৃতির অংশ। কখনো ইংল্যান্ড আধিপত্য দেখিয়েছে, কখনো অস্ট্রেলিয়া। স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের যুগ থেকে শুরু করে শেন ওয়ার্ন, গ্লেন ম্যাকগ্রা, স্টিভ ওয়াহ, অ্যান্ড্রু ফ্লিনটফ, জেমস অ্যান্ডারসন কিংবা বেন স্টোকস— অসংখ্য কিংবদন্তির ক্যারিয়ারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অ্যাশেজের স্মৃতি।

বিশেষ করে ২০০৫ সালের অ্যাশেজ ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে আজও আলাদা করে মনে রাখা হয়। ইংল্যান্ডের মাটিতে অনুষ্ঠিত সেই সিরিজে দুই দলের লড়াই ছিল এতটাই তীব্র যে পুরো ক্রিকেট বিশ্ব তার দিকে তাকিয়ে ছিল। ইংল্যান্ড শেষ পর্যন্ত ২-১ ব্যবধানে সিরিজ জেতে। লর্ডস ও এজবাস্টনের নাটকীয়তা, ট্রেন্ট ব্রিজের রোমাঞ্চ— সব মিলিয়ে ২০০৫-এর অ্যাশেজ আধুনিক ক্রিকেটের অন্যতম স্মরণীয় সিরিজ হয়ে আছে।

২০১৩ সালে অস্ট্রেলিয়ান পেস বোলার মিচেল জনসন ৩৭ উইকেট নিয়ে ইংল্যান্ড দলকে একাই ধসিয়ে দিয়েছিলেন। তার বাউন্সারের ট্রমা থেকেই ইয়ান বেল, জোনাথন ট্রট, টিম ব্রেসনান-এর মতো তাবড় তাবড় খেলোয়াড়রা খেলা থেকেই অবসর নিয়ে নিয়েছিলেন সিরিজ শেষে! ভাবা যায়?

আবার, ২০১৯ সালের অ্যাশেজেও দেখা যায় একেবারে অন্যরকম নাটক। হেডিংলিতে, ইংল্যান্ডের বেন স্টোকস অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে অবিশ্বাস্য এক ইনিংস খেলে ম্যাচ জিতিয়ে দেন। ৩৬২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ইংল্যান্ড যখন প্রায় হেরে বসেছিল, তখন স্টোকসের ১৩৫ রানের অপরাজিত ইনিংস ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় প্রত্যাবর্তনের গল্প হয়ে যায়।

অ্যাশেজের সৌন্দর্য এখানেই। এটি শুধু কে কত রান করল বা কে কত উইকেট নিল, তার হিসাব নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ইতিহাস, জাতীয় গর্ব, পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা, দর্শকদের আবেগ এবং নতুন কিংবদন্তি তৈরির সম্ভাবনা।

একটি ছোট্ট পত্রিকার রসিকতা থেকে যে ‘ছাই’-এর গল্প শুরু হয়েছিল, সেটিই আজ ক্রিকেটের সবচেয়ে পরিচিত প্রতীকগুলোর একটি। ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া যখন আবার মাঠে নামে, তখন লড়াইটা শুধু একটি সিরিজের জন্য থাকে না। মাঠে ফিরে আসে ১৮৮২ সালের সেই ইতিহাস— যে ইতিহাসের ছাই আজও নিভে যায়নি। যা জ্বলছে প্রজন্মের পরে প্রজন্ম ধরে।

শিক্ষার্থী | পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
Facebook
Threads
LinkedIn
Telegram
X
Reddit
Email
WhatsApp