দৈবচয়িত ৪

প্রথম অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন
দ্বিতীয় অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন
তৃতীয় অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

চতুর্থ অধ্যায়
দ্বিতীয় সকাল

ফজরের আজান হচ্ছে। অরণ্য মনে মনে বলল, “মাশা’আল্লাহ, কী মধুর গলা।” ছোট বেলায় ও মাগরিবের আজান দিত বাড়িতে। ওর ছোটবোন ওর গলা শুনে ভেংচি কাটত, আর বলত, গরু আজান দিলেও নাকি এর চেয়ে ভাল শোনাবে। রাগে ওর গা জ্বলত। দীপাটা যে কী গাধার গাধা! গরু কি কথা বলতে পারে? গরু কেমন করে আজান দেবে?

উঠতে ইচ্ছে করছে না একদম। তারপরও উঠে পড়ল অরণ্য। এমন মধুর ডাককে অগ্রাহ্য করা অসম্ভব। উঠে ব্রাশ, পেস্ট, গামছা নিয়ে মেইন বিল্ডিং-এর দিকে রওনা দিল ও।  বিজয় ঘুমাচ্ছে – মনে হচ্ছে, ঘুমিয়েছে বেশিক্ষণ হয়নি। ইচ্ছে করেই জাগালনা ওকে। উপরতলায় এরকম জোরে আজান হচ্ছে, অথচ পুরো জিমের সবাই ঘুমাচ্ছে। কী আশ্চর্য!

বাইরে তখনো আবছা অন্ধকার। কাল রাতে জায়গাটা যেমন মুখর হয়েছিল ছাত্রদের আনাগোনায়, এখন সেটাই কেমন ভুতুড়ে। গার্ডেন লাইটগুলো না থাকলে পথ খুঁজে পেতেই কষ্ট হতো । গাছগাছালির ডালপালা লতাপাতা ভেদ করে ল্যাম্পপোস্ট থেকে আলো এসে পড়ছে পথে। সে আলোয় গা-ছমছম রহস্যাবৃত এই ভোরে ও আস্তে আস্তে এগিয়ে যায় ফজলুল হক হলের প্রধান ভবনের দিকে। নির্জন পথে হাঁটতে হাঁটতে ওর মজু কাকার কথা মনে পড়ল। মজু কাকা সুদের ব্যবসা করতেন। মানুষকে টাকা ধার দেয়া, আর তার উপর প্রতি বছর সুদ গোনা। কিন্তু মজু কাকার একটা গুণ ছিল, কোন ওয়াক্তের নামাজ জামাত ছাড়া আদায় করতে  তাকে দেখেনি কেউ। ভোরের আজান হবার পরপরই আর একটা গলা শুনতে পেত সবাই – “উঠেন, সবাই উঠেন! ফজরের নামাজের সময় হইছে! উঠেন, সবাই উঠেন! ফজরের নামাজের সময় হইছে!” তার বাড়ি থেকে মসজিদ, প্রায় মাইল খানেক দূর। পুরো পথটায় এই সাতটা শব্দ সুর করে বলতে থাকতেন। ষষ্ঠ শ্রেণিতে অরণ্য যেবার পৌনঃপুনিক শিখল, তখন ও ভেবেছিল মজু চাচাকে এটা শিখিয়ে দিলে কেমন হয়? তিনি উনার বাসা থেকে বের হবেন, একবার বলবেন “উঠেন, সবাই উঠেন! ফজরের নামাজের সময় হইছে!” তার পরে জুড়ে দেবেন ‘পৌনঃপুনিক’। তাহলে মসজিদ পর্যন্ত উনাকে আর কষ্ট করে বার বার বলতে হত না। কথাটা মনে পড়ে ওর হাসি পেল। “তওবা!” শব্দটা নিজের অজান্তেই মুখ থেকে বেরিয়ে এল।    

একটা জিনিস মাথায় আসলে আর যেতে চায় না। আচ্ছা, সুদের ব্যবসা আর নামাজ, দুটো এক সঙ্গে কেমন করে যায়? সুদ খাওয়া হারাম। তাহলে ব্যাপারটা কি এরকম যে সুদ খেয়ে যে গুনাহ হচ্ছে, নামাজ পড়ে তার জন্যে মাফ চাওয়া হচ্ছে আল্লাহর কাছে? না এমন যে, নামাজ পড়ার হুকুম রয়েছে, সুদ না খাওয়ারও হুকুম রয়েছে, এত হুকুমের মধ্যে যে যেটা পারছে সেটা করছে? মজু কাকার সুদের পাপ, আর মানুষকে নামাজে আহবানের পূণ্য, দুয়ে কি কাটাকাটি হবে? নাহ। মাথা কাজ করছে না। ধর্মে পড়াশুনা কম করলে যা হয়!

অজু করে এসে অরণ্য দেখল, বেশিরভাগ টংয়েই সবাই বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। বিজয়ও। ইচ্ছে করেই বিজয়কে জাগালনা অরণ্য। নামাজের সময় আছে, চাইলে পরে উঠে পড়তে পারে। সন্তর্পণে পাঞ্জাবি বের করল ব্যাগ থেকে। গেঞ্জির উপর সেটা চড়িয়ে ফজর পড়তে চলে গেল ও।

ফিরে আসতেই দেখল বিজয় জেগে উঠেছে।

-আমাকে ডাকলিনা যে? নামাজ পড়ে আসছিস?

-জ্বী। আপনে ঘুমাচ্ছিলেন। ভাবলাম, রাতে ঘুম হয় নি।

-আচ্ছা, এখন কি একটু ঘুমাবি?

-জ্বী না। এখন আর ঘুম আসবে না।

-তাহলে একটু পড়াশুনা কর। আমি মুখ হাত ধুয়ে আসি।

বিজয় যেতে না যেতেই মহিন ঢুকল।

-কী অর্ণি, ঘুম হলো ভাল?

-জ্বী।

-বিজু কই?

-মুখ ধুতে গেছে।

-ও, আচ্ছা। তুমি রেডি পরীক্ষার জন্যে?

-আল্লায় জানে।

-আল্লাহ তো জানবে, কিন্তু তোমার প্রিপারেচন তো তুমিও জানবা, নাকি?

-জ্বী।

-আচ্ছা, তুমি পড় এখন। বিজু আসলে নাস্তা করতে যাব একসাথে। 

ক্যান্টিনে নাশতা করতে এসে পরপর দু কাপ চা খেল অরণ্য। রাতে ঘুম না হবার রেশটা যায়নি। মাথাটা অসম্ভব ভারী হয়ে আছে। বেশ ভোগাবে মনে হচ্ছে। পরীক্ষাটা ঠিকমত দিতে পারলে হয়।

কাল রাতের জিমের গল্প সবার মুখে মুখে। মহিন বলল, এই বিজু, কাইলগা রাইতকা কী ছে রে?

-কিয়া আর? ফারুইকক্যার হোলাহাইন আই বিলু ভাই’র ল্যাপ তোষক বেজ্ঞিন হালাই দি আর এগ্যা হোলারে উডাই দি গেছে।

-হেতেনরে বোলে মাইচ্ছে-অ?

-না, মারে ন’। সোহাইগগ্যা চুল ধরি টাইনসে খালি।

অরণ্যর দিকে তাকিয়ে মহিন বলল, ভয় পেয়েছিলে?

যদিও অরণ্য অনেক ভয় পেয়ে গিয়েছিল, বলল, জ্বী, একটু।

-শুন, ভয়ের কিছু নাই। আমাদেরকে কিছু বলবে না। যত গুন্ডামি করুক, হাবিব ভাইএর উপরে কথা বলবে না। আর বিলু ভাই ও! ছয় মাস হইছে পরীক্ষা শেচ হইছে, এখনো কিছু খুঁইজা পায় নাই। অন কোনাই গেছে হ্যাতে?

শেষের প্রশ্নটা বিজয়কে। বিজয় উত্তর দেয়, নাসির‍্যা কইছে কোনাই জানি লই যাইবো। কীজানি, কইত্যাম হাইত্যান ন। তুই কি খুব টেনশন করছিস পরীক্ষা নিয়ে?

-না, ভাইয়া। মাথা ধরে আছে।

-ওষুধ খাবি?

-না, আমি ওষুধ খেতে চাইনা।

-বেশি ধরলে প্যারাসিটামল খা। নইলে আবার পরীক্ষার হলে গিয়া অসুবিধা হবে।

-আচ্ছা দেখি।

-শোন, তুই তো ভাল ছাত্র। পরীক্ষা নিয়া টেনশন করিস না। কপালে থাকলে টিকবি, নইলে না।

এতক্ষণ মহিন চুপ করে শুনছিল। এবার খাওয়া থেকে মুখ তুলে বলল, তুই কি হাগল অইছত্তি! (অরণ্যর দিকে তাকিয়ে) ও টিকবে না, মানে কী? ও কি তোর মত খারাপ ছাত্র নাকি?

-হাগল আঁই, না তুই? তুই ওরে এত প্রেসার দিবার কোন দরকার আছে নি?

-আঁই কি ভুল কিছু কইছি নি? তোর মত গাধা যদি ঢাকা ইনভার্সিটির ফিজিক্সএ মাষ্টার্সে চানচ হাইতো হারে, তাইলে…

-তুই বেশি কতা কস। 

অরণ্য হাসে। বিজয় আর মহিন ভাইয়ার কথোপকথন ওর বেশ লাগে। মাথাটা হাল্কা হয়ে আসে।

———

বিজয় আর অরণ্যর সঙ্গে জিম পর্যন্ত এসে মহিন বলল, আমি আসছি, আমাকে রেখে যাবি না। পকেটে হাত দিয়ে দেখল, আঠারটা আধুলি আছে। কাল চানখারপুল থেকে ফেরার পথে টাকা ভাঙ্গিয়ে আধুলি করে নিয়ে এসেছে। কমপক্ষে চার মিনিট কথা বলা যাবে। ঢাকার বাইরে বলে বেশি টাকা লাগে। ঢাকায় হলে এক আধুলিতেই তিন মিনিট কথা বলা যেত।  অবশ্য  চার মিনিট কথা বলার মত কিছু নেই।

মেইন বিল্ডিং-এ হাউজ টিউটরদের বাসার নিচতলায় কয়েনবক্স। দেয়ালের সঙ্গে লাগানো একটা ইস্পাত বা লোহার সবুজ রঙের বাক্স। উপরের দিকে ডায়াল ঘোরানোর জন্য নম্বর গুলো, আর পাশে একটা রিসিভার। ডায়ালের পাশেই একটা ছোট চিকন লম্বা ফুটো। মহিন রিসিভার তুলে আধুলিটাকে ছোট ফুটো দিয়ে গলিয়ে দিতেই ডায়াল-টোন বেজে ওঠে। নম্বর ঘোরাতেই ওপার থেকে শব্দ শোনা যায় সামাদ সাহেবের।

-হ্যালো, হ্যালো।

-মা’কে দাও।

-কেমন আছিস তুই?

-মা’কে দাও।

-কেন, আমার সাথে কথা বলতে পারিস না?

-মা’কে দাও। আমার কয়েন শেষ হয়ে যাচ্ছে।

-কয়েন শেষ হয়ে যাচ্ছে? সেই কয়েন কোথা থেকে আসল, শুনি? এক টাকা রোজগার করার মুরোদ নেই আবার দেমাগ দেখায়? বাপের সাথে কথা বলতে ঘেন্না লাগে? আসছ কোত্থেকে শুনি?

চিৎকারগুলো মহিনের এক কানে ঢুকে আর এক কান দিয়ে বেরিয়ে গেল। তার ভেতর দিয়েই সে শুনল, রৌশন খালা বলছেন, আপা ফোন চাচ্ছেন।

-চাইবেই তো! ও-ই তো এই পোলারে লাই দিয়া দিয়া নষ্ট করছে! এখন পোলায় আর মায়ে জোট হইছে। আমি তো শত্রু। সারা জীবন তো শত্রুর জন্য খাটলাম। যা নিয়া যা!

প্রায় ছোঁড়ার মত করেই ফোনটা রৌশন খালাকে দিলেন সামাদ সাহেব। কিন্তু তার চিৎকার বন্ধ হয় না।   

-সবগুলা জাহান্নামে যা। মাস শেষ না হতেই টাকা দাও। তো আমার উপর যদি এতই ঘেন্না, তো আমার টাকায় তোমাদের ঘেন্না হয় না? সেটা তো ঠিকই খাচ্ছ!

মহিন বুঝতে পারে না, ওর বাবার যত রাগারাগি, একতরফা চিৎকার, সব ওর সঙ্গে ফোনে। সামনাসামনি ওর সঙ্গে কথাই বলতে পারে না। উঁচুস্বরে দূরে থাক, এমনিই কথা বলতে পারে না। অপরাধীদের এই একটা ব্যাপার। এরা ভেতরে ভেতরে খুবই দূর্বল। সৎ মানুষের চোখের দিকে তাকাতে এদের ভয়। বিশেষ করে যে মানুষ জেনে গেছে তাদের অপরাধের কথা। এমন আচরণ করতে থাকে যেন চোখের দিকে তাকালেই ভস্ম হয়ে যাবে। মহিনের মনে পড়ে ও কোন একটা ফিকশনে পড়েছিল, একটা ডাইনির চোখের দিকে যখন ভাল মানুষরা তাকায়, তখন ডাইনিটা ওদের মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। এখানে উলটো। ওর মনে হয় বাবা ওর চোখের দিকে তাকায় না, কারণ চোখের দিকে তাকলেই বুঝি তার সব শেষ হয়ে যাবে। 

মহিনের সঙ্গে ওর বাবার এই করলা-তেতো সম্পর্কের ব্যাপারটা বেশিদিনের না। অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে তখন মহিন। বাড়ি গিয়েছিল এরশাদ ভ্যাকেশনে। বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে সময় কেটে যাচ্ছিল দিব্যি। সেদিনও ইসলামিয়া মাদ্রাসার মাঠে জমপেশ আড্ডা দিয়েছিল ওরা কয়েকজন। আসর শেষ করে যে যার বাসায় চলে গেছে। মাগরিব হতে তখনো অনেক বাকি। ইসলামিয়া মাদ্রাসার ক্যাম্পাসটি ভয়ানক সুন্দর। এজন্যে কখনো আড্ডা দিতে চাইলে ওরা এখানে চলে আসে। মাদ্রাসাটার বড় আকর্ষণ হচ্ছে শতবর্ষী আকর্ষণীয় দীঘিটা। বিশাল বড় দীঘিটার উত্তর পাড়ে মাদ্রাসার ক্যাম্পাস আর পূর্ব প্রান্তে সর্বসাধারণের ব্যবহারের জন্যে সুরকি দিয়ে তৈরি  পাকা ঘাট। এরকম পুরোনো দীঘিগুলোর ঘাটের দুপাশে সাধারণত সুন্দর করে দুটো পাকা হেলানো বেঞ্চ থাকে। সে বেঞ্চগুলোর একটাতে বসে বিকেলবেলার ম্লান আলোয় রুমার কথা ভাবছিল মহিন। তখনো রুমাকে বলা হয়নি মনের দলাপাকা কথাগুলো। বলা হয়নি ও রুমাকে দেখতে পায় ঘুমের ঘোরে, ঘুম ভেঙ্গে, এবং ঘুমাতে গিয়ে। ও রুমাকে দেখতে পায় মায়ের পাশে – রান্নাঘরে, ঘরের পেছনের পুকুরঘাটে, বরইতলায়। বলা হয়নি রুমা খুনসুটি করে বেড়ায় রিকশায় পাশে বসে, ওদের বারান্দার ব্যালকনিতে, কী সকালের চায়ের টেবিলে।  কখন মনে পড়েনা? কী মুদির দোকানে ঝুলানো লজেন্স র‍্যাপারে, কী লড কার্জনের পরীক্ষার হলে কঠিন সমীকরণ সমাধানে…।  

মহিনের ভাবনার জাল ছিঁড়ে আচমকা এক বয়োবৃদ্ধ লোক এসে মহিনের পা জড়িয়ে ধরে হাউ মাউ কান্না শুরু করে দেয়।

-আব্বা আঁরে বাঁচান। আমনে-এ খালি আঁরে বাঁচাইতেন হাইরবেন।

-আরে আরে, করেন কী? পা ছাড়েন, পা ছাড়েন বলছি!

-আব্বা ন’, আম্নে কন আগে, আমনে আঁরে বাঁচাইবেন।

মহিন কোনমতে বুড়ো লোকটার হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করে উঠে দাঁড়ায়। ভদ্রলোক আবার ঝুঁকে পড়ে মহিনের পা ধরতে যান। মহিন এবার দু’হাত দিয়ে লোকটার দু’হাত ধরে টেনে তোলে।  কৃশকায় লোকটার দুচোখে পানি। সাদা পাঞ্জাবির পরতে পরতে দারিদ্র্যের তালি। দু’চোয়ালের গর্ত জানান দিচ্ছে মাত্রা ছাড়ানো পুষ্টিহীনতার। কিন্তু দেখে ভিক্ষুকও মনে হচ্ছে না।

-আচ্ছা, আচ্ছা, দাঁড়ান। বলুন,  কী হয়েছে? আচ্ছা ঠিক আছে, পাশে বসেন।

লোকটা আস্তে আস্তে কোন রকমে বেঞ্চে উঠে বসল। মহিনের কাছ থেকে একটু দূরত্ব নিয়েই বসল। তারপর পাঞ্জাবির কোণে চোখ মুছে লোকটা বলতে শুরু করল।

সোনাপুর থেকে মাইল দেড়েক পূর্বদিকে মতিপুর এলাকায় লোকটার বাস। সম্পদ বলতে বউ, তিন মেয়ে, স্ত্রীর পোষা হাঁস-মুরগি, নিজের একটা গাই গরু, বাবার ভিটা আর তার চৌহদ্দিতে থাকা আধা কানি ফসলী জমি। ফসলী জমিতে তিন ধাপে শীতকালীন সবজি, আমন, আর আউশ চাষ করে ভালই যাচ্ছিল ওদের। দু’ মৌসুমে যে ধান পেত জমি থেকে তাতে বছর চলে যেত এক-আধাবেলা খেয়ে। শীতের সময়ের উপরি সবজি, গরুর দুধ, আর হাঁসমুরগির ডিম সোনাপুর বাজারে বেচে কিছু আয় হত। তা জমিয়ে দু’তিন ঈদ পর পর কাপড় কিনে দিত বউ আর মেয়েদের। উপরওয়ালা ভালই রেখেছিলেন।

কিন্তু সবকিছু উলট-পালট করে দিল উড়ির চরের ঝড়। যে ঝড়ে উড়ির চরে হাজারে হাজারে মানুষ মরল, সে ঝড়ে উড়ে গেল মতিপুরের অর্ধেক ঘরবাড়ি। লোকটার ঘরটায় পড়ে রইল কয়টা খুঁটি। চৌকিটাকে একটা খুঁটির সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে তার নিচে ওরা পাঁচজন কুন্ডলী পাকিয়ে রাতটা পার করেছিল কাদা-পানিতে একাকার হয়ে। সারা রাত ধরে উপরওয়ালাকে ডেকেছিল ওরা। বার বার মনে হয়েছিল, এই বুঝি সব গেল, এই বুঝি সব গেল। কিন্তু সব গেলনা, আবার গেলও।

সরকারের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা বলতে পাওয়া গেল দুই বান (আট প্রস্থ) ঢেউটিন। সারা গ্রামের একই অবস্থা। কেউ যে কারো পাশে গিয়ে দাঁড়াবে, তার উপায় নেই। এমন সময়ে ফেরেশতার মত তাদের উঠানে এসে দাঁড়াল গোফরান মৃধা। গোফরান মৃধা সবাইকে বলল জমির দলিলটা নিয়ে সোনাপুরের উত্তরা ব্যাঙ্কে যেতে। সরকারের নির্দেশে ব্যাঙ্ক সহজ শর্তে ঋণ দিচ্ছে।  উপায়ান্তর না পেয়ে একদিন জমির দলিল নিয়ে লোকটা হাজির হয় সামাদ সাহেবের অফিসে।

এ পর্যন্ত বলে লোকটা একটা দীর্ঘশ্বাস নেয়। বলে, বুইজছেন্নি আব্বা, তুফ্যানে যেই জিনিস নিতো হারে ন, হেই জিনিস অন লই গেছে আম্নের আব্বা। হিরিস্তা মনে কইচ্ছিলাম যেই গফরান সাবেরে, হ্যতে আসলে হুরা শতান আছিল।

সামাদ সাহেব লোকটার কাছ থেকে কয়েক জায়গায় টিপসই নেন। তারপর জমির দলিলটি রেখে দশ হাজার টাকা ওর হাতে দিয়ে বলেন, আগামী তিন মাস কোন টাকা দিতে হবে না কিন্তু তার পর থেকে মাসে পাঁচশ টাকা করে তিন বছর ধরে দিতে হবে। শেষ কিস্তির টাকা দিলে দলিল ফেরত পাবে।

-আব্বাগো, হেইসুমে যদি বুইঝতাম আঁই কিয়ের ভিত্তে হড়িয়ের, তাইলে আঁই গাছের নিচে থাইকতাম মাইয়াগুণরে লই।

ব্যাঙ্কের টাকায় লোকটার বাড়িতে ঘর উঠল আবার। ভেবেছিল, জমির ফসল বিক্রি করে একটু একটু করে টাকা শোধ করবে। কিন্তু ঝড়ের সময় মতিপুরের খালের বালি উঠে এসেছিল জমিতে। সে জমিতে আর ফসল হয়না। লোকটা দিনমজুরি শুরু করল। লোকটার স্ত্রী একটু দূরে শ্রীপুরের এ বাড়ি, সে বাড়ি কাজ করে খাবার জোগাড় করে।

-মাস হারই হাঁসশ টিঁয়া যোগার করন কি এত হস্তা? আমনে কন? আর বদিল্লার কাম, দিনে বার টিঁয়ার উপরে ক্যা দিতো চা না। আর ব্যাক দিন ত কাম হান অ যা’না।

দু’শো টাকা হাতে নিয়ে লোকটা তিনমাস পর সামাদ সাহেবের অফিসে হাজির হয়। সামাদ সাহেব টাকা নিতে অস্বীকৃতি জানান। বলেন, নিয়ম নাই। লোকটাকে বলেন পুরো টাকা নিয়ে আসতে। লোকটা আর আসে না। দুই মাস পর, পাঁচশ টাকা নিয়ে এলে সামাদ সাহেব বলেন এক হাজার টাকা নিয়ে আসতে।  মাস যায়, আর লোকটার হিসাব আর সামাদ সাহেবের হিসাবের ফারাক বেড়েই চলে। তারপর একদিন নিলামে তার জমি বিক্রি হয়ে যায়। নিলামে স্থির হয় নতুন মালিক হিসেবে যৌথভাবে জমিটি কিনে নিয়েছেন মহব্বতপুরের আব্দুস সামাদ এবং ঠক্করের গোফরান মৃধা সাহেব।

-কাইল জমি রেষ্টরি করার তারিক দিছে। হেইটার লাই আমনের কাছে আইছি। আমনে আম্নের আব্বারে যদি এক্কানা বুঝাই কইতেন!  হেতেনের এত টিয়া হইস্যা, হেতেন আঁর এই ছোড জমি ইয়ান লই কিরবো?

সে রাতেই বাবার মুখোমুখি হয়েছিল মহিন।

-বাবা, ঠক্করের গোফরান মৃধাকে তুমি চেন?

-হ্যাঁ চিনবো না কেন? আমার অফিসে তো প্রায়ই আসে। কেন, বল তো?

-উনি কেন আসে তোমার অফিসে?

-মানে কী? বিভিন্ন কাজে আসে। জমি-জিরাত বন্ধকের ব্যাপারে আসে। কী হয়েছে আমাকে বল তো?

-আচ্ছা, কালকে কি তুমি মতিপুরের  সোবহান মিয়ার জমি তোমাদের নামে রেজিষ্ট্রি করতে যাচ্ছ?

-হ্যাঁ। কিন্তু তোকে কে বলল?

-বাবা, আমি শুনেছি। আর এও শুনেছি, কী কায়দায় তোমরা দুজন মিলে উনার জমিটা দখল করেছ।

-আমার কী করার আছে এখানে? জমি বন্ধক দিয়ে ঋণ নিয়েছে, ঋণ দিতে পারছেনা, তাই জমি নিলামে উঠেছে। আমি শুধু কিনেছি নিলামে।

-তুমি চাইলে কিন্তু উনার ঋণের মেয়াদ বাড়িয়ে উনার কিস্তিটা ছোট করে দিতে পারতে। কিন্তু তুমি ইচ্ছে করে করোনি, কারণ তুমি ওই জমি দখল করতে চেয়েছ।

-মহিন! বাবার সাথে কিভাবে কথা বলতে হয়, তা নিশ্চয়ই আমি তোমাকে শিখিয়েছি! (রাগ বেড়ে তুই থেকে তুমিতে রুপান্তর)

-জ্বী বাবা। আমি তো গলা নিচু করেই কথা বলছি।

-তাহলে তুমি আমাকে এগুলো কী বলছ? ইউনিভার্সিটিতে পড়ে ঘাড়ে মাথা গজিয়েছে, তাইনা? এজন্য আমি তোমাকে পড়তে পাঠিয়েছি ঢাকায়?

মহিনের এই স্বভাব। কিছুতেই বিরক্ত হয়না। এতে প্রতিপক্ষ রাগের মজাটা নিতে পারে না। মহিন আস্তে আস্তে বলল

-বাবা, তুমি কাল সোবহান মিয়ার জমির দলিলটা তাকে ফেরত দিয়ে দেবে। তার নামে যে লোন আছে সেটা তোমার একাউন্ট থেকে ব্যাঙ্কে দিয়ে দিও, প্লিজ। সোবহান মিয়াকে আমি বলব, ও মাসে দুশো টাকা করে তোমাকে ফেরত দিয়ে যাবে, যতদিন না পুরো টাকাটা শোধ হয়। খুব কি অসুবিধা হবে, বাবা?

মহিন এত আস্তে আস্তে নরম করে কথাগুলো বলাতেই কিনা, সামাদ সাহেবের স্বর নেমে এল খুব নিচে।

-তুই এসব কী বলছিস, মহিন?

-হ্যাঁ বাবা, আমি ঠিকই বলছি। তুমি যদি তা না কর, আমি এ বাড়িতে আর আসব না। আর হ্যাঁ, আমি এখন জানি, তোমার এ টাকাপয়সা-জমিজমার উৎসের মধ্যে পাপ আছে। কিন্তু সে পাপ মোচনের সুযোগ তোমার আছে কিনা আমি জানি না।

-তোদের জন্যেই তো সব।

-না, বাবা, তা না। তোমাকে লোভে ধরেছিল। আমার মনে হয় তুমি ব্যাঙ্কের ম্যানেজার হিসাবে যে টাকা পেতে, তা দিয়ে আমার ঢাকার পড়াশুনা আর তোমাদের থাকা খাওয়া অন্য দশজনের চেয়ে ভালই চালাতে পারতে। তাইনা?

সামাদ সাহেব চুপ করে রইলেন।

-যদি তাই হয়, তাহলে আমার পড়ার খরচটা দিও। বাকি সব কিছু, যদি পার, যাদের কাছ থেকে নিয়েছ, তাদের দিয়ে দিও।

বলে মহিন রুম থেকে বেরিয়ে যায়। দেয়ালের পাশে ছায়ার মত মায়ের অস্তিত্ব অনুভব করে। আয়েশা বেগম কখন থেকে যে দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে শুনছিলেন ওদের কথা, ওদের দুজনের কেউই খেয়াল করেনি তা।

মা ফোন ধরতেই মহিন সালাম দিয়ে শুরু করে।

-স্লামালেকুম, মা।

-ওয়ালাইকুম সালাম। কিরে বাবা, কেমন আছিস?

-জ্বী ভাল। মা, তুমি কেমন আছ?

-আছি, ভাল। একরকমই।

-মা, ওষুধ খাচ্ছ তো ঠিকমত?

-সেটা কী আর বলতে? রোশা না থাকলে যে আমার কী হত? রোশার জন্য মায়া লাগে রে।

-আচ্ছা, শুন, খালার কথা আর একদিন হবে। তোমার শরীর কেমন জানতে ফোন দিয়েচি।

-ভাল করেছিস। তোর কাছে টাকা-পয়সা আছে রে?

-জ্বী আছে। তবে মাসের শেষে একটু টান পড়তে পারে। বিজুর ছোট ভাই আসছে ভর্তি পরীক্ষা দিতে।

-বিজু কেমন আছে?

-আছে, ভাল আছে।

-টিউশনিটনি পাইছে?

-না, মা। বুয়েট আর অনার্চের ঠেলায় পিলুদের কেউ টুইশানি দেয় না।

-পরিচিত কেউ নাই? ধর নোয়াখালির কেউ, যারা ঢাকাতে থাকে?

-চেষ্টা করতেছি আমরা। দোয়া কইরো, মা।

-আচ্ছা, বাবা। শুন খাওয়া দাওয়া নিয়ে কষ্ট করবি না। টাকা লাগলে আমারে কল করিস। আর বিজুরে আমার দোয়া দিস। ওর ছোট ভাইয়ের নাম কী?

-অর্ণি।

-এটা আবার কেমন নাম? কেমন মেয়ে মেয়ে নাম।

-না মা, ওর নাম অরণ্য। ওকে আমরা অর্ণি ডাকি।

-আচ্ছা, ওকে আমার দোয়া দিস। আর এখানে আসলে আমার সঙ্গে দেখা করতে বলিস।

-আচ্ছা, মা।

রিসিভারটা ঝুলিয়ে রেখে মহিন কয়েনবক্সে হাত ভর করে দাঁড়িয়ে থাকে অনেকক্ষণ। মা’র সঙ্গে ফোনে কথা বললে বোঝাই যায় না মা কতটা কষ্টের ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন। কী হাসি-খুশি ভাব নিয়ে কথা বলেন। এই ভাল! কষ্টটা দেখতে হচ্ছেনা ওকে। এজন্য ও একবারও বাড়ি যাবার কথা তোলে না। বাবার সঙ্গে সেদিনের কথোপকথনের পর ঈদের সময় ছাড়া ও এ পর্যন্ত কখনো বাড়ি যায় নি। গতবারের এরশাদ ভ্যাকেশন কাটিয়েছিল বন্ধুর সঙ্গে শেওড়াপাড়ার মেসে।

——-

সকাল দশটায় ভর্তি পরীক্ষা শুরু। আড়াই ঘণ্টার পরীক্ষা। অরণ্যর পরীক্ষা পড়েছে উদয়ন বিদ্যালয়ে।

কালকের সেই ঢাউস প্যান্টটা নিচের দিকে ভাঁজ করে পরে নিয়েছে ও। উপরে একটা শার্ট। সেটাও মহা ঢিলে-ঢালা। গতবারে বিজয় যখন বাড়িতে গিয়েছিল, অরণ্য এটা রেখে দিয়েছিল ওর কাছ থেকে। দেখে মনে হচ্ছে “টাল কোম্পানি” থেকে কেউ নিয়ে এসেছে। অরণ্যদের এক আত্মীয় চট্টগ্রাম হকার্স মার্কেটে ব্যবসা করেন। সেখানে জাহাজে বিদেশ থেকে অনেক পুরোনো কাপড়-চোপড় আসে। আমেরিকা-কানাডা-ইউরোপে মানুষ যখন মারা যায়, তার কাপড়-চোপড় নাকি তারা দান করে দেয়, আর সেটাই তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে পাঠিয়ে দেয় ওরা। গ্রামে এ ধরনের কাপড়গুলোকে “টাল কোম্পানির মাল” বলে চালিয়ে দেয়া হয়। বছর দুয়েক আগে তার কাছ থেকে এই শার্টটি পেয়েছে বিজয়। বেগুনি রঙের জমিনের উপর রম্বসের মত আঁকিবুকি। দেখতে মন্দ না। কিন্তু উপরের দিকটা ভীষণ ঢোলা। বাড়ির পাশের এক বন্ধু প্রথম দিন দেখেই বলল – আরে, এটা তো মেয়েদের শার্ট! দেখিস না, উলটা দিকে বোতাম!

বিনে পয়সায় পাওয়া শার্ট – উলটা বোতাম কোন ব্যাপার না। আর কে-ই বা দেখতে আসছে? কাজ চললেই হল।

রিকশা পেতে দেরি হচ্ছিল বেশ – হাঁটতে হাঁটতে একেবারে শহীদুল্লাহ হল ছাড়িয়ে ঢাকা মেডিকেলের কোণে আসতে হয়েছে। মহিন লাফ দিয়ে উপরে উঠে বসল। গদিতে এক পাশে বিজয় আর আরেক পাশে অরণ্য। অরণ্য বলল,

-ভাই, আপনি এখানে বসেন।

-না অর্ণি, ওর উপরে বসতেই ভাল লাগে। ও নাকি বিভিন্ন জিনিস ভাল দেখতে পারে ওখান থেকে।

বলেই বিজয় হাসল। অরণ্য ঠিক বুঝতে পারলনা, বিজয় কী বোঝাতে চাইল। মহিন ধমক দিয়ে বলল, এই বিজু, তুই উল্টা-পাল্টা কথা বলবি না ছোট ভাইয়ের সামনে। আমিও কিন্তু হাটে হাড়ি ভাঙ্গব তাহলে।

রিকশা ঢাকা মেডিকেলের সামনে থেকে আস্তে আস্তে শহীদ মিনারের সামনে পৌঁছে গেল। এই সেই শহীদ মিনার। বইতে, পত্র-পত্রিকায় অসংখ্যবার ও ছবি দেখেছে এই শহীদ মিনারের। বাবার কাছে তো সেই ছোটবেলা থেকে অসংখ্যবার শুনেছে একুশে ফেব্রুয়ারীর গল্প। আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারী। আহা! ফেব্রুয়ারীর একুশ তারিখটা ওদের বাসায় অন্য রকম একটা দিন। সেদিন বাসার অনেক নিয়মই শিথিল। ভোর তিনটেয় বাবা উঠিয়ে দিতেন ঘুম থেকে। তারপর সেই অন্ধকারে খালি পায়ে হেঁটে হেঁটে বন্ধুদের সঙ্গে প্রভাত ফেরি। তারপর শহীদ মিনারের সামনে জমায়েত আর পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ। বাসায় ফিরতে ফিরতে দিন বয়ে গেলেও বাবার কোন অনুযোগ নেই। এই একটা ব্যাপার – দেশের কোন ভাল কিছুতে লোকটা সবকিছু ভুলে যায়। অরণ্যর মনে হয় ও যদি কখনো এসে বাবাকে বলত, “বাবা, আমি এরশাদকে খুন করে এসেছি”, বাবা নিশ্চয়ই বলতেন, “খুব ভাল করেছিস! কাজের কাজ হয়েছে একটা। এইবার যদি দেশটার কিছু হয়!”

বিজয় ওকে চিনিয়ে দিতে থাকে দুপাশের স্থাপনাগুলো। শহীদ মিনার, উলটো দিকের হলদে রঙের শিক্ষকদের কোয়ার্টার, জগন্নাথ হল, বুয়েটের আবাসিক ভবন গুলো পেরিয়ে ওরা উদয়ন বিদ্যালয়ে পৌঁছে যায়। অনেক মানুষজন আর রিকশার ভিড় গেটে। ভিড় পেরিয়ে সামনে গেটের কাছে চলে গেল ওরা তিনজন। গেটের মুখেই প্রবেশপত্র চেক করছেন একজন শিক্ষকগোছের কেউ। দেখেশুনে বললেন, তোমার পরীক্ষা তো এখানে না।

অরণ্যর মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ার মত অবস্থা। না, এ যে এখানে লেখা আছে, উদয়ন বিদ্যালয়! 

প্রায় একই সঙ্গে বিজয় আর মহিন বলে ওঠে, এখানে না মানে কী?

-হ্যাঁ, ঠিকই বলছি, এখানে না। প্রবেশপত্রে ঠিকই লেখা আছে। কিন্তু গত দু’দিন ধরে দেশের বড় বড় পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে নতুন করে আসন বিন্যাস দেয়া হয়েছে। এখানকার রোল নম্বর ৬৩০১-৬৯০০।

বিজয় ভীষণ রেগে গেল। সবার সামনেই অরণ্যকে ধমকাল।

– তুই এত পত্রিকা পড়িস, তুই দেখিস নাই?

অরণ্যর মনে হল ওর মাথা ঘুরাচ্ছে। ওর দু’কান লাল হয়ে উঠল। পুরো গা ঘামতে শুরু করল। পরশু থেকে অরণ্যর সঙ্গে সংবাদপত্রের যোগাযোগ বন্ধ। নোয়াখালি এক্সপ্রেসে উঠার পরে ভেবেছিল কিনবে, কিন্তু টাকার কথা ভেবে আর কেনা হয়নি। আর জিমে তো ও কোন পত্রিকা দেখেনি। কাজেই পড়ার সুযোগ হয়নি। তাহলে কি সব এখানেই শেষ? ভর্তি পরীক্ষাটা আর দেয়া হল না বোধ হয়। নিজের উপরে প্রচন্ড ঘৃণা হতে লাগল। গত দুদিন যে পত্রিকার পাতায় চোখ বোলানো হয়নি – সেটা মাত্র দুটো দিন। কালিতারা বাজারের হাসানের ডেকোরেটররের দোকান থেকে শুরু করে মোস্তফা ডাক্তারের দোকান – অন্তত পাঁচ রকমের সংবাদপত্র রাখে ওরা। প্রতিদিন সবগুলো পত্রিকা পড়ে ও বাড়ি ফিরে। দুটো দিন মিস করেছে। তাও ইচ্ছে করে নয়। তাতেই কি ওর জীবনের ভাগ্যলিপি বদলে যাবে এমন করে? দুদিন পত্রিকা পড়তে পারেনি বলে? পরীক্ষা দিয়ে না টেকাটা মেনে নেয়া যায়, কিন্তু পরীক্ষা না দিতে পারা? অরণ্য ধপ করে রাস্তায় পা দিয়ে বেঞ্চের মত উঁচু ফুটপাতের উপর বসে পড়ল।   

বিজয় নিজের মনে গজর গজর করতে থাকে, লেখে। হুঁহ। লেখা-লেখি করে উদ্ধার করে ফেলবে আমাদেরকে। সামান্য পত্রিকা পড়ে নিজের সিট কোথায় পড়ছে তা যেখানে জানতে পারে না, সেখানে উনি দুনিয়া উদ্ধার করবে!

-মহি, অন কিরুম ক’ চাই।

কিন্তু মহিনকে কোথাও দেখা গেল না। বিজয় গেটের শিক্ষকটাকে জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা আপনি বলতে পারবেন, আসন বিন্যাসের তালিকাটা কারো কাছে পাওয়া যাবে কিনা?

ভীড় বেড়ে গিয়েছে অনেক। ভদ্রলোকের কাছ থেকে কোন উত্তর পাওয়া গেলনা। এক এক করে অনেককে জিজ্ঞেস করল। কোন কোন অভিভাবক আজকের কাগজ নিয়ে পড়ছে। কাল বা পরশুর কাগজ কোথাও পাওয়া গেল না।

বিজয় অরণ্যকে বলল, তুই আমার সঙ্গে আয়। পলাশীর মোড়ে দোকানগুলোতে দেখি কালকের পত্রিকা মেলে কিনা। 

-মামা, চলেন। মহির বাচ্চা আবার কই গেল কে জানে! আশ্চর্য!

লাফ দিয়ে দুজনে উঠে পড়ল রিকশায়। রিকশা সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের গেটের কাছে আসতেই গেটের কাছাকাছি কোথাও থেকে মহিনের গলা শুনল।

-বিজু, এই বিজু। অর্ণি!

মহিন স্বভাবতই খুব নরম করে কথা বলে। ওর গলার স্বর যে এত চওড়া হতে পারে, ওদের দুজনের কারো ধারণাতেই সেটা ছিল না। একটা পত্রিকা হাতে পাইপের মত রোল বানিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে মহিন বের হচ্ছে সলিমুল্লাহ হল থেকে। যখনই শুনেছে পত্রিকায় আসন বিন্যাস আছে, ও কিছু না বলেই পত্রিকার সন্ধানে সলিমুল্লাহ হলের কমনরুমে চলে গিয়েছিল।

বিজয় রিকশা থামাল। হাঁফাতে হাঁফাতে মহিন এসে পড়ল কাছে। অরণ্য উপরে উঠে জায়গা করে দিল মহিনকে। মহিন হাঁফাচ্ছে। দম নিয়ে বলল, ওর কত, সাত হাজার একশ’ আটাচ না? আল্লাহর রহমত। বেশি দূর না। নীলক্ষেত হাই স্কুল।

রিকশায় উঠার পর থেকে অরণ্য মনে মনে আল্লাহ আল্লাহ জিকির করে যাচ্ছিল। বিজয় বিরক্তির সাথে দু একবার তাকিয়েও কিছু বলেনি। মহিনের বলা নম্বরটা হঠাৎ করে ওর মস্তিষ্ক সচল করে দিল। ও বলল, জ্বী ভাইয়া সাত হাজার একশ আটাশ।

-ঠিক করি চাইছত্তি? না আবার হিয়ানে যাই হিরি আইতো অইবো? অর্ণি, এডমিট কার্ড আর একবার দেখ।

– আঁই ভালা করিই দেখছি। তুই চা।   

বিজয় কব্জিতে হাত দিয়ে ঘড়িটাকে ঘুরিয়ে বলল, সাড়ে নটা বাজে। চলে যেতে পারব আমরা। অরণ্যর মনে হল, ও জীবন ফিরে পেয়েছে। মহিনের দিকে তাকিয়ে বলল, ভাই, আমি সরি। আপনাকে অনেক দৌড়াতে হল।

-আরে অর্ণি, বল কী তুমি? চল এখন আগে পরীক্ষার হলে পৌঁছি। পরীক্ষা দাও। আল্লাহ আল্লাহ করে টিকলে তখন এসব কিছুই কোন ব্যাপার না।

দশটা বাজার কিছুক্ষণ আগেই রিকশা পৌঁছে গেল পরীক্ষা কেন্দ্রে। অরণ্য ভিতরে ঢুকে গেল। উপরের দিকে তাকাল ও। কৃতজ্ঞতা প্রকাশে ক্ষণিকের জন্য চোখটা বন্ধ হয়ে এল অরণ্যর।

——

কমেন্ট করুন

ফজলুল বাসেত (পুরো নাম: আবদুশ শাকুর ফজলুল ওয়াহেদ) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষক ।

বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।

পরিসংখ্যান নিয়ে শিক্ষকতা ও গবেষণার পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশের পত্রিকায় অনিয়মিত কলাম লেখেন।

ফজলুল বাসেত

ফজলুল বাসেত (পুরো নাম: আবদুশ শাকুর ফজলুল ওয়াহেদ) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষক । বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন। পরিসংখ্যান নিয়ে শিক্ষকতা ও গবেষণার পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশের পত্রিকায় অনিয়মিত কলাম লেখেন।

Comments are closed.

0