দৈবচয়িত ২

প্রথম অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

দ্বিতীয় অধ্যায়
প্রথম দিন

এইখানে বলতে বিজয় যে জায়গাটাকে বুঝিয়েছে, সেটার নাম ফজলুল হক হল জিমনেসিয়াম। যদিও আক্ষরিক অর্থে জিমনেসিয়ামের কর্মকাণ্ড ওখানে হয়না, তবুও ব্রিটিশরা যেহেতু ওটাকে ওই কাজে বানিয়েছিল, সংক্ষেপে এটাকে সবাই “জিম” নামেই চেনে।

ছেলেরা ভর্তি হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ে, কিন্তু সে অনুপাতে আবাসিক হল তৈরি হচ্ছে না। ফজলুল হক হলের মেইন বিল্ডিং উপচিয়ে, এক্সটেনশনে ডাবলিং-ট্রিপলিং করেও জায়গা পাচ্ছে না থাকার। সামরিক শাসকদের মাথা মোটা হলেও নতুন নতুন আবাসিক হল হলে আন্দোলনের লোক আরো বাড়বে – এটা না বোঝার মত এতটা মোটা ছিল না। কাজেই উনাদের দাক্ষিণ্যটা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই কম ছিল।  

কিছু ছেলে মিলে হঠাৎ একদিন বাক্স-পেটরা-কম্বল নিয়ে খালি জিমটা দখল করে বসল। তারপর আস্তে আস্তে এলো টং, মশারি। ধীরে ধীরে পুরো জিমটার দেয়ালের সঙ্গে টং-গুলো সরকারি হাসপাতালের বেডের মত বসে গেল। মাঝের জায়গাটাও বাদ যায়নি। মাঝেও সারি করে বসে গেল কিছু টং। নোয়াখালী সরকারি হাসপাতালের জেনারেল ওয়ার্ডগুলোর এরকমই অবস্থা – পার্থক্য ওখানকার টং-গুলো রড দিয়ে তৈরি আর এখানকার-গুলো কাঠের।

একেকটা সিঙ্গেল টং-এর প্রত্যেকটিতে দুজনের আস্তানা। টং-এর চারকোণায় কাঠের লম্বা চারটা খুঁটি – মাথার দিকটার দুটোতে মশারি দলা করে রাখা। প্রত্যেক খুঁটিতেই হ্যাঙ্গারের মত জিনিস বেঁধে শার্ট, প্যান্ট এসব ঝুলানো। খুঁটিগুলো সব বিভিন্ন রকম তার আর রশি দিয়ে একে অপরের মাঝে বিরাট সেতুবন্ধন তৈরি করে রেখেছে। অনেকটা ফকিরাপুলের ইলেকট্রিক আর ক্যাবল লাইনগুলোর মত। পার্থক্য শুধু এগুলোর উপর ভেজা লুঙ্গি শার্ট এসব টেনে দেয়া শুকাবার জন্য।

কাগজে-কলমে শহীদুল্লাহ হলের সঙ্গে সম্পৃক্ত হলেও ওই টংগুলোর একটা দখল করে নিবাস গেড়েছে বিজয়। তার সঙ্গে ডাবলিং-এর সঙ্গী মহব্বতপুরের ম্যানেজারের ছেলে মহিন। মহিন  ভাইকে অরণ্য অনেকবার দেখেছে। ঈদের সময় বিজয়ের বন্ধু  হুদা ভাই সহ তারা অনেক বারই ওদের বাড়িতে এসেছেন।

পুরো জিমটার দিকে চোখ বুলিয়েই অরণ্য বুঝে যায় বিজয় কেন কোনদিন ওকে ঢাকায় নিয়ে আসতে চায়নি। নিজেরই যেখানে থাকার ঠিক নেই সেখানে ছোট ভাইকে এনে তার সামনে নিজের অসহায়ত্ব দেখানোর মধ্যে তো বাহাদুরির কিছু নেই। যতদিন ঠেকিয়ে রাখা যায়। ঠেকিয়ে রাখার দিন তাহলে আজকেই শেষ! অরণ্যর মনটা খারাপ হয়ে গেল বিজয়ের কথা ভেবে।

মহিনের ডাকে ফিরে তাকায় অরণ্য।

– কি অর্ণি, আসছ? কোন সমস্যা নাই। এই কদিন তুমি এখানে থাকবা। আমি দিনে একবার দুবার আসব গোচল করতে। এ ছাড়া আরা আমারে দেখবানা। আঙ্কেল-আন্টি ভাল আছে?

অরণ্যর একটু খটকা লাগে। বাসার কেউ ছাড়া অপরিচিতরা ওকে কখনো অর্ণি ডাকে না। বিজয় মনে হয় সবার সাথে ওকে অর্ণি বলেই পরিচিত করেছে। মহিন ভাই এর কথায় একটু হাসিও পেল – মহিন ভাই কিছু কিছু শব্দে কখনো কখনো ‘স’-কে ‘চ’ করে ফেলেন। 

– জ্বী, মহিন ভাই। সবাই ভাল আছে। আপনি ভাল আছেন?

– আমাদের আবার ভাল থাকা! দেখতেছই ত! কিন্তু তুমি কোন চিন্তা করবা না। ভাল কইরা ঠাইচা পড়। তারপর একটা ভাল কইরা ঘুম দিবা। ঘুমের সমস্যা হওয়া ঠিক না। সকালে উইঠা ভর্তি পরীক্ষা দিতে যাবা। তুমি জানি কীসে পরীক্ষা দিবা?

অরণ্য বুঝে উঠতে পারে না, মহিন ভাই কোন অঞ্চলের ভাষায় কথা বলছে। নোয়াখালীর ভাষা নিঃসন্দেহে না!

– ‘ক’-ইউনিট কালকে। ‘ঘ’ ইউনিট আগামী শুক্রবার।

অরণ্যকে রেখে বিজয় হুট করে উধাও হয়ে গিয়েছিল। হুড়মুড় করে ঢুকল। দুই হাতে নাশতা। পরটা, ভাজি আর ডাল। আর ড্যানিশের কাটা টিনের পটে চা। টং-এর কোনায় রাখতে রাখতে বিজয় হড়হড় করে বলে যায়।

– তুই এখনো এভাবে দাঁড়িয়ে আছিস? ব্যাগ রাখ। কাপড় পালটাইলে পালটা। গোসল করবি এখন? না করলে যা খালি হাত-মুখ ধুয়ে আয়। মহি, আঁই ক্লাসে যাইয়ের। তুই অর্ণিরে এক্কানা মেইন বিলডিং এর বাথরুমে লই যা।

– আইচ্ছা, তুই চিন্তা করিস না। আঁই হ্যাতারে বেগগিন দেকাই দিমু। আঁর ব্যানে কোন কেলাস নাই।

অরণ্য খেয়াল করল, বিজয় আর মহিন অবলীলায় নোয়াখালীর ভাষায় কথা বলছে নিজেদের মধ্যে। কিন্তু আবার যখন ওর সাথে কথা বলছে তখন শুদ্ধ ভাষা ব্যবহার করছে। এ বিষয়টা অরণ্য বা বিজয়ের কাছে নতুন নয়। বাসার ভেতরে বাবা কখনো নোয়াখালীর ভাষা বলতে দিতেননা। বাবা বলতেন, তুমি থাক নোয়াখালীতে, বাইরে গেলেই তোমাকে নোয়াখালীর ভাষা বলতে হবে। তাহলে তুমি শুদ্ধ বাংলা শিখবে কিভাবে? কাজেই অরণ্যর কথা শেখা থেকে গত সতের বছরে এ দ্বৈত সংস্কৃতিতে ও অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। এখানটায় উলটো হচ্ছে ব্যপারটা – বাইরে শুদ্ধ বাংলা, ভেতরে নোয়াখালী।

শার্টটা কোনরকমে গায়ে পেঁচিয়ে একটা পরটা হাতে নিয়ে কামড় দেয় বিজয়। গজর গজর করতে করতে বলতে থাকে –

– এই শফি চৌধুরী স্যারের মাথা খারাপ। সকাল সাড়ে আটটা ছাড়া সে ক্লাস নেয় না। মনে হয় বাড়িতে বউ-এর ঠ্যালা খায়, এ জন্যে ডিপার্টমেন্টে যত তাড়াতাড়ি আসতে পারে ততই তার সুবিধা। আর আমাদের বারটা!

অরণ্য ওর ব্যাগটা খুলে গামছা বের করছিল হাত-মুখ ধোবে বলে। বিজয়ের কথায় ও আর মহিন দুজনেই হেসে ফেলল।

বিজয় পরটা দিয়ে বাটি থেকে দলা করে ভাজি তুলে মুখে পোরে। তারপর টং-এর পাশে থাকা টেবিল-সদৃশ মাচাটার উপর থেকে একটা খাতা নিয়ে বেরিয়ে যায়।  

বিজয় বেরিয়ে যেতেই মহিন বলল, অর্ণি, চল তোমাকে মেইন বিল্ডিং এর গোচলখানা দেখায়া দেই। ব্রাশ টুথপেষ্ট নিয়া নাও। গামছা আছে? না থাকলে আমারটা নিতে পার। ওইখানে ঝুলানো আচে।

অরণ্য কখনো এ পর্যন্ত ব্রাশ দিয়ে দাঁত মাজেনি। তুষ-পোড়ানো ছাই-ই ছিল সই। না মেজেছে, বাড়িতে নিজ হাতে তৈরী নিমের ব্রাশ দিয়ে। মহিন ভাইকে সেটা কিভাবে বলবে বুঝতে উঠতে পারছিলনা। ও কখনো টুথব্রাশ ব্যবহার করেনি সেটার কারণ সেটা কেনার সামর্থ ওদের ছিলনা। সেটা গোপন করবার জন্যে নয়, বরং বিজয় মহিনের কাছে কিভাবে ওদের অবস্থা তুলে ধরে, সেটার সঙ্গে বেমানান কিছু বলে বিজয়কে খাট করে ফেলবে এই ভয় হচ্ছিল।

– ব্রাশ-পেষ্ট নিয়েছ?

– জ্বী, ব্রাশ-পেষ্ট নাই।

সত্য-মিথ্যার মাঝামাঝি একটা নিরপেক্ষ উত্তর দিল অরণ্য। নিরপেক্ষ হয়ত মানুষ হয়না, কিন্তু বাক্য হয়। মহিন ভাই কি বুঝল যে ওর জীবনে টুথব্রাশের আগমন ঘটেনি, না ধরে নিয়েছে যে সে বাড়ি থেকে আনতে ভুলে গেছে, তা অরণ্য বুঝতে পারলনা।

– আচ্ছা দাঁড়াও, আমি আসছি।

পাঁচ মিনিট যেতে না যেতেই মহিন ফিরে এল। হাতে একটা নতুন টুথব্রাশ। অরণ্যর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, নাও।

অরণ্য একটু আমতা আমতা করছিল। বাড়ী থেকে সারা জীবন শেখানো হয়েছে, অন্যের দেওয়া জিনিস নিতে নেই। মহিন কি বুঝল কে জানে, বলল, শুন আমি তোমার বড় ভাই। বিজু যদি দিত তুমি নিচ্চয়ই না করতে না? ওখানে টুথপেষ্ট আছে, নিয়ে নাও।

জিম থেকে বেরিয়ে হাতের বামে গেলেই মেইন বিল্ডিং। চোখজুড়ানো সবুজ গাছগাছালিতে ঘেরা ফজলুল হক হলের লাল রঙের তিনতলা প্রধান ভবন। কংক্রিটের সরু পথ চলে গেছে জিম থেকে প্রধান ভবনে। এতটা সুন্দর পরিপাটি পথ, পাশে পরিকল্পনামাফিক রঙিন ফুল আর বাহারি পাতার বাগান – এমনটা শুধু আজাদ প্রডাক্টসের ভিউকার্ডে বিলেতি ছবিতেই দেখেছে অরণ্য। পরক্ষণেই ভাবল – না ঠিক না। বাবার সঙ্গে সোনাপুরে এডিসির বাঙ্গলোয় যেবার গিয়েছিল – সেটাও এমন পরিচ্ছন্ন আর গুছানোই ছিল। ভবনটির প্রবেশপথে বিরাট লোহার দরজা। সে দরজার দুপাশে প্রধান ভবনের সঙ্গেই লাগোয়া দুটো দোতলা বাসা। মহিন ওকে সব চিনিয়ে দিচ্ছিল।

– এ দুপাশে দুটো বাসা হল হাউজ টিউটরদের। কাছে থাকলে সুবিধা। রাতে-বিরাতে গ্যাঞ্জাম হলে তাড়াতাড়ি রুমে চলে আচতে পারে।

অরণ্য চিন্তা করছে মহিন ভাই কখন স’কে চ বলে। একটা ছকে ফেলতে হবে। যেমন ঠিক কোন শব্দটি বলার পর তার এটা হয়। কোন বিশেষ বিশেষ শব্দে হয়, না এমনি কিছুক্ষণ কথা বলার পরপরই হয়। ভেবে বের করতে হবে।

লোহার দরজার এক পাশটা খোলা। সেটা গলে ভেতরে ঢুকে পড়ল ওরা দুজন।  ভেতরে একটি সুন্দর আয়তাকার সবুজ মাঠ। সে মাঠের তিন বাহুতে তিনতলা ভবন জুড়ে ছাত্রদের সব থাকার কক্ষগুলো। প্রবেশপথ আর হাউজ টিউটরদের বাসাগুলোর দখলে অন্য বাহুটি। বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই ভেতরে এমন সুন্দর পরিচ্ছন্ন সবুজ একটি মাঠ রয়েছে। মাঠের বুক চিরে একটা কংক্রিটের পথ চলে গেছে সোজা অন্য প্রান্তে, যেখানে ভবনের মূল সিঁড়িঘর। সেখানে গিয়ে মহিন বলল, অর্ণি, প্রত্যেক তলাতেই কর্নারে বাথরুম আছে। তুমি যে কোন তলায় যেতে পার। আমার কাছে নীচতলারটা একটু বেশী স্যাঁতস্যাঁতে লাগে, সেজন্যে আমি দোতলা বা তিনতলারগুলোতে যাই।

– চলেন তাহলে উপরেই যাই। 

– চল। এটা হল মেইন সিঁড়ি। এটা দিয়েও যেতে পার, আবার ওই দুই পাশে আরো দুটো সিঁড়ি আছে সেগুলো দিয়েও যাওয়া যায়।

সিঁড়ি বেয়ে ওরা উঠে যায় একেবারে তিনতলায়। কোণের বাথরুমে গিয়ে রীতিমত একটা ধাক্কা খায় অরণ্য।

বাথরুমটাকে একটা বড় রুম বলা চলে। বড় রুমটার চার দেয়াল ঘিরে চার রকমের আয়োজন। ভেতরের দিকের একটা দেয়াল ঘেষে সারি বেঁধে কয়েকটা বেসিন আর তাদের উপরে আয়না লাগানো। বাকি দুটো দেয়ালের একপাশে সারি দিয়ে ছোট ছোট আলাদা কক্ষের গোসলখানাগুলো, আর অন্য পাশে সারি দিয়ে টয়লেটের ছোট ছোট কক্ষগুলো। ভেতরের অপর দেয়ালের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে দাঁড়িয়ে মুত্রত্যাগ করার নিমিত্তে পাশাপাশি কয়েকটা ইউরেনাল। ইউরেনালের নীচের দিকের দেয়ালে হলুদাভ দাগ-মনে হয় গত কয়েক বছরে ওখানে কেউ হাত দেয়নি পরিষ্কার করতে। ও কখনো পত্রিকায় পড়েছে এগুলো সম্পর্কে। আচ্ছা ইউরেনাল এর বাংলা কি? মূত্রাধার? মূত্রপাত্র? পস্রাবথলী? নাহ, কোনটাই যুতসই মনে হচ্ছে না। ভেবে বের করতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশের একটা বাথরুমে এগুলো কেন? এখানে কারো সামনে দাঁড়িয়ে মূত্রত্যাগ তো রীতিমত একটা অসম্মানসুলভ আচরণ! ভেতরের টয়লেটে ঢুকে করলেই তো হয়।  

পুরো মেঝেটা ভিজে একাকার। বোঝার উপায় নেই পানি, না অন্য কিছু। ভাগ্যিস ও ওর স্যান্ডেল পরে এসেছিল। নইলে বাথরুমে ঢোকাই যেতনা। বাথরুমে ঢোকার আগ পর্যন্ত ওর মনে হচ্ছিল পুরো হলটা একটা ছবির মত। আসলে বাইরের চাকচিক্য আর সৌন্দর্য দিয়ে যে ভেতরটা পরিমাপ করা যায়না, ফজলুল হক হলের প্রধান ভবনের বাথরুমগুলো তার জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ।

মহিন আর ও নাশতা শেষ করল এক সঙ্গে। চা-টা ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছে। কিছু করার নেই, ঠাণ্ডা চা-ই দুজনে ভাগ করে খেল। খাওয়ার পর অরণ্য খেয়াল করল ওর দুচোখে রাজ্যের ঘুম। মনে হচ্ছে এমন ঘুম ওর জীবনে আগে আসেনি কখনো। নোয়াখালী এক্সপ্রেস-এ রাত্রিকালীণ ভ্রমণের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া! ওকে হাই তুলতে দেখে মহিন বলল, তুমি একটু ঘুমিয়ে নাও। আমি দুপুরে আসব। একসঙ্গে দুপুরের খাওয়া খাব। মহিনের কথা ওর কানে ঢুকেছে কি ঢুকেনি, ও একটা বালিশে মাথা দিয়ে বলল, একটু ঘুমাই। ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে যেতে যেতে শুনল মহিন ভাই ফিস ফিস করে কাউকে বলছে, জোসি, ও বিজুর ছোট ভাই অর্ণি। ভর্তি পরীক্ষা দিতে এচেছে। ঘুমাচ্ছে – দেখিস যেন ডিস্টার্ব না হয়।

কতক্ষণ ঘুমিয়েছিল অরণ্য জানেনা। হঠাত মনে হল বশির আহমেদের গানের আওয়াজ ভেসে আসছে কোথা থেকে – অনেক সাধের ময়না আমার বাঁধন কেটে যায়, মিছে তারে শিকল দিলাম রাঙ্গা দুটি পায়। একটু বোঝার চেষ্টা করল কোথা থেকে আসছে শব্দটা। সে চেষ্টা থেকে কিনা, দুচোখের পাতা আরা জোড়া লাগতে চাইল না। ভীষণ বিরক্তি নিয়ে ও উঠে বসল টং-এর উপর। এবার বুঝতে পারল গান বাজছে দু তিনটা টং পরে একটা টং-এ। যিনি বাজাচ্ছেন তার কোন দিকে ভ্রুক্ষেপ নেই।

অরণ্য ওর ব্যাগ খুলে একটা খাতা আর গনিতের স্থিতিবিদ্যা বইটি বের করে পড়তে বসে গেল। বশির আহমেদের গানটা এখন আর একেবারেই বিরক্তিকর লাগছে না। বরং মনে হচ্ছে আরো বেশি সময় ধরে বাজলে মন্দ হয় না। কিন্তু রেডিও বলে কথা। একটু পরেই ঘ্যানর ঘ্যানর করে বিজ্ঞাপন দেয়া শুরু করেছে – লাইফবয় যেখানে স্বাস্থ্য সেখানে, লাইফবয়! – তিব্বত সাবান পাঁচশ সত্তর, বিশুদ্ধ সাবান পাঁচশ সত্তর…। অন্ধকারে সূর্যশিখা নতুন দিগন্তের দিশারী – সানলাইট ব্যাটারি…।  বিজ্ঞাপনগুলো শুনে ওর হাসি পায়। লাইফবয় সাবান দিয়ে গোসল করুন – স্বাস্থ্যবান থাকবেন সারা জীবন। বিশুদ্ধ সাবান কি? বিশুদ্ধ পানি আছে, বিশুদ্ধ তেল আছে, সাবান বিশুদ্ধ কথাটার মানে কি? আর রেডিও বাংলাদেশ শুনলে মনে হবে সাবান, কনডম, আর জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি ছাড়া বাংলাদেশে আর কিছু তৈরি হয় না। এখন আবার বাজছে বাংলাদেশের নতুন জাতীয় সঙ্গীত – কি যাদু করিলা পিরিতি শিখাইলা থাকিতে পারিনা ঘরেতে। ওদিক থেকে মন সরিয়ে ও বইয়ের পাতায় মনোযোগ দিতে চেষ্টা করল। কালকের পরীক্ষার জন্য তৈরি হতে হবে।

চিৎকার শুনে ও বই থেকে মুখ তুলে তাকায়।

– হেই বিলু ভাই, আপনে নাকি সিট ছাড়েন নাই?

– শুন না, ইন্টারভিউ ত দিয়েই যাচ্ছি, কোন কিনারা হচ্ছে না। কই যাব বল তো?

– না ভাই, আপনেরে ত বলছিলাম গত সপ্তাহের মধ্যে সিট খালি করে দিতে। পোলাপান জ্বালাইতেছে। পরে দেখবেন মান সম্মান নিয়া যাইতে পারতেছেন না। তখন কিন্তু আমারে দোষ দিতে পারবেন না।

– শুন ভাই না আমার। আর দুটো, খালি দুটো সপ্তাহ সময় দাও আমাকে। এর মধ্যে কিছু না হলে তখন চলে যাব।

– ভাই, এইটা আমার ব্যাপার হইলে আমি কি আপনেরে না করতাম? পোলাপান পথে ঘাটে ঘুমাইতেছে। ওদের থাকার জায়গা নাই। আপনের ত ফাইনাল শেষ হইয়া গেছে ছয় মাস হইলো বইলা।

– সবই বুঝি ছোট ভাই। কিন্তু চাকরি একটা না হলে কি করি, বল। বাড়িতে মুখ দেখাতে পারছিনা।

তারপর খপ করে ছেলেটার হাত দুটো ধরে কাঁদো কাঁদো গলায় বিলু ভাই নামের ছেলেটা বলতে থাকে – খালি দু’টা সপ্তাহ ছোট ভাই। দু’টা মাত্র সপ্তাহ। তুমি ওদেরকে বুঝাও। তোমার কথা ওরা শুনবে।

– আচ্ছা আমি দেখব। কিন্তু কথা দিতে পারতেছি না!

বলে ছেলেটা যেভাবে তীরের বেগে এসেছিল, ঠিক সেভাবে জিম থেকে বের হয়ে যায়। অরণ্য বিলু নামের ছেলেটার দিকে তাকিয়ে দেখে। মেঝের দিকে স্থির তাকিয়ে ওর টং-এর উপর বসে আছে বিলু। বয়স বিজয়ের মতই হবে – এক কি দুই বেশি হতে পারে। মনে হচ্ছে চোখ দিয়ে এখনি পানি পড়বে। সে ভয়েই কিনা, বিলু শুয়ে পড়ে মুখ গুজে বালিশে। পুরুষ মানুষদের চোখের পানি ফেলতে নেই। অন্যদের দেখিয়ে তো নয়ই।

অরণ্যর পড়া শিকেয় উঠে। সেও অকারণে বালিশে শুয়ে পড়ে। উপরে ছাদ থেকে চুনকাম খসে পড়ছে – চোখের জন্য ১০ নম্বর বিপদসংকেত। পাশ ফিরতেই দূরে বিলুকে চোখে পড়ে। বিলুর অসহায়ত্বের একাধিক গল্প ওর মনে উঁকি দিয়ে যায়। গল্প?

বসতবাড়ী বন্ধক দিয়ে সাধের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া শেষ করেছে বিলু। ডিগ্রী মিলেছে, কিন্তু মেলেনি চাকরি। ডিগ্রীটা দিয়ে কি বসতবাড়ীটা ফেরত পাবে? অনেক  করে বাবাকে বলেছিল, “বাবা, দেখো, আমি পড়া শেষ করলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। চাকুরী পেয়ে প্রথমে নীলুর বিয়ে দেব। তারপর ঢাকায় একটা বাসা নিয়ে তোমাদের তুলব সেখানে। একটু একটু করে বসতবাড়ির ঋণ শোধ করব”।

সে স্বপ্নগুলোতে ক্যান্সার ধরা পড়েছে অনেকদিন হল। ক্যান্সারের ঔষধ কিমোথেরাপি। আর বিলুর ক্যান্সারের কিমোথেরাপি হল একটা চাকরি। দুটো পেতেই চাই টাকা। কিন্তু টাকা কোথায় পাবে ও? মৃত্তিকা বিজ্ঞানের ছেলেকে কেউ টিউশনি দেয় না। মৃত্তিকা বিজ্ঞানের ছেলেকে কেউ চাকরি দেয় না। যে দেশে টাকা দিলে সব বিল্ডিং এর অনুমোদন মেলে, যে দেশে কৃষকেরা উপরের দিকে চেয়ে থাকে গাছ লাগিয়ে, সে দেশে মৃত্তিকা বিজ্ঞান কেন পড়ানো হয় – মাবুদ আল্লাহ জানেন। বিসিএস-ই একমাত্র ভরসা। কিন্তু বিসিএস তো আর ছ’মাসে ন’মাসে হয় না!

বিজয়ের ডাকে ঘুম ভাঙ্গল।

-অর্ণি, এই অর্ণি, উঠ। অনেক বেলা হয়ে গেছে। ভাত খাবি না?  আগে যা গোসল করে আয়।

ফজলুল হক হলের ডাইনিং জিমের ঠিক উলটা দিকের দোতলা বিল্ডিং এর নীচতলায়। বিশাল লম্বা একটা হলঘরের মধ্যে দুপাশে দু’সারিতে অসঙ্খ্য টেবিল বিছানো। দেয়ালের এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত। প্রত্যেকটা টেবিলের চারদিকে চেয়ার পাতা। টেবিল আর চেয়ার সবগুলোকে দেখলে মনে হবে লোহা দিয়ে তৈরি। তবে টেবিলগুলো যে সে রকম কিছু সেটা বসেই টের পেল অরণ্য। তার আগে বিজয় ওকে কাউন্টারে নিয়ে গিয়েছে কিভাবে খাওয়া কিনতে হবে তা দেখাতে। পাঁচ টাকা দিয়ে একটা তরকারির বাটি কিনতে হয়। বাটিতে হয় একটা মাছের টুকরার সাথে কিছু তরকারি থাকবে অথবা থাকবে এক টুকরা গরুর (জনশ্রুতি আছে মহিষের) বা মুরগির মাংস ঝোল দিয়ে রান্না করা। সাথে একটা ছোট ভাজি বা ভর্তা। লাইন ধরে সবাই কাউন্টারের সামনে। কাউন্টারে টাকা দিলে ম্যানেজার একটা প্লেট হাতে দিচ্ছে। সে প্লেট পাশের কাউন্টারে ধরলে প্লেটের মধ্যে থপ করে একজন চামচ দিয়ে ভাজি বা ভর্তাটা বসিয়ে দিচ্ছে আর এগিয়ে দিচ্ছে একটা তরকারির বাটি। ভাত আর ডাল ফ্রি। সেটা টেবিলেই দেয়া আছে। যে যত খেতে পারে। সিস্টেমটা অরণ্যর খুব পছন্দ হল।

হাতে প্লেট আর বাটি নিয়ে বিজয়, মহিন, আর অরণ্য খালি তিনটি চেয়ার দখল করে বসল। অরণ্য আর মহিন পাশাপাশি, বিজয় টেবিলের উলটো দিকে। অরণ্যর জন্য সেটা ভালই হল। যদিও বিজয় ওর সঙ্গে আসার পর থেকেই বন্ধুর মত আচরণ করছে, কিন্তু ওর ভয় পুরোটা কাটছেনা। সময় লাগবে। আঠার বছরের অভ্যাস কি আর এক সকালেই যায়?

আজকের মেনু রুই মাছ, আর পটল ভাজি। পাঁচ টাকায় রুই মাছ আর পটল ভাজি। বাংলাদেশে মনে হয় এই একটা জায়গায় এ দামে এমন মেনু দিয়ে দুপুরের খাবার মিলবে। নোয়াখালী এক্সপ্রেসে রাতে দুইটা কলা আর এক প্যাকেট আলামিনের গ্লুকোজ বিস্কুট কিনতেই তো তিনটা টাকা নিয়ে গিয়েছিল। এ নিয়ে একটা ফিচার লেখা যায়। বিজয় ভাতের বড় বাটিটা অরণ্যর দিকে ঠেলে দিয়ে বলে, নে একবারে বেশি করে নিয়ে নে। আবার ফিরে আসতে দেরি হতে পারে।

মহিন অরণ্যর পাতে ভাত তুলে দিতে থাকে। অরণ্য না করার পরেও আরো দু’চামচ জোটে ওর ভাগে। ভাত পাতে তুলে ভাজি দিয়ে মেখে মুখে তোলে বিজয়। দেখাদেখি অরণ্যও তাই করে।

– কি বিজয় ভাইয়া, এইটা ছোট ভাই নাকি?

– হ্যাঁ, কেমনে বুঝলা?

– আরে ভাই আপনাদের চেহারা দেখলে যে কেউ বুঝবে।

– হ্যাঁ, ও ভর্তি পরীক্ষা দিবে। কালকে ক আর আগামী সপ্তাহে ঘ।

– তো ছোট ভাই কেমন আছ? কি নাম?

– জ্বী, অরণ্য। আপনি ভাল আছেন?

– অরণ্য! বেশ সুন্দর নাম তো! বিজয় ভাই, আপনের আব্বা এত সুন্দর সুন্দর নাম কেমন করে রাখছে? আমার বাচ্চা-কাচ্চা হলে আমি উনার কাছে নাম খুজব।

– আচ্ছা, বাবাকে বলব! তো তোমার সব কিছু ভাল? হলের বাইরে বেরোতে পার ত? পুলিশ কিছু বলে টলে?

– না ভাই, কিছুদিন ভাল আছি। ডিস্টার্ব করতেছে না। ঠিক আছে আপনারা খান। মহি ভাই দেখি একদম চুপ। (অরণ্যর দিকে তাকিয়ে) কি বললা জানি নাম, অরণ্য? শুন ভাইয়া (বিজয়ের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে) আমার বড় ভাই, সে হিসাবে তুমি আমার ছোট ভাই। কিছু লাগলে বলবা। আমি মেইন বিলডিং এ থাকি। ভাইয়া জানে কোথায়।

– ভাল থেকো হাবিব! আবার জানি চৌদ্দ শিকের মধ্যে ঢুইকো না।

– দোয়া রাইখেন ভাইয়া।

ছেলেটি চলে যাওয়ার পর বিজয় ওর পরিচয় দেয়।

ওর নাম হাবিব। হাবিব ছাত্রদলের ফজলুল হক হল শাখার নেতাগোছের কেউ। লোকজন ওকে খুব পছন্দ করে। মানুষের সঙ্গে ভদ্র ব্যবহার ওর স্বভাবের মধ্যে। কারো জন্য কিছু করতে পারলে ও খুশি হয়। অন্য অনেক ছাত্রনেতা যেমন ক্যান্টিন ডাইনিং এ ফাও খায়, ও কেয়ারই করে না! আমার কোন সমস্যা হলে আমি ওকে গিয়ে বলি। আজ পর্যন্ত একদিনও আমাকে জিজ্ঞেস করেনি, আমি কোন দল করি কিনা, বা আমি কখনো ওদের মিছিলে গিয়েছি কিনা। মাঝে কয়েকবার পুলিশ ধরেছিল। ধরে, আবার ছাড়ে। আন্দোলন একটু বাড়লে ধরে নিয়ে যায়। আবার কমলে ছেড়ে দেয়।

অরণ্য খাচ্ছে। ভাজি শেষ করে বাটি থেকে তরকারিটা ঢেলে নিল পাতে। কুমড়োর তরকারি। মাছের টুকরোটাকে অনেক কষ্টে খুঁজে বের করা গেল। আচ্ছা, মাছ না হয় ফাঁকিবাজি করে ছোট দেবে, তাই বলে কুমড়ো দিয়ে কেউ রুই মাছ রান্না করে?

ভাতগুলো শক্ত লাগছে খুব। মহিন ভাই জানি কেমন করে সব বুঝে ফেলেন। 

– শুন অর্ণি, আমি তোমারে একটা ট্রিক দেখাই। ওই যে ডাইলের তাগারি (বড় কাঁসা বা এলুমিনিয়ামের বাটি) দেখতেচ? ওই খান থেকে দুই টগবা ডাইল নিবা। নিয়া এই যে এরকম কঠিন করে কচলাবা। তারপর ফুরুত ফুরুত করে পেটের ভেতর ঢুকায়ে ফেলবা। এই ভাই, ডালটা একটু এদিকে দেন তো!

ডালের বাটি কয়েক হাত হয়ে অরণ্যর সামনে পৌঁছায়। তাহলে এই হল সেই বিখ্যাত হলের ডাইল। জনশ্রুতি আছে এতে নাকি প্রচুর ভিটামিন আছে। দিনের পর দিন একই অধোয়া হাঁড়িতে রান্না হয় বলে হাঁড়ির নীচে যে গাদ জমে তা-ই নাকি ওই ভিটামিনের উৎস। নিন্দুকেরা বলে রাতে রেখে দেওয়া ওই হাঁড়িতে ছোট বড় চার বা ততোধিক পদবিশিষ্ট নিশাচর ক্ষুদ্র প্রাণীদের বিচরণ নাকি ভিটামিনের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। অবশ্য বাটির ভেতরের তরলে ডালের অস্তিত্ব বের করার জন্য অনুবীক্ষণ যন্ত্রের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।

সেসব ভেবে লাভ নেই এখন। অরণ্য এতক্ষণে মহিন ভাইয়ের ফ্যান হয়ে গেছে। দু’টগবা ডাল পাতে ঢেলে ও কচলাতে শুরু করল।  কচলিয়ে এক লোকমা মুখের ভেতরে পুরল। সাদা শুকনা ভাতগুলা এতক্ষণ যে বিস্বাদ লাগছিল, সেটা এখন আর অত বিস্বাদ ঠেকছে না। বরং অন্য এক প্রকার স্বাদ অনুভূত হচ্ছে। মা’র রান্না বাড়ির ডাল, মেজ মামীর রান্না ডাল, ছোট খালার রান্না ডাল, বড় ফুফুর রান্না ডাল, জিয়াফতের ডাল – কোন রকমের ডাল রান্নার সঙ্গে এ স্বাদটা মিলছেনা। খেয়ে তৃপ্তি হচ্ছে তাও নয়, আবার অতৃপ্তি হচ্ছে সেটাও নয়। আশেপাশে তাকিয়ে দেখল সবাই গোগ্রাসে গিলছে সে অমৃত।

বিজয় টের পায়। বলে, আচ্ছা এখন খেয়ে নে কোন রকম করে। রাতে তোকে চানখারপুলের হোটেলে নিয়ে খাওয়াব।

অরণ্য লজ্জা পেয়ে যায়। বলে, না ভাইয়া, কোন অসুবিধা হচ্ছে না। দেখেন না, সব শেষ করে ফেলছি।

ভাত নষ্ট করা গুনাহের কাজ বলে হোক আর অন্য যে কারণে হোক, পাতের ভাত শেষ করেই অরণ্য হাত ধুতে উঠল।

বিজয় প্র্যাকটিকাল ক্লাস করতে গেছে। মহিন ঘুমাচ্ছে টং-এর উপর। অরণ্য বসে বইয়ের পাতা উলটাচ্ছে। কিন্তু পড়ায় মন বসছেনা। ফজলুল হক হল মসজিদ থেকে আসরের আজান ভেসে আসছে। অরণ্য লুঙ্গির উপর একটা শার্ট পরে নেয়। মেরুন রঙের শার্টটি গতবার বাড়িতে গিয়ে বিজয় ওকে দিয়ে এসেছিল। ওর ব্যাগে যে দুটো শার্ট আছে সেগুলোও বিজয়েরই পুরোনো শার্ট। সবার জন্য নতুন শার্ট কেনার সামর্থ্য বাবার কখনো ছিলনা। তাই উপর দিক থেকে কোনটা ছোট হয়ে গেলে বা কেউ পরতে না চাইলে সেটা অন্যদের ভাগ্যে জুটত। ঈদের সময় লুঙ্গির সঙ্গে কখনো কখনো নতুন জামা জুটত।

জিম থেকে বের হতে হতে আজান শেষ হয়ে যায়। পাশের সিঁড়িটা বেয়ে ও উঠে যায় উপরে। নামাজ শেষ করে নেমে ভাবল – একটু ঘুরে দেখা যাক চারপাশটা। হাতের ডানে ছোট্ট গলির মত জায়গাটা, যেখানটায় লন্ড্রি আর একটা টং দোকান সেদিকে হাঁটা শুরু করল ও। একটু যেতেই ভয়ঙ্কর সুন্দরের দেখা পেল।

মসজিদের পেছনটায় বিশালাকৃতির একটা পুকুর। ওদের বাড়ির পাশের সফর আলী মাষ্টারদের দীঘিটির কাছাকাছি হবে। পুকুরের চার পাশে শুধু নারিকেল গাছ আর নারিকেল গাছ। এপাশটায় মসজিদ, মসজিদ পেরিয়ে একটু গেলেই ফজলুল হক হলের প্রধান ভবনের এক কোনা চোখে পড়ে। উলটো পাড়ে ফজলুল হক হলের মতই লাল রঙের আর একটা পুরোনো ভবন। ভবনের কোণগুলোতে ফজলুল হক হলের মতই সুন্দর গম্বুজাকৃতির থাম। পরে জেনেছে ওটাই শহীদুল্লাহ হলের প্রধান ভবন। পুকুরের পানিটা ভীষণ স্বচ্ছ। পানিতে বিকেলের মিষ্টি রোদ পড়ে রূপোর ঝিলিক, স্বচ্ছ জলে শহীদুল্লাহ হল আর নারিকেল গাছগুলোর ছায়া, উপরে নারিকেলের ডগায় ঝিরিঝিরি শব্দে মৃদুমন্দ বাতাস – সব মিলিয়ে পড়ন্ত বিকেলে মায়াময় এক পরিবেশ তৈরি হয়েছে এখানটায়।

পুকুরের চার পাশ জুড়েই সুন্দর ছিমছাম পিচঢালা পথ। ফজলুল হক হলের লম্বা পথটা দিয়ে হাঁটা শুরু করল অরণ্য। মাঝামাঝি এসে চোখে পড়ল লাল ইটে বাঁধানো ঝকঝকে পুকুরঘাট। পুকুরে গোসল করছে একাধিক ছেলে বুড়ো। হংসরাজি আপন মনে জলকেলি করে যাচ্ছে ঘাটের দু’পাশে। এ ঘাট থেকে ওপারে এর চেয়ে বড় একই রঙের আরো একটা ঘাট চোখে পড়ল। আহ্‌, কি সুন্দর! ঘাটের কয়েকটা সিঁড়ি বেয়ে মাঝামাঝি এসে বসে পড়ল ও । অন্য দু’পাড়ের এক পাড়ে একটা চার কি পাঁচতলা লাল রঙের উঁচু দালান (শহীদুল্লাহ হল – এক্সটেনশন-১)  আর অন্য পাড়ে সাদা রঙের একটা ভবন (প্রাণিবিদ্যা ভবন)। সর্বত্রই লাল আর সবুজের মাঝে সাদা রঙের এ ভবনটিকে একদম বেখাপ্পা লাগছে। কোন পাগল স্থপতির মাথায় এরকম একটা সাদা রঙের দালান এখানে করবার বুদ্ধিটা এসেছে, খুঁজে বের করতে হবে।

কতক্ষণ বসেছিল পুকুরঘাটে, ও জানে না। মহিনের ডাক শুনে পিছন থেকে

– অর্ণি তুমি এইখানে? আমি তো ভয় পেয়ে গেছি তোমাকে না দেখে।   

– খুব সুন্দর এ জায়গাটা।

– রাতের বেলা আরো সুন্দর লাগে। তুমি তো অনেক বই পড়। হুমায়ুন আহমেদের বই পড়?

– জ্বী ভাইয়া।

– শুন, ওই যে উলটা দিকের লাল বিল্ডিংটা দেখছ, এইটা হইল শহীদুল্লাহ হল। ওটার একজন হাউজ টিউটর হচ্চেন হুমায়ুন আহমেদ স্যার।

– ও আল্লাহ! কি বলেন! উনার সঙ্গে দেখা হয় আপনাদের?

– বল কি, হয় না আবার? প্রায়ই হয়। জান, উনি একটু পাগল টাইপের মানুষ।

– মানে কি?

– এই ধর, রাত বারটা বাজে। তুমি হঠাৎ পুকুর পাড়ে আসলা ঘুরতে। যদি জ্যোৎস্নার রাত হয়, তাহলে দেখতে পার উনি উনার বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে গোসল করতে নামচেন পুকুরে।

– বলেন কি?

– হ্যাঁ……। তুমি অবাক হচ্ছ? অবাক হবার কিছু নাই। সে আরো অনেক পাগলামি করে। তোমাকে সব গল্প করব। আগে ভর্তি হয়ে যাও।

–  যদি পারি।

– যদি পারি মানে? তোমাকে পারতে হবে।

– দোয়া কইরেন ভাই।

আপু কি এক্সটেনশনে যাবেন?

রোকেয়া হলের গেটে দাঁড়িয়ে পর পর দুজনকে অনুরোধ করেছে মহিন। দুজনের কেউই যাবেনা রোকেয়া হলের এক্সটেনশনে। রুমাকে আগে থেকে বলেনি মহিন বিকেলে আসার কথা। হঠাৎই মনে হল দেখা করবে। আগে থেকে বলে না রাখলে এই সমস্যা। হলের গেটে একটা স্লিপ হাতে করে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। তারপর কোন ছাত্রীকে ঢুকতে দেখলে “আপু, আপু, আপনি কি এক্সটেনশনে যাচ্ছেন?” বলে স্লিপটা হাতে ধরিয়ে দিতে হয়। বেশির ভাগ মেয়েই সাধারণত সাহায্য করে। মাঝে মধ্যে পাওয়া যায় দুই একটা বেয়াড়া টাইপের! গত দুই বছরে অন্তত গোটা পঞ্চাশেক এরকম বেয়াড়াদের দেখা পেয়েছে মহিন। এদের মধ্যে দুইটা জাত আছে। মহিন এদের নাম দিয়েছে গুল্ম আর বাঁদর জাত। গুল্ম জাতটা জেনুইন। এরা লজ্জাবতী লতার মত – অপরিচিত ছেলেদের দেখলে কেমন চুপসে যায়। পারলে দশ হাত দূর দিয়ে চলে যাবে, কিন্তু শুনতেও চাইবে না কি বলতে চাচ্ছে ছেলেটা। মায়েরা বোধ হয় বারণ করে দিয়েছে – অপরিচিত ছেলেদের কাছ থেকে কিছু নিতে নেই। আর বাঁদর জাতটা – আর বলতে? বাঁদরামি করবে গায়ে পড়ে। গত সপ্তাহেই একটা বাঁদরের দেখা পেয়েছে মহিন। 

– আপু কি এক্সটেনশনে যাবেন?

–  জ্বী না।  কেন, ভাইয়া? (এমন গলার টান, খুব আদর যেন!)

– না, একটা মেসেজ পাঠানোর দরকার ছিল।

– কি মেসেজ, ভাইয়া? বলেন, আমি গিয়ে বলে দেব।

– না, আপনি তো এক্সটেনচনে যাচ্ছেন না।

– তাতে কি? আপনার জন্য না হয়  একটু কচটই করলাম।

মহিনের চ’-মুদ্রাকে ভেংগানোর সুযোগ বাঁদরটা ছাড়ল না। অবশ্য এরকম ফাজিল প্রজাতি মহিনের চেনা আছে। হাতে এক টুকরা কাগজে রুমার নাম আর রুম নম্বর লিখে এনেছে। ওটা নিয়ে যাবে, রুমার কাছে জীবনেও পৌঁছাবে না। ফাজিলের ফাজিল!

না আপু, থাক, অন্য কাউকে দেব। আপনার কষ্ট করার দরকার নেই।

বাঁদরটাও বুঝে যায়, এটা ঘাগু – এটার সঙ্গে বেশী বাঁদরামি চলবে না। রাস্তা মাপে। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না মহিনের। গুল্ম এবং বাঁদর প্রজাতির বাইরে একজনকে পেয়ে গেল। বিশ মিনিটের মধ্যে রুমা এসে হাজির।

– কি ব্যাপার, কালকে ত বলছিলা আজকে আসবা না। আসছ যে?

– না, হঠাৎ করে মনে হল তোমার সঙ্গে একটু দেখা করে আসি। তোমার অসুবিধা নাই ত?

– আরে না, চল ওইখানে গিয়ে বসি। কতক্ষণ আর রুমের মধ্যে বসে পড়া যায়?

দুজনে রাস্তা পার হয় ডাস’এর পেছনে সবুজ চত্ত্বরে গিয়ে মুখোমুখি বসে। রুমা একদম সাদামাটা কাপড় পরে এসেছে। মনে হয় ওটা পরেই ছিল রুমে। সবুজ পাজামার উপরে সাদা-সবুজের একটা প্রিন্ট কামিজ। উপরে আবার সবুজ ওড়না। রুমার এ রূপটি মহিনের খুব পছন্দ। কোন কৃত্রিমতা নেই। নেই কোন বাগাড়ম্বর প্রসাধন। সত্যিকারের রুমা! না বলে কয়ে আসার এটাই পুরস্কার মহিনের জন্যে।

– তো কি করলা সারাদিন?

– রুমেই ছিলাম। একটু কাপড়-চোপড় জমে ছিল, সেগুলা ধুলাম। খেয়ে-দেয়ে তারপরে পড়তে বসেছিলাম। খালি ঘুম আসে। পড়তে বসলে আরো বেশি আসে।

মহিন হাসে। শব্দহীন হাসি। মহিনের এ হাসিটা রুমার খুব পছন্দ। এ ভুবন-ভোলানো হাসিটাই তো চুম্বকের মত ওকে মহিনের কাছে নিয়ে আসে। ওর দুঃখ-কষ্ট-বেদনার একমাত্র মহৌষধ।

– হাস কেন?

– তোমার আমার অদ্ভুত মিল। আমিও খেয়ে-দেয়ে পড়তে বসছিলাম। কিসের পড়া, কিসের কি? ঘুমাইলাম আছর পর্যন্ত। তারপর তোমার এখানে আসলাম।

– খোদাদাদ খান স্যারের হোমওয়ার্ক করছ? কালকেই ত জমা দিতে হবে।

– সেইটা নিয়াই ত বসছিলাম। ওপেন সেট, ক্লোজ সেট, সবই বুঝি। কিন্তু নিজে অঙ্ক করতে গেলে আর পারি না।

– ঠিক বলছ। শুননা, আজকে কি হল, মাকে ফোন দিয়েছিলাম আজকে তিন দিন পরে।

– তারপর?

– ফোন করে শুনি আম্মু আব্বুর সাথে কথা বলছেনা আজ দু’দিন ধরে।

– কেন?

– কেন আবার? মান-অভিমান চলছে। আম্মু বলেছিল ক’দিনের জন্য নানুবাড়ি যাবে কুমিল্লায়। আব্বু বলেছে এখন না, সেজন্যে।

মহিন আবার হাসে। এবার রুমা বিরক্ত হয়।

– হাস কেন? এখানে হাসার কি হল?

– না, দুইটা কথা মনে কইরা হাসলাম। এ বয়সেও দেখ উনারা একজন আর এক জনকে কতটা ভালবাসে। মান-অভিমান তো ভালবাসা থেকেই হয়, নাকি?

– আর?

– আর আঙ্কেল এখনো দেখ আন্টিকে ছাড়া দুই দিন থাকতে পারে না।

– তো?

– আমি ভাবতেছি ওই বয়সে গেলে আমাদের কি অবস্থা হবে। তো উনাদের মান-অভিমান ভাঙ্গছে?

– না। আম্মুকে বলেছি বাদ দিতে – আব্বু এত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে আম্মুর উপর। বেচারার উপর রাগ করে কোন লাভ আছে?

আকর্ণ হাসি হেসে মহিন বলে, আব্বুর মেয়েও সে কথা যেন বোঝে।

– আচ্ছা বাদ দাও। বাড়ির খবর কি? খালা কেমন আছে?

– আজকে কথা হয় নাই, একটু ব্যস্ত ছিলাম। বিজুর ছোট ভাই আসছে, কালকে ভর্তি পরীক্ষা দিবে। ওরে একটু সব চিনায়া দিলাম। কিন্তু কালকে কথা বলছি। এখনো আগের মতই আছে। আব্বা দেখতেছে, ইন্ডিয়া নিয়া যাইতে চায়। কিন্তু আম্মা যাইতে চায় না।

– কেন, খালা যেতে চায়না কেন?

– না, আম্মা বলেন এত দূর যাইতে যাইতেই নাকি উনি আর থাকবেন না। উনি এখানে থেকেই মরতে চান।

মহিনের মুখের আগের সে হাসি মিলিয়ে গেছে। দু’বছর আগে ওর মায়ের স্ট্রোক হয়েছিল। তখন থেকেই উনি বিছানা ছেড়ে উঠতে পারেন না। খাওয়া, গোসল, বাথরুম – সবই করতে হয় বিছানায়। একটা কাজের লোক, ঠিক কাজের লোক না, দরিদ্র আত্মীয় আছেন সারাদিন উনাকে দেখাশোনা করার জন্য। হাতে তুলে মাথাটা একটু উঁচু করে খাইয়ে দেয়া, কোলে তুলে মেকশিফট বাথরুমে বসিয়ে দেয়া, পরিষ্কার করা, কাপড় বদলানো – সব কাজ এক হাতে করেন রৌশন খালা। রৌশন খালার সে কি ধৈর্য! বাবা একটু গোবেচারা শর্মিন্দা স্বভাবের। এসে যে একটু সাহায্য করবে, পারে না! যতক্ষণ রৌশন খালা কাপড় বদলানো বা গোসল করাবে, ততক্ষণ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবে। পুরুষ মানুষের এত লজ্জা কোত্থেকে আসে, মহিন বুঝতে পারে না। নিজের বৌ এর সামনেও লজ্জা? তাও অসুস্থ বৌ-এর সেবায়?

রুমা হাত বাড়িয়ে মহিনের কব্জিটাতে আলতো করে একটা চাপ দেয়। দিয়েই সরিয়ে নেয় হাতটা। মহিন এ চাপের অর্থ বোঝে। ওর বুকের ভেতরে যে উথাল-পাথাল কষ্ট, সেটা রুমাকে ছুঁয়ে গেছে। মুখে রুমা কিছুই বলেনা, কিন্তু ওর হাতের স্পর্শ ওকে জানিয়ে দেয় – আমি আছি তোমার সঙ্গে, মহিন। অন্যের দুঃখ-কষ্টের ভাগ এত সহজ করে কেউ নিতে পারে এটা মহিন রুমাকে না দেখলে জানতনা কোনদিন। ও বড়ই ভাগ্যবান। বিধাতা ওর জন্যেই রুমাকে গড়েছেন এমন করে। কষ্ট তিনিই দেন, আবার কষ্ট লাঘবের উপায়ও তিনিই দেন। উপরের দিকে মুখ তুলে মহিন ধন্যবাদ জানায় দৈবের প্রতি। আর তখনি টুপ করে একটা ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে মহিনের চোখ থেকে। আর তাতেই মনে হয় রাজ্যের সব কষ্ট উড়ে গেছে। রুমা প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে।

-চল, কিছু খাই।   

রুমা জানে কলিজা সিঙ্গারা মহিনের খুব পছন্দ। এটা রুমার খুব কাজে আসে। মহিন কোন কারণে রাগ হয়ে থাকলে ও ওর চোখের সামনে কলিজা সিঙ্গারা ধরে। মহিনের রাগ এক নিমেষেই শেষ। ডাসের কাউন্টার থেকে দুটো কলিজা সিঙ্গাড়া নিয়ে ওরা হাঁটতে থাকে শামসুন্নাহার হলের আলো-আঁধারি ফুটপাত ধরে। এক একটা যুগল পা ফেলে আগানো, এক একটা বাক্য বিনিময়, এক একটা স্মিত হাসি। এ অন্য কিছু নয় – নিখাদ ভালবাসা।    ভালবাসায় সিক্ত হবার কারণেই কিনা, মহিনের চ’-মুদ্রাটা এখানে এলে হাওয়া হয়ে যায় নিমেষে।

কমেন্ট করুন

ফজলুল বাসেত (পুরো নাম: আবদুশ শাকুর ফজলুল ওয়াহেদ) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষক ।

বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।

পরিসংখ্যান নিয়ে শিক্ষকতা ও গবেষণার পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশের পত্রিকায় অনিয়মিত কলাম লেখেন।

ফজলুল বাসেত

ফজলুল বাসেত (পুরো নাম: আবদুশ শাকুর ফজলুল ওয়াহেদ) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষক ।বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।পরিসংখ্যান নিয়ে শিক্ষকতা ও গবেষণার পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশের পত্রিকায় অনিয়মিত কলাম লেখেন।