বিশেষ সম্পাদকীয়

“কেহ গরিব অর্থের জন্য, কেহ গরিব রূপে
এই দুনিয়ার সবাই গরিব, কান্দে চুপে চুপে রে
কান্দে চুপে চুপে”।

বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের এই গোপন কান্নাকে যিনি হাসি আর আনন্দের ফল্গুধারায় অকপটে কথার গাঁথুনি দিয়ে সাজিয়েছেন তিনি হুমায়ূন আহমেদ।

হুমায়ূন আহমেদ, কথার জাদুতে যিনি মোহাবিষ্ট করেছেন বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত তরুণ প্রজন্মকে। বিগত শতকের আশি, নব্বই দশক থেকে চলতি শতকের প্রথম ভাগ মিলে প্রায় তিন যুগ যাবৎ আমাদের প্রতিদিনকার জীবনকে তিনি তুলে এনেছেন তাঁর রচনায় – গল্প, নাটক, উপন্যাস আর চলচ্চিত্রে; আর সেই সাথে একচ্ছত্র রাজত্ব করেছেন কথাশিল্পী হিসেবে।

সাধারণ শ্রেণির মানুষের স্বপ্ন-স্বপ্নভঙ্গ, আশা-নিরাশা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, ভালোবাসা-ঘৃণার গল্প হুমায়ূন আহমেদ অবলীলায় তুলে এনেছেন তাঁর লেখনীতে যেন আমাদের না বলা কথাটাই তিনি বলছেন। হুমায়ূন আহমেদ-এর লেখা যেন আমারই কথা, আমারই পরিবারের গল্প, আমাদেরই গোপন স্বপ্নগুলোর নিঃসংকোচ প্রকাশ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে পেশাগত জীবন শুরু করলেও লেখালেখির টানে শেষ পর্যন্ত লেখক পরিচালক হিসেবে সুপরিচিত হয়ে ওঠেন এই অনবদ্য কথা সাহিত্যিক। ‘শঙ্খনীল কারাগার’ নামক উপন্যাস দিয়ে উপন্যাস লেখার জগতে প্রবেশ করলেও হুমায়ূন আহমেদের প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’। পরবর্তীতে লেখককে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। গল্প উপন্যাসের মাধ্যমেই হুমায়ূন আহমেদ সৃষ্টি করেছেন হিমু ও মিসির আলির মতো পরষ্পরবিরোধী যুক্তিহীন ও যুক্তিবাদি মনস্তত্ত্বের চরিত্র। এছাড়াও তিনি সৃষ্টি করেছেন অত্যন্ত জনপ্রিয় শুভ্র নামক মেধাবী তরুণ প্রজন্মের চরিত্রকে।

হুমায়ূন আহমেদ ধারাবাহিক নাটকের মাধ্যমে বাংলাদেশ টেলিভিশনের নাটককে নিয়ে যান অনন্য উচ্চতায়। তাঁর রচিত ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘বহুব্রীহি’, ‘অয়োময়’, ‘আজ রবিবার’ প্রভৃতি নাটক দর্শকদের মাঝে তুলে ধরে পারিবারিক আবেগ ও বন্ধনকে। নাটকের মাধ্যমেই হুমায়ূন আহমেদ ‘সুখী নীলগঞ্জ প্রজেক্ট’, ‘সত্য দিবস’ –এর মতো ধারণা মানুষের বিশ্বাসে পরিণত করার দুঃসাহস দেখান। নাটকের নাটকীয়তাকে হুমায়ূন আহমেদ এমন আবেগীয় পর্যায়ে নিয়ে যান যে নাটকের চরিত্র ‘বাকের ভাই’-এর ফাঁসির ঘটনাকেও মানুষ বাস্তবে কল্পনা করতে বাধ্য হয়। হুমায়ূন আহমেদ তিনি যিনি ‘এই দিন দিন নয়, আরো দিন আছে; এই দিনেরে নিবো আমরা সেই দিনের কাছে’ – গানের মাধ্যমে এক সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন তুলে ধরেন তাঁর অগনিত ভক্তদের মাঝে।

নাটকের মতো চলচ্চিত্রেও হুমায়ূন আহমেদ সমান পারদর্শীতার পরিচয় দেন। তাঁর ‘শঙ্খনীল কারাগার’ ও ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ চলচ্চিত্র দু’টি এর অন্যতম উদাহরণ। এছাড়াও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘আগুনের পরশমনি’ ও ‘শ্যামল ছায়া’-ও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

হুমায়ূন আহমেদ শুধু একজন লেখক ছিলেন না, তিনি ছিলেন তরুণ প্রজন্মকে স্বপ্নবাজ করে তোলার কারিগর। তিনি বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে সেন্টমার্টিন দ্বীপকে পরিচিত করিয়েছেন; তিনি বৃষ্টি আর জোছনাকে তরুণদের আবেগে স্থান করিয়েছেন; তিনি হলুদ পাঞ্জাবি আর কদম ফুলকে তরুণদের চিন্তায় গেঁথে দিয়েছেন।

তরুণ প্রজন্ম সহ সর্বস্তরের মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় এই কালজয়ী কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদ-এর আজ প্রয়াণ দিবস।

হুমায়ূন আহমেদ-এর এই প্রয়াণ দিবসে প্যাপাইরাস এর পক্ষ থেকে বিনম্র শ্রদ্ধা।

কমেন্ট করুন
ব্যবস্থাপক |

সদস‍্য, সম্পাদনা পর্ষদ, প‍্যাপাইরাস

প্রাক্তন শিক্ষার্থী

পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সেশন:১৯৯৯-২০০০

রোকনুজ্জামান

সদস‍্য, সম্পাদনা পর্ষদ, প‍্যাপাইরাসপ্রাক্তন শিক্ষার্থীপরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সেশন:১৯৯৯-২০০০