পান্থশালা

“চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা আকাশ বাতাস জল
যেমন আছে তেমনি ঠিক রইবে অবিকল
মাত্র আমি আর থাকবোনা কেবল জনপূর্ণ ভবে
সুন্দর এই পৃথিবী ছেড়ে একদিন চলে যেতে হবে।“

– বাউল বিজয় সরকার

       ছাব্বিশ জানুয়ারি। ঘুমিয়েছি বেশ রাত করেই। গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজ ছিল তা নয়- ফেসবুক স্ক্রল করা আর ইউটিউব। প্রতিদিনকার অমূল্য সম্পদ সময়, গোগ্রাসে তো গিলছে এই দুই মহাদানবই। পরদিন সকাল দশটায় ক্লাস; অধ্যাপক ডঃ তসলিম সাজ্জাদ মল্লিকের টাইম সিরিজ অ্যানালাইসিস। ঘুম থেকে জেগে উঠতেই প্রথমে চোখ পড়ল টেবিলের সামনে টাঙ্গানো দেয়াল ঘড়িটার দিকে। হায় হায়! দশটা পনের বেজে গেছে। অবশ্য প্যারা নাই। অনলাইন ক্লাস। স্যারের ক্লাসে যখনই জয়েন দেয়া যায়, স্যার তখনই এডমিট করে দেন। তাড়াহুড়ো করে জয়েন দিলাম ক্লাসে। এডমিট হচ্ছে না। এক বন্ধুকে ম্যাসেঞ্জারে ম্যাসেজ দিলাম। কিরে ক্লাস কতক্ষণ হলো শুরু হয়েছে?

না- সেদিন আর সেই ক্লাস শুরু হয়নি; এরকম আর হবেও না। ক্লাস হবে ঠিকই কিন্তু সেই প্রত্যাশিত কণ্ঠের পরিবর্তে অন্য আরেক কণ্ঠ শুনবে সকলে। অন্য ইমেইল থেকে ক্লাসের ইনভিটেশন আসবে, কোর্স মেটেরিয়াল আসবে।

সেদিন সকালের সেই ঘটনার আকস্মিকতা চমকে দিয়েছে সকলকে। অবাক বিস্ময়ে থমকে গিয়েছিল মস্তিষ্কের চিন্তাশক্তি কিছু সময়ের জন্যে। এ গল্পটা শুধু আমার বা আমাদের ব্যাচেরই নয়, সকালে ঘুম থেকে উঠে ছাত্রবৎসল এই মহান মানুষটির অকাল প্রয়াণের খবরটি চমকে দিয়েছিল তাঁর সান্নিধ্যে আসা সকলকেই।

সত্যিই কি এ ধরিত্রী পান্থশালা নয়? নাকি এক পান্থশালার চাইতেও কম সময় কাটে এ ক্ষণিকালয়ে আমদের? মা বলেন, এক গামলা ছাইয়েরও বিশ্বাস আছে কিন্তু মানুষের নিঃশ্বাসের কোনো বিশ্বাস নাই। সত্যিই কি বিশ্বাস আছে? কি অবাক করা এক অনিবার্য সত্য! বিজ্ঞানের কত অগ্রগতি; চিকিৎসা বিজ্ঞান কতটা এগিয়ে গেছে। আবিষ্কৃত হয়েছে ন্যানো মেডিসিন, কৃত্রিম হৃদপিন্ড আরও কত কি। কিন্তু অমরত্ব লাভের কোনো ঔষধ কী কখনও আবিষ্কার করা সম্ভব হবে? কিছু মানুষের চলে যাওয়াই হয়তো এসব অদ্ভুত ভাবনায় ভাবিত করে তোলে। কিন্তু পরক্ষণেই যুক্তির কাছে হার মেনে যাই। অমরত্ব লাভের কোনো পথ বিজ্ঞান যদি সত্যিই কোনদিন আবিষ্কার করে ফেলে, তাহলে সেটা হবে বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় ভুল, সবচাইতে ভয়াবহ আবিষ্কার!

ভালো মানুষেরা নাকি বেশিদিন বেঁচে থাকে না। এর পেছনে সুন্দর একটি যুক্তিও প্রচলিত রয়েছে। মানুষ যেমন বাগান থেকে সবচেয়ে সুন্দর ফুলটিই তুলে আনে তার বা তার প্রিয়জনের জন্যে, সর্বশক্তিমানও তেমনি তাঁর প্রিয় মানুষদের আগেভাগেই তাঁর কাছে ডেকে নেন। যদিও এ কথার না আছে কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি, না আছে সঠিক পরিসংখ্যান। তবে কিছু মানুষের প্রয়াণে কথাটিকে বিশ্বাস করতে মন চায়- বলতে মন চায় আশপাশের লোকজনকে। তসলিম স্যার হলেন এই মানুষগুলোর মধ্যে একজন।

সমস্যায় জরাজীর্ণ এ পৃথিবীতে অধিকাংশই সারাজীবন অতিবাহিত করে সমস্যাগুলোকে নিত্যদিনের সঙ্গী করে। দাদা, আমি সাতে পাঁচে থাকি না ধরনের জীবন যাকে বলে আর কি। আবার কিছু মানুষ স্ব-উদ্যোগে বাড়িয়ে চলেছে এ মহাবিশ্বের এনট্রপি। অল্প কিছুসংখ্যক মানুষ এই দুই শ্রেণির ব্যতিক্রম। যারা পরিবর্তন ঘটাতে চেয়েছে এ সমাজব্যবস্থার, প্রচলিত ভুল ধ্যান-ধারণার। কেউ পেরেছে, কেউ পারেনি। এই মানুষগুলো ক্ষণজন্মা। যাদের জন্য পৃথিবী আজও বাসযোগ্য।

 অধ্যাপক ডঃ তসলিম সাজ্জাদ মল্লিক তাঁদের মধ্যে একজন কিনা তা বলতে পারি না। তবে শুধুমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের কথা বিবেচনায় আনলে তিনি নিঃসন্দেহে একজন ক্ষণজন্মা। কী অদম্য ইচ্ছাশক্তি একজন মানুষের মধ্যে যে তিনি ছাত্রদের পরিসংখ্যান বুঝতে শেখাবেন, ভালোবাসতে শেখাবেন। সারাদেশের এত এত সব  বৈচিত্রপূর্ণ পরিবেশ, পরিস্থিতি থেকে পরিসংখ্যান পড়তে আসা শিক্ষার্থীরা কী কী সমস্যার সম্মুখীন হয় এরকম উপলব্ধি হয়তো অনেকেই করেন। কিন্তু এই মানুষটি তাঁর উপলব্ধিকে বাস্তবে রূপ দেয়ার যুদ্ধে নেমেছিলেন। পরিসংখ্যান যে শুধুমাত্র একটি নীরস বিষয় নয়; একে ভালোবাসা যায়, সুন্দর একটা ভবিষ্যৎ গড়া যায় এটিকে অন্তরঙ্গম করতে পারলে- সেটি বুঝানোর দায় ঘাড়ে নিয়েছিলেন এই মহৎপ্রাণ মানুষটি। মূলত তাঁরই উদ্যোগ আর অনুপ্রেরণায় গড়ে উঠেছিল কাজী মোতাহার হোসেন স্ট্যাটিসটিকস্‌ ক্লাব। উদ্দেশ্য, বিভিন্ন প্রতিযোগিতা, সভা-সেমিনারের মধ্য দিয়ে এ বিভাগের শিক্ষার্থীদের পরিসংখ্যানের গুরুত্ব উপলব্ধি করানো, পরিসংখ্যানের প্রতি আগ্রহ আর ভালোবাসা জন্মানো। কিন্তু মাঝপথেই রণে ভঙ্গ দিয়ে তিনি পাড়ি জমালেন অসীমের উদ্দেশ্যে। তবে তাঁর প্রদর্শিত পথ ধরে তাঁর গুণগ্রাহীরা, সহযোদ্ধারা যুদ্ধটা চালিয়ে যাবেন আর অসীমে বসে তিনি তা অবলোকন করবেন এই আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

হায়! কী অনিশ্চয়তায় ভরা এ জীবন সকলের! তবুও কত আশা আকাঙ্খায় ভরা। সেটা মন্দ কিছু নয় বটে। কিন্তু খুব অবাক লাগে মানুষের অর্থের পাহাড় গড়া দেখে। তাও আবার অবৈধ উপায়ে। পুরো দেশের বারটা বাজিয়ে, দেশের মানুষগুলোর অধিকার ক্ষুণ্য করে সম্পদের তাজমহল তৈরী করছে মুষ্টিমেয় কয়েকজন। দেশের টাকা বিদেশী ব্যাংকে জমাচ্ছে। এদের সুবুদ্ধি হবে কবে? সত্যিই কি এদের কখনও মৃত্যভয় তাড়া করে না। যাদের জীবন এতটা অনিশ্চয়তার মধ্যে সেই মানুষের এমন আচরণ সত্যিই বিস্ময়কর। এই মহাবিশ্বের নিয়ন্তা মানুষগুলোকে সঠিক জ্ঞান দান করুক। মৃত্যু মানুষকে আরও ভাবাক, চালিত করুক সঠিক পথে। মৃত্যু নিয়ে আরও ব্যাপক গবেষণা হোক। শেষ করছি মৃত্যু নিয়ে আমাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থসমূহ কী বলছে তা দিয়েঃ

প্রত্যেককে মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে। আমি তোমাদেরকে মন্দ ও ভালো দ্বারা পরীক্ষা করে থাকি এবং আমারই কাছে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে। (আল কুরআন, সুরা আম্বিয়া-৩৫)

যার জন্ম হয়েছে তার মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী এবং যার মৃত্যু হয়েছে তার জন্মও অবশ্যম্ভাবী। অতএব, অপরিহার্য কর্তব্য সম্পাদন করার সময় তোমার শোক করা উচিত নয়। (শ্রীমদ্ভগবদগীতা, সাংখ্যযোগ-২৭)

আমার জীবন চিরস্থায়ী নয়; আমার জন্য, মৃত্যুই কেবলমাত্র স্থায়ী। আমি অবশ্যই মারা যাব; আমার জীবন মৃত্যু্র মধ্য দিয়ে শেষ হবে। জীবন স্থায়ী নয়; একমাত্র মৃত্যুই স্থায়ী। (গৌতম বুদ্ধ, ধম্মপদ)

পৃথিবীর ধূলিকণা যেরূপ পৃথিবীতেই প্রত্যাবর্তন করে, জীবন-শ্বাস তদ্রূপ ঈশ্বরের কাছে ফিরে যায় যিনি এটি প্রদান করেছিলেন। (বাইবেল, ১২:৭)

বাদশাহ্‌ বা অভিজাত কেউই থাকবে না। ধনী বা গরীব কেউই থাকবে না। যার পালা আসবে সে আর এখানে থাকতে পারবে না। (শ্রী গুরু গ্রন্থ সাহিব, পানা- ৯৩৬)

কমেন্ট করুন
শিক্ষার্থী | পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সেশনঃ ২০১৬-১৭

হরিপদ শীল

সেশনঃ ২০১৬-১৭

0