ভাল থেকো, পারতু!

“স্যার, আপনাকে আমি একটা কথা বলি– আমরা যত কিছুই বলি, পরিসংখ্যান খুব ভাল সাবজেক্ট, পরিসংখ্যান পড়লে চাকরির অনেক সুযোগ আজকাল– তাতেও পরিসংখ্যান যারা পড়তে আসে, তাদের বেশির ভাগই তো আর শখ করে পড়তে আসে না। ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিকেল, এসব না হয় বাদই দিলাম- আপনি মেধাতালিকার ক্রম দেখলেই সেটা বুঝবেন। তো যারা অনিচ্ছাকৃতভাবে পরিসংখ্যান নিয়ে পড়ছে, মোটিভেশনের অভাবেই তো তাদের বেশির ভাগ পড়ায় ইন্টারেস্ট পাচ্ছে না।

হইতে চাইলাম ডাক্তার, এখন মুখস্থ করতেছি ফরমুলা। বুঝছেন, স্যার। এরকম মোটিভেশন থাকলে কি আর পরিসংখ্যান শেখা যাবে? সেজন্য স্যার আমি ভাবছি কিউ এম এইচ ক্লাবের ব্যানারে এমন কিছু প্রোগ্রাম হাতে নেব যা দিয়ে এসব ছাত্রদের মোটিভেট করা যায়– ন্যূনতম তারা যেন একটা সম্মানজনক জিপিএ নিয়ে বের হতে পারে– নিদেনপক্ষে যেন ড্রপআউট না হয়ে যায়…”

কথাগুলি তসলিম সাজ্জাদ মল্লিক (পারতু)-র। মৃত্যুর বেশ কিছুদিন আগে আমার সঙ্গে ফোনে কথা হচ্ছিল।

আমি পারতুকে ক্লাসে পড়িয়েছি। আমাকে পড়িয়েছেন পারতু’র বাবা মল্লিক স্যার। একাডেমিক জগতে কিছু সম্পর্কের কথা শোনা যায়– একাডেমিক সিবলিং, একাডেমিক চিলড্রেন। যদিও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এটা প্রয়োগ করা হয় পিএইচডি তত্ত্বাবধায়কদের এবং তাদের তত্ত্বাবধানে যারা পিএইচডি সম্পন্ন করছে তাদের ক্ষেত্রে, কিন্তু আমার ভাবতে ভাল লাগে আমাকে যিনি পড়িয়েছেন, তার সন্তানকে পড়ানোর সৌভাগ্য আমার হয়েছে। পারতু পরিসংখ্যান পড়তে এসে আমায় সে সুযোগ করে দিয়েছে।

আমার একাডেমিক চিল্ড্রেন, আমার প্রিয় ছাত্র- পারতু আমাদের ফাঁকি দিয়ে চলে গেছে ওপারে। এই সেদিনই ওকে দেখেছিলাম আতাহার স্যারের অনুষ্ঠানমালায়, তার আগেই বিশ্ব পরিসংখ্যান দিবসের অনুষ্ঠানে। একবারও কি ভেবেছি তখন– সেই শেষ দেখা! সেই শেষ কথা! আমার সঙ্গে তার শেষ স্মৃতি থেকে যাবে করোনার জুম লেন্সে?

পারতুর সঙ্গে আমার আলাপচারিতা ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কে সীমাবদ্ধ ছিল। প্রচণ্ড নম্র স্বভাবের এই ছেলেটার ভদ্রতা-নম্রতা চোখ-মূখ ছাপিয়ে সর্বাঙ্গে প্রতিধনিত হত। বন্ধুদের সাথে করিডোরে হাটছে; সদ্য নিয়োগ-প্রাপ্ত প্রভাষক আমি – আমাকে দেখে দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে দিচ্ছে সালাম। আনত দৃষ্টি, কিঞ্চিত অবনত মস্তক– আমার দৃষ্টির বাইরে কোথাও লুকোতে চাইছে যেন! লজ্জায় নয়, ভয়ে নয়– নম্রতায়, শ্রদ্ধায়। আমার সঙ্গেই যে সে এমনটি ছিল তা নয়– অন্য সব গুরুজনেও তার ছিল অপরিসীম নতি। পরিসংখ্যান বিভাগের একজন প্রবীণ অধ্যাপকের ছেলে হিসেবে সে বিভাগে তার বিচরণ তার উপর কীরূপ চাপ সৃষ্টি করতে পারে আমরা সবাই তা অনুমান করতে পারতাম। পারতু পরিণত মানুষের মত স্থান-কাল-পাত্র ভেদে শুধুমাত্র আমাদের যোগ্য ছাত্র, আমাদের সহকর্মীর সুযোগ্য সন্তান এবং আমাদের অন্য ছাত্রছাত্রীদের পরম বন্ধু হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেনি, বরং ওর কৃতিত্বে নিজেই আবার পরিসংখ্যানের শিক্ষকতায় যোগ দিয়েছে একই বিভাগে।

পারতু যখন অনার্স শেষ করল বা কাছাকাছি, তখনি আমি দেশের বাইরে চলে আসি। পারতুর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা তাই আজীবন ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কে সীমাবদ্ধ থেকেছে। ওর সঙ্গে এর পর দেখা হয়েছে অনেক অনেক পরে। বোধ করি বছর বার কি পনের পরে। ব্যবহারে সেই আগের মতই নম্রতা। পারতুক্য শুধু কিছুটা কথায়– পুরোদস্তুর অধ্যাপকের দৃঢ়তা আর অভিজ্ঞতার আভাস সুস্পষ্ট বাক্যচয়নে।

সামনা-সামনি ওর সঙ্গে আরো কয়েকবার দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমিনার দিতে যাব। ভোর বেলা গাড়ি নিয়ে আমার জন্যে দাঁড়িয়ে থেকেছে আনসার ক্যাম্পের রাস্তায়, আমাকে নিয়ে একসঙ্গে আসবে বলে। যতই বলেছি, “পারতু, আমি চলে যেতে পারব, একা”, ততই “স্যার, আপনি জানেন না এখানকার পরিবেশ কত চেঞ্জ হয়েছে।” বলে জোর করে এসে দাঁড়িয়ে থেকেছে আমার অপেক্ষায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের কম্পিউটার ল্যাবের সেমিনারে দাঁড়িয়ে আমাকে পরিচিত করেছে ওর ছাত্রছাত্রীদের কাছে। যখনি কোন প্রয়োজনে ওকে বলেছি ওর কাছ থেকে একটা উত্তরই পেয়েছি– “স্যার, কোন সমস্যা নেই, স্যার”।

ঢাকায় গেলে সামনা সামনি যেটুকুন কথা হত, পারতু’র সঙ্গে এর বাইরে আমার যোগাযোগ হত প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়াদি নিয়ে। যে ক’টা পেপার রিভিউ করার আমন্ত্রণ জানিয়েছি, সানন্দে শেষ করেছে নির্ধারিত সময়ের আগেই। যেটিতে ওর দক্ষতার অভাব ছিল, নির্দ্বিধায় আমাকে বলেছে সেটি। ও নিয়মানুবর্তিতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

গত বছরের আগষ্টের শেষ সপ্তাহে আমাকে ফোন করেছিল পারতু। এ এমন কোন ঘটনা নয় হয়ত। কিন্তু পারতু আমাকে সেই প্রথম বাংলাদেশ থেকে ফোন করেছিল। অবশ্য ইমেইলে জানান দিয়েছিল আগে সময় চেয়ে। সেদিন পারতু আমার সঙ্গে কথা বলেছিল এক ঘণ্টার কাছাকাছি। এর পুরোটা জুড়েই ছিল কীভাবে ও ছাত্রদের উদ্বুদ্ধ করবে পরিসংখ্যান পড়াশুনায়!

ও বলছিল, আর আমি শুনছিলাম।

“স্যার, আমরা জানি আমাদের ছাত্রদের গবেষণায় উৎসাহী করতে হবে। কিন্তু সেটা হেল্প করবে কোন ছাত্রদের, বলেন? উপরের দিককার ছাত্রদের। তাইনা, স্যার? যে ছেলেগুলো ঝরে যাচ্ছে, যারা স্ট্রাগল করছে টিকে থাকতে, তাদের জন্য আমাদের কিছু করতে হবে, স্যার”।

আমি মনোযোগ দিয়ে শুনছিলাম। এ বিষয়ে ওর উচ্ছাস দেখে আমি মুগ্ধ। বেশির ভাগ মানুষই ভালদের দেখে। নিচের দিককার বা মেডিওকারদের কথা কয়জন ভাবে এমন করে? কিউ এম এইচ ক্লাব নিয়ে ওর স্বপ্ন ছিল এ ক্লাবটি এমন সব পদক্ষেপ নেবে যাতে পরিসংখ্যানের ধারণাগুলোতে সব ধরনের ছাত্ররা আকৃষ্ট হয়।   ভাল থেকো, পারতু। ছাত্রদের কল্যাণের জন্য তুমি যে সময় আর শ্রম দিয়েছ, তার ফসল পেয়েছে ছাত্ররা। তোমার প্রয়াণে তোমার ছাত্রদের কান্নাভেজা অভিব্যক্তি তারই প্রমাণ। সর্বশক্তিমান তোমাকে তার আশ্রয়ে রাখুন! দেখা হবে ওপারে, ইনশাআল্লাহ!

কমেন্ট করুন

ফজলুল বাসেত (পুরো নাম: আবদুশ শাকুর ফজলুল ওয়াহেদ) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষক ।

বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।

পরিসংখ্যান নিয়ে শিক্ষকতা ও গবেষণার পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশের পত্রিকায় অনিয়মিত কলাম লেখেন।

ফজলুল বাসেত

ফজলুল বাসেত (পুরো নাম: আবদুশ শাকুর ফজলুল ওয়াহেদ) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষক ।বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।পরিসংখ্যান নিয়ে শিক্ষকতা ও গবেষণার পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশের পত্রিকায় অনিয়মিত কলাম লেখেন।