ভাঙাগড়া

ভোর থেকে মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। নদীর পাশেই ঢালু নিচু জায়গায় একচালা টিনের ঘর নীলুর। স্বামী, একমাত্র ছেলে, শাশুড়ি নিয়ে একটা ঘরেই বসবাস। উঠানে চুলা। খড়ের ছাউনি দেয়া। বৃষ্টিতে পানি উঠে গেছে, ছেলেটা ক্ষুধায় কাঁদছে। জিনিসপত্রগুলো সরিয়ে রাখছে নীলু। শুকনো কাপড় কিছু রক্ষা করতেই হবে। টিনের চালে পলিথিন বিছিয়ে ফুটা বন্ধ করছে নীলুর স্বামী করিম। এদিকে যে বাসায় ছুটা কাজ করে নীলু সেখানেও যেতে পারছে না। এগুলো করবে না কি ঐ বাসায় যাবে?

শাশুড়ি বিলাপ করে করে আল্লাহকে ডাকছেন, বিছানায় বসে। এমন দিনে উনার ঠান্ডা কাশি বেড়ে যায়। চুলা ধরাতে পারলে আদা চা বানাতো নীলু ছেলে আর শাশুড়ির জন্য। করিম নেমে এলে তাকে বিশ টাকা দিয়ে নীলু বলে রুটি কিনে এনে দিতে। করিম বলে এত কাদা পানি পেরিয়ে সে যেতে পারবে না। কাথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ে। শাশুড়ির বিলাপ বাড়তে থাকে। তিনি ভেবেছিলেন কিছু আনলে তিনিও পাবেন। কিন্তু ছেলে তো গেল না। অগত্যা ছেলে কোলে নিয়ে নীলু বের হলো । যে বাড়িতে কাজ করে সেখানে কিছু দিবেই আপা। খাইয়ে দেবে ছেলেকে। মাথায় পলিথিন বেধে নেয়। আর ছেলের মাথায় ছাতা। আসলেই এত কাদা পানি মাড়িয়ে রোজ যাতায়াত করতে হবে, ভেবে তারও কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু কান্নারত ছেলের জন্যই তাকে বের হতে হলো। ঘরে ছেলের জন্য কিছুই এনে রাখা যায় না। শাশুড়ি সব বের করে, মা ছেলেতে খেয়ে নেয়। সে জানে আজ কপালে দুঃখ আছে। আপাও অপেক্ষা করছে।

কলিং বেল দিতেই আপা খুলে দিল। হাতে চায়ের মগ। বারান্দায় গিয়ে আবার বসল আপা। কিছু বললো না। পিছনে গেল নীলু।

-কিছু বলবি?

-জি আপা।

-বল।

-ছেলেটা খুব কাঁদছে।

-কেন? কী হলো?

-খিদে পাইছে।

-ওহ! তাই বল। কী খায়? বানিয়ে দে।

-চা বানাই?

-তোর খেতে মন চাইলে বানা। আমার এই নিয়ে তিন কাপ চলছে।

-আজ হাসপাতালে যাইবেন না?

-না, কাল নাইট ছিল। এক কাজ কর। ওকে বিস্কুট আর চা দে। দ্রুত হাতে খিচুড়ি বসিয়ে দে। গোশত ভুনা চুলায় চাপিয়ে দে। ভাজা হোক। আর আচার আছে না?

-জি আপা।

দ্রুত ছেলের পেট ঠান্ডা করে রান্না বসায় নীলু। আপার ঘর থেকে মিষ্টি একটা গানের সুর বাজছে। আপার বিয়ে হইছে কিনা, বাচ্চা আছে কিনা কিছুই জানে না নীলু। কোনদিন প্রশ্ন করেনি। নীলুর ছেলে নাসিমকে ঈদে জামা দেয় আপা। সাথে আনলে খাবার দেয়। মাঝে মাঝে তার জন্য খাবার প্যাক করিয়ে দেয়। কিন্তু কোনকিছুই অতিরিক্ত করে না। তাকে দেখে কিছুই বোঝা যায় না। বয়স হয়েছে, কিন্তু একাই থাকে। বাসায়ও যায় না। কেউ আসেও না। মাঝে মাঝে এই বাড়ির বাড়িওয়ালি কাজ করাতে ডাকে, তখন নানা প্রশ্ন করে, কিন্তু নীলু কিছুই জানে না। সে কোন খবর দিতে পারে না।

খেতে বসে নীলু আর ছেলেকেও সাথে নেয় মুনিয়া। নীলু সকাল থেকে কিছু খায়নি। পেটে ক্ষুধা, মুখে লাজ সে আজ দেখাতে পারেনি। বলতেই প্লেট এনে বসে পড়েছে ছেলেকে নিয়ে।

-এই বৃষ্টি মাথায় করে আজ না এলেও চলতো।

-না আইলে খাওন জুটতো না।

-তোকে না বলেছি বাচ্চার জন্য খাবার কিনে রাখতে?

-শ্যাষ আপা।

-হুম।

আর কথা হলো না। আপা চুপচাপ খেয়ে রুমে চলে গেল। নীলু কাপড় ভিজিয়ে, থালাবাসন ধুয়ে নিল। দুই রুমের বাসা। চট করে মুছে নিল। বারান্দা ভর্তি গাছ। কাদা পানি ছিটেছে দেয়ালে। যত্ন করে মুছল নীলু। ছোট ছোট কাজগুলো আপা খুব পছন্দ করে। আপার আচার সেই বানিয়ে এনেছে। আপা বাজার করে দিয়েছিল অবশ্য বৃষ্টি থামছে না। কাজ সেরে নীলুর আজ ফিরতে ইচ্ছে করছিল না। আপা খাবার নিয়ে যেতে বললেন। বাসায় চুলা ভেজা জানে সে। খাবারের পোটলা আর বাচ্চা কোলে ভিজে ভিজে নীলু রওনা দেয়। ক্লান্ত শরীরে পা চলে না। সে মনের জোরে এগিয়ে যায়। খুব ইচ্ছে করে পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়া কোন রিকশায় উঠে যেতে। কিন্তু লাভ নাই। আসল পানি কাদার পথ তো রিকশা যাবে না। সে ধীরে ধীরে চলতে থাকে।

পৌঁছে দেখে স্বামী আড়মোড়া ভেঙে উঠলো কেবল। শাশুড়ি তেতে আছেন। তার রাগান্বিত মুখের সামনে যেতে ভয় লাগছে নীলুর। খাবার বেড়ে দিতে যাবে তখন শাশুড়ি নেমে এসে দুই চড় লাগালেন।

-সেই সক্কালে বাইর হইছস!  তর শাউড়ি বুড়া মানুষ না খাইয়া আছে!  হুশ আছে তর?

নীলু ক্লান্ত শরীরে আর নিতে পারে না, মুখ থুবড়ে পড়ে মেঝেতে। আজ ছেলের হাত লাগাতে হয় না, রাগে বিড়বিড় করতে থাকে আর ছেলের বৌকে আচ্ছামতো পিটিয়ে রমিছা বেগম খেতে বসে। বৌয়ের হাতের খিচুড়ি। করিম কিছু বলে না। ভরপেট খেয়ে আবার ঘুম। মাকেও বাধা দেয়নি। বৌকেও উঠায় না। সন্ধ্যা নেমে এসেছে। ব্যাঙ ডাকছে। নীলু উঠে দাঁড়ায়। ছেলেকে কোলে নেয়, বাক্স বের করে বিছানার নিচ থেকে।  সামান্য কিছু জমানো টাকা আর বিয়ের শাড়িটা পুটলিতে বেঁধে বের হলো ছেলে কোলে নিয়ে।

শাশুড়ি, স্বামী দুজনের কেউই টের পায়নি। ওদের বাড়ি লাগোয়া বাড়িগুলো থেকে রাতের রান্নার ধোঁয়া বের হচ্ছে। চাল ফুটিয়ে ভাতের গন্ধ ছড়িয়েছে।

ভাত! কটা ভাতের জন্য সে সারাদিন খেটে মরছে। বাপ, মা মরা এতিম মেয়ে নীলু দাদীর কাছে বড় হয়েছে। বিয়ের সম্বন্ধ এনেছিল ছোট কাকা। ছোট কাকা নিজের মেয়ের মতোই ভালোবাসত। করিমের সব ভালো, কিন্তু অলস। কোন কাজেই সে অলসতার জন্য টিকতে পারে না। অনেক কষ্ট করে টাকা জমিয়ে ড্রাইভিং শিখতে পাঠিয়েছিলো নীলু। তাও শেষ পরীক্ষা না দিয়ে ফিরে এলো। বাসাবাড়িতে কাজ করেই তার জীবন যাবে নীলু জানত। কিন্তু ছেলেটা, তার তো ভবিষ্যত আছে!  করিমের ভালো লাগে না কাজ করতে। আবার এসে বসে রইলো। শাশুড়ি কিছুই বলেন না । তার একমাত্র ছেলে। কাজ না করতে চাইলে না করুক। বৌ এসেছে ঘরে। তার দায়িত্ব ঘর চালানো। এতিম মেয়ে এনেছে সে। যৌতুকও খুব সামান্য, এখন গায়ে খেটে পুষিয়ে দিচ্ছে!

ভাবতে ভাবতে কখন যে পৌঁছে গেছে!  নিজেও জানে না নীলু।

গিয়ে দেখে আপা হন্তদন্ত হয়ে বের হচ্ছে। একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে বাড়ির সামনে। নীলুকে বাচ্চা আর পুটলি হাতে দেখে খুব অবাক মুনিয়া। হাতের ইশারায় গাড়িতে উঠতে বলে, নীলু কিছু জিজ্ঞেস না করে উঠে পড়ে। গাড়ি রওনা দিয়েছে ঢাকার পথে। মফস্বলি নিস্তরঙ্গ জীবন থেকে হঠাৎ করে নীলু আছড়ে পড়ে ঢাকার বুকে। মুনিয়ার মা মারা গেছেন। বিচিত্র কোন এক কারণে মুনিয়া বাসা ছেড়ে মফস্বলে একা থাকাই শ্রেয় ধরে নিয়েছিল। নীলু যথারীতি কোন কৌতূহল ছাড়া তার দায়িত্ব পালন করে গেছে। মুনিয়ার ভাই পরিবারসহ কর্মস্থলে ফিরে গেলেন। মুনিয়ার বাবা মুনিয়াকে আর নারায়ণগঞ্জ ফিরতে দিলেন না। একবার গিয়ে শুধু সে ইস্তফা দিয়ে এসেছে আর বাসার মালপত্র এনেছে। নীলু আর নীলুর ছেলেকে আকড়ে ধরে বেঁচে থাকার নতুন রসদ পেলেন মুনিয়ার বাবা।

কেটে গেল পাঁচ বছর।

নাসিম স্কুলে যায়। মুনিয়া বিদেশে পড়তে গেছে। এক বিকেলে দরজায় এসে হাজির করিম। নীলু কথা বলতে চাইল না। বার কয়েক ঘুরে গেল করিম। নীলু এলো না। একদিন মুনিয়ার বাবার সামনে পড়ে গেল। তিনি ভেতরে ডাকলেন। সব শুনলেন। পাঁচ বছর আগে তার কাছে আসার আগে নীলুর জীবন। নীলুকে হারিয়ে তারা মা ছেলে পরের মাসেই ঘর ভাড়া দিতে না পেরে খালি হাতে গ্রামে ফেরে। করিম তখনও নিজেকে শুধরে নেয়নি। মা বুড়ো শরীরে আবার মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাজ করতে শুরু করে। এমন এক বর্ষাকালে নিউমোনিয়াতে মারা যান করিমের মা। করিম তখন আর কোন উপায় না পেয়ে ভিটেমাটি বিক্রি করে ঢাকায় চলে আসে। নীলুর খোঁজ করেছিল কিন্তু মুনিয়ার সেই ভাড়া বাসার দারোয়ান এটুকু বলেছিল নীলু বাচ্চাসহ মুনিয়া আপার সাথে চলে গেছে। মুনিয়া আপার ঠিকানা সে জানে না। বাড়িওয়ালা জানলেও বলেনি। মায়ের মৃত্যুর পর করিম আবার যায় সেই বাড়িতে এবার বাড়িওয়ালা সব শুনে ঠিকানা দেন। করিম ভাবে কাজ খুঁজে ঘর ভাড়া করে তারপর নীলুর সামনে যাবে। কিন্তু সে ভাবেনি ঢাকায় জীবন যাত্রা এতো কঠিন। এই পাঁচ বছরে সে নিজের খাওয়া মেস ভাড়া বাদ দিয়ে যা সঞ্চয় করেছে তার বলেই নীলুর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। মুনিয়ার বাবা সব শুনলেন। করিম কী কী কাজ জানে জিজ্ঞেস করলে করিম উত্তর দেয়- রাঁধুনি, মালি, দারোয়ান, ডেলিভারি বয় এমনকি দিনমজুরের কাজও সে করেছে স্ত্রী সন্তানের জন্য। মুনিয়ার বাবা তাকে একটা সুযোগ দিবেন ভাবলেন। বললেন এক সপ্তাহ পরে আবার আসতে। তিনি নিলুকে সব বললেন। এক সপ্তাহ ভাবার সময় দিলেন।  করিম এতেই যেন আকাশের চাঁদ পেলো।

এক সপ্তাহ পর,

মুনিয়ার বাবা বাজার করেছেন। নীলুকে ভালো করে রান্না করতে বললেন। করিম এলো দুপুরে, তিনি নীলুকে বললেন, করিমকে খেতে দিতে। পাঁচ বছর পর, নীলু পাশে দাঁড়িয়ে স্বামীকে খেতে দিচ্ছে। খুব তৃপ্তি করে খাচ্ছে করিম।

মুনিয়ার বাবা বুঝলেন, এখন করিম নীলুকে ভালো রাখবে। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন করিমকে দারোয়ানের চাকরিটা দেবেন। মুনিয়ার সংসার তো দেখা হলো না। নীলুর সংসার দেখবেন তিনি।

Facebook Comment
কমেন্ট করুন
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ

0