প্যাপাইরাস আছে বলেই লিখছি

“আসলো আবার নবীন বছর
সাজলো আবার ধরা,
দূর হয়ে যাক অসৎ যারা,
বিবেকটা দিক নাড়া।
থাকুক ভালো, ভালো মানুষ,
তুমিও থেকো ভালো।
তিমিরটুকুর চাইনে দেখা,
চৌদিকে হোক আলো।”

গতবছর প্যাপাইরাসের বছরপূর্তি উপলক্ষে একটা শব্দমাধুর্যে ভরা মেইলের উত্তর দিতে গিয়ে লাইনক’টি লিখেছিলাম। এছাড়া আরও যা যা লিখেছিলাম তা প্যাপাইরাস ‘সফল হোক সকল মঙ্গল প্রয়াস’ নামে প্রকাশ করেছিল। সেবার করোনা মহামারীর কারণে গ্রামের বাড়িতে; অফুরন্ত ফাঁকা সময়। এবার ঢাকায়; পুরনো ব্যস্ততায় ভরা।

এইতো সেদিন প্রথম বর্ষে ভর্তি হলাম; নতুন শহর, অচেনা সব মুখ, ক্লাসের চাপ। দেখতে দেখতে পাঁচটা বছর কেটে গেল। অচেনা মুখগুলো চেনা হয়ে গেল। কেউ কেউ তো আবার জায়গা দখল করে রীতিমতো জেঁকে বসে গেল হৃদাসনে। সময় যেন কেটে যাচ্ছে জল যেমন মেঝেতে গড়িয়ে পড়লে ছড়িয়ে যায় সেভাবে। মহাকালের যাত্রার গতির সাথে তাল মেলানোই দিন দিন দুষ্কর হয়ে পড়ছে।

সম্ভবত দু’হাজার উনিশের মার্চ। ক্লাসে এসে সাকিব ভাই (তখনও তাঁর নাম জানি না) জানালেন আমাদের বিভাগের একটি ম্যাগাজিন রয়েছে— বেশ ক’বছর ধরে প্রকাশ হচ্ছে না। সেটার অনলাইন সংস্করণ প্রকাশ করা হবে; স্বেচ্ছাসেবী এবং লেখক প্রয়োজন। ভাবলাম একটা কিছু লেখা দেওয়া যায়। কী লেখা যায়, কী লেখা যায়? মাথায় আসলো, যার এত অবদান পরিসংখ্যান বিভাগের প্রতি তাঁর সম্পর্কেই কোনো একটা লেখা দাঁড় করানো যায় কিনা দেখি। বইপত্তর আর ইন্টারনেট ঘেঁটে পেলাম মজার কিছু তথ্য। কাজী মোতাহার হোসেনের ছোটবেলার এমন কিছু ঘটনার উল্লেখ রয়েছে যার অনেকগুলো ঘটেছে আমার নিজের সাথেও। লিখে ফেললাম ‘কাজী ও আমি— অথবা সবাই’।

সাকিব ভাই একদিন ফোন করে বললেন, “হরিপদ, একটু সায়েন্স লাইব্রেরির এখানে আসতে পারবা? তোমার লেখাটা নিয়ে একটু কথা ছিল।” গিয়ে দেখি রোকন ভাইয়ের হাতে সম্ভবত আমার লেখাটার একটা ড্রাফট। জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “বই পড়? কোনটা বইটা পড়ে মনে হয়েছে আরও একবার পড়ি বইটা?” তখন কী উত্তর দিয়েছিলাম আজ আর তা মনে নেই। এরপর উনি বললেন, “দেখ, লেখকের কাজ হলো পাঠককে লেখার মধ্যে ঢুকানো; তার গভীরে নিয়ে যাওয়া। তুমি পয়েন্ট করে লিখেছ ঠিক আছে কিন্তু অসুবিধা হলো এতে পাঠক মনে করবে একাডেমিক কোনো লেখা পড়ছি; লেখাটার ভেতরে ঢুকতে পারবে না। একটু চেষ্টা করে দেখ তো ঘটনাগুলো গল্প আকারে বলা যায় কিনা।” চেষ্টা করে দেখলাম, কাজ হলো। মে সংখ্যায় প্রকাশিত হলো লেখাটা। এরপর থেকে লিখছি; প্যাপাইরাস আছে বলেই লিখছি। আর প্যাপাইরাস সেগুলো প্রকাশও করে যাচ্ছে ধারাবাহিকভাবে। ধন্যবাদ প্যাপাইরাস। বেঁচে থাকো হাজার বছর।

কালের আবর্তনে আবার একটা পুরাতন বাংলা বছরকে পেছনে ফেলে নতুন বছরে পা দিয়েছি আমরা। নতুন বছরের আগমনে কবিগুরু লিখলেন,

“নিশি অবসানপ্রায়, ওই পুরাতন
বর্ষ হয় গত!
আমি আজি ধূলিতলে এ জীর্ণ জীবন
করিলাম নত।
বন্ধু হও, শত্রু হও, যেখানে যে কেহ রও,
ক্ষমা করো আজিকার মতো
পুরাতন বরষের সাথে
পুরাতন অপরাধ যত।”

পৃথিবীটা অত্যন্ত সুন্দর। সুন্দর মনের একজন মানুষ হওয়া চাই। তবেই পৃথিবীর সে সৌন্দর্যটাকে উপভোগ করা সম্ভব। বিদ্বেষভাব ছড়িয়ে কী লাভ এই ক্ষুদে জীবনে! কী করলে কী হবে বা কী হবে না— এতকিছু না ভেবে বর্তমানটাকে উপভোগ করা কি খুব কঠিন? আসুন এই নতুন বছরে চেষ্টা করি সুন্দর মনের একজন মানুষ হওয়ার! আসুন সাঁইজির সাথে গলা মিলিয়ে গাই,

“মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপা রে তুই মূল হারাবি
মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।”

কমেন্ট করুন
শিক্ষার্থী | পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সেশনঃ ২০১৬-১৭

হরিপদ শীল

সেশনঃ ২০১৬-১৭