প্লাসিবো ইফেক্ট

একটুখানি সহানুভূতিমূলক কথা বা আচরণ কারো জীবনের কোনো সমস্যার সমাধান দিতে পারে না ঠিকই কিন্তু ঐ একটু কথা বা আচরণই হয়তো কোনো ব্যাক্তির কোনো সমস্যা সমাধানের নিয়ামক হতে পারে। বলছিলাম মেডিকেল সাইন্সের একটি ইন্টারেস্টিং বিষয় “প্লাসিবো”-এর কথা।

Placebo হল ল্যাটিন এর জন্য ‘I will please’ এবং এটি এমন একটি চিকিৎসাকে বোঝায় যা বাস্তব বলে মনে হয়, কিন্তু কোনো থেরাপিউটিক সুবিধা নেই বলে ডিজাইন করা হয়েছে। প্লাসিবো ইফেক্ট হচ্ছে, রোগীকে দক্ষতার সাথে এমন ওষুধ বা ব্যবস্থাপনা দেওয়া, যার বাস্তবে রোগের সাথে কোনো সম্পর্কই নেই। কোনো সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও, বেশিরভাগ সময় রোগী সেই ঔষুধ বা ব্যবস্থাপনার কারণে সুস্থতা লাভ করে অথবা ভালো বোধ করে। প্লেসিবো মুলত ঔষধ এর মতো দেখতে দেখতে কোনো টেবলেট বা সিরাপ যার কোনো ঔষধী গুণ নেই। তবে যেহেতু রোগী ভাবছে যে তাকে কোনো একটা কার্যকরী ঔষধ দেয়া হচ্ছে, তাই নিজের দেহের ইমিউনিটি সিস্টেম বুস্ট আপ হয় এবং রোগ প্রতিকারে অনেক কাজে আসে।

সাধারণত রোগীকে মানসিকভাবে আশ্বস্ত করার জন্য যে তাকে ঔষধ প্রয়োগে চিকিৎসা করা হচ্ছে বলে প্রকৃতপক্ষে প্লাসিবো প্রয়োগ করা হয়। প্লাসিবো মুলত ঔষধ এর মতো দেখতে দেখতে কোনো টেবলেট বা সিরাপ যার কোনো ঔষধী গুণ নেই। তবে যেহেতু রোগী ভাবছে যে তাকে কোনো একটা কার্যকরী ঔষধ দেয়া হচ্ছে, তাই নিজের দেহের ইমিউনিটি সিস্টেম বুস্ট আপ হয় এবং রোগ প্রতিকারে অনেক কাজে আসে।

প্রচলিত আছে, চিকিৎসাবিজ্ঞান বিকশিত হওয়ার আগে ইউরোপে হাতুড়ে ডাক্তাররা এক জায়গায় বেশি দিন থাকত না, তারা ভ্রাম্যমাণ অবস্থায় চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা দিত। তারা যখন কোনো জায়গায় যাত্রা করতো, তার আগে সেখানে তাদের কিছু দক্ষ ও চালাক অনুসারীদের পাঠাত তাদের হয়ে প্রচারণা করার জন্য। সেই অনুসারীরা তাদের গুরুর নানা অতিমানবীয় কীর্তি জনসমাগমে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে প্রচার করত। এভাবেই তারা সেখানকার সাধারণ মানুষদের প্রভাবিত করত, তাদের চিকিৎসা নেওয়ার জন্য। আর এর ফলে তারা আর্থিকভাবে লাভবান হতো এবং দ্রুত অন্যত্র সরে পড়ত। এ প্রকৃতির চিকিৎসক যথেষ্ট সচেতন ছিল; তার কারণ তারা নিতান্তই অনুমানের উপর ভিত্তি করে ব্যবস্থাপত্র দিত না। তারা প্রথমে রোগাক্রান্ত মানুষের বিভিন্ন লক্ষণ ও উপসর্গ পর্যবেক্ষণ করত এবং সে অনুযায়ী ওষুধ ও ব্যবস্থাপনা দিত। তাই ছোটখাটো রোগ নিরাময়ে তারা সফলকাম হতো এবং সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করত।

নিউজিল্যান্ডের ভিক্টোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি মজাদার পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বেশকিছু ছাত্র-ছাত্রীদেরকে ঝাঁঝালো টনিক ওয়াটারের সাথে এক ফালি লেবু দিয়ে পরিবেশন করানো হয় এবং তাদেরকে বলা হয় এগুলো হচ্ছে ভদকা; অবাক করা বিষয় হলো, পরীক্ষা শেষের প্রশ্নোত্তর পর্বে,পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই নিজেদেরকে মাতাল হিসেবে দাবি করে। তাছাড়া তাদের শরীরে নানা রকম মাতলামির লক্ষণ ও উপসর্গ পর্যবেক্ষণ করা হয়, অথচ তাদের উপর প্রয়োগকৃত পরীক্ষায় কোথাও অ্যালকোহলের ব্যবহার ছিল না।

এখানে ভদকা না খেয়েও মাতাল হওয়ার বিষয়টিকে প্লাসিবো ইফেক্ট আর টনিক ওয়াটাররের পরিবর্তে ভদকা ব্যবহৃত হওয়ার কারণে একে আমরা বলি প্লাসিবো।

ঠিক এরকম ঘটনা ঘটে চিকিৎসাক্ষেত্রে। অনেকসময় ডাক্তাররা ইচ্ছাকৃতভাবে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে রোগ নির্ণয় করেন এবং ওষুধ হিসেবে রোগীকে ‘চিনির ট্যাবলেট’ প্রদান করেন। সম্পূর্ণ বিষয়টি রোগীর অজানা থাকায় সে চিনির ট্যাবলেটকেই আসল ওষুধ হিসেবে বিবেচনা করে এবং আশ্চর্যজনকভাবে সুস্থ বোধ করে। এটিকে নিছক কোনো গল্প নয়, এর পেছনেও রয়েছে একটি যুক্তিসঙ্গত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। 

মস্তিষ্ক যখন বুঝতে পারে অথবা ধরে নেয়, আমরা খুবই কার্যকর কোনো ঔষুধ খাচ্ছি, তখন সে নিজেই এন্ডোরফিন নামক একপ্রকার রাসায়নিক পদার্থ নিঃসৃত করে। এর গাঠনিক সংকেত মরফিনের মতো। আর মরফিন ব্যথা নিরাময়ের কাজে ব্যবহৃত হয়। এক্ষেত্রে এন্ডোরফিন আমাদের মস্তিষ্কের নিজস্ব ব্যথা নিরাময়করী উপাদান হিসেবে কাজ করে; এর প্রভাবে রোগী তার ব্যথা থেকে উপশম লাভ করে এবং ভালো অনুভব করে। প্লাসিবো ইফেক্টের ফলে রোগীর মস্তিষ্কে যে আসলে পরিবর্তন হয়, তা দেখা যায় তা এফএমআরআই করলেই বোঝা যায়।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো, প্লাসিবো ইফেক্টের ফলে কোনো রোগ বা ব্যাথা থেকে সাময়িক মুক্তি পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু এটি স্থায়ী সমাধান নয়। কারণ প্লাসিবো ইফেক্টে প্রয়োগকৃত কোনো প্লাসিবো রোগের উপর সরাসরি প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। তবুও চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর গুরুত্ব অনেক বেশি। নতুন নতুন ওষুধের কার্যকারিতা নির্ণয়ের ক্ষেত্রে প্লাসিবো ইফেক্ট অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। নতুন কোনো ভ্যাকসিন যখন মানুষের উপর প্রয়োগ করা হয়, তার আগে একটি জনসংখ্যার অর্ধেকের উপর প্লাসিবো ভ্যাকসিন এবং বাকি অর্ধেকের উপর নতুন ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হয়।

এক্ষেত্রে রোগী অথবা ডাক্তার কেউ জানেন না যে, কোন ব্যক্তিকে কোন ভ্যাকসিন দেওয়া হচ্ছে। তবে, সঙ্কেতের মাধ্যমে নিরপেক্ষভাবে এই তথ্য সংরক্ষণ করে রাখা হয়। এর ফলে পরীক্ষাটি কোনো পক্ষপাত ছাড়াই সংঘটিত হয়। এ পদ্ধতিকে ডাবল ব্লাইন্ড পরীক্ষা বলা হয়। এ পরীক্ষায়, আসল ভ্যাকসিনপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা যদি প্লাসিবো ভ্যাকসিনপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের থেকে বেশি সুস্থ হয়, তবেই সেটিকে কার্যকরী ভ্যাকসিন বলে ঘোষণা করা হয়। 

প্লাসিবো ইফেক্ট অনেকগুলো বিষয় দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। ডাক্তার আর রোগীর মধ্যকার সম্পর্ক তার মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কারণ রোগী আর ডাক্তারের সম্পর্ক যদি ভালো হয়, তাহলে প্লাসিবো ইফেক্ট কাজ করার সম্ভাবনা বেশি। এজন্য বেশিরভাগ সময় মানুষ চিকিৎসার জন্য স্বনামধন্য ও পরিচিত ডাক্তার খোঁজেন। যে ডাক্তারের যত বেশি খ্যাতি, তার বেলায় প্লাসিবো ইফেক্ট তত বেশি কার্যকরী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আবার ডাক্তার যদি কোনো রোগকে গুরুত্ব সহকারে দেখেন, তাহলে প্লাসিবো ইফেক্ট হওয়ার সম্ভাবনা বেশি হয়। তাছাড়া ডাক্তার বা ঔষুধ থেকে রোগীর আশা যত বেশি থাকবে, সেটি প্লাসিবো ইফেক্টকে তত বেশি প্রভাবিত করবে। অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তি যদি মনে করে, অমুক ডাক্তার খুবই ভালো এবং তমুক ঔষধ সর্বাধিক কার্যকরী, তাহলে সেক্ষেত্রে প্লাসিবো ইফেক্ট কার্যকরী হবে।

তুলনামূলক বেশি তেতো ওষুধের ক্ষেত্রে প্লাসিবো ইফেক্ট হওয়ার সম্ভাবনা বেশি হয়। রঙ-বেরঙের বিভিন্ন রকম ওষুধের মধ্যে ব্যথা নিরাময় করে এমন জাতীয় ওষুধের রং হচ্ছে সাদা, তার কারণ হচ্ছে সাধারণত সাদা রংকে প্রশমনের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যদিও এর ব্যতিক্রম হওয়াটা খুব অস্বাভাবিক নয়। তবুও ওষুধ তৈরি ও বাজারজাতকরণের আগে ওষুধের রং, নাম ও ওষুধে ব্যবহৃত চিহ্ন অনেক মনস্তাত্ত্বিক বিষয় ভেবে নির্ধারণ করা হয়। এক্ষেত্রেও প্লাসিবো ইফেক্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। 

প্লাসিবো ইফেক্ট কেন কাজ করে, গবেষকদের কাছে এর কারণ এখনও প্রায় অজানা। তবে অনেকগুলো বিষয়ের মধ্যে একটি বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ ধরা হয়। সেটি হলো, ব্যক্তির জিনগত বৈশিষ্ট্য। তাই যেসব ব্যক্তির মস্তিষ্কের ডোপামিন বেশি নিঃসৃত হয়, তারা বা তাদের ক্ষেত্রে প্লাসিবো ইফেক্ট বেশি কাজ করে। এর ফলে যেসব ব্যক্তির দেহে ডোপামিন তুলনামূলক বেশি নিঃসৃত হয়, সে সকল ব্যক্তির ক্ষেত্রে চিকিৎসা ফলপ্রসূ হওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি হয়।

প্লাসিবো প্রভাবকে কাজ করতে সাহায্য করে এমন কিছু অন্যান্য জিনিসের মধ্যে রয়েছে:

প্ল্যাসিবোর বৈশিষ্ট্য – যদি বড়িটি আসল মনে হয়, তবে এটি গ্রহণকারী ব্যক্তি বিশ্বাস করার সম্ভাবনা বেশি যে, এতে একটি সক্রিয় ঔষুধ রয়েছে। গবেষণা দেখায় যে বড় আকারের বড়িগুলি ছোট বড়ির তুলনায়  শক্তিশালী প্রভাব বিস্তার করে এবং 2টি বড়ি গ্রহণ শুধুমাত্র একটি গিলে ফেলার চেয়ে বেশি শক্তিশালী বলে মনে হয়। সাধারণত, ইঞ্জেকশনের বড়ির চেয়ে বেশি শক্তিশালী প্লাসিবো প্রভাব থাকে।

ব্যক্তির মনোভাব – যদি ব্যক্তি আশা করে যে চিকিৎসাটি কার্যকর হবে, তবে প্লাসিবো প্রভাবের সম্ভাবনা বেশি, তবে প্লেসিবো এখনও কাজ করতে পারে যদিও ব্যক্তিটি সাফল্যের বিষয়ে সন্দিহান হয়। পরামর্শকের শক্তি এখানে কাজ করছে।

ডাক্তার-রোগীর সম্পর্ক – যদি ব্যক্তিটি তাদের স্বাস্থ্যসেবা অনুশীলনকারীকে বিশ্বাস করে, তাহলে তাদের বিশ্বাস করার সম্ভাবনা বেশি যে প্লাসিবো কাজ করবে।

বর্তমানেও প্লাসিবো ইফেক্ট নিয়ে গবেষণা চলছে। আর এর কিছু ভালো এবং কিছু ক্ষতিকর দিক রয়েছে। তবে এর ভালো দিকগুলো চিকিৎসাবিজ্ঞানে আশানুরূপ ভূমিকা পালন করছে। যেমন, নতুন ওষুধ,ভ্যাকসিন ইত্যাদির কার্যকরী ভূমিকা নির্ধারণ। তাছাড়া ডিপ্রেশনের রোগীদের সেক্ষেত্রে প্লাসিবো ট্রিটমেন্ট ভালো কার্যকরী হয়, কারণ ডিপ্রেশনের সাথে মনস্তাত্ত্বিক বিষয় সরাসরি জড়িত।

আবার আমাদের আশেপাশে এমন অনেক ব্যক্তি আছেন, যারা সবসময় কোনো না কোনো রোগে আক্রান্ত থাকেন, কিন্তু ডাক্তাররা রোগের সঠিক কারণ নির্ধারণ করতে ব্যর্থ হন। তাদের ক্ষেত্রে প্লাসিবো ইফেক্টের মাধ্যমে চিকিৎসা করালে বেশ ভালো ফল পাওয়া সম্ভব হতে পারে। আর এর ক্ষতিকর দিক গুলো একটু সচেতন থাকলেই এড়ানো সম্ভব হয়।

তবে মনে রাখতে হবে যে, প্লেসিবো কখনো কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য বা টিউমারকে সঙ্কুচিত করে না। মুলত প্লেসিবো আমাদের ইমিউনো সিস্টেম একটু বুস্ট আপ করতে পারে এবং হরমোন নিঃশ্বরণ করে ব্যাথার অনুভুতি কমাতে পারে। কোনো জটিল রোগ যেমন টিউমার, হাপানি বা ক্যান্সার কখনোই প্লাসিবো প্রয়োগ করে নিরাময় হয় না।

অতএব, একথা বলা বোধহয় ভুল হবে না, মনের জোর বড় জোর হলেও, জ্ঞানের জোর মোটেও ফেলনা নয়!

কমেন্ট করুন
শিক্ষার্থী | পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শিক্ষাবর্ষঃ ২০১৯-২০

মোঃ সাবিত আল-সাবা রিয়ন

শিক্ষাবর্ষঃ ২০১৯-২০

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.