সেপ্টেম্বর 23, 2026

রিকশা থেকে নেমে বাসার গেটে পা রাখতে যাব, ঠিক তখনই মোখলেস সাহেব পেছন থেকে ডাক দিলেন,

“হাসান সাহেব, দাঁড়ান, দাঁড়ান!”

বেশি কথা বলা মানুষদের আমি স্বভাবতই পছন্দ করি না। এরা একটি কথার একশোটা মানে বের করে পরে সেই কথা দিয়ে মানুষকে বিরক্ত করতে খুব ভালোবাসে। আনায়া সঙ্গে ছিল বলে লোকটার কথা শোনার জন্য দাঁড়াতেই হলো; নাহলে সে আমাকে রূঢ় মানুষ ভেবে বসতে পারে।

“কী খবর, আনায়া মামনি? বাবার সঙ্গে স্কুল থেকে বাসায় ফিরছ?”

“জি আঙ্কেল,” সে বেশ আগ্রহ নিয়েই উত্তর দিল।

“হাসান সাহেব, জানেন কী হয়েছে?”—কথাটা বলার আগমুহূর্ত পর্যন্ত মোখলেস সাহেবের চোখে সংবাদ জানানোর যে চকচকে ভাব ছিল, তা হঠাৎ কেমন যেন বদলে গেল। সেখানে ফুটে উঠল এক ধরনের আতঙ্ক।

কণ্ঠে ভয়ের ছাপ রেখে তিনি বলতে শুরু করলেন, “পাশের বাসার যে কলেজে পড়া মেয়েটা—তার কথা মনে আছে আপনার? যাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না! মেয়েটাকে নাকি নদীর পাড়ে ধ…”

তিনি কী বলতে যাচ্ছিলেন তা শুনতে চাইছিলাম না, নাকি পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পাঁচ বছরের মেয়ের উপস্থিতি আমাকে বাকিটা শুনতে বাধা দিল—জানি না। আমি মোখলেস সাহেবকে থামিয়ে দিলাম। তিনিও অপ্রস্তুত হয়ে আনায়ার দিকে তাকিয়ে পরিস্থিতি বুঝতে পারলেন এবং বিদায় নিয়ে চলে গেলেন।

বাসায় পৌঁছে খাবার টেবিলে মন অন্যদিকে নিতে চাইলেও কেন যেন পারছিলাম না। আনায়ার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি তার অবস্থাও আমার মতোই। মাত্র পাঁচ বছরের একটি মেয়ের মাথায় কি আমার মতোই চিন্তা চলছে? সে কি তার প্রিয় আপুর কথা ভেবেই এমন চিন্তিত মুখে বসে আছে? পাশের বাসার মেয়েটার সঙ্গে ওর সম্পর্ক ছোটবেলা থেকেই। মাঝেমাঝেই দেখতাম, ওরা কত গল্প করছে। যেদিন মেয়েটা হারিয়ে গেল, আনায়ার হাজারটা প্রশ্ন ছিল—

“আপু কি আর আমার সঙ্গে দেখা করতে আসবে না? তোমরা কেন আপুকে খুঁজতে বের হচ্ছ না?”

আজ লাশ পাওয়ার ব্যাপারটা কি সে বুঝতে পেরেছে?

ভাবতে ভাবতেই বাসার নিচ থেকে আপুর মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ ভেসে এল। বারান্দায় গিয়ে দেখলাম, আপুর নিথর দেহটা নিয়ে আসা হয়েছে।

“আমার মেয়েটার কী দোষ ছিল? আমার মেয়েটা কি বাঁচার অধিকার রাখত না! শয়তানগুলো আমার মেয়েটাকে বাঁচতে দিল না রে! আল্লাহ, ও আল্লাহ গো!”

আপনারা কখনো কোনো মাকে তার সন্তানের জন্য এমনভাবে কাঁদতে দেখেছেন কি না জানি না; তবে আমি হলফ করে বলতে পারি—সেই কান্নার শব্দ যখন আকাশে পৌঁছায়, তখন নিশ্চয়ই ফেরেশতাদের আত্মাও কেঁপে ওঠে। তারাও নিশ্চয়ই মেয়েটার জন্য কাঁদে।

আমার হুঁশ ফিরতেই দেখলাম, আনায়াকে তার মা জাপটে ধরে রেখেছে। সে নিচে যেতে চায়, তার প্রিয় আপুকে শেষবারের মতো ছুঁয়ে দেখতে চায়; কিন্তু পারছে না। আমরা সবাই যেন একেকটি পাথরের মূর্তি হয়ে গেছি। চারপাশে এক ভয়ংকর নিস্তব্ধতা। সবাই তাকিয়ে আছে সেই লাশের দিকে আর লাশের পাশে বিচারের দাবিতে আর্তনাদ করতে থাকা এক অসহায় মায়ের দিকে।

ঠিক তখনই সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে লাশের পাশ দিয়ে নির্বাচনী প্রচারণার আওয়াজ ভেসে এল—

“দেশের উন্নয়ন চাইলে, দেশনেতাকে ভোটে জেতান!”

শিক্ষার্থী | পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
Facebook
Threads
LinkedIn
Telegram
X
Reddit
Email
WhatsApp