তপ্ত দুপুরে সমগ্র জেলা শহর কেমন খাঁ খাঁ করছে। তার মাঝে স্বমহিমায়, ঠুনকো বীরদর্পে দাঁড়িয়ে আছে একমাত্র সদর কয়েদখানা। তার কাঠের গন্ধে লেগে আছে এক মানুষের অব্যক্ত দীর্ঘশ্বাস।
একই সময়ে জানালার ধারে বসে কাঁথায় শেষ কয়েকটা ফোঁড় দিচ্ছে ওয়াসানাত। বার বার অন্যমনস্ক হয়ে তন্ময় হয়ে বসে আছে; যেন অনন্তকাল ধরে সে বুনছে, তবু শেষ হচ্ছে না। অলক্ষ্যেই দু-ফোঁটা জল নাক বেয়ে কাঁথায় আঁকা ফুলের উপর পড়ল।
এসবের শুরু আনুমানিক চার বছর আগে হবে।
ওয়াসানাত তখন সন্তানসম্ভবা। বিয়ে হয়েছে তাদের মাত্র পাঁচ মাস। বাজারের ঠিকাদারের বাড়িতে সামান্য কাজে হাত বাড়ানোর জন্য ইরফানের ডাক পড়েছিল। সেটা শেষ করে বাড়ি ফিরতে ফিরতে গোধূলির শেষ আভা তার মুখে লাগল।
ঐদিন রাতেই গাঁয়ের জমিদারের রাস্তার পাশের গুদামঘরে আগুন লাগল। তাতে পুলিশ তদন্ত করতে এসে নাকি কেরোসিনের গন্ধ পেয়েছে। কিন্তু প্রমাণ কই?
কাউকে তো ধরতে হবেই। সেই বলির পাঁঠা হতে হলো ইরফানকে। একজন নাকি তাকে সেই সময় বাড়ির দিকে তড়িঘড়ি করে যেতে দেখেছে। ব্যস, পাঁচ বছরের সাজা…!
কত স্বপ্ন ছিল তার দু-চোখে! সে আর তার ছেলে হাত ধরে হাটে যাবে, নিজে তাকে মেলা দেখাবে, আর বাড়ি ফেরার সময় ওর মায়ের জন্য বিশ টাকার বাতাসা নিয়ে যাবে। কিন্তু মানুষ যত স্বপ্ন বোনে, ভাগ্য তত নিঃশব্দে ছুরি ধার করে।
ওয়াসানাতকে বাপের বাড়ি নিয়ে যাওয়া হলো। প্রথম প্রথম সে মাটিতে আছড়ে পড়ে কান্নাকাটি করে একশেষ করল, শরীরের ওড়নার হোশ নেই। কাশতে কাশতে রক্ত বের হয়েছিল। তারপর তার বাবার নির্লিপ্ত বাণী— “এ গ্রামে আমাদের মান-সম্মান আছে। ওদের সাথে সব সম্পর্ক শেষ।” — শুনে সে একবারে নেতিয়ে গেল।
ইরফান এক সময় জেলে কাঠের কাজ শিখল। তার রোজ দেড় ঘণ্টা কাজের সময় বরাদ্দ। সে দ্রুত এক ঘণ্টায় নিজের কাজ শেষ করে, বাকি ত্রিশ মিনিট নিজের ছেলের জন্য কাঠের সাইকেল বানাতে লাগল। দীর্ঘ তিন মাস লেগেছে পুরোপুরি সাইকেল বানাতে। তার ছেলে এটায় চড়ে সমগ্র উঠান দাপিয়ে বেড়াবে। উঃ, কী সুন্দর দৃশ্য, ভাবতেই পুলক জাগে! খোদাই করে লিখে দিল “পঙ্খীরাজ”।
দীর্ঘ পাঁচ বছর পর অবশেষে সেই মামলায় ইরফান খালাস পেল। সে “পঙ্খীরাজ” কাঁধে নিয়ে শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল (আগেই খবর জোগাড় করেছিল)। উঠানে ঢুকে দেখল একটা পাঁচ বছরের ছেলে মাটিতে বসে আছে, তার দিকে তাকিয়ে নিষ্পাপ হাসি দিচ্ছে। কিন্তু চোখ নামিয়ে কোমরের কাছে আনতেই ইরফানের পায়ের নিচের মাটি সরে গেল। আকাশের স্রষ্টা যেন অজস্র বজ্রাঘাত তার মাথায় নিক্ষেপ করলেন! সে দেখল, তার ছেলের দুটি পা নেই। এভাবেই সে জন্মেছে।
ইরফান শুধু মুখ দিয়ে আলতো আওয়াজ বের করল, “বাবা…!”
- আকাশ আহমেদhttps://www.thepapyrus.org/author/%e0%a6%86%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b6-%e0%a6%86%e0%a6%b9%e0%a6%ae%e0%a7%87%e0%a6%a6-2/বৃহস্পতিবার, অক্টোবর 10, 2024
- আকাশ আহমেদhttps://www.thepapyrus.org/author/%e0%a6%86%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b6-%e0%a6%86%e0%a6%b9%e0%a6%ae%e0%a7%87%e0%a6%a6-2/বৃহস্পতিবার, নভেম্বর 14, 2024
- আকাশ আহমেদhttps://www.thepapyrus.org/author/%e0%a6%86%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b6-%e0%a6%86%e0%a6%b9%e0%a6%ae%e0%a7%87%e0%a6%a6-2/রবিবার, জানুয়ারি 19, 2025
- আকাশ আহমেদhttps://www.thepapyrus.org/author/%e0%a6%86%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b6-%e0%a6%86%e0%a6%b9%e0%a6%ae%e0%a7%87%e0%a6%a6-2/বৃহস্পতিবার, জুলাই 10, 2025
- আকাশ আহমেদhttps://www.thepapyrus.org/author/%e0%a6%86%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b6-%e0%a6%86%e0%a6%b9%e0%a6%ae%e0%a7%87%e0%a6%a6-2/বৃহস্পতিবার, আগস্ট 14, 2025












