কাল ক্রীড়া

বর্ষা নেমেছে বহুদিন হলো। অসময়ের প্লাবনে ফসল নষ্ট হওয়ার জোগাড়। তবুও প্রকৃতির এই খামখেয়ালিপনা। গত বছরের খরার পর এবার আকস্মিক অতিবৃষ্টিতে মাঠ-ঘাট আর জলাশয় একই রেখায় দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। উঠানগুলো জলে টইটম্বুর। সীমানার বিস্তৃতিতে মাছগুলোর আজ অবাধ স্বাধীনতা প্রাপ্তি ঘটেছে। যে জায়গায় আগে গরু চরতো সেখানে আজ মাছ আর সাপের চারণভূমি। জলমগ্ন এই ধরায় স্থলবাসীরাই আজ শরণার্থী। গৃহপালিত গরুগুলোকে গৃহের এক কোণে বসে জাবর কাটাতে দেওয়া ছাড়া আর কোন কাজ আপাতত গৃহকর্তা অর্পণ করতে পারেনা। বারান্দার সাথে লাগোয়া মাচার উপর বসে তৃষ্ণা মুড়ি খাচ্ছিল আপন মনে। মাচাটা কাঁচা বারান্দা থেকে খানিকটা উপরে হওয়ায় তার অনুজ রতন এর পক্ষে দিদির সাথে শামিল হওয়ার উপায় ছিলনা। তবে দাওয়ায় হেলান দিয়ে সেও দিদির খাবারের থলি থেকে নিজের পাওনাটা আদায়ে কৃপণ ছিলনা। রতনের পাশে শুয়ে থাকা দুইটা অভুক্ত কুকুর ওদের দিকে আলসে নয়নে তাকিয়ে আছে। বর্ষা মৌসুম এই অবোধ বালক বালিকাদের জন্য এক নতুন মাত্রা যোগ করে। গতকালের হালকা ঝড় তাদের আধা পাকা স্কুলের টিনের চাল উড়িয়ে নিয়ে গেছে। এদিকে অবিরাম বর্ষণে এই বিস্তীর্ণ জনপদের একটা মাত্র সড়কও হাঁটু সমান কাদার পাঁকে পরিণত হয়েছে। তাই স্বেচ্ছা প্রণোদিত ছুটিতে এই অনিশ্চিত ভবিষ্যতের শিক্ষার্থীকূল বেশ আয়েশ যাপন করছে তাদের স্ব-স্ব জীর্ণ কুটিরে। জীবন যেখানে মুখ থুবড়ে পড়ে সেখানে শিক্ষা এক বিলাসবহুল প্রমোদ ছাড়া কিছুই না। ক্ষণকাল পর তৃষ্ণা রতনকে বলে উঠল, “ভাই মাছ ধরতি যাবি?” রতন বরাবরই তার দিদির একান্ত অনুগত অনুচর। দুনিয়ার তামাম সিদ্ধান্তে সে তার দিদির সাথে সর্বদা একমত থাকে; বিপরীতে স্বয়ং তার মা বাবা থাকলেও। দাওয়ায় হেলান দেওয়া ছিপিটা নিয়ে খানিক বাদে ওরা বের হলো। বাড়ির কর্তা সুরেন দাওয়ায় হেলান দিয়ে হুঁকায় টান মারছিল। খসখসে চামড়ার দেহখানি অনেক দিন যে তেলটুকুর আঁচও পায়না তা বেশ স্পষ্ট। কালো গভীর চোখের দৃষ্টি এক অজানা ভবিষ্যতের পানে। সুরেন একজন ধান ভাগি চাষি। টাকার বিনিময়ে জমি বর্গা পায়। আর সারা বছর ভাগ্যলক্ষ্মীর পানে চেয়ে থাকে। ভাগ্য ভালো হলে গোলায় ধান ওঠে নয়তো ঋণ করে যে টাকাটা সে জমির মালিককে দেয় সেটার যোগাড় হয়না। কোনো বার খরা তো কোনো বার বন্যা। ছোট বেলায় বাপ দাদার কাছে গুপ্তধনের গল্প শুনতো। এমন পরিস্থিতিতে ওর মনে হচ্ছিল যদি জমি চাষ করতে গিয়ে এক কলসি গুপ্তধন পেতো তাহলে সেই টাকা দিয়ে হাজী সাহেবের সব জমি নিজেই ভাগে নিয়ে চাষ করতো। জমিন চাষ করাই যার নেশা তার চিন্তা এমনতর হওয়াটাই অর্থবহ। নিজের পেশাকে নেশা ভাবতে পারেনা বাঙ্গালি আর তার পরিণতি আজকের এই সমাজ ব্যবস্থার অসুস্থ প্রতিযোগিতার নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।

বাইরে তখনো গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। হঠাৎ সুরেনের স্ত্রী আনুভার রান্নাঘরের ভিতর থেকে ডাকাডাকিতে সুরেনের তন্দ্রা কেটে গেলো। ঘরের ভিতরে গিয়ে দেখে এক জলবোড়া সাপ রান্নাঘরটার ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করছে। ঘরের চারপাশটা জলমগ্ন। মাঝখানে চরের মতো এই উঁচু আশ্রয়ে সব প্রাণীই আশ্রয় নিতে চাইছে। জল-স্থল এখানে কোনো ফারাক করছে না। সাপটাও হয়তো একটু শুষ্ক জায়গার খোঁজে চষে বেড়াচ্ছে। তৃষ্ণা আর রতন খানিক বাদে ব্যর্থ মনোরথে বাড়ি ফিরল। এসে দেখে তার পিসি তার ছেলে মেয়ে নিয়ে হাজির। পিসতুতো ভাই-বোন সমীর আর শশীকে দেখে ওদের আনন্দ আর ধরেনা। সুরেনের একবোন, নাম কলমি। ছোট বেলায় বিয়ে একবার হয়েছিল বটে। তবে সেটা নিজের অমতেই। বাল্যবিবাহ। স্বামী পক্ষাঘাতে মারা যায়। সুন্দর মুখশ্রী আর সন্তান না থাকায় পাত্র আবার জুটে যায়। হঠাৎ ওদের আগমনে সুরেন বাহ্যিক ভাবে সহাস্য বিনিময় করলেও অনেক চিন্তা মাথায় খেলে যাচ্ছে তরঙ্গের মতো। বাড়িতে সুরেনের মা ছাড়াও স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে সহ এই অনাকাঙ্ক্ষিত নতুন তিনমুখের অন্ন আয়োজন করা এই অবস্থায় সকল সম্ভাব্য উপায়েও অসম্ভবপর। সুরেনের ভগ্নীপতি বিশ্বনাথের পিতা পয়সাওয়ালা মানুষ। তবে তিনি যেমন কৃপণ, তেমন অবিশ্বাসী। বেঁচে থাকতে নিজের সব টাকা কড়ি লুকিয়ে রাখতেন। নিজের চার পুত্রকেই বিশ্বাস করতে পারতেন না; পুত্রবধূগনকে তো একদমই না। হঠাৎ করেই হপ্তার জ্বরে পরপারে পগারপার। মরার পর তন্নতন্ন করে খুঁজেও টাকা কড়ি কিছু মেলেনি। কিছু জায়গাজমি ছাড়া আর কিছুই আপাতত দৃশ্যমান হয়না বিশ্বনাথের। এখানেও ভাগাভাগি। তাই থলেতে যে কিঞ্চিৎ প্রাপ্তি যোগ ঘটেছে তাতে বর্তমান বাজারে বেশ টালমাটাল অবস্থায় বিশ্বনাথ। শশীও বড় হয়ে উঠছে। বিয়ের বাজারে তুলতে গেলেও যে গ্যাঁটের প্রয়োজন সেটাও আপাতত নেই। ছোট খুপরি দোকানটাও জলদেবতার ভোগে গেছে। তাই বলতে গেলে উদ্বাস্তু; বসত ভিটা ছাড়া। কলমির বাপের বাড়ি ছাড়া এমন অবস্থায় কোথাও উঠবার জায়গা নেই। সব শুনে সুরেন বুঝতে পারলো এই আপদ বহুত কালেরই হবে। তাই একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, “কী আর করবিনি, আইসে পড়লি। থাক ইহানে কয়দিন।” আপন ভাইয়ের বিমাতা সুলভ আচরণ যে যথেষ্ট যুক্তিযুক্ত সুরেনের এই অবস্থায় তা কলমি বুঝতে পারলো। তবে সেটা এড়িয়ে যাওয়াই এই মুহূর্তে তার কর্তব্য মনে হলো। সারাপথ আসতে আসতে শশী, সমীর ওদের সারা গায়ে কাদার ছড়াছড়ি। পুকুর টুকুর সব একাকার। তাই উঠানের কর্দমাক্ত জল থেকেই বালতি কেটে স্নান সেরে নিল। সদ্য জন্ম নেওয়া শীতল জলে দাপাদাপি করতে বাচ্চাদের মজা সবসময়ই বেশি থাকে। তবে আনুভার লাঠি হাতে তেড়ে আসায় ওদের অগত্যা উঠতে হলো বেশ বিরক্তির সাথে। স্বভাবতই মা জাতি সব সময় নিজের ছেলেমেয়ের প্রিয় কাজ গুলোতেই বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তবে সেটার মূলে যে শুভাশিস থাকে সেটা হয়তো ছেলেমেয়েরা বুঝতে পারেনা। তাদের কাছে ওই শুভাশিস বিষের ন্যায় জ্বালাময় মনে হয়।

দুপুরে সব্বাই বারান্দায় এক লাইনে খেতে বসে গেল যেন দৃশ্যত মনে হতে পারে নেমন্তন্ন। তবে ভোজের বিষয়বস্তুতে তা মনে হবার কোন কারণ ছিলনা। আলু ভর্তা আর গরম গরম আতপ চাউলের রক্তলাল ভাত। সাথে কাঁচা লংকা, পেয়াজ তো আছেই। সমীর আর শশী গত রাত থেকে উপোষ করেছে। এই অনিচ্ছাকৃত উপোষ তাদের সামনে পরিবেশনকৃত বিদুরের খুদকেও রাজভোজের শামিল করে তুলেছে। গোগ্রাসে তাদের আহার দেখে সুরেনের ভগ্নীর চোখের জল স্থির থাকতে পারলো না। দু এক ফোঁটা মিশে গেলো নিজের পাতে। কলমির মা অদূরে বসে সুপারি কাটছিলো কম্পমান হাতে। মেয়ের চোখের জল তার চোখ এড়ালো না। সুরেন না খেয়েই বেরিয়ে পড়েছে জমির দিকে। জমির আইল ভেঙ্গে গেছে গতকাল। বাইরের জল এসে ভরিয়ে দিয়েছে। তবুও মন্দের ভালোর আশায় ছুটে চলা। জামাল মাস্টার এর বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় দেখা গেলো বেশ বড় জটলা পেকেছে। উৎসুক জনতা যেন একজনের দিকে চেয়ে আছে। সামনে মাস্টার সাহেব বসা। একটু কাছে গিয়ে দেখে কাসেমকে চায়ের দোকানের দাওয়ায় খুঁটির সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে। ঘটনা জানতে চাইলে একজন জানালো যে গত রাতে মাস্টার সাহেবের বাড়ি থেকে সিঁধ কেটে টাকা-পয়সা, ঘটি-বাটি আর এক থলে চাউল চুরি করেছে কাসেম। তার বিচার চলছে। গায়ের চেয়ারম্যান আর মাস্টার মশাই সামনে বসা। কাসেমের বউ নাই। গত বছর তালাক দিয়ে দিয়েছে। পাশের পাড়ার দেলোয়ারের সাথে সম্পর্ক ছিল এই সন্দেহে। তবে তালাকের সন্দেহকে সত্য করেই বিবাহ বসে দেলোয়ার এর সাথে। ছোট মেয়েটাকে ওর মা নিতে চায়নি। কাসেমও যেতে দেয়নি। উভয়ের সম্মতিতে মেয়ে আজমীরা ওর বাবার সাথেই আছে। তবে গ্রামের রাস্তায় ভ্যান চালিয়ে যে আয় হতো সেটা এখন বন্ধ প্রায় দুই মাস। টাকাপয়সা যা সঞ্চয় ছিল সেটার শেষও হয়েছে। বাধ্য হয়ে মেয়ের ক্ষুধার জালায় এই পন্থা ধরতে হলো। বিষয়টা মানবিক বিবেচনা করে মাস্টার মশাই বেশি দূর জল না গড়িয়ে ওকে ছেড়ে দিতে সম্মত হলেন। উৎসুক জনতাও বায়োস্কোপ দেখার মতো দেখে যে যার পথে পা দিল। সুরেন একটা বিড়ি নিল দোকান থেকে। পাশে মাটিতে বসে কাসেম একখানা রুটি গোগ্রাসে গিলছে। কয়দিন খায়না কে জানে! ওর দিকে চেয়ে বেশ কয়েক টান দিল। বিড়িটার স্বাদ আজ উৎকট লাগছে। ফেলে দিয়ে নিজের গ্যাঁট থেকে টাকা মিটিয়ে পা বাড়ালো। হাজী সাহেব বাড়ি নেই। তিনি বিশেষ কাজে জেলা শহরে গেছেন কোর্টে। ছোট বেলায় নিজের বাবার সাথে একবার গিয়েছিল বটে। তবে সে স্মৃতি এখন নিজের চোখের দৃষ্টি শক্তির মতোই ঘোলাটে। ঘরে চালও বাড়ন্ত। ওদিকে ভাগনা, ভাগ্নি, বোনের উৎপাত। লুঙ্গীর গ্যাঁট থেকে বের করে গুনে দেখলো সব মিলিয়ে একশোও হবে না। তাও নিরুপায়।

বাজারের দোকানপাট সব নষ্ট হয়ে গেছে জল উঠে। সবাই ঐ সাইক্লোন সেন্টারের পাকা মেঝের উপর বাজার সদাই নিয়ে বসছে। ওখান থেকে একফালি কুমড়া, দুই কিলো চাউল আর কয়টা আলু নিজের গামছায় পোটলা করে বাড়ি ফিরছিল। একখানা ভাঙ্গা কাঠের বাটের ছাতা মাথার উপর ছিল বটে। তবে সেটা বৃষ্টির সাথে নেহাত রসিকতা ছাড়া কিছুই মনে হয়না। বাটের আগায় বড় বড় ছিদ্র দিয়ে বৃষ্টির জল তার কেশহীন সুবৃহৎ মাথাকে বার বার ধৌত করে দিচ্ছিলো। বাড়ির সামনে এসে দেখলো জলের স্রোত পড়েছে বেশ তড়িৎ গতিতেই। মাঝে মাঝে দুএকটা মাছ উঁকি মারছিলো। সুরেন খানিকটা সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। হঠাৎ গোটা পাঁচেক কই মাছের লাইন পড়ে গেলে একটু সামনে। মাছগুলো ওদের কানের সাহায্যে মাটি আঁকড়িয়ে ডাঙায় উঠছে। সুরেন কাঁধের পোটলাটা নিচে রেখে ওমনি সামনে গেল। লুঙ্গির ভিতর এক টানে চারটাকে উঠাতে পারলো একটা জলে টুপ করে পড়ে গেল। বেশ জ্বলজ্বলে চোখে স্মিত হাসিতে মাছগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখলো একনজর। বেশ হৃষ্টপুষ্ট। এই অবস্থায় গরীবের আহারে এর থেকে বড় ভোজ আর কী হতে পারে! বাড়ি এসে দেখে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঝামেলা ঘটেছে। পিচ্ছিল ইটের উপর পড়ে যেয়ে পায়ে ব্যথা পেয়েছে শশী। পাশের পাড়ার হারু কবিরাজ এসে তেল পড়া দিয়ে গেছে। মালিশ করতে বলেছে দিনে কয়েকবার। পা মচকে গিয়েছে; শুয়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে মেয়েটা। আনুভা আর কমলি মাথার কাছে বসা। রাতের বেলায় খেতে গিয়ে সমীর আর রতন একটা মাছ নিয়েই কাড়াকাড়ি শুরু করলো। দূর থেকে কলমি সেটা দেখলো। কিছুক্ষণ চুপ থেকে আর না পেরে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে হেটে গিয়ে দুই ঘা লাগিয়ে দিল নিজের ছেলের পিঠে। এরপর কাঁদোকাঁদো ভাবে এসে বসে পড়লো নিজের মেয়ের শয্যা পাশে। শশী কখনো তার মাকে এভাবে রাগতে দেখেনি। আজ এমন মুখশ্রী দেখে একটু হকচকিয়ে গেছে। সমীর বসে কাঁদছে। আনুভা এসে অনেক শান্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। হুঁকায় টান দিতে দিতে সুরেন দাওয়ার এক প্রান্ত থেকে দেখলো সব। কিন্তু কিছুই বললো না। নিরুত্তর ভাবে দূরের গাছের সারিতে চোখ নিবিষ্ট করে শান্তির টান দিতে লাগলো।

বর্ষাটা যাবে যাবে করেও যাচ্ছে না। ধরণী পৃষ্ঠের কী এক অদৃশ্য মায়ার টানে বার বার নেমে আসে আকাশ ভেদ করে কে জানে! ফসলের মৌসুমে এটা সাহায্য হলেও ফসল কাটার মৌসুমে বড়ই অযাচিত। তবে অযাচিত ঘটনা গুলোই যাচিত হয় কালের পরতে পরতে।

দিন দশেক এভাবে গেল। জল একটু একটু করে কমতে শুরু করেছে। শশীও অনেক সুস্থ। চারদিকের জলমগ্ন স্থল একটু একটু করে পৃথিবীর মুখ দেখছে। কত সুদীর্ঘকালের কালো ছায়া যেন তাদের পৃথক করে রেখেছিল জনাকীর্ণ এই জনপদের বাহারি মানুষ গুলোর পদচিহ্ন থেকে। কতকাল কত রমণী হয়তো এই বুকচিরে জল আনতে যায় না। কতকাল এই রাস্তা কোনো তিন চাকা ওয়ালা জন্তুর চাপে পিষে যায় না। একসময় হয়তো এটাই তার কাছে পীড়ন বলে মনে হতো। তবে এখন সেটা আকাঙ্ক্ষিত। কর্ম ছাড়া জীবনযাত্রা কখনো নির্বাহ হয় না, হতে পারেনা। যার যেটা কাজ সেটা তাকে আপেক্ষিক ভাবে পীড়িত করলেও সেটাই তার মোক্ষম পন্থা জীবনযাত্রার জন্য। আর এই সত্য যেমন ভাবে প্রযোজ্য জীবন্ত যে কোন সত্তার জন্য, ঠিক তেমনি ভাবে প্রযোজ্য যে কোন জড় বস্তুর জন্যই।

অনেক কাল বাবার বাড়িতে গলগ্রহ হয়ে থাকার পর কলমি অবশেষে বাড়ির দিকে যাত্রা করলো। বিশ্বনাথ ওদের নিয়ে যেতে এসেছিল। বিশ্বনাথ শুধু নিতেই আসেনি বরং বেশ চমকপ্রদ এক খবর জানান দিতেও এসেছে। তাদের ঘরের কোণা থেকে এই বড় ট্রাংক পাওয়া গেছে। বৃষ্টির জল শুকানোতে ট্রাংকের উপরের মাটি সরে গিয়ে জেগে উঠেছে। ওরা চারভাই সেটা বের করে। ট্রাংক ভর্তি বেশকিছু টাকা আর অনেক সোনা রুপার জিনিস বের হয়েছে। এটাই যে ওর বাবার লুকানো সম্পদ সেটা ট্রাংকের ভিতরটা দেখেই বুঝতে পেরেছে। যেটা চার ভাগেও নেহাত কম পড়বে না বিশ্বনাথের জন্য। তাই এখন সানন্দে আতিথ্য গ্রহণ করতে পারে তাও বেশ জোরেশোরে জানিয়ে গেল বিশ্বনাথ।

বর্ষার শেষে ফসল অধিকাংশ পচে নষ্ট হয়ে গেল। আগুন সমান দাম দিয়ে জিনিসপত্র কিনে বেঁচে থাকা সুরেনের মতো হতদরিদ্রদের কাছে গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতই অবস্থা। নিজের ভাগের ফসলও নষ্ট হয়ে গেল। যেখান থেকে লোন এনে হাজী সাহেবের জমি নিয়েছিল ভাগে, তারা টাকা দেওয়ার তাগাদা দিচ্ছে। ছেলেমেয়েদের পোশাকের অবস্থাও যা তা। আনুভা শেষ কবে নতুন শাড়ি জড়িয়েছে সেটাও মনে করতে পারেনা। তবে, তৃষ্ণা হয়তো বুঝতে পারে বাবার চোখের ভাষা। তাই ছোট ছোট আশাগুলোকে কাগজের নৌকায় ভাসিয়ে দেয় অনেক দূরে। মেয়েদের এই জগতে চলতে ফিরতে অনেক ত্যাগই করতে হয়। সেটা কখনো নিজের জন্য, কখনোবা পরিবারের জন্য। তবে সবই ঘটে অন্তরালে। সদা থাকে অপ্রকাশিত। প্রকাশ করতে গেলেই সমাজ হেই হেই করে ওঠে। বাঙ্গালি সমাজের এই অপরিপক্বতা নারীর সেই সূক্ষ্ম কিন্তু সুদূরপ্রসারী অবদানকে বহুলাংশে চেপে দিয়েছে কালের স্রোতে।

অবশেষে সুরেন নিরুপায় হয়ে বিশ্বনাথের দ্বারস্থ হলো।

উত্থান পতনের ভিতর দিয়ে এখন কলমির অবস্থা উল্লেখ করার মতো। গৃহস্থালির আতিশয্যে গৃহ যথেষ্ট নজর কাড়ার মতোই। বোনের গৃহে ভালোই আপ্যায়ন হলো। বহুত দিন ভালমন্দ খাওয়ার পরিস্থিতি আসেনা। তাই সুযোগ পেয়ে পেটপূজাটা বেশ ভালো ভাবেই শেষ করলো। এবার কাজের কথায় আসলো সুরেন। সুরেনের কথা শুনে বিশ্বনাথ একটু নড়েচড়ে বসলো। বলল, “দেহেন দাদা আমাগো অবস্থা তো বুজছেন। দোহানডা খাড়া করাইছি। শশীর জন্যি ছেলেপক্ষও রাজি। ঐ হানে তো বেশ টাহা পয়সা লাগে। এহন আপনেরে কীভাবে কী এরতি পারি?” সুরেন একটু হতভম্ব হলো বটে।

তবে ঘরের ভিতর থেকে কলমি সব শুনলো। বিশ্বনাথ দোকানে যাবার আগে সুরেনকে আজ রাতটা তাদের বাড়িতে থেকে যেতে বললো। সুরেন অবশ্য তার অপরাগতা প্রকাশ করলো অকপটে। বাড়ির দিকে অনেক কাজ। তাছাড়া এতো দেনাদারিতে থেকে আতিথ্য গ্রহণ করার মতো আর ধৈর্য্য ছিলনা সুরেনের। বিকালের দিকে বাড়ির দিকে রওনা দিলো সে, তবে যাওয়ার সময় তার বোন কলমি তার হাতে কিছু টাকা গুজে দিয়ে বলল, “দাদা, টাহা কয়ডা রাহো। সামনে পুজো, মামনি আর বাবুর জন্যি কিছু কিইন্যা দিও। আমি আর তো কিছু করতি পারলাম না তুমাগো জন্যি।”

সুরেন বের হয়ে এলো। সূর্য তখনো পশ্চিম আকাশে লুকোচুরি খেলছে। সুরেনের কাছে মনে হলো এই লুকোচুরি তার সাথেই খেলা হচ্ছে। বাড়ি এসে জানতে পারলো পাওনাদার তাগাদা দিয়ে গেছে। অনেক শাসিয়ে গেছে ওদের। নিজের বসতভিটা ছাড়া আর কিছু ছিল বলে তার মনে পড়েনা। তবে সেটা ছাড়াও নেহাত বোকামি ছাড়া কিছু হবে বলে মনে হয়না। আনুভা বুঝতে পারতো সুরেনের ভিতর কী চলছে।

সেদিন সন্ধ্যায় সুরেন বাড়িতেই দাওয়ায় বসে আছে। আনুভা কাছে এসে একটা ছোট পুটলি এনে দিলো সুরেনের হাতে।

“এইডে কী?”

“খুইলে দ্যাহো।”, আনুভা বলল।

দুইটা বালা আর একটা চিকন সোনার চেইন। আনুভার বিয়ের সময় ওটা তাকে পরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

সুরেন তখনো বিড়ি ফুঁকছিল আর চেয়েছিল আনুভার দিকে।

ও কাঁদছে নিঃশব্দে। শব্দহীন কান্নাগুলো খুব উৎকট স্বাদের হয়। দুমড়ে মুচড়ে ফেলে ভিতরটা। মনে হয় পাঁজর ভেঙে হৃৎপিণ্ডটা বের হয়ে আসবে। কিন্তু গলা ফোটে না। কোনো অশরীরী যেন গলাটা চেপে রাখে সর্বশক্তি দিয়ে। আর ভেতরে চলে টাইফুনের প্রলয় নৃত্য!

সুরেন কেঁদেছিল কিনা সেটা অন্ধকারে বোঝা যায় না। তবে আনুভার পাশে বসে থেকে থেকে কাঁপছিল বিড়িটা হাতে রেখেই। যাইহোক সুরেন কোনো আপত্তি না রেখেই ওটা নিয়ে পরদিন থানা শহরে গেল বিক্রি করার জন্য। তবে যে টাকা হয় তাতে নিজের দেনা পূরণ হবার মতো যথেষ্ট নয়। উপায়ান্তর না দেখে করতে হলো বিক্রি। আর কিছু টাকা এখান ওখান থেকে নিয়ে ঋণটা মুক্ত হলো। তবে এখন তার ঘরে কানা কড়িও অবশিষ্ট রইল না। সুরেনের শারীরিক অবস্থা ভাল ছিল না। তাই কায়িক শ্রমের পথটাও বন্ধ ছিল তার জন্য। আনুভার বাবা মার কুলে কেউ ছিলনা। তাই সাহায্য চাওয়ার জায়গাগুলো ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছিল। খালি পাতিলে জল গরম করে ছেলে মেয়েদের বুঝানো হতো রান্না হচ্ছে। ক্ষুধার জ্বালায় কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে যেত। ঘুম থেকে উঠবার আগে সুরেন যদি বাইরে কাজ করে কিছু পেত ওটা ছেলেমেয়েদের কপালে জুটতো। পাশের বাড়ির ফেলে দেওয়া ভাতের ফ্যান তাদের দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় জায়গা করে নিয়েছিল বেশ পাকাপোক্ত ভাবেই। সুরেন তার মাকে মেয়ের বাড়ি পাঠায়। রেখে আসার সময় বলে আসে কিছুদিন পরই নিয়ে যাবে। তবে সেই দিন আর আসতে চায়না। মাঝ রাতে ক্ষুধার্ত ছেলেমেয়েদের ক্রন্দন আনুভাকে প্রতিদিন একটু একটু করে নিঃশেষ করছিল সবার অজ্ঞাতসারে। আনুভা বেশ কয়দিন সুরেনকে ঘুমাতে গেলে বলতো, “আমারে আমার মা খুব ডাহে। মাঝে মাঝে মারে দেখতি পাই আমার শিয়রে খাড়ানো। আমারে দুই হাত বাড়ায়ে ডাহে। আমার রতনের কী হবে?”

পূজার মাত্র সাত দিন বাকি; দেবীপক্ষের সূচনা। এমন এক কাক ডাকা ভোরে আনুভার আর সাড়া মেলে না। সুরেন যতই ডাকে কোনো উত্তর আসেনা। বাইরে থেকে তখন আযানের শব্দ ভেসে আসছে। তৃষ্ণা, রতন তখনো ঘুমাচ্ছে।

কমেন্ট করুন
প্রাক্তন শিক্ষার্থী | সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, চুয়েট

0