ভাল চা, মন্দ চা

লাঞ্চের পর থেকে এ পর্যন্ত পুরোটা সময় নিজের টেবিলে সাদা কাগজে আঁকিবুঁকি করে মাথা গরম করে বসে আছে রন। ঘড়িতে মাত্র সাড়ে তিনটে বাজে। অফিস ছুটির এখনো ঢের দেরি। অবশ্য এর মাঝে চারটেয় রয়েছে চা-বিরতি, ভালর মধ্যে এখন সেটাই পড়ছে চোখে।

রন আবার ঘড়ির দিকে তাকাল। না, সময় কাটছে না। একঘেয়েমি লাগছে খুব। এ অফিসে ঢোকার পর থেকে একটার পর একটা ডিজাইন দিয়ে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা সাজাতে জীববিজ্ঞানীদের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে রন। কাঁহাতক আর এ নিয়ে থাকা যায়!

রন পড়াশুনা করেছে গণিতে। ক্যামব্রিজ থেকে আন্ডারগ্রাজুয়েট শেষ করেছে প্রায় দশ বছর হতে চলল। লন্ডনে ছ’সাত বছরের মত কাজ করেছিল ও। হাই স্কুলে পদার্থবিদ্যা আর গণিতের ক্লাস নিয়ে গবেষণার তেমন সুযোগ পেত না ও। বছর তিনেক আগে হঠাত করেই দু’টো সুযোগ হাতে এসে যায়। দুটোতেই গবেষণার বিস্তর সুযোগ। একটাতে কাজ করতে হবে কমবেশি মডেল নিয়ে – ব্রিটেনের ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডনের বিখ্যাত গাল্টন ল্যাবরেটরিতে। আর একটা হচ্ছে অপেক্ষাকৃত কম মর্যাদার হার্টফোর্ডশায়ারে অবস্থিত একটি কৃষি এবং খাদ্য গবেষণা কেন্দ্রে।, যেখানে রয়েছে বছরের পর বছর ধরে সংগ্রহ করা প্রচুর তথ্য-উপাত্ত নিয়ে কাজ করার সুযোগ। দ্বিতীয় সুযোগটিকেই বেছে নিয়েছে রন। 

রনের এখনকার কাজটি মিস মিউরিয়েল ব্রিস্টলের সঙ্গে। সুন্দরী মিস ব্রিস্টলের নতুন পরীক্ষণ পরিকল্পনায় ওর অফিসের সব সময় কাটছে আজকাল। বড্ড একঘেয়ে। কাজটা, মিস ব্রিস্টল না! বরং মিউরিয়েল খুব স্মার্ট এবং আকর্ষণীয়। রনের ধারণা, সুন্দরী মেয়েরা স্মার্ট হলেও এক ধরনের গাধা হয়। মিউরি এর ব্যতিক্রম না। যেমন, রনের মত হ্যান্ডসাম গণিতবিদকে পাশে রেখেও মিউরি পছন্দ করেছে রসায়নবিদ বিলকে। গাধা মেয়ে! 

ও চাইলে মিউরির কাজটা এক নিমেষে করে ফেলতে পারে। কিন্তু ইচ্ছে করছে না একেবারে। রনের মাঝে মাঝে চিন্তা হয়, বিল আর মিউরিকে নিয়ে ও কি হিংসে করছে? ইচ্ছে করে গড়িমসি করছে মিউরির কাজটা নিয়ে? ‘আচ্ছা চা-বিরতিতে যদি মিউরির সঙ্গে দেখা হয়ে যায়? এক কাজ করি, আগে গিয়ে ওর জন্য চা বানিয়ে নিয়ে আসি’ – ভাবল রন। ছেলেদের কেয়ার পছন্দ করে না এমন মেয়ে ঈশ্বর সৃষ্টি করেননি বলেই রনের ধারণা। 

চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ে রন। কিচেনে কেউ আসেনি তখনো। চায়ের পানি গরমও দেয়া হয়নি। বড় ইলেকট্রিক কেটলটাতে পানি ভরে দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল রন। কিচেনের জানলা দিয়ে বাইরের বাগানের গাছগাছালিতে রোদ্দুরের খেলা দেখতে লাগল রন। হঠাৎ মনে হল “মিউরি ওর চা দুধ দিয়ে খেতে পছন্দ করে। কাজেই চায়ের কাপে আগে দুধ ঢেলে রাখতে পারি”। বাড়তি যত্নটা নিশ্চয়ই মিউরির চোখ এড়াবে না।

রন চায়ের কাপে দুধ ঢালল। এর মধ্যে একজন দুজন করে ষ্টেশনের আরো কিছু বিজ্ঞানী আসতে শুরু করেছে কিচেনে। লিকার হয়ে গেছে। রন নিজের কাপসহ বিল আর মিউরির জন্যে বানানো আরো দুটি চায়ের কাপ একটি ট্রেতে নিয়ে চলে এলো নিজের অফিসের সঙ্গে লাগোয়া মিউরির অফিসে। মিউরি আর বিল এ অফিসটা শেয়ার করে। “আচ্ছা, ম্যানেজারটাও যে কী, কেন আমাকে বিলের ডেস্কটা দিলে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেত!” – অনেকবার ভেবেছে রন। 

চায়ের কাপটা এগিয়ে দিতেই মিউরি হাতে নিয়ে বলল, “থ্যাঙ্ক ইউ, রন।” রন বিলের দিকে ফিরতেই মিউরি বলল, “সরি রন, এ চা তো আমি খাব না!”

বিল এবং রন দুজনেই মিউরির দিকে তাকাল। রন বলল, “কেন, কোন সমস্যা, মিউরি?” বিল শুধু মুচকি হাসল।        

-“সরি, রন। কাপে আগে দুধ ঢেলে চা বানালে সেটা খেতে পচা হয়। আমি খেতে পারিনা”।

রনের মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল। সুন্দরীদের দেমাক আছে, এতদিনে রন তা জেনেছে। কিন্তু তাই বলে এমন তুচ্ছ ব্যাপারেও যে দেমাক দেখাতে পারে তা ওর জানা ছিল না। কোথায় চা করে এনেছে বলে খুশি হবে, তা না, উল্টো খুঁত ধরছে। রাগ চেপে ও বলল, “সত্যি? তুমি আগে দুধ ঢালা চা এর সঙ্গে আগে লিকার ঢালা চা এর তফাত করতে পার? কেমনে কী? সব তো মিলে মিশে এক হয়ে যায়।”

এক হয় কি হয় না, তা বিজ্ঞানীদের বলার কথা। কিন্তু বিজ্ঞান একদিক সমর্থন করলেও ব্রিটেনে চা আগে, না দুধ আগে, এ বিতর্ক সাধারণের মধ্যে চলে আসছে চায়ের আগমনের সময় থেকেই।

-“তা বলছি কী? আমি স্বাদও আলাদা করতে পারি। আমি যাচ্ছি নিজে এক কাপ বানিয়ে নিয়ে আসছি”। মিউরি বলল।

রনের মেজাজ আরো খারাপ হল। তাপ-গতি-বিদ্যা অনুসারে এটা একই হবার কথা। একে ছেড়ে দেয়া যায় না। পরীক্ষা করে দেখতে হবে। দেমাক ভাঙ্গার মোক্ষম সুযোগ।  

-“না, না, তোমার যেতে হবে না। আমি নিয়ে আসছি। দাঁড়াও। বিল, তুমি কি আমার সঙ্গে একটু আসবে?”

বিল আর রন দুজনে কিচেনে চলে গেল। দুজনে মিলে ওরা মোট আট কাপ চা বানাল। চার কাপে আগে দুধ ঢেলে, আর বাকি চার কাপে আগে চা ঢেলে। রনের কাজ দেখে বিলের খুব হাসি পাচ্ছিল। কারণ বিল জানত, মিউরি এ ব্যাপারে খুবই সেন্সিটিভ। 

মিউরির অফিসে ফিরে এলো ওরা আট কাপ চা হাতে।

“ওকে মিউরি, পরীক্ষা হয়ে যাক”, চায়ের ট্রে মিউরির দিকে এগিয়ে দিতে দিতে রন বলল, “এখানে আট কাপ চা। চার কাপ আগে দুধ দিয়ে বানানো, আর বাকি চার কাপ পরে দুধ দেয়া। তুমি একটা একটা করে টেস্ট করবে, আর আমাকে বলবে কোনটা কোন ধরনের।”

মুচকি হেসে মিউরি বলল, “আচ্ছা, তা না হয় বললাম। কিন্তু যদি বলতে পারি, আমার পুরষ্কার কী হবে?”

রন ভাবল বলে, “তুমি বিলকে ছেড়ে আমার কাছে আসবে”। কিন্তু রন নিতান্তই ভদ্রলোক। বিলের সামনে কি আর এ কথা বলা যায়?

-“আচ্ছা, যদি বলতে পার, তোমার ডিজাইনটা আমি আজই করে দেব।”

রাজি হয়ে গেল মিউরি রনের খেলায়, “ওকে, গেম অন! লেট্‌স্‌ ডু ইট!”

ছোটখাটো একটা ভিড় জমে গিয়েছে তখন মিউরির অফিসে। ভিতরে ভিতরে এক ধরনের আনন্দ অনুভব করছিল রন। দৈবক্রমানুসারে প্রথম কাপটা এগিয়ে দিল ও মিউরির দিকে।

মিউরি চায়ে চুমুক দিল। ঠোঁট দুটোর আলতো আলিঙ্গনে একটা হাসির রেখা খেলে গেল ওর চোখে মুখে।

-“এতে আগে চা দিয়ে পরে দুধ মেশানো হয়েছে। ঠিক বলেছি?”

-“হ্যাঁ, বলেছ।” মনে মনে রন বলল, “গুল তো লেগে যেতেই পারে! ফিফটি-ফিফটি চান্স। দেখা যাক বাকিগুলোতে তোমার গুল কেমন কাজে লাগে!” এগিয়ে দিল ও দ্বিতীয় কাপটা। 

রুমভর্তি লোককে অবাক করে দিয়ে মিউরি একে একে সাতটা কাপের প্রিপারেশন সঠিকভাবে বলতে পারল। দুধ প্রথম, চা প্রথম, …। সপ্তম কাপে এসে চতুর্থ “আগে দুধ-পরে চা” কাপটা সনাক্ত হয়ে যাওয়াতে অষ্টম কাপ চাখার প্রয়োজন পড়ল না। ততক্ষণে রনের গা-মাথা ঘেমে একাকার। প্রকাশ্যে এমন নাস্তানাবুদ জীবনে কখনো হতে হয়নি ওকে। তার উপর আবার মিউরির কাছে। অহংকার গিলে ফেলে মিউরির দিকে হাত বাড়িয়ে দিল রন, “ইউ আর আ জিনিয়াস!”

এমন হার মেনে নিতে পারছিলনা রন। বাসায় ফিরে সারা রাত ওর ঘুম আসছিলনা। মনে হচ্ছে অফিসে কেমন করে মুখ দেখাবে ও। বিল ব্যাটার মুচকি মুচকি হাসি দেখলে এমনিতেই গা জ্বলে যায়! 

রাত একটা বাজে। রন হুড়মুড় করে উঠে পড়ল বেড থেকে। পাশের টেবিলে একগাদা কাগজের স্তূপ পড়ে আছে। ওখান থেকে একটা কাগজ টেনে নিল। ভাবল, “আচ্ছা, যদি ধরে নেই মিউরি সত্যি সত্যি দু’ধরনের চায়ের পার্থক্য করতে জানেনা, তাহলে ওর আটটা চায়ের কাপ থেকে চারটা সঠিক কাপ বেছে নেয়ার সম্ভাবনা কত হবে?”

গণিতবিদ রনের জন্য এ প্রশ্নের উত্তর কঠিন কিছু নয়। ও কলম দিয়ে কাগজে লিখল, “১/৭০” বা “.০১৪৩”। অর্থাৎ, মিউরি যদি আসলেই পার্থক্যটা না জানত, তাহলে ওর আটটিই সঠিক বলার সম্ভাবনা ছিল খুবই কম – শতকরা এক ভাগ। কাজেই অনায়াসে ধরে নেয়া যায় ও পার্থক্যটা জানে। আচ্ছা, ও যদি একটা ভুল করত? মানে, আটটা কাপ থেকে ও চারটা কাপকে “দুধ আগে” বলে চিহ্নিত করল, কিন্তু তার মধ্যে একটা ভুল করে “চা আগে” পড়ে গেল। তাহলে কী করত রন? বিশ্বাস করত যে মিউরি সত্যিই দুরকম চায়ের বিভেদ করতে জানে? 

মিউরির চেহারা ভুলে গেছে তখন রন। সে আঁকিবুঁকি করে হাইপারজিওমেট্রিক বিন্যাস ব্যবহার করে কাগজে লিখলঃ মিউরি যদি আসলেই পার্থক্যটা না জানে, তাহলে দৈববলে ওর হুবহু ছ’টা সঠিক (তিনটে “দুধ আগে”, তিনটে “চা আগে”) পাবার সম্ভাবনা = ০.২২৮৬। তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়াল, মিউরির যদি দু’ধরনের চা সনাক্ত করার জ্ঞান না থাকত, তবে মিউরির দু’টো বা তার চেয়ে কম ভুল করার সম্ভাবনা হতো ০.২৪৩৯, বা ০.২৫ এর কাছাকাছি। কাজেই মিউরি দু’টো ভুল করলে ওর জ্ঞান সম্পর্কে সন্দেহ থেকে যেত অনেকখানি। যদি চারটে বা দু’টো সঠিক হত, বা কোনটাই সঠিক হত না তাহলে সন্দেহ আরো বেড়ে যেত। 

হাইপোথিসিস (চা সনাক্ত করার জ্ঞান নেই) সম্বন্ধে অনিশ্চয়তা হুবহু পরিমাপের পদ্ধতিটা ধরতে পেরে রন আনন্দে লাফিয়ে উঠল। কোথায় মিউরি, কোথায় কী? মিউরির কাছে পরাজয় আবিষ্কারের নেশার কাছে কিছুই না! নগ্ন আর্কিমিডিস ইউরেকা বলে যেভাবে রাস্তায় নেমে দৌড়াচ্ছিলেন, রনের মনে হল পাজামা পরেই এখন অফিসে যেতে পারলে ভাল হত। সমীকরণগুলো গুছিয়ে ফেলা যেত টাইপরাইটারে। কিন্তু সে তো হবার নয়। রনকে অপেক্ষা করতে হল সকাল হবার।

কোন এক অপরাহ্ণে সোনালী রোদ্দুরে বিল আর মিউরির বিয়ে হয়ে গেল। রনের কোন আক্ষেপ রইলনা ওতে। কারণ, মিউরির কল্যাণে পাওয়া রনের আবিষ্কারটি পরিসংখ্যানে কালজয়ী “ফিশারের এক্স্যাক্ট টেস্ট” নামে পরিচিতি লাভ করেছে তখনিই।

পাদটীকা:

১। রনের পুরো নাম রোনাল্ড আইলমার ফিশার। ফিশার যদিও বিল রোচ এবং মিউরিয়েল ব্রিস্টলের সঙ্গে কাজ করতেন, ইতিহাসে কোথাও মিউরিয়েল ব্রিস্টলের প্রতি ফিশারের দুর্বলতার কথা পাওয়া যায়নি। উপরের গল্পের এ বিষয়টি লেখকের কল্পনাপ্রসূত। অন্য সব চরিত্র এবং ঘটনা কিছুটা অতিরঞ্জিত করে লেখা হলেও সত্যি। বিয়ের পর মিউরিয়েল ব্রিস্টলের নাম হয়ে যায় মিউরিয়েল ব্রিস্টল রোচ। আর কালক্রমে পরিসংখ্যানের জনক বলে অভিহিত লাভ করেন স্যার রোনাল্ড ফিশার।  

২। এ মাসেই স্যার রোনাল্ড এ ফিশারের মৃত্যু দিবস (উনত্রিশে জুলাই)। ফিশারের ইউজেনিক্স এর উপরে গবেষণা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। সাম্প্রতিক বর্ণবাদ-বিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে ফিশারের বর্ণবাদী কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করে ফিশার পুরষ্কার বাতিলের দাবীর সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন লেখক। এতদসত্ত্বেও, পরিসংখ্যানে ফিশারের অবদান অনস্বীকার্য।

কমেন্ট করুন

ফজলুল বাসেত (পুরো নাম: আবদুশ শাকুর ফজলুল ওয়াহেদ) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষক ।

বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।

পরিসংখ্যান নিয়ে শিক্ষকতা ও গবেষণার পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশের পত্রিকায় অনিয়মিত কলাম লেখেন।

ফজলুল বাসেত

ফজলুল বাসেত (পুরো নাম: আবদুশ শাকুর ফজলুল ওয়াহেদ) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষক ।বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।পরিসংখ্যান নিয়ে শিক্ষকতা ও গবেষণার পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশের পত্রিকায় অনিয়মিত কলাম লেখেন।