বসন্তের রেণু

বাতাসটা বেশ দুরন্ত হয়ে উঠেছে থেকে থেকে। বসন্তের দুপুরে মধ্যগগনে সূর্য যখন প্রখর রোদে সবকিছুকে ঝলসে দিতে চায় তখন হালকা বাতাসের ঝাপটা রোদ্দুর এর ঝাঁজকে মৃদু করে দেয়। গাছে গাছে আমের মুকুল ধরেছে। বাতাসে কচিমুকুলের একটা অম্ল গন্ধ বের হতে শুরু হয়েছে। তবে সেটা প্রকট হয়ে ওঠেনি। গাছের অবস্থান ব্যতীত তা পাওয়া মুশকিল। আর যদি ব্যাপারটা হয় লোহালক্কড়ের বেড়িতে আবদ্ধ কোনো নগর, তবে এসব নেহাৎ অবতারণা মাত্র! গাড়িখানা বাবুবাজার এর সামনে এসেছে। এখানে প্রায়শই জ্যামের ঘানি টানতে হয় সৌরভকে। তার কর্মস্থলের খাতিরে এই রোডটা তার পরিচিত। গাড়ির গ্লাসখানা নামিয়ে কিছু খুঁজছে সে। বেশ কিছু সময় পর একটা সাত কিংবা আট বছরের বাচ্চা মেয়ে  এগিয়ে এলো বেশ সহাস্য বদনে। মুখে একগাদা ময়লার মাঝেও বেতফলের ন্যায় চোখের মণিতে ঠিকরে পড়া শুচিস্মিত হাসির ঝরনা যেকোনো শুষ্ক বালুতেও প্রানের সঞ্চারণ ঘটাতে পারে। সৌরভ জিজ্ঞেস করলো, “কী রে  দীপা? তোকে দেখছিলাম না যে, কোথায় ছিলি?” অবসন্নতার স্বরে ও জবাব দিলো, “রোদ ডি দেখছেন নি! ছায়ায় বইসা আছিলাম। আপনার আইজ এত্তো দেরি ক্যান?” এমন শাসন সুলভ কথা সৌরভকে মাঝে মধ্যেই শুনতে হয় এই মেয়েটার কাছ থাকে।

“দে”, হাত বাড়িয়ে সৌরভ বললো।

“বকুল  না গোলাপ, কোনডা দিমু? সাদা গোলাপ আছে দুইডা। আপনার লাইগা রাখছি। দিমু?”

“দে; তোর যেটা খুশি।”

থলির ভিতর থেকে বের করে সৌরভের হাতে বেশ কিছু ফুল ধরিয়ে দিলো দীপা। ইতিমধ্যে ট্রাফিক হালকা চলতে শুরু করছে। তাড়াতাড়ি মানিব্যাগ থেকে কিছু টাকা ওর হাতে ধরিয়ে গ্লাসটা উঠিয়ে দিল। ফুলগুলোতে পারতপক্ষে অতটা সুবাস না থাকলেও সৌরভ বেশ কয়েকবার ঘ্রাণ নেওয়ার চেষ্টা করলো। দীপাকে ও চেনে গত আট মাস ধরে। বাবুবাজারের সামনের ঐ মোড়টায় ফুল বিক্রি করে,  ফেরি করে। ট্রাফিক জ্যামে আটকে পড়া মানুষকে ফুলের ঘ্রাণের অনুভূতি যোগায় এই বাচ্চা মেয়েটা। নিজে শরীর কিংবা পোশাক অনাদরে রাখলেও ফুলগুলোকে বেশ যত্ন করে ছোট থলিতে পুরে থাকে। অবশ্য এই বাড়তি ভালবাসা ওর ফুলের উপর নয় বরং এটা নিজের খাবার জোটানোর খাতিরেই।সৌরভ তার রোজকার খরিদ্দার। তার জন্য স্পেশালভাবে সাদা গোলাপ কিংবা অন্য কোনো ফুল রাখাটা রোজকার খরিদ্দারকে খুশি করবার একটা প্রচেষ্টা মাত্র; কোনো মায়া নয়। জীবনের প্রারম্ভে বুর্জোয়া সমাজব্যবস্থার চাপে ক্লিষ্ট হয়ে বেড়ে ওঠা এই বাচ্চাগুলো জীবনের হিসাব কষতে শুরু করে ঠিক তখন থেকেই যখন আর দশটা বাচ্চা মায়ের কোলও ত্যাগ করেনি। তবে এই সব হিসাব নিকাষ ছাপিয়ে সৌরভের কাছে দীপার জন্য  আলাদা একটা সহানুভূতি কাজ করে। সৌরভ বিয়ে করেছে বছর দুয়েক হলো। তার স্ত্রী অরিত্রি পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম এ আক্রান্ত। তাই মা হওয়ার সাধটা অপূর্ণ রয়ে গেছে। ছাদ বাগান আর পোষা গিরিবাজের সাথে ঘরকন্না চলে সারাদিন। নিজের অপূর্ণ পাত্রকে পাশে সরিয়ে এসব কিছু নিয়েই ভুলে থাকতে চায় সে। বাস্তবতা হলো, অপ্রাপ্তি হেতু যে পাত্র খালি পড়ে আছে ওটাকে যত নাড়াচাড়া করা হবে শব্দই বেশি হবে। প্রাপ্তিতে ঐ তীক্ষ্ণ শব্দের অনুনাদ ছাড়া আর কিছুই  যোগ হবে না।

সৌরভের সকাল সকাল বাসায় ফিরে আসায় অরিত্রির কাছে সুখকরই মনে হল। লাল প্যাকেটে মোড়ানো বই। বইটার উপর দুইটা সাদা গোলাপ। এগুলো সব টেবিলের উপর রেখে সৌরভ বাথরুমে গেছে। অরিত্রি সৌরভকে উদ্দেশ্য করেই বললো, “সাদা গোলাপ কি ঔ যে দীপা ওর কাছ থেকেই এনেছো?”

“হ্যাঁ, কেনো ভাল লাগেনি?” বাথরুমের ভিতর থেকেই সৌরভ জবাব দিল।

অরিত্রি অবশ্য কোনো উত্তর আর দিলো না। হাফ ডে অফিস করে ছুটি পাওয়ায় একটা গাঢ় ঘুম দিয়ে ঠিক সন্ধ্যার একটু আগেই ঘুম থেকে উঠল সৌরভ। বাসার ছাদে গিয়ে দেখে অরিত্রি টবের গাছগুলোতে পানি দিচ্ছে।

“ঘুম শেষ হলো?”

সৌরভ উত্তর না দিয়ে উদাসভাবে কিছু দেখছিল। ক্ষণকাল পর বললো, “হা,তা তো হলোই, তুমি তাড়াতাড়ি তোমার এসব শেষ করো। আজকে বাইরে ডিনার করবো। অনেকদিন হলো তোমাকে নিয়ে বাইরে যাওয়া হয় না।”

সন্ধ্যার পর বের হলো ওরা। কিছুক্ষণ বেলস পার্কে লেকের বাতাসে বসলো দু’জন। ব্যস্ত শহরের ভিতর এই জায়গাটা খুব প্রিয় অরিত্রির। বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডিতে থাকাকালে ওদের প্রথম পরিচয় হয় এই লেকটার বদৌলতে। তাই জায়গাটা স্থান, কাল অপেক্ষা অধিক গুরুত্ব বহন করে ওদের কাছে। অরিত্রির চোখ জুড়ে এই লেকের সুবিস্তৃত পানি লুকোচুরি খেলছে। বসে থাকা বেঞ্চির পাশের দন্ডায়মান ল্যাম্পপোস্ট এর সোডিয়াম আলো অরিত্রির লাল টিপখানাকে বিবর্ণতা দান করেছে। যেটা ওর ভিতরকার মলিনতারই  রূপক হয়ে বার বার সৌরভের চোখে ধরা দিচ্ছে। সৌরভ বেশ কয়েক বার খেয়াল করলো  জিনিসটা। পরে নিজেই ওর টিপখানা তুলে দিলো।

“কী হলো!” অরিত্রি একটু অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করলো।

বেশ গম্ভীর স্বরে সৌরভের উত্তর ছিল,’কিছু না’।

ডিনার শেষ করে ওরা বাসার দিকে ছুটলো। রাত তখন ১০টার মতো। গাড়িখানা সৌরভ নিজেই চালাচ্ছিল। বামপাশে ওর স্ত্রী। দৃষ্টির সীমানায় রাস্তার পাশে  ফুটপাতে থাকা এক মহিলা তার ছোট বাচ্চাকে কোলে নিয়ে স্তন পান করাচ্ছিল। জিনিসটায় চোখ আটকে গেলো অরিত্রির। সামনের ট্রাফিকগুলো স্লো মোশনে চলছিল বিধায় সৌরভকেও বাম্পারে আগাতে হচ্ছিল ধীর গতিতে। সৌরভ অনেকক্ষণ ব্যাপারটা খেয়াল করছিল। ওর বামহাতটা অরিত্রির হাত স্পর্শ করলো।

একটু হকচকিয়ে উঠলো অরিত্রি। কী এক ঘোরের মধ্যেই ডুবে গেছিলো ও। দু’জনের মুখ চাওয়া চাওয়ি হলো একবার। অরিত্রির একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ছাড়া কিছুই শোনা গেলো না। কেউ কিছু বলছে না। ওদের এই কিছু না বলাই  বহু অকথিত সত্যকে স্বীকার করে নিয়েছিল অকপটে।

দিন  এভাবে কাটছিল ওদের। মাঝে মাঝে ওদের মাঝে তর্কের আসর জমতো। তবে সেগুলো কোনো বাস্তব প্রেক্ষাপটের উপর ভিত্তি করে নয়। বিভিন্ন লেখকের সৃষ্ট  চরিত্রের পক্ষে বিপক্ষে দাঁড়িয়ে যেতো দুইজন। অরিত্রি যদি “যোগাযোগ” এর কুমুদিনীর পক্ষ নিয়ে তাকে বিদ্রোহিনী নারীর রূপ হিসেবে গুণকীর্তন করতো, তাহলে সৌরভ পক্ষ নিতো মধুসূদনের। যদি “চোখের বালি” এর মহেশকে  স্বাভাবিক সৌন্দর্য পিপাসু চরিত্র হিসেবে মনে হতো অরিত্রির কাছে, তাহলে বিনোদিনী চরিত্রকে নির্বিকার চিত্তে প্রভাব ফেলে যাওয়া সুনিপুণ চরিত্র হিসেবেই ধর্তব্য হয়ে যেত সৌরভের কাছে। অনেক সময় এই তর্ক ওদের চোখের ঘুমটাও কেড়ে নিতো।

দেখতে দেখতে পহেলা বৈশাখ এসে গেলো। অরিত্রি সাদা রঙের শাড়ি পড়ে বের হলো সৌরভের সাথে। ওদের অফিসে অনুষ্ঠান আছে। অরিত্রিকে সাথে নিয়েই যেতে হবে। সেদিন রিকশা নিয়েই  বের হলো ওরা ;শখের বসে। অফিসের অনুষ্ঠান শেষে  বৈশাখী মেলাতে ঘুরতে গেলো। ছোটবেলায় বাবার সাথে অনেক বার মেলায় গেছে অরিত্রি। তবে সেই মেলার লোকজ আভিজাত্য এখন নিছক লৌকিকতা মাত্র মনে হয়। মেলায় ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ সৌরভ খেয়াল করলো কেউ তার জামা ধরে টানছে। পকেটমার ভেবে তড়িৎগতিতে পিছনে ফিরে জাপটে ধরলো হাত। দেখলো দীপা দাঁড়িয়ে। মুখে সেই চিরাচরিত হাসি।

“উনি ক্যাডা আপনের সাথে? বউ?”, বলে আবার ফিক করে হেসে দিলো।

পিছন ফিরে অরিত্রিও এতক্ষণে একটু ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছে। সৌরভ সব বললো ওকে। অরিত্রি সম্মিত বদনে বললো, “হ্যাঁ, আমি উনার বউ। তোমার ফুলগুলো খুব সুন্দর।”

“তুই এখানে কী করিস?” সৌরভ জিজ্ঞেস করল।

“মেলায় আইছি ঘুরবার লাই।”

অরিত্রি এক পলকে দেখছে ওকে। ধুলাময় চুলগুলোতে বেণীও করেছে দীপা। বেশ অবাক নয়নে অরিত্রি জিজ্ঞেস করলো, “বাহ!তুমি তো সুন্দর বেণী করতে পারো।”

“আম্মায় কইরে দিছে।”, বলে আমার হেসে দিলো।

অরিত্রি ওকে কাছে নিয়ে আদর করলো। বললো, “কিছু কেনার ইচ্ছা আছে তোমার?”

“হ, কিনমু না? সব কিনমু! বড়ো হইয়ে যখন আপনের মতন হমু আপনের মতো এমন শাড়ি, চুড়ি কিনমু। আপা আপনের টিপডা কিন্তু খুব সুন্দর।”

অরিত্রি  হেসে  ওর কাঁধে হাত রেখে বললো, “চলো,তোমার জন্য টিপ দেখি।”

দীপাকে সাথে নিয়েই ওরা মেলায় ঘুরলো। মেলায় ওদের কিছু পরিচিত ব্যক্তিবর্গ তাদের পরিবার নিয়ে এসেছে। সৌরভের সাথে দেখা হয়ে গেলো। অরিত্রির সাথেও। তবে দীপাকে  ওদের সাথে ঘুরতে দেখে নাক সিটকাতে ভুলেনি কিছু তথাকথিত উচ্চমার্গীয় ব্যক্তিরা। সৌরভ কিছুটা বিব্রত হলেও অরিত্রি নির্বিকার ছিল। মেলায় ঘুরে ঘুরে ওকে কিছু জিনিস কিনে দিলো অরিত্রি নিজেই। সৌরভের এসব বিষয়ে মত ছিল না,তবে অরিত্রির এমন অবস্থায় তাকে নিবৃত্ত করাটা আখেরে নিজের জন্য বোকামি হবে বুঝতে পেরে আর কোনো উচ্চবাচ্য করলো না।

প্রকৃতি শূন্যস্থান রাখতে চায় না। প্রতিনিয়তই এই শূন্যতা পূরনের চেষ্টা চালিয়ে যায় প্রতিটা জীব তথা জড় শক্তি! উপযুক্ত সময় আর সুযোগের মেলবন্ধনে এই শূন্যতা পূরনের কার্য সম্পন্ন হয়। বায়ু প্রতিনিয়তই তাপের দহনে দগ্ধীভূত হয়ে হালকা হয়ে উঠে যায় মহাশূন্যে। আর উপযুক্ত সময় বুঝে এই শূন্যস্থান পূরনে সৃষ্টি হয় নিম্নচাপের  যা দুর্নিবার। তাকে বাঁধা দিতে গেলেই  যত বিপত্তি!

দীপাকে দেখে আসবার পর থেকে অরিত্রির ভিতর মাতৃত্বের মন্থন ঘটে। এতোদিনকার সৌরভের স্বেচ্ছাপ্রণোদিত কর্ম  এখন আবশ্যিক কাজে পরিণত হয় অরিত্রির অনুরোধে। প্রতিদিন তার দীপার থেকে ফুল কেনা চাইই চাই!সৌরভ যতই বোঝায় না কেন সে তার বক্তব্যে অটল।

ভঙ্গুরতা ধর্ম নিয়েই নারীজাতি পৃথিবীতে আসে। এদেরকে সোজা করতে গেলে এরা নিজেই চুরচুর হয়ে ভেঙে পড়বে। তাই শান্তি হেতু নিজের দৃঢ়তার বিজারণ ঘটানোই বুদ্ধিমানগন শ্রেয় মনে করেন। সৌরভও ঐ পথ অনুসরণ করতে লাগলো। অরিত্রি মাঝে মাঝে সৌরভের সাথে বের হতো যাতে করে দীপার সাথে দেখা হয়। কথা বলতে পারে। অভুক্ত থাকা দীপাকে নিয়ে মাঝে মধ্যে রেস্টুরেন্টে গিয়ে খাওয়াতো অরিত্রি। দীপার পক্ষে এর অর্থ বোঝবার জ্ঞান না থাকলেও সৌরভ এসব দেখে কষ্ট পেত প্রবল ভাবেই। তবে ঘুণাক্ষরেও সেটা সামনে প্রকাশ হতে দিতো না। নিজের আর্থিক তথা মানসিক স্বাবলম্বিতা ছাপিয়ে  বিধাতা সৃষ্ট এই দীনতা ঘুচাবার সামর্থ্য সৌরভের নেই। আর এখানেই ওর ট্রাজেডি।দীপাকে স্কুলে ভর্তি করাতে চেয়েছিল অরিত্রি। কিন্তু দীপার মা আছে, বস্তিতে থাকে ওরা। ওরা এটা চায় না যে দীপা তার কাজ ছেড়ে স্কুলে যাক। দীপার বাবা মাদক চোরাচালানের দায়ে জেলে পচে মরছে। আর যে ভাই আছে সে পঙ্গু। ভিক্ষা বৃত্তি করে। এমন অবস্থায় দীপার মার পক্ষে দীপার রোজগার বন্ধ করা সম্ভবই নয়।

বন্ধনহীন বৃহত্তর পৃথিবীতে মানুষ যতটা সৃষ্টিশীল কাজে নিমজ্জিত হতে পারে, বন্ধনযুক্তদের বেলায় সেই সুযোগ কমই ঘটে।  পিছনের টান তাকে সৃষ্টিতে অবদান রাখতে দেয় না। অদৃষ্ট রোয়াতে আটকে পড়ে চিরাচরিত কাজে জীবনকে লগ্নীপত্রে সমর্পণ করে আমৃত্যু পর্যন্ত।

ঈদের ছুটিতে সৌরভ আর অরিত্রি ওদের দেশের বাড়িতে বেড়াতে যাবে। শপিং শেষ। বাড়ি যাওয়ার কিছু দিন আগে  সৌরভের অগোচরে অরিত্রি একটা জামা দিয়ে আসে দীপাকে। নীল রঙের উপর সাদা রংয়ের কাজ করা। অরিত্রি নিজেই পছন্দ করে কিনেছিল। জামাটা দিয়ে চলে আসার সময় দীপা বললো, “তোমারে আমি একটা জিনিস দিবো, তুমি বাড়ি থাইকা আসো তারপর।”

ওরা বাড়িতে চলে গেলো। ছুটিতে ভাই-বোন সবাই বাড়িতে। আনন্দের কোনো কমতি নেই। আনন্দে উৎসবে অরিত্রির মন ও পূর্বাপেক্ষা বেশ প্রফুল্ল। ইদের তৃতীয় দিন। সকাল ১১টার মতো বাজে তখন ঘড়িতে। সৌরভ বাড়িতে একা বসেই মোবাইলে ইমেইল বক্সটা চেক করছে। টিভিটা অন করা। খবর হচ্ছে। হঠাৎ একটা শব্দ ওর কানে খুব লাগলো।

খবরটার দিকে অবচেতন  মনেই একটু মনোযোগ দিল।

“গতকাল রাত ১টা নাগাদ রামছড়ি রেললাইনের পাশে  একটা ৯ বছর বয়সী  মেয়ের মৃতদেহ পাওয়া গেছে। পুলিশ মৃতদেহটি সনাক্ত করে ময়নাতদন্তের জন্য চালান করে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট অনুযায়ী  ভিক্টিম রেপ এন্ড মার্ডারের স্বীকার হয়েছে। ভিকটিম  ইসলামপুর বস্তির বাসিন্দা আফজাল হোসেনের কন্যা ফরিদা ইয়াসমিন (দীপা)। বাবুবাজার সার্কেলে ফুল বিক্রি করত সে। তবে ঘটনার সাথে জড়িতে কে বা কারা তা এখনো নিশ্চিত করা যায় নি।”

বুকের ভিতর হঠাৎ একটা মোচড় দিয়ে উঠলো সৌরভের। নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে সে আস্তে করে টিভিটা অফ করে দিলো। অরিত্রি তখন অন্য একটা রুমে বসে “কপালকুণ্ডলা” পড়ছিল। শেষের দিকে। সৌরভ খানিকক্ষণ ওর পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।

অরিত্রি ক্ষণকাল পর টের পেয়ে  সৌরভের মুখের দিকে না তাকিয়েই বললো, “সব মেয়েকেই কেন  এভাবে বিসর্জন দিতে হয়, বলতো! কখনো পিতার কল্যাণ হেতু, কখনো স্বামীর জন্য আবার কখনো সমাজের জন্য।”

সৌরভের কণ্ঠ ভারী হয়ে আসছিল ক্রমশ। বলতে গিয়েও বলতে পারলো না, অরিত্রি, তোমার দীপারও বিসর্জন হয়ে গেছে! গত রাত্রে। সেই ধ্বনি কি তুমি শুনতে পাও, অরিত্রি!

কিন্তু পুরুষ মানুষের সব অবস্থায় ভাঙতে নেই। জগৎ সংসারের সংস্থাপনে এক পুরুষ যখন বিসর্জনে রচনা করে ঠিক তখনই অন্য কোনো পুরুষকে সেই শোক শারঙ্গীর টুটি টিপে ধরতে হয় বৃহত্তর মঙ্গলের অভিপ্রায়ে। সৌরভ  সেই সংস্থাপনই করলো, সহাস্য বদনে অরিত্রির মুখ পানে একবার তাকিয়ে। পরক্ষণেই রুম থেকে বের হয়ে গেল। সৌরভ জানে এই খবর প্রকাশ পাবেই অরিত্রির কাছে।যে কয়টাদিন চাপা রাখা যায় সেটাই এখন সৌরভের কর্তব্য হবে। সে ছাড়া কেউ বুঝবে না এই সম্পর্কের গভীরতা। আর চারদিন ছুটি। সৌরভ সর্বোতভাবেই এই সম্পর্কিত কোনো বার্তা যাতে করে অরিত্রি অবধি না যায় সে চেষ্টা  করে গেছে। সফলও হয়েছে। তবে তার চোখে মুখে একটা অস্থিরতা খেয়াল করেছে অরিত্রি। অফিসিয়াল ব্যাপার বলে কাটিয়ে দিয়েছে সৌরভ।

অবশেষে ছুটি কাটিয়ে নিজের কর্মক্ষেত্রে ফিরলো ওরা। বাড়ি গিয়ে মনটা ভাল ছিল অরিত্রির। এতো আপন মানুষের সাথে একসাথে থাকা আর গ্রাম্য বাঙালীদের দিলখোলা আলাপ আচরণে কারো মন খারাপ থাকাটাও অযৌক্তিক! তাই বাড়ি থেকে ফিরে তার রেশ কাটতেও একটু সময় লাগে বৈকি। সৌরভ এখন অফিসে থাকতেই পিওনকে দিয়ে ফুল আনিয়ে রাখে প্রতিদিন যেনো দীপার সাথে দেখা করার প্রয়োজন অরিত্রির বোধোদয়ই না হয়। প্রথম দিনেই অফিস থেকে ফেরার সময় একগাদা বই কিনে আনলো। বইপোকা অরিত্রি তো মহাখুশি। একসাথে এতে বই কী হেতু আনা হল তার কারণ জিজ্ঞেস করতেও ভুলে গেলো সে। কয়েক সপ্তাহ গেল এভাবে। সৌরভও খানিক দুশ্চিন্তা মুক্ত হয়েছে। আর অফিসের কাজে ব্যস্ত হয়ে গেছে। ঠিক এমনই একদিন অরিত্রির শপিং এর ইচ্ছে হলো। সৌরভকে ফোন করে বলাতে সৌরভ বললো, “আমি গাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি। তুমি করে নাও। আমি একটু ব্যস্ত আছি কাজে।”

অরিত্রি বের হলো। শপিং করতে গিয়ে ব্লু একটা ড্রেস দেখে হঠাৎ তার মনে পড়ল, “এমন একটা ড্রেস তো দীপাকে দিয়েছিলাম। কিন্তু ওতো পড়ে দেখালো না কেমন লাগলো।” শপিং শেষ করে দীপা যে সার্কেলের আশে পাশে ফুল হাতে দাঁড়িয়ে থাকতো ওখানে ড্রাইভারকে কিছুক্ষণ দাঁড়াতে বললো। তবে আশে পাশে দীপাকে দেখা গেলো না। স্কুলে ভর্তির জন্য একবার দীপা যে বস্তিতে থাকতো ওখানে যাওয়া হয়েছিল অরিত্রির। তাই মনস্থ করল “একবার ওর বাসাই গিয়েই দেখি না!” ড্রাইভারকে বললো, “আপনি চলে যান অফিসে। আমার এখানে কাজ আছে একটু। আমি সিএনজি করে চলে যাবো।”

একটা রিক্সা নিয়ে ইসলামপুরের দিকে রওনা দিলো অরিত্রি। দীপার বাসায় পৌঁছে জানলো সব, শুনলো সব। ছেড়া সেই নীল জামাটা বের করে আহাজারি করতে করতে সব বললো দীপার মা। ধর্ষিত হওয়া রক্ত মাখা ওরই দেওয়া সেই নীল জামা। জামাটাকে ছিড়েখুঁড়ে খেয়েছে এই সর্বভুক দ্বিপদী প্রাণীর দল। কতিপয় পিশাচের কদর্য চাহিদার পণ্য হয়ে যাওয়া দীপার একবার হলেও কি মনে হয়েছিল, আহলাদ করে যার দেওয়া কাপড়খানা  পড়েছিল সেই অরিত্রিকে! তবে হারিয়ে যাবার আগে নিজের দেওয়া কথা রেখে গেছে দীপা। ফুল বিক্রি থেকে কিছু টাকা দিয়ে একটা নীল শাড়ি কিনেছিল। শাড়িটা হয়তো দামি নয়। তবে ঐ শাড়িটার মূল্য অপেক্ষা তার পার্থিব অস্তিত্ব আজ ঢের দামি।।

অরিত্রি বাড়ি চলে এসেছে।

সারাদিন শেষে সৌরভ যখন বাসায় পৌছায় তখন রাত। বাসায় ঢুকার সাথে সাথেই সৌরভকে ধরে অরিত্রির সে কী কান্না! নীল শাড়িখানা ধরে বাচ্চাদের মতো ফুপিয়ে কাঁদছে। সৌরভ আজ কিছু বলছে না। অরিত্রি কি জানে! তার স্বামীকে আজও আসা যাওয়ার পথে দীপাকে কল্পনা করতে হয় অবচেতন মনে। ওর গাড়ির গ্লাসে টোকা দেওয়া, মনের ভিতরে এসে এতখানি প্রভাব বিস্তার করে থাকতে পারা, সমাজের চোখে সামান্য এই ফেরী করা বালিকাকে  সবাই হয়তো সমবেদনার চোখে দেখবে। অনুভব করতে পারবে না। ফুলের রেণুর মতো ছুটে ছুটে, সবাইকে ফুলের সুবাসে ভাসিয়ে একদিন হাসতে হাসতেই হারিয়ে যায় আমাদের সমাজের এই পুষ্পরেণুগুলো। এই সমাজব্যবস্থার কাঁদার পাক তাকে উড়তেই দেয় না। চোরাবালির মতো টেনে নামায় অন্ধকারে। স্থান কাল ভেদে এই বিসর্জনগুলো হয়তো অবয়ব বদলায়  ঘটনার ভিন্নতায়। তবে পরম্পরার চূড়ান্ত বিচারে একই ফল লাভ করে।

নতুন বছরে আবার বসন্ত এসেছে। সৌরভের গাড়ির গ্লাসের উপর আবারো ঠক ঠক ঠক। গ্লাসটা নামানো মাত্রই, “স্যার, এই কয়ডা মালা আছে, কিনা নেন না স্যার।”

কমেন্ট করুন
প্রাক্তন শিক্ষার্থী | সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, চুয়েট

0