সোনার হরিণ

অনেক হয়েছে। এই লোকটার বেহায়াপনা রুনা আর সইবে না! এই নিয়ে কতবার রাগ করে বাচ্চা নিয়ে বাপের বাড়ি চলে এসেছে রুনা হিসেব নেই!

প্রতিবার ঐ লোকটা আবার ফিরিয়ে নিয়ে যায়। রুনা কিছুতেই স্বামীর উপর রাগ করে থাকতে পারে না। আবার ফিরে যায় সেই দুঃখ কষ্টের সংসারে। সবসময় পরদিনই এসে হাজির হয়। এবার হলো টা কী? সাত দিন হয়ে গেল কোন খবর নেই। একটা ফোনও করেনি  রুনাকে বা রুনার বাবা-মাকে।

অদ্ভুত!

খুব চিন্তা হচ্ছে।

একবার ঘুরে আসব কি? মনের মধ্যে হাজারটা দুশ্চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে।

শপিং এ যাওয়ার নাম করে বের হল রুনা। এখন নিজেরই হাসি পাচ্ছে। নিজের বাসায় যাচ্ছে মিথ্যা কথা বলে! সিএনজি থেমে যেতেই আবার আগের চিন্তা গুলো মাথায় চেপে বসল। সাত তলা বিল্ডিং এর সপ্তম তলায় বাসা। বিয়ের পর থেকেই ওরা সবসময় সবচেয়ে উঁচু ফ্ল্যাটে থাকে। এসব বাসার ভাড়া তুলনামূলক কম। একটা পত্রিকা অফিসে চাকরি করে রুনার বর শিমুল। কতইবা মাইনে পায় অথচ রুনা কত চমৎকার সামলে নেয়। টাকা পয়সা নিয়ে কখনো ঝগড়া বাঁধে না  ওদের। ঝগড়া বাঁধে শিমুলের ভুলো মন নিয়ে। সারাক্ষণ মানুষটা কী যে ভাবতে থাকে! এই ছাতা হারাবে না হয় টিফিন বাটি! কেউ একটু মায়াভরা চাহনিতে দুটো কথা বললেই পকেটে যা থাকে বের করে দেয়!

 খুব ধীরে ধীরে সিড়ি বেয়ে উঠল রুনা। দরজার  সামনে একগাদা ময়লা! দরজা খোলাই আছে। মেঝেতে পুরু ধুলার আস্তরণ। সব ঘর এলোমেলো। বুকের ভেতর হিম হয়ে গেল রুনার। ধপ করে সোফায় বসে পড়ল রুনা। কী হলো মানুষটার? কাঁপা কাঁপা হাতে ফোন করল।

ফোন সুইচড অফ!

দুহাতে মুখ চেপে কাঁদতে আরম্ভ করল রুনা। দুপুর নাগাদ ঘটনা জানাজানি হলে আত্মীয় স্বজন। প্রতিবেশী সবাই এসে হাজির হল। রুনার অবস্থা খারাপ। একেকজন একেক মত দিচ্ছে। রুনার ছোট বোন টুম্পা বলল। এভাবে বসে না থেকে পুলিশকে খবর দিতে  হবে। হাসপাতালে খোঁজ নিতে হবে। সবাই ভাগ করে নিল কে কোথায় যাবে…

পুলিশ প্রথমেই বলে বসল। সাত দিন কি ঘুমিয়ে ছিলেন? এত দিনে কত কিছুই তো হতে পারে! হাসপাতাল। মর্গে খোজ নিন গিয়ে। বলেই গা এলিয়ে বসে রইল। রুনা বুঝল যা করার তাদেরই করতে হবে। ঢাকায় হাসপাতাল তো একটা দুটো নয়…. তাছাড়া এত বড় শহরে কোথায় খুঁজবে মানুষটাকে। তিন দিন খুব ঘটা করে খোঁজ চলল। তারপর যে যার বাড়ি চলে গেল। এর মধ্যে পুলিশ চারটা বেওয়ারিশ লাশ দেখিয়েছে। একটাও মেলেনি। কী যে উৎকণ্ঠার ভেতর কাটছে রুনার দিন।

এক মাস হতে চলল। কোন খোঁজখবর পাওয়া গেল না। সবকিছুর জন্য রুনা নিজেকেই দায়ী করে। সেদিন অমন করে ঝগড়া করে বাসা থেকে বের হয়ে না এলে হয়ত এমন হত না….

মানুষটাকে চিরতরে হারালাম? নিজের মনকে প্রবোধ দিতে পারে না রুনা। প্রতিটা মুহূর্ত মনের ভেতর কাঁটা বিঁধে আছে কখন যে খারাপ কোন সংবাদ আসবে। কে জানে।

তিন মাস পর।

বর্ষার দুপুর। মেয়েকে স্কুল থেকে ফেরার সময় কাকভেজা হয়ে গেছে রুনা। ফোনটা সেই রিক্সা থেকেই বেজে চলেছে। কিন্তু এত বৃষ্টির মধ্যে মেয়ে কে কোলের মধ্যে নিয়ে ভালোমত পলিথিনে মুড়িয়ে নিয়েছে। আরেক হাতে ব্যাগ। ব্যাগে মোবাইল বাজছে। রিক্সা থেকে নেমে ভাড়া মিটিয়ে বিল্ডিং এর নিচে দাঁড়িয়ে ফোন বের করে দেখে শিমুলের ভাগনি অন্তরার নম্বর। ছয়টা মিসড কল।

-কী ব্যাপার অন্তরা? আমি নিতুকে স্কুল থেকে ফিরলাম । কী যে বৃষ্টি এখানে…

-সেসব কথা পরে হবে মামী। আগে তোমরা এক জায়গায় আসো।

-কোথায় যাব?

-আমি ঠিকানা দিচ্ছি।

-কেন? কী হয়েছে?

-চলে আস। আমি ঠিকানা টেক্সট করছি।

-আরে…

জবাব না দিয়ে কেটে দিল অন্তরা। সাথে সাথে বড় ভাইকে ফোন করল রুনা। বলল এখুনি অফিসের গাড়ি নিয়ে আসতে। খুব জরুরি দরকার।

গাড়িতে রুনা। একমাত্র মেয়ে। বড় ভাই মিলে অন্তরার টেক্সট করা ঠিকানাতে রওনা দিল। পুরো আটানব্বই কিলোমিটার দূর। কিসের আশায় কেনই বা ছুটে চলেছে রুনা নিজেও জানে না। জায়গা মত পৌঁছে অন্তরাকে কল দিল রুনা। কাছেই ছিল ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল।

-কী হয়েছে মা? এবার বল। কোন বিপদ হয়নি তো?

-বলছি তার আগে ভেতরে এসো। এক বিশাল বাগান বাড়িতে ঢুকল। এই বাড়ির মালিক আমেরিকাতে স্থায়ী বসবাস করেন। এই বাড়ির দেখভাল করে কেয়ার টেকার। চাকর। ড্রাইভার। আর একটা বুড়ো মালি আছে যে তিন পুরুষ ধরে এই বাড়ির বাগানের পরিচর্যা করে চলেছে। সবাই বাগানের চেয়ারে বসল। বুড়ো মালি একজনকে ডাক দিল। ধীর পায়ে এগিয়ে এলো লোকটা। মুখে অনেক দিনের না কামানো দাড়ি। চোখের নিচে কালি। ওজনও অনেক কমে গেছে। পরনে লুঙ্গি আর সুতির পুরোনো ফতুয়া। হাত-পা কাদা মাখা।বাগানে কাজ করছিল।

বুড়ো মালি নাতীকে নিয়ে সরকারী হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে গিয়েছিল। ফেরার পথে দেখে এক লোক ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছে। হাসপাতালের আয়া ছিল পাশে  বলল। যে ইনি ছিনতাইকারীর দ্বারা আহত হয়ে বিশ দিন ভর্তি ছিলেন, । এখন আর আগের কিছু মনে করতে পারছেন না। মালির মায়া হয়। সাথে করে নিজের কোয়ার্টারে নিয়ে যায়। একা একা তারও ভীষণ খারাপ লাগে। নির্বিকার ভাবে কাজ করে শিমুল। নিজের বাসায় যাওয়া বা প্রিয়জনদের দেখতে চাওয়ার কোন আকুতি নেই তার। এজন্য মালি কোন খোঁজ খবর করেনি। পুলিশকে বলা উচিত ছিল, সে বুঝতেই পারেনি।

অন্তরা এই বাড়ির সামনে দিয়ে রোজ ছাত্র পড়াতে যায়। ও বেশ কিছু দিন ধরে এই লোকটাকে দেখেছে। দেখেই বুকের ভেতর হু হু করে উঠেছে। খোঁজ নিতেই আসল সত্য বেরিয়ে এলো।

রুনা লাফ দিয়ে উঠে দৌড়ে সামনে গিয়ে দাঁড়ায় মানুষটার। মানুষটা আবেগহীন চোখে তাকিয়ে থাকে। রুনার চোখে প্রমত্তা নদীর বাধ ভেঙ্গে গেল।

দুই বছর পর।

রুনাদের আর ঝগড়া হয় না। শিমুলের ভুলো মন। পাগলামি সব মেনে নিয়েছে রুনা। এখনও সম্পূর্ণ সুস্থ না শিমুল। পত্রিকা অফিসে সবাই ওকে খুব ভালোবাসে। চাকরিটা ধুঁকে ধুঁকে চলছে। রুনা নিজেই ঘরের সব কাজ করে। মেয়েকে পড়ায়, অনলাইন বিজনেস চালু করেছে খাবার বিক্রির। আরো বেশি হিসেব করে সংসার চালায়।

রুনা তার হারিয়ে যাওয়া সোনার হরিণ আবার খুঁজে পেয়েছে। এবার আর ভুল করবে না।

কমেন্ট করুন