দ্য হানি ট্র্যাপ

(১)

শহীদুল্লাহ হল থেকে বের হয়েছি সকাল দশটায়। ঘন্টায় দু’শ টাকা দরে রিকশা ভাড়া করে ঘুরতে ঘুরতে বাবুবাজার ব্রিজ পার হয়ে কেরানীগঞ্জ চলে এসেছি।

একটা খালের বাঁকে দুই রাস্তার মোড়ে ‘একতা হোটেল’ দেখতে পেয়ে রিকশা বিদায় করলাম। লাঞ্চের জন্য বেছে নিলাম ভুনা খিচুড়ি, হাসের মাংস আর আইস-কোল্ড স্প্রাইট। এত স্বাদের রান্না অনেকদিন খাইনি।

ছায়াঘেরা পথে কিছুক্ষণ হাঁটলাম। একটা আমগাছের নিচে বেঞ্চ পাতা রয়েছে দেখলাম। ঠিক এমনটাই মনে মনে চেয়েছি। বেঞ্চে বসে খালের পানির দিকে তাকিয়ে রইলাম। ঢাকা শহরের এত কাছে এমন গ্রামীন পরিবেশ!

একা একা সেলেব্রেট করছি। গতকাল বিকালে অনার্স ফোর্থ ইয়ারের রেজাল্ট দিয়েছে। প্রায় চব্বিশ ঘন্টা পার হয়ে গেল, এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না পাশ করেছি। সিজিপিএ ২.৫৩।

হলে সেলেব্রেট করার উপায় ছিলো না। আমার দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধু ফেল করেছে। ওরা দু’জন নোট গুছিয়েছে, সেই নোট পড়ে আমি পাশ। আমার চেয়ে বেশি পড়ে, আমার চেয়ে ভালো পরীক্ষা দিয়ে ওরা দু’জন ফেল। ভার্সিটির মূল্যায়ন পদ্ধতি বড়ই অদ্ভুত!

পাঁচটা বেজে গেছে। সিদ্ধান্ত নিলাম, একতা হোটেলেই বিকালের নাস্তা করবো।

(২)

জানালার পাশের একটা টেবিলে বসে নাস্তার অর্ডার দিলাম – শিক কাবাব, পরোটা আর স্প্রাইট।

পাশের টেবিলে দু’জন লোক বসে আছেন। একজনের মাথায় চুল কম, প্লেটে খাবারও কম। একটা সিংগাড়ার অর্ধেকটা খেয়েই তার খিদে মিটে গেল। একটা চায়ের অর্ডার দিলেন তিনি।

অন্য লোকটির মাথা-ভর্তি চুল আর প্লেট-ভর্তি খাবার। তাকে বলা যায় সর্বভুক। একটা মোগলাই দু’তিন মিনিটে সাবাড় করে তিনি একটা ফালুদা অর্ডার দিলেন।

আমরা তিনজন ছাড়া রেস্টুরেন্টে আর কোনও কাস্টোমার নেই। ঐ দু’জন পরষ্পরকে চিনতেন না, এইমাত্র পরিচয় পর্ব সারলেন। ‘টেকো’ লোকটার নাম টুটুল আর ‘খেকো’ লোকটার নাম সেলিম।

এত টেবিল ফাঁকা থাকতেও দু’জন অপরিচিত লোক কেন এক টেবিলে বসলেন? একটু ভেবে আমি ঘটনাটা re-construct করলাম এভাবে: টুটুল সাহেব প্রথমে এলেন, টেবিলটাতে বসলেন, একটা সিংগাড়া অর্ডার দিলেন, তারপর উঠে হাত ধুতে গেলেন। ঠিক তখনই সেলিম সাহেব এলেন, টেবিলটা ফাঁকা আছে মনে করে বসে পড়লেন। ওয়েটার এসে টুটুল সাহেবের জন্য সিংগাড়া রেখে গেলেন। সেলিম সাহেব যেহেতু বসে পড়েছেন, আর উঠলেন না। টুটুল সাহেব এসে হয়তো অন্য টেবিলে বসতেন, কিন্তু তার সিংগাড়া এখানে দেয়া হয়েছে বলে তিনি এখানেই বসলেন।  

একটা সিংগাড়া দু’জন অপরিচিত লোককে এক টেবিলে বসিয়েছে!

হঠাৎ মনে হলো, মানুষ খুব কমই ‘চেয়ারে’ বসে। ছাত্ররা ‘সিটে’ বসে পরীক্ষা দেয়, দর্শক ‘সিটে’ বসে সিনেমা দেখে। সবচেয়ে মজার কথা, সবাই ‘টেবিলে’ বসে খায়। বন্ধুদের সাথে কোথাও খেতে গেলে আপনি হয়তো বলবেন, আয় আমরা এই ‘টেবিলে’ বসি।

সেলিম সাহেবের মোবাইলে রিংটোন বেজে উঠলো।

‘কিরে ব্যাডা, তুই কি লঞ্চে ওঠতে পারছো?’ কলটা রিসিভ করে হাসিমুখে বললেন সেলিম সাহেব। ওপাশের কথা শুনে ‘বাই’ বলে কথা শেষ করলেন।

‘কিছু মনে করবেন না,’ বললেন টুটুল সাহেব, ‘আপনার বাড়ি কি বরিশাল?’

একটু হাসলেন সেলিম সাহেব। বললেন, ‘আমার বন্ধু কল করেছিলো। ওর বাড়ি বরিশাল, তাই ঠাট্টা করে ওভাবে কথা বলেছি।’

‘বরিশালের মানুষ কাউকে “তুই” সম্বোধন করলেও খাইছো, করছো – এরকম বলে কেন?’

সেলিম সাহেব কিছু না বলে হাসলেন।

আমি হঠাৎ তাদের আলোচনায় যোগ দিলাম। বললাম, ‘শুধু বরিশালের লোকেরা বললেই দোষ? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখলে তো দোষ হয় না!’

দু’জনই অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালেন। সেলিম সাহেব বললেন, ‘রবীন্দ্রনাথ কোথায় এরকম লিখেছেন?’

‘কেন, ঐ গানটা শোনেননি? যদি “তোর” ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা “চলো” রে।’

‘আরে, তাই তো!’ দু’জনই একসাথে হেসে উঠলেন।

‘আপনার বাড়ি কি বরিশাল?’ টুটুল সাহেব জিজ্ঞেস করলেন।

‘না,’ বললাম আমি।

(৩)

মোবাইলে সময় দেখে উঠে দাঁড়ালেন সেলিম সাহেব। হাত তুলে টুটুল সাহেব আর আমাকে বিদায় জানিয়ে এগিয়ে গেলেন কাউন্টারের দিকে। বিল দিয়ে রেস্টুরেন্টের মালিকের সাথে কথা বলতে শুরু করলেন। আলাপ শুনে বুঝতে পারলাম তাদের পরিচয় অনেক দিনের।

রাস্তা দিয়ে একটি মেয়ে হেঁটে আসছে। মিষ্টি চেহারা। ‍উজ্জ্বল শ্যামলা মুখে কালো টিপ মানিয়েছে বেশ। চোখ ফেরাতে পারছি না।

মেয়েটি একতা হোটেলের কাছাকাছি আসতেই পিছন থেকে একটা মাইক্রো এসে ঘ্যাঁচ করে তার পাশে ব্রেক কষলো। চমকে তাকালো মেয়েটি। মাইক্রোর দরজা খুলে দু’জন লোক নেমে এলো। মেয়েটার দু’হাত ধরে টেনে মাইক্রোতে তোলার চেষ্টা করছে তারা। মেয়েটা নিজেকে বাঁচাতে প্রাণপণ চেষ্টা করছে।

‘পুলিশে খবর দিন’ বলে আমি ছুটে রেস্টুরেন্ট থেকে বের হলাম। সেলিম সাহেব এরই মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছে গেছেন। গুন্ডাদের একজনের সাথে তার হাতাহাতি হচ্ছে। অন্য লোকটা পকেট থেকে পিস্তল বের করলো। আমি থমকে দাঁড়ালাম। কিন্তু, সেলিম সাহেব এখনও মেয়েটাকে ছাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টা করছেন। হয়তো পিস্তলটা খেয়াল করেননি। অথবা, তার সাহস বেশি।

রাস্তার উল্টোপাশের বিল্ডিং-এর আড়াল থেকে হঠাৎ দু’জন পুলিশ হাজির হলো। একজনের কাঁধে বন্দুক। বাঁচা গেল, ভাবলাম আমি। তাদের দিকে তাকিয়ে হাত উঁচিয়ে ‘পুলিশ’ বলে চিৎকার করলাম।

পরমুহূর্তেই মেয়েটাকে এদিকে ছুটে আসতে দেখলাম। পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখতে গিয়ে সে আমার গায়ে ধাক্কা খেলো। পড়ে যাচ্ছিলো, আমি দু’হাত বাড়িয়ে তাকে ধরে ফেললাম।

পিস্তলধারী লোকটা ফাঁকা গুলি করলো। পুলিশ দু’জন ছুটে পালালো!

আমি মেয়েটাকে টেনে নিয়ে রেস্টুরেন্টে ঢোকালাম। পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখি সেলিম সাহেবের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে তাকে মাইক্রোতে তোলা হলো।

‘পুলিশে খবর দেয়া হয়েছে।’ রেস্টুরেন্টের মালিক মোবারক সাহেব আমাকে শুনিয়ে যেন নিজেকেই সান্ত্বনা দিচ্ছেন।

আমি কিছু বললাম না। পালিয়ে যাওয়া পুলিশ দু’জনের কথা মনে পড়লো। দ্রুতগতিতে ধাবমান মাইক্রোর দিকে তাকিয়ে আমি Police শব্দের আসল উচ্চারণ বুঝতে পারলাম: P-o ‘প’, l-i ‘লাই’ আর c-e ‘সি’ – ‘পলাইসি’ (পালিয়েছি)।

কী একটা ব্যাপার আমার মাথায় আসতে গিয়েও আসছে না।

(৪)

মেয়েটির মুখোমুখি বসলাম। এক গ্লাস পানি খেয়ে সে কিছুটা ধাতস্থ হয়েছে। জানা গেল, তার নাম সানজানা। একটা প্রাইভেট ভার্সিটিতে অনার্স থার্ড ইয়ারে পড়ে। বাসা কেরানীগঞ্জেই।

‘লোক দু’জনকে চিনেন?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি।

‘না।’

‘কারও সাথে শত্রুতা আছে?’

‘না।’

‘প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান বা এই জাতীয় কিছু?’

‘না।’

হিসেব মিলছে না।

মেয়েটি যেদিক থেকে এসেছে, সেদিকেই আমি ঘুরতে গিয়েছিলাম। বেশ খানিকটা পথে কোনও ঘরবাড়ি বা দোকানপাট নেই। ফাঁকা জায়গা থেকে মেয়েটিকে কিডন্যাপ না করে রেস্টুরেন্ট পর্যন্ত কেন এলো লোকগুলো?

একটু আগে যে প্রশ্নটা মাথায় আসতে গিয়েও আসেনি, সেটা এখন মাথায় এলো। মেয়েটার সাথে টানাহ্যাঁচড়ার সময় তাকে ভয় দেখাতে লোকগুলো কেন পিস্তল ব্যবহার করেনি?

বুঝতে পারলাম, ঘটনাটা ছিলো একটা হানি ট্র্যাপ (honey trap)। সেলিম সাহেব ছিলেন তাদের আসল টার্গেট। সুন্দরী নারীকে ব্যবহার করে পুরুষকে ঘায়েল করার আইডিয়া নতুন নয়।

মেয়েটাকে কি তার অজান্তে ব্যবহার করা হয়েছে? মোটেই না। মাইক্রো নিয়ে অপারেশনে এসে তারা কি সুন্দরী একটা মেয়ের আশায় বসে থেকেছে?

এখন মনে হচ্ছে, আমি ‘পুলিশ’ বলে চিৎকার করাতেই মেয়েটা ছুটে পালানোর চেষ্টা করেছে। আমি তাকে টেনে রেস্টুরেন্টে নিয়ে এসেছি বলেই সে ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে পারেনি। নইলে হয়তো সে তার দলের সাথে মাইক্রোতেই যেতো।

‘আপনার আইডি দেখান তো প্লিজ,’ বললাম আমি।

মেয়েটি পার্স থেকে তার এনআইডি বের করে আমার হাতে দিলো। ছবির সাথে তার চেহারা মিলিয়ে দেখলাম। নামও ঠিক আছে, সানজানা।

‘আমি কি এবার যেতে পারি?’ জানতে চাইলো মেয়েটি। ‘সন্ধ্যা হয়ে গেছে। বাসায় চিন্তা করবে।’

‘পুলিশ আসার আগে আপনি যেতে পারবেন না।’

মেয়েটি একটু দুশ্চিন্তায় পড়লো মনে হলো। বললো, ‘পুলিশ আমার স্টেটমেন্ট নিতে চাইলে প্রয়োজনে আমার বাসায় যেতে পারবে।’

‘শুধু স্টেটমেন্ট না। আমার ধারণা পুলিশ আপনাকে অ্যারেস্ট করবে।’

‘কেন এমন মনে হলো আপনার?’

তাকে সন্দেহ করার কারণ ব্যাখ্যা করলাম। চুপসে গেল মেয়েটি।

(৫)

‘আমি তাদের দলের কেউ না,’ বললো সানজানা। ‘কিছু টাকা পেয়ে কাজটা করেছি। আমি শুধু টিম লিডারের নাম জানি, রাজু – যে পিস্তল দিয়ে গুলি করলো। তার নাম্বার আমার কাছে আছে, আমাকে একবার কল করেছিলো।’

‘তাকে কল দিন প্লিজ,’ বললাম আমি।

সানজানা দু’তিনবার চেষ্টা করে জানালো মোবাইল বন্ধ।

‘আমাকে নাম্বারটা দিন।’

নাম্বারটা বের করে মোবাইল আমার দিকে এগিয়ে দিলো মেয়েটি। দেখলাম মোবাইলে সিম একটাই। তার কাছে আর কোনও মোবাইল নেই।

আমি ‘টিম লিডারের’ নাম্বরটা আমার মোবাইলে টাইপ করতে গিয়ে ইচ্ছা করে ভুল করলাম। সানজানাকে বললাম, ‘আমি নাম্বার টাইপ করতে গেলেই ভুল হয়। আমাকে নাম্বরটা টেক্সট করে দিন প্লিজ।’

সানজানা নাম্বারটা পাঠাতেই আমি লক্ষ করলাম, মেয়েটির নিজের নাম্বার বাংলালিংকের। আমাদের হল থেকে পাশ করা এক বড় ভাই বাংলালিংকে আছেন। আমি উঠে গিয়ে তাকে কল করে কথা বলে মেয়েটির নাম্বার তাকে টেক্সট করলাম। কয়েক সেকেন্ড পরেই তিনি জানালেন, সিমটা সানজানার নামেই রেজিস্ট্রি করা। আবার মেয়েটার মুখোমুখি বসলাম

‘আপনার কি মনে হচ্ছে আমি খুব খারাপ মেয়ে?’ সানজানার প্রশ্ন।

‘না। তবে সেলিম সাহেবকে মেরে ফেলা হলে আপনি ফেঁসে যাবেন।’

‘মেরে ফেলার কথা আসছে কেন?’ অবাক হয়ে বললো মেয়েটি। ‘তাকে মেরে ফেলতে চাইলে তো এখানে ঢুকে গুলি করলেই চলতো। আমাকে দরকার হলো কেন?’

তাই তো! ‍সেলিম সাহেবকে খুন করা নিশ্চয়ই তাদের উদ্দেশ্য নয়। তাহলে কিডন্যাপ করার উদ্দেশ্য কী? টাকা আদায়?

নতুন একটা প্রশ্ন মাথায় এলো। কিডন্যাপ করতেও তো মেয়েটার সাহায্য দরকার ছিলো না! সেলিম সাহেব রেস্টুরেন্ট থেকে বের হওয়া মাত্র পিস্তল ঠেকিয়ে তাকে মাইক্রোতে তোলা যেতো!

সানজানাকে এ কথা বলতেই সে নিচু কন্ঠে বললো, ‘আমার ধারণা সেলিম সাহেব নিজেই নিজেকে কিডন্যাপের ব্যবস্থা করেছেন।’

অবাক হলাম আমি। জানতে চাইলাম, ‘কেন এমন মনে হলো আপনার?’

‘লোকগুলোর টুকরো টুকরো কথা জোড়া দিয়ে। সেলিম সাহেবের সাথে তার ওয়াইফের বনিবনা হচ্ছে না। কোনও টেকনিক্যাল কারণে ডিভোর্সও দিতে পারছেন না। তাই নিজের জন্য “গ্লোরিয়াস ডেথ” এর ব্যবস্থা করেছেন – একটি মেয়েকে বাঁচাতে গিয়ে মৃত্যু।’

তাই তো! ঘটনার পূর্ব মুহূর্তে সেলিম সাহেব বিল দিয়ে রেস্টুরেন্টের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। অন্য কারও সুযোগ ছিলো না সেলিম সাহেবের আগে মেয়েটার কাছে পৌঁছানোর।

‘মনে হচ্ছে আপনার কথাই ঠিক,’ বললাম আমি।

‘সেলিম সাহেব সংসার করতে না চাইলে কেউ তো জোর করে সংসার করাতে পারবে না,’ বললো সানজানা। ‘ডিভোর্সের পরিবর্তে এরকম “গ্লোরিয়াস ডেথ” তার স্ত্রীর জন্যও ভালো।’

‘হতে পারে,’ বললাম আমি।

‘এবার কি আমি যেতে পারি? নাকি আপনি চান রাতে একা ফিরতে গিয়ে সত্যিকারের বিপদে পড়ি?’

মেয়েটার এনআইডি-র ছবি তুলে নিয়েছি। তার মোবাইল নাম্বারও পেয়েছি। প্রয়োজনে যোগাযোগ করা যাবে।

‘ঠিক আছে যান,’ বললাম আমি। ‘আশা করি আবার আমাদের দেখা হবে।’

‘আপনি যদি চান দেখা হবে।’

(৬)

সানজানা চলে গেছে। আমি কাউন্টারে দাঁড়িয়ে মোবারক সাহেবের সাথে কথা বলছি।

‘আপনি তো বললেন পুলিশে খবর দিয়েছেন। কিন্তু –’

‘আমি নিজে তো পুলিশে খবর দেইনি,’ বললেন মোবারক সাহেব। ‘মাথায় চুল কম লোকটা –’

‘টুটুল সাহেব?’ এতক্ষণে লোকটির কথা আমার মনে পড়লো।

‘হ্যাঁ হ্যাঁ, টুটুল সাহেব। আপনি যখন বললেন পুলিশে খবর দিন, তখনই তিনি কল করে আমাকে জানালেন পুলিশে খবর দিয়েছেন।’

‘তিনি কোথায়? তাকে তো বের হতে দেখলাম না!’

‘যখন গুলির শব্দ হলো, তিনি কিচেনের দরজা দিয়ে দ্রুত বের হয়ে গেলেন।’

আমার হঠাৎ খটকা লাগলো। গুলির শব্দ শুনে বেশি ভয় পেলে তার তো টেবিলের নিচে লুকানোর কথা, ঘরের বাইরে যাওয়ার কথা নয়।

জিজ্ঞেস করে জানলাম, টুটুল সাহেব এই এলাকার লোক না। আগে কখনও এই রেস্টুরেন্টে আসেননি। তিনি কীভাবে থানার নাম্বার জানেন?

তিনি কি কিডন্যাপ টিমের সদস্য? সে ক্ষেত্রে থানার কেউ এখনও কিছু জানে না। পালিয়ে যাওয়া পুলিশ দু’জন নিজেদের সার্ভিস ‍রেকর্ড ঠিক রাখার জন্য ঘটনার কথা বসদেরকে নিশ্চয়ই বলেনি।

মোবারক সাহেবকে অনুরোধ করলাম থানায় কল দেয়ার জন্য। কথা বলে তিনি জানালেন, ‘থানায় আগে কোনও খবর দেয়া হয়নি। তারা বললো এখনই পুলিশ পাঠাবে।’

‘সেলিম সাহেব কি এর আগে এ ধরনের কোনও ঝামেলায় জড়িয়েছেন?’ জানতে চাইলাম আমি।

‘মেয়েরা বিপদে পড়লে তিনি সব সময় দৌড়ে যান।’

বুঝতে পারলাম, লোকগুলো সেলিম সাহেবের এই বৈশিষ্ট্যকে কাজে লাগিয়েছে। তাকে কাউন্টারে গিয়ে বিল দিতে দেখে টুটুল সাহেব কিডন্যাপ টিমকে জানিয়েছেন।

কিন্তু, সরাসরি কিডন্যাপ কেন করা হয়নি? কেন মেয়েটাকে ব্যবহার করার দরকার হলো?

হঠাৎ করেই উত্তরটা মাথায় এলো। সেলিম সাহেবের সাথে শত্রুতা আছে এমন কেউ নিশ্চয়ই জড়িত। কেউ যাতে সেই লোককে সন্দেহ না করে, সেই উদ্দেশ্যেই সানজানাকে ব্যবহার করা হয়েছে।

মেয়েটা কোথা থেকে শুনলো সেলিম সাহেব নিজেই নিজেকে কিডন্যাপ করিয়েছেন? ‍নিশ্চয়ই সে মিথ্যা বলেছে।

কল করে দেখলাম মেয়েটার নাম্বার বন্ধ।

মোবারক সাহেবকে ব্যাপারটা জানালাম। সানজানার এনআইডি দেখিয়ে বললাম, ‘আমি এই ঠিকানায় খোঁজ নিয়ে আসি।’

‘কষ্ট করার দরকার নেই,’ বললেন মোবারক সাহেব। ‘ঐ এলাকায় আমার পরিচিত লোক আছে। তাকে দিয়ে খোঁজ নেয়াচ্ছি।’

জানা গেল, ঐ ঠিকানায় সানজানা নামের এক মেয়ে থাকতো। সে কয়েক মাস আগে মারা গেছে।

আসল সানজানার সিম আর এনআইডি নকল সানজানা ব্যবহার করেছে। শুধু ছবিটা বদলে নিয়েছে। নিখুঁত জালিয়াতি।

টিমের অন্য সদস্যরাও নিশ্চয়ই পরিচয় গোপন রাখার ব্যবস্থা করে কাজে নেমেছে। এত আটঘাট বেঁধে কাজ করার উদ্দেশ্য মনে হচ্ছে ভয়ংকর কিছু। হয়তো সেলিম সাহেবকে খুন করে লাশ গুম করা হবে।

(৭)

নিজেকে দায়ী মনে হচ্ছে। যদি মেয়েটাকে ছেড়ে না দিতাম, পুলিশ তার কাছ থেকে হয়তো টিমের অন্য সদস্যদের খোঁজ বের করতে পারতো। তাছাড়া, টিমের একজন সদস্য ধরা পড়েছে জানলে অন্যরা হয়তো সেলিম সাহেবকে খুন করতে ভয় পেতো।

মোবারক সাহেবকে সংক্ষেপে ঘটনাটা ব্যাখ্যা করলাম। জানতে চাইলাম, ‘সেলিম সাহেবের সবচেয়ে বড় শত্রু কে?’

‘আকমল সাহেব।’

‘তাকে এখনই কল দিন। বলুন, তিনি যে সেলিম সাহেবকে কিডন্যাপ করিয়েছেন, তা এলাকার সবাই জেনে গেছে। পুলিশও তদন্তে আসছে। এখন সেলিম সাহেবকে তিনি ছেড়ে দিলেই সবার মঙ্গল।’

মোবারক সাহেব কয়েকবার চেষ্টা করে বললেন, ‘তার মোবাইল বন্ধ।’

‘একটা মেসেজ দিয়ে রাখুন। সেলিম সাহেবের ওয়াইফকে খবর দিয়ে থানায় যেতে বলুন। আপনিও থানায় যান। লোক লাগিয়ে আর মোবাইল ট্র্যাক করে আকমল সাহেবকে বের করা দরকার। দেরি হলে সেলিম সাহেবকে হয়তো বাঁচানো যাবে না।’

আমাকে বের হতে দেখে মোবারক সাহেব বললেন, ‘আপনি কোথায় যাচ্ছেন? আমার সাথে থানায় যাবেন না?’

‘আমি একটা কাজ সেরে পরে থানায় যাবো।’

একতা হোটেল থেকে বের হয়ে বিষন্ন মনে হলের পথ ধরলাম। এদেশে পুলিশের যা চরিত্র, আমি নকল সানজানাকে চলে যেতে দিয়েছি বলে আমাকে তারা নির্ঘাৎ ফাঁসিয়ে দিবে। তাই হলে ফিরে যাওয়াই ভালো।

মনে মনে বললাম, যারা মানুষকে গুম করে তারা সবাই ধ্বংস হোক।

অনার্স পরীক্ষায় কোনও রকমে পাশ করেছি ঠিকই, কিন্তু জীবনের পরীক্ষা আরও অনেক কঠিন। অলরেডি আজকের পরীক্ষায় ফেল করেছি। ‍সেলিম সাহেবের মতো আমিও হানি ট্র্যাপে পড়েছি।

(শেষ)

কমেন্ট করুন

প্রাক্তন শিক্ষার্থী

পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সেশনঃ ১৯৮৩ - ৮৪

জাফর আহমেদ খান

প্রাক্তন শিক্ষার্থীপরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সেশনঃ ১৯৮৩ - ৮৪