আটলান্টিসঃ The Lost City

পৃথিবীর ইতিহাস কি ঠিক ততটাই, যতটা আমরা জানি? নাকি সমুদ্রের গভীরে বা মাটির নিচে কালের অতল গহ্বরে লুকিয়ে আছে আমাদের অজানা কোনো রহস্য?

মানুষ কল্পণা-প্রবণ। আইনস্টাইনের ভাষ্যমতে কল্পণা জ্ঞানের চেয়েও জরুরি। কারণ জ্ঞান বা যুক্তি তর্ক দিয়ে আপনি যা জানেন তা প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন, কিন্তু কল্পণা দিয়ে আপনি বিশ্বজয় করতে পারবেন আর একদম অজানা জিনিসও আবিষ্কার করে ফেলতে পারবেন।

হারানো শহর আটলান্টিস এমনই একটা মিথ, যেটা এখনো আবিষ্কৃত হয় নি। তবে বর্তমান সময়েও এই আটলান্টিস খোঁজে ব্যাস্ত হয়ে আছে অনেকেই। প্লেটো, রহস্যময় আন্ডারওয়াটার কিংডম সম্পর্কে লিখেছেন:

“সমুদ্রের জন্য, সেই সময়ে নৌযান ছিল; সেখানে প্রবেশদ্বারের মুখের সামনে ছিলো একটা স্তম্ভ। যাকে গ্রীকরা বলেন, ‘হেরাক্লিসের স্তম্ভ’। প্লেটোর মতে আটলান্টিস এমন একটি দ্বীপ যার উত্তরের বেশিরভাগ অংশ পর্বত দিয়ে গঠিত। দক্ষিণে আয়তাকার আকৃতির একটি বিশাল সমভূমি দ্বীপটিকে ঘিরে ছিল যা ৫৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ৩৭০ কিলোমিটার প্রশস্ত। আর এই দ্বীপটি সমগ্র এশিয়ার চেয়েও বড় ছিলো।

দ্বীপের আকার নিয়ে প্লেটোর সাথে একমত, টারটুলিয়ান, একজন খ্রিস্টান লেখক, যিনি বিশ্বাস করতেন যে আটলান্টিস একসময় আটলান্টিক মহাসাগরে বিদ্যমান ছিল। তিনি বলেছিলেন যে, এটি আজকের লিবিয়া এবং এশিয়ার মিলিত আয়তনের চেয়েও বড় হবে।

যেহেতু অন্য অনেকে ভূমধ্যসাগরে আটলান্টিস শহরের অবস্থানের প্রস্তাব করেছিলেন, তাই বর্ণনাগুলি শহরের আকারকে গ্রীসের বৃহত্তম দ্বীপ ক্রিট পর্যন্ত স্কেল করে এসেছে।

যাইহোক, প্লেটোর যুগের পরে অনেক গল্পে, আটলান্টিসকে একটি বিশাল শহর হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছিল, শহরের আকার সম্পর্কে নির্দিষ্ট কিছু অনুপস্থিত। এডগার কায়স, একজন আমেরিকান খ্রিস্টান রহস্যবাদী, প্রস্তাব করেছিলেন যে আটলান্টিস হতে পারে ইউরেশিয়া সমান আকারের।

সবথেকে বড় যে প্রশ্ন সব বিজ্ঞানীদের মনে ঘুরপাক খায়, তা হল আটলান্টিস কোথায়? শহরটি ভূমিকম্প বা সুনামির পরে সমুদ্রে ডুবে গেছে বলে মনে করা হয়। তথাকথিত আটলান্টিস ছিল জিব্রাল্টার শিলার কাছে একটি বৃহৎ দ্বীপ এবং এতে একটি পোসাইডন মূর্তি, কেন্দ্রীভূত দেয়াল এবং খাল ছিল। প্লেটো যোগ করেছেন যে সমুদ্রের নীচে শহরটি আটলান্টিক মহাসাগরের কোথাও হওয়া উচিত ছিল। যাইহোক, এখন পর্যন্ত কোন প্রযুক্তি সমুদ্রের তলদেশে এমন কোন শহর আবিষ্কার করতে পারে নি।

যদিও কিছু তত্ত্ব প্রস্তাব করেছিল যে আটলান্টিস ভূমধ্যসাগরে, স্পেনের উপকূলে অবস্থিত, কিছু লোক যুক্তি দিয়েছিল যে এটি অ্যান্টার্কটিকার অধীনেও হতে পারে। দীর্ঘকাল ধরে, অ্যাজোরসকে আটলান্টিস শহরের স্থান বলে মনে করা হত। তবে, নতুন গবেষণা একটি নতুন জায়গা প্রকাশ করা হয়েছে, এবং বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত যে আটলান্টিস স্পেন এবং মরক্কোর সমুদ্রের মধ্যে কোথাও কাডিজে পাওয়া যেতে পারে।

এই গল্পের সত্যতার পরিধি নিজেই একটি রহস্য। আটলান্টিস কোথায় আছে বা এটি আদোও বাস্তবে বিদ্যমান আছে কি না? এমন প্রশ্নগুলি এখনও উত্তরহীন। তবে যতক্ষণ না এর নীচের সত্যটি সম্পূর্ণরূপে উন্মোচিত না হয়, ততক্ষণ বিশ্ব সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ শহরের অস্তিত্ব সম্পর্কে জল্পনা-কল্পনা চালিয়ে যাওয়া হবে। তবে একদা ট্রয়কেও তো রূপকথার এক রাজ্য বলে ধারণা করা হতো। সেটা যদি আবিস্কার হতে পারে, তাহলে হয়তো সমুদ্রের নিচে তলিয়ে যাওয়া শহর আটলান্টিসও একদিন খুঁজে পাওয়া যেতেই পারে।

চলুন আটলান্টিস সম্পর্কে কিছু প্রচলিত মিথ বা কিংবদন্তি জেনে আসা যাকঃ

কিভাবে তৈরী হয়েছিলো এই আটলান্টিস?

এটা জানতে একটু ঘুরে আসতে হবে পূরাণের কাহিনী থেকে। তাদের মতে আটলান্টিস শহরটি তৈরী করেছিলেন পসেইডেন, যিনি ছিলেন সমুদ্রের, ঝড় এবং ভুমিকম্পের ইশ্বর। গল্প অনুসারে, পসেইডন সবচেয়ে বড় দ্বীপ খুঁজে বের করার জন্য বিশ্বের মধ্য দিয়ে হেঁটেছিলেন, যতক্ষণ না তিনি তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড়, আটলান্টিসে পৌঁছান এবং দেখতে পান যে, এটি এমন লোকদের দ্বারা বাস করে যারা বাকি বিশ্বের চেয়ে সুন্দর এবং বুদ্ধিমান ছিল। সেখানে তিনি Cleito নামক এক মহিলাকে দেখে তার প্রেমে পড়েন। এরপরে তিনি এই দ্বীপকে সবার থেকে বিচ্ছিন্ন করেন এবং তার একপাশ পাহাড় দিয়ে ঘিরে দেন। কল্পকাহিনী বলে যে ক্লিটোর পাঁচ জোড়া যমজ পুত্র ছিল পসেইডনের সাথে, যার মধ্যে বড়জনের নাম ছিল অ্যাটলাস। দশ পুত্র মহান শহর উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিলেন এবং প্রথম সন্তান অ্যাটলাস আটলান্টিসের প্রথম শাসক হন। এটা বিশ্বাস করা হয় যে তারা তাদের বাবার জন্য একটি বিশাল মন্দিরও তৈরি করেছিল, যার সাথে পসেইডনের একটি বিশাল মূর্তি ছিল ডানাওয়ালা ঘোড়া দ্বারা বহন করা রথে। সেই মূর্তিটি সম্পূর্ণরূপে সোনার তৈরি। এটি এমন একটি মন্দিরে স্থাপন করা হয়েছিল যার সর্পিল ছাদটি এত উঁচুতে ছিল যে, মন্দিরের সর্পিল দিয়ে মেঘগুলি ভেসে যায়।

কিভাবে এটি হারিয়ে গেলো?

পৌরাণিক বিবরণ অনুসারে, আটলান্টিস শহরের পতন ঘটে যখন এখানকার লোকেরা লোভী এবং অনৈতিক হয়ে ওঠে, যা দেবতাদের ক্ষুব্ধ করে। তখন দেবতারা একটি আগুন এবং ভূমিকম্পের রাত পাঠিয়েছিল যার ফলে শহরটি ডুবে গিয়েছিল। গবেষকদের মতে, এর পতনের কারণও ছিল একটি ভয়াবহ ভূমিকম্প যা সভ্যতাকে অল্প সময়ের মধ্যে গ্রাস করে। এর ফলে শহরটি সমুদ্রের গভীরে তলিয়ে যায়।

বাস্তবতায় ফিরে আসি, মুলত অনেকের মতে এটা হতে পারে যে, প্লেটো তার নৈতিক বক্তব্য গুলোকে তুলে ধরার জন্যে আটলান্টিস নামে একটি কল্পিত সভ্যতার আশ্রয় নিয়েছিলেন, যার মাধ্যমে তিনি দৃষ্টান্ত সহকারে তার বক্তব্য গুলোকে তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু চিন্তা করে অবাক হতে হয়, যে সময় এই আটলান্টিসের কাহিনী লেখা হয়েছিলো তখন দুনিয়াতে খুব কম সুযোগ ছিলো আশেপাশে ঘুরে দেখার। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, পানির নিচে একটা শহর আসলে কতটুকুই বা বিশ্বাসযোগ্য?

এই আটলান্টিস নিয়ে শতশত মিথ এখনো প্রচলিত আছে, মানুষ এখনো এটির খোজে বের হয়। এটি নিয়ে তৈরী হয়েছে Lost city of Atlantis নামের ছবিও। শত জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ট্রয় নগরীর মতো খুঁজে পাওয়া যাবে কি বিশ্বের একসময়কার সবচেয়ে সমৃদ্ধ শহর আটলান্টিসকে? নাকি এটি একটি মিথ হিসেবেই থেকে যাবে, যাকে খুজতে হবে চিরকাল?

কমেন্ট করুন
শিক্ষার্থী | পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শিক্ষাবর্ষঃ ২০১৯-২০

মোঃ সাবিত আল-সাবা রিয়ন

শিক্ষাবর্ষঃ ২০১৯-২০