ড্যাফোডিল: প্রকৃতি, প্রেম ও জীবন দর্শনের নিদর্শন

সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির রহস্য উদঘাটন করা মানুষের পক্ষে অসম্ভব। সৃষ্টিকর্তা অনেক ক্ষেত্রেই সেই ক্ষমতা মানুষকে দেননি। সৃষ্টিকর্তার প্রদত্ত নিয়ামতগুলো শুধুমাত্র আমরা দেখতে পারি বা উপলব্ধি করতে পারি। তাঁর সৃষ্ট সব সৃষ্টিগুলো একজীবনে দেখে শেষ করা সম্ভব নয়।

ফুল সৃষ্টিজগতের সৌন্দর্য, ভালোবাসা ও মায়ার প্রতীক। ফুলের মধ্যে ড্যাফোডিলের নাম জানেন না এমন ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। ড্যাফোডিল ফুল হিসেবে যেমন অনন্য তেমনি অনন্য এর নামকরণের ইতিহাস।

ড্যাফোডিল নার্সিসাস নামক গোত্রের একটি ফুল। গ্রীক মিথলজি অনুযায়ী এই ফুলের নাম নার্সিসাস। নার্সিসাস ছিল অনিন্দ্য সুন্দর এবং আকর্ষণীয় এক যুবক। যে তার নিজের রূপকে অসম্ভব ভালোবাসতো। সব পরীরা তাকে পছন্দ করতো এবং তার কাছে আসতে চাইতো। কিন্তু নার্সিসাস ছিল প্রচণ্ড অহংকারী। সে সবাইকে নিজের অযোগ্য মনে করতো। 

একদিন নার্সিসাস শিকার করে বাড়ি ফিরছিল, পথিমধ্যে “ইকো” নামে এক পরী তাকে দেখে তার প্রেমে পড়ে যায়। ইকো কথা বলতে পারতো না কিন্তু সে পাহাড়ে প্রতিধ্বনি তৈরি করতে পারতো। প্রতিধ্বনির মাধ্যমে সে নার্সিসাসকে বোঝানোর চেষ্টা করলো যে, নার্সিসাসকে সে ভালোবাসে। সব বুঝতে পেরে নার্সিসাস তাকে সবার মতোই প্রত্যাখ্যান করে। দুঃখে কষ্টে ইকো পাহাড়ে পাহাড়ে কান্নার প্রতিধ্বনি তৈরি করতে থাকে এবং অবশেষে আত্নহত্যা করে। 

নার্সিসাসের এরূপ আচরণে প্রতিশোধের দেবী নেমেসিস ক্ষুব্ধ হয়ে যায় এবং তাকে একটি শিক্ষা দেওয়ার চিন্তা করে, সে যেন কোনদিন কারো ভালোবাসা না পায়।  

নেমেসিস একদিন তাকে বনে শিকারে নিয়ে যায় এবং শিকারে গিয়ে নার্সিসাসের প্রচুর তৃষ্ণা পায়। সে তৃষ্ণা মেটানোর জন্য নদীতে পানি পান করতে যায়। পানি পান করতে গিয়ে নদীর পানিতে নার্সিসাস তার প্রতিচ্ছবি দেখতে পায়। নিজের এতো সুন্দর প্রতিচ্ছবি দেখে নার্সিসাস নিজেই নিজের প্রেমে পড়ে যায়। প্রতিচ্ছবি ধরতে গিয়েও ধরতে পারে না।

এই প্রথম নার্সিসাসের কাউকে ভালো লাগে। সে মনে প্রাণে তাকে পেতে চায়। নার্সিসাস বনে বনে ঐ ব্যক্তিকে খুঁজে বেড়ায় যার প্রতিচ্ছবি সে নদীর পানিতে দেখেছিল।  তাকে না পেয়ে, দুঃখে কষ্টে নার্সিসাস খাবার খাওয়া ছেড়ে দেয় এবং প্রচন্ড অসুস্থ হয়ে পড়ে। একসময় তার শরীর ভেঙ্গে পড়ে, তার সকল সৌন্দর্য ম্লান হতে থাকে। শারীরিক অসুস্থতায় ভুগতে ভুগতে নার্সিসাস মৃত্যুবরণ করে। এবং মাটির সাথে মিশে যায় তার দেহাংশ। আর ঐ মাটিতেই জন্ম হয় নার্সিসাস ফুলের।

Flowering daffodils. Blooming yellow narcissus flowers. Spring flowers. Shallow depth of field. Selective focus.

গ্রীক পুরাণের নার্সিসাস, কবি নজরুলের নার্গিস, ইংরেজ নৈস্বর্গপ্রিয় কবি উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থের “ড্যাফোডিল” কবিতা সব একই মর্মার্থ বহন করে।

কবি নজরুল তার জীবদ্দশায় কুমিল্লায় নার্গিস নামে এক পল্লী বালিকার প্রেমে পড়েন। পরবর্তীতে সেই সম্পর্ক ছিন্ন করে নজরুল ফিরে যান নিজ শহর কলকাতায়। কিন্তু তারপরও নার্গিসকে কবি নজরুল কখনোই ভুলতে পারেননি। যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে তার রচিত কবিতা ও গানে। ড্যাফোডিলের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে ইংরেজ কবি উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ “ড্যাফোডিল” নামে একটি কবিতা রচনা করেন। ‘’’

অন্য এক ইংরেজ কবি রবার্ট হেরিক তার “টু ড্যাফোডিল” কবিতায় এর ক্ষণস্থায়ী রূপে হতাশা প্রকাশ করে মানুষের জীবনের সঙ্গে একে তুলনা করেন।

আত্মতৃপ্তি, আত্মপলব্ধি এবং আত্নসম্মানের গুরুত্ব উপলব্ধি করে পাউলো কোহেলো তাঁর “আলকেমিস্ট” বইতে বলেন-

I weep for Narcissus, but I never noticed that Narcissus was beautiful. I weep because, each time he knelt beside my banks, I could see, in the depths of his eyes, my own beauty reflected.

Paulo Coelho

রেফারেন্স :

কমেন্ট করুন

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

প্যাপাইরাসের অনলাইন সংস্করণের ৪র্থ বর্ষপূর্তি

প্রতিযোগিতাটি শুধুমাত্র পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের জন্য