সেপ্টেম্বর 28, 2026

আজ ঈহিতার মনটা ভীষণ খারাপ। বাড়ি থেকে হলে ফিরেছে মাত্র— বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যে। বাবা-মাকে, পরিবারকে ছেড়ে আসার কষ্ট তো ছিলই, তার সাথে আবার গ্রামের সেই গাছগাছালি, খোলা আকাশ, মাটির গন্ধ— সব থেকে দূরে সরে এসেছে-এ জন্যেও মনটা কাঁদছিল ভীষণ।

ঈহিতা পড়াশোনা করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের Soil, Water and Environment বিভাগে। ভীষণ আবেগপ্রবণ মেয়ে, ভাবুক, আর প্রকৃতির প্রতি গভীর টান রয়েছে তার। ডিপার্টমেন্টটাও বেছে নিয়েছিল এই ভালোবাসা থেকেই। হলে আসার সময় চন্দ্রা-নবীনগর থেকে সাভার পার হয়ে  বিশাল বিশাল ময়লার স্তূপ গুলো চোখে পড়েছিল যখন, ও ভাবছিল, “সিঙ্গাপুর, জাপান, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস ইত্যাদি দেশে কত উন্নত waste management system, আমাদের কেন এরকম? আমাদের দেশটা ছোট- এ জন্য কি? তবে সিঙ্গাপুর, জাপান এই দেশগুলো ছোট হলেও তো কত সুন্দরভাবে ওরা Waste Management সামলায়, তাহলে আমাদের দেশেই কেন এমন হচ্ছে? সরকার থেকে শিক্ষাও তো দেয়া হয়, সচেতনতা সৃষ্টি করা হয়, তাহলে? main reason কী? শুধুই কি প্রযুক্তির অভাব? নাকি আরো গভীরে যেতে হবে?”

Environmental science এর ফিল্ড ওয়ার্কে গিয়ে বুড়িগঙ্গার পানি পরীক্ষা করতে গিয়ে যতই BOD, COD, pH এর হিসেব শিখেছে— মাথায় গেঁথে গিয়েছে প্রশ্নগুলো। তবে  Excel-এ টেবিল করা, ডাটা বিশ্লেষণ— এসব একদমই ভালো লাগে না তার। কি বিরক্তিকর কাজ!

সেই সময়ই সিনেটের এক বিতর্ক প্রতিযোগিতায় পরিচয় হয় অনির্বাণের সাথে। Statistics ডিপার্টমেন্টের ছেলেটা, ঠান্ডা স্বভাব, চোখে চশমা, মুখে তীক্ষ্ণতা। স্বভাবতই সে লজিক্যাল, প্রাকটিক্যাল,পরিসংখ্যান দিয়ে বুঝতে ও বোঝাতে ভালোবাসে, ঈহিতা দেখে ছেলেটা ডেটা বিশ্লেষণে এতটা দক্ষ! কিন্তু ঈহিতা ঠিক শান্তি পেত না ওর সাথে কথা বলে। ও মনে মনে ভাবে, “অনির্বাণ সবকিছুকে সংখ্যা দিয়ে মাপতে চায়, কিন্তু living things, emotions বলে তো কিছু আছে তাই না! আজব ছেলে তো এ!” তবে দিন যত যাচ্ছিল ততই ও বুঝতে পারছিল, সে নিজে পড়ছে মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগে আর অনির্বাণ পড়ছে পরিসংখ্যানে। আলাদা ডিপার্টমেন্ট, আলাদা পড়াশোনা, একারণে ওদের প্রায়োরিটিও আলাদা। যেমন ঈহিতার জন্য field work, তো অনির্বাণের data work, ঈহিতার ক্ষেত্রে emotions, তো অনির্বাণের evidence, ঈহিতার priority nature, তো অনির্বাণের priority হয় number।

পরের কয়েকটা দিন দুই ডিপার্টমেন্টের যৌথ সেমিনারে ওদের দেখা হয় বারবার।

ওদের মধ্যে কথা হলে অনির্বাণ ওকে শেখায় কিভাবে Data দিয়ে Graph এ নদীর পরিবেশ, মাটির ক্ষয়, দূষণ, সম্ভাব্য Future তুলে ধরা যায়। ক্লাসগুলো করে ঈহিতাও বুঝতে পারছিল পরিসংখ্যান কতটা জরুরি। ঈহিতা ঠিক করে waste management system বিষয়ে একটা প্রজেক্ট করবে। এটা ভীষণ দরকার এসময়ে। আর এর জন্য অনির্বাণের সাহায্য দরকার তার।

এর পরের গল্পটা বদলে গেল যখন ওরা আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় প্রতিযোগিতায় একটা প্রজেক্টে একত্র হলো। প্রজেক্টে ঈহিতা, অনির্বাণ ছাড়াও তাদের দলে ছিল রিদিমা আর ঈশান। রিদিমা অনির্বাণের ফ্রেন্ড, একই ডিপার্টমেন্ট এর। মেধাবী, মাঝে মাঝে তর্ক করে অনির্বাণের সাথে, তবে সাপোর্টিভ। ঈশান মৃত্তিকা পানি ও পরিবেশ বিভাগের ছেলে, regular student, কিছুটা খুনসুটে, মানে মজা করতে ভালোবাসে।

সবাই সকলের সাথে পরিচিত হয়ে নেয় ওরা। প্রজেক্টের জন্য বিষয় ঠিক করে সবাই মিলে। ওদের যেতে হবে রংপুরে প্রজেক্টের কাজ করতে। ঈশানের (SWE) বাসা ওখানে। তো, হাসি-মজা করতে করতে এগিয়ে যেতে থাকে ওদের কাজ।

ওদের এবিষয়ে যথেষ্ট সাহায্য করেন পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক শেখর চক্রবর্তী স্যার। কোনো সমস্যা হলেই স্যারকে মেসেজ করত অনির্বাণ—

“স্যার, এই প্রবলেম ফেইস করছি… ডাটা এন্ট্রি হচ্ছে না, ডিজাইনটা কেমনে করলে ভালো হতো?”

ঈহিতা-ঈশান পাবলিক কমিউনিকেশনে কোনো সমস্যা ফেস করলে স্যারকে জানাত। উনি মাঝে মাঝে নতুন কিছু আইডিয়াও দিতেন। খুব supportive ছিলেন উনি।

রংপুরে গিয়ে একটা পরিষ্কার এলাকা ওরা ট্যুরে যায়। রিসার্চের উদ্দেশ্যেই ঘুরে দেখা, observe করা, তথ্য সংগ্রহ করা। কত শতাংশ এলাকা সাধারণত পরিষ্কার থাকে বা থাকে না, sewage system কেমন, লোকজনের মতামত— সব কিছু।

অনির্বাণ সেই ডেটা collect করে রেকর্ড করে। রিদিমা (Stat.) ভিডিও করে।

এরপর ওরা যায় কিছুটা অপরিষ্কার এলাকায়। সেখানেও লোকেদের সাক্ষাৎকার নেয়। রিদিমা আর অনির্বাণ পরিসংখ্যান তৈরি করে— যেমন কত বাড়ি নিয়মিত পরিষ্কার করে, কতগুলো বাড়ি কম করে, ইত্যাদি।

২০ জনকে নিয়ে একটা ছোট জরিপ করে ওরা। প্রজেক্টের অনেকেই ছিল তরুণ— বিশেষ করে স্কুল-কলেজের স্টুডেন্ট। ওরা যখন বলে “আমরা ঢাবির স্টুডেন্ট”, সবাই আগ্রহ নিয়ে অংশ নেয়।

“গ্রাম হলেও আমরাও চাই পরিষ্কার থাক পরিবেশটা,” — বলে এক মেয়ে।

ঈশান (SWE) হেসে বলে, “এই আগ্রহটাই তো বদল আনবে। “

রিদিমা (Stat.) survey form design করে, results analysis করে।

আর এক্সেল দিয়ে ডেটা visualization করে অনির্বাণ।

তারপর শুরু হয় “Best Clean Village” আর “Green School Area” প্রতিযোগিতা।

ঈহিতা-ঈশান গেম প্ল্যান করে, পুরস্কারের ধারণা দেয়। দল গঠন করে, লোকজনকে বুঝিয়ে দেয়।

সাতদিন ধরে চলে প্রতিযোগিতা, তথ্য সংগ্রহ, রেকর্ড, রিসার্চ।

এই কদিন ওরা ঈশানের বাড়িতে থাকে— অনেক মজা করে, তবে যথেষ্ট পরিশ্রমও করে।

এক সন্ধ্যায় সবার মধ্যে ক্লান্তির ছাপ, ঈহিতা বলল, “শুধু প্রজেক্টের জন্য তো করছি না, মন থেকে করছি… একটু যদি কিছু বদলানো যায়। “

অনির্বাণ তাকিয়ে বলল, “হ্যাঁ, আর তুমি… মানে তোমরা সকলে যখন থাকো তখন তো কিছুই অসম্ভব মনে হয় না। “

ঈশান হেসে বলল, “তা তো অবশ্যই। তা তো অবশ্যই। তুমি মানে তোমরা তাইনা। না রে অনি, হ্যাঁ?”

 “আরে এমন কিছু না ভাই!”

ঈহিতা হেসে বলে, “চলো কাজটা আগে শেষ করি।”

প্রতিযোগিতা শেষে Before vs After পার্থক্য রেকর্ড করে ওরা।

পুরো কার্যক্রম ভিডিও করে কন্টেন্ট বানায়— একটা গল্প স্টাইলে ভিডিও, সাথে ডেটা গ্রাফ, ইনফো। সুন্দর একটা রিপোর্ট বানিয়ে ফেলে।

প্রজেক্ট জমা দেওয়ার দিন এসে যায়। ৫ জন মিলে জমা দেয় আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় প্রতিযোগিতায়।

ভিডিও এডিটিং, ডেটা অ্যানালাইসিস, কাজের রেকর্ড— সব নিখুঁত ছিল।

ঈহিতা আবেগে বলে উঠল—

“এটা শুধু এক প্রজেক্ট নয়, এক পদক্ষেপ বলতে পারেন— দেশকে বাঁচানোর। পরিষ্কার একটা বাংলাদেশ গড়ার ছোট্ট একটা শুরু।”

সকলে দাঁড়িয়ে হাততালি দেয়। শেখর স্যার অত্যন্ত আনন্দিত, গর্বিত।

তিনি বলেন, “এটা শুধু তথ্য ছিল না, তত্ত্ব ছিল না— এতে হৃদয় ছিল, বাস্তবতা ছিল, আর ছিল পরিবর্তনের ইচ্ছা। তোমরাই বিজয়ী।”

ঈহিতা, অনির্বাণ, ঈশান, রিদিমার মুখে শান্তির হাসি।

অনির্বাণ, ঈহিতা ধন্যবাদ জানায় শেখর স্যারকে। স্যার অভিনন্দন জানায় সকলকে। ঈহিতা স্যারকে জানায় তার Waste Management System mastering প্রজেক্ট বিষয়ে। স্যার বলেন,

“যতটা পারি, সাহায্য করব। এটা ভবিষ্যতের বড় কাজ হতে পারে।”

অনির্বাণ তাকায় ঈহিতার দিকে। ঈহিতা অনির্বাণকে বলে, “আরো একটা প্রজেক্ট আছে… তোমার সাহায্য লাগবে।”

অনির্বাণ হেসে বলে, “Let’s start this new project. আমি আছি। Nature and Number এবারও পাশাপাশি হাঁটবে কী বলো?”

“Let’s start again.”

Student | Department: Soil, Water & Environment
Facebook
Threads
LinkedIn
Telegram
X
Reddit
Email
WhatsApp

আরও লেখা সমূহ