বৃষ্টি মানেই বাঁধনছেঁড়া আনন্দ। ছোটবেলায় বৃষ্টি মানেই ছিল আমার কাছে এক উৎসব। গ্রামের বাড়ির টিনের চালে যখন ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামত, তখন মন জুড়ে শুধুই মাতামাতি আর উল্লাস! স্কুল ব্যাগটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে ঠাকুমাকে বলতাম–’ ঠাকুমা, আজ আর স্কুলে যেতে হবে না!’
উঠোনের কোণে টিনের চাল থেকে পড়া পানি, জমে থাকা কাদাজলে পা ডুবিয়ে লাফালাফি, ভিজে চুপসে যাওয়া জামা নিয়ে আমরা খেলতাম গোল্লাছুট, দৌড়াদৌড়ি, আরো কতো কি! সেই মাটির গন্ধ! সেই বৃষ্টি! যে অনুভব করেছে, মাটির সাথে যার খেলা হয়েছে, সে কখনো ভুলতে পারবে না এ টান। এ যেন এক তীব্র মাদকতা। আসলে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে এর। ‘Mycobacterium vaccae’ নামক এক ধরনের উপকারী ব্যাকটেরিয়া মাটিতে থাকে। যখন আমরা মাটি স্পর্শ করি, নাড়াচাড়া করি, তখন এই ব্যাকটেরিয়াগুলো আমাদের ত্বকের সংস্পর্শে আসে, শরীরে প্রবেশ করে এবং মস্তিষ্কের ‘সেরোটোনিন’ (Serotonin) নামক রাসায়নিকের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, যা মনকে শান্ত ও প্রফুল্ল রাখে, বিষণ্ণতা দূর করে, মেজাজ ভালো রাখে।
বৃষ্টির দিনগুলোতে ক্ষেতের আইলে জমে থাকা জলে চলত আমাদের মাছ ধরার পালা। বাবা, কাকারা কোচ দিয়ে ধরতো মাছ, আমরা কেউ জাল ফেলতাম, কেউ বা খালি হাতেই ধরতাম পুঁটি, ট্যাংরা, শোলমাছ, কাঁকড়া। আবার কখনো কখনো শুধু ঝুড়ি দিয়েও মাছ ধরতাম; এতো মাছ থাকত তখন! মাছ ধরা শেষে কাদা মাখা শরীর নিয়ে বাড়ি ফিরতাম। কত আনন্দ করেছি সেসময়!প্রতিবছর পাড়ার সব ছোটরা মিলে আয়োজন করতাম ‘ব্যাঙের বিয়ে’। কেউ হতাম মেয়ে পক্ষের, তো কেউ ছেলে পক্ষের। তখন বুঝতাম না কোনটা কী ব্যাঙ। দাদুরা বলে দিত।এখন পার্থক্য বুঝি, পুরুষ ব্যাঙগুলো স্ত্রী ব্যাঙের চেয়ে আকারে ছোট হয়, আর গলার নিচে থাকে রঙের কিছুটা ভিন্নতা। আর পুরুষ ব্যাঙগুলোকে হাতে নিলে ওরা শব্দ করে ডাকে কিন্তু স্ত্রী ব্যাঙগুলো ডাকে না। এসব দেখেই দাদুরা আমাদের বলে দিতেন কোনটা কোন ব্যাঙ। বিয়েতে আসর সাজানো, হলুদ মাখানো,দান দক্ষিণা দেয়া, বাসি বিয়ে পর্যন্ত সব করতাম ব্যাঙের বিয়েতে।আর বিয়ে শেষ হতে না হতেই আবার ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি।
আরো কতো স্মৃতি বর্ষাকালের! বর্ষাকাল মানে ছিল আমার আর বন্ধুদের কাছে তাল কুড়ানোর এক বিশাল অভিযান। বিশাল তালগাছ থেকে ঝড়ের পর ঝরে পড়া তালগুলো খুঁজে বের করতাম। ঠাকুমা মানে আমার দাদি তালের রস ঘষে বের করে নারকেল, চালের গুড়ো দিয়ে মেখে দিতো মাকে, এরপর মায়ের হাতের গরম গরম তালের বড়া, তালের পিঠা! আহা, সে স্বাদ যেন আজও জিভে লেগে আছে। পিঠা মুখে দিয়েই মনে হতো, এই আনন্দ বুঝি পৃথিবীর কোথাও নেই!
সন্ধ্যায় চলত মুড়ি-চানাচুর আর চায়ের আড্ডা। বাড়ির সবাই মিলে বসতাম। আমি ঠাকুমার কোলে বসে গল্প শুনতাম। আমার যাতে ঘুম না ধরে, সেজন্য তিনি বেছে বেছে ভূতের গল্প বলতেন। সেই সময় ওনার মুখে শোনা ভূতের গল্প আর বাইরে বৃষ্টির শব্দে এক ভুতুড়ে পরিবেশ সৃষ্টি হতো। রাতে রান্না হতো খিচুড়ি আর বেগুন ভাজি। আহ্! শৈশবের সেই দিনগুলো!
দিন গড়িয়ে গেল। সময়ের গতি যেন প্লেনের থেকেও বেশি দ্রুত। ভর্তি যুদ্ধে পড়াশোনার সুযোগ পেলাম স্বপ্নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ভর্তি হওয়ার আনন্দ আর নতুন জীবন শুরুর উত্তেজনা যখন তুঙ্গে—ঠিক তখনই নেমে এলো এক অপ্রত্যাশিত ঝড়—বিশ্বজুড়ে শুরু হওয়া মহামারী “করোনাভাইরাস”। সবকিছু থমকে গেল। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেল। হল-ক্যাম্পাসের স্বপ্নগুলো মুহূর্তেই শেষ। আবার ফিরে এলাম গ্রামে, এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে। ফোন আর ল্যাপটপেই চলত অনলাইন ক্লাস।
দীর্ঘ বন্ধের মধ্যেই এলো আরেক দুর্যোগ— ভীষণ বন্যা। বিশেষ করে আমাদের তিস্তা নদীর দু’কূল উপচে পড়ল। আমাদের বাড়ি তিস্তা থেকে একটু দূরে, এখানে সাধারণত বন্যা হয়না কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দীর্ঘদিন টানা বৃষ্টিপাতে জলাবদ্ধতা দেখা দিল। অন্যদিকে তিস্তা পাড়ে, নদীর জল যেন দানবের মতো গ্রাস করছিল সবকিছু। গ্রামের পর গ্রাম জলে ডুবছিল বন্যা আর নদী ভাঙনের ফলে। আমাদের সবুজ ফসলের ক্ষেতগুলো মুহূর্তেই জলের তলে চলে গেল। কৃষকের সব স্বপ্ন ধুয়ে-মুছে গেল তিস্তার ঘোলা জলে। সেই দৃশ্য ছিল হৃদয়বিদারক।
ঠিক সেসময় পেলাম এক নতুন সুযোগ। ঢাবিতে চান্স পাওয়ার সুবাদে কিছু সিনিয়র আর বন্ধুদের সাথে পরিচয় হয়েছিল। যোগাযোগ করে জানতে পারলাম, তারা একত্রিত হয়ে বন্যার্তদের জন্য ত্রাণ কার্যক্রম শুরু করেছে। তারা শুধু তহবিল সংগ্রহ করেনি, নিজেরাই মাঠে নেমে কাজ শুরু করে দিয়েছে। আর দেরি করলাম না। নিজের স্বপ্নের কাজ করার সুযোগ পেলাম। পুরোনো পরিচিতি আর নতুন উদ্যম নিয়ে যোগ দিলাম। চাল, ডাল, ওষুধপত্র আর শুকনো খাবার নিয়ে পৌঁছে গেলাম ক্ষতিগ্রস্ত সব এলাকায়। নিজের চোখে দেখলাম মানুষের অসহায়তা। দেখলাম ভিজে যাওয়া ঘরবাড়ি আর ক্ষুধার্ত মুখগুলো।
একবার, নদীর কিনার ঘেঁষে এক ছোট্ট চরে ত্রাণ দিতে গিয়ে দেখি এক বৃদ্ধাকে, শীর্ণ দেহ। টানা দু’দিন ধরে তিনি নাকি কিছু খেতে পাননি। বৃদ্ধার কাঁপতে থাকা হাত আর নিস্পলক, শূন্য দৃষ্টি—যেন সব আশা হারিয়ে ফেলেছে। সেই মুহূর্তে আমার শৈশবের স্মৃতিগুলো এক পলকে খেলে গেল। কিন্তু তখন তালের পিঠা বা ভূতের গল্পের আরামদায়ক স্মৃতি নয়। চোখে ভাসছিল এক রূঢ় বাস্তবতা, যেখানে মানুষ চরম কষ্টের মুখোমুখি। তাঁর অসহায় চেহারা দেখে আমার নিজের ঠাকুমার কথা ভীষণ মনে পড়ছিল, কষ্ট হচ্ছিল খুব। তাঁর হাতে যখন খাবার আর ওষুধ তুলে দিলাম। বৃদ্ধাটি আমার হাত ধরে ফিসফিস করে বললেন, “বাছা,তোরা না এলে আজ হয়তো…।” কথা শেষ করতে পারলেন না। কান্নায় ভেঙে পড়লেন।সেই চোখ ভরা জল আর নীরব আশীর্বাদ আমার হৃদয়ে এক গভীর রেখা কেটে দিল। সত্যি বলছি, সেই মুহূর্তে আমার চোখ ভিজে আসছিল কান্নায়।
সেই দিন আমি স্পষ্ট বুঝলাম, শুধু বইয়ের পাতায় জ্ঞান নয়, আসল শিক্ষা লুকিয়ে আছে মানুষের পাশে দাঁড়ানোয়। আর তখন মনে পড়লো, আমি তো মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগে পড়ার সুযোগ পেয়েছি!
মহামারীর অন্ধকার আর বন্যার ভয়াল পরিস্থিতিতে, আমার ভেতরের শৈশব যেন খুঁজে পেল জীবনের নতুন মানে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বর আমায় কাছে টানতে পারেনি, কিন্তু এই ত্রাণ কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে চিনলাম জীবনের আসল পাঠশালা। আমার নতুন এক লক্ষ্য স্থির হলো: এই প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো মোকাবিলা করার জন্য জ্ঞান অর্জন করতে হবে। মাটির বিজ্ঞান, জলের প্রবাহ এবং পরিবেশের স্থিতিস্থাপকতা নিয়ে গবেষণা করতে হবে, যাতে আমাদের গ্রামগুলো আর এভাবে ভেসে না যায়। অতীতের ভেজা স্মৃতিগুলো এই কর্মযজ্ঞের মাধ্যমে পেল এক নতুন আলো। এই আলোতেই আমি ভবিষ্যতের পথ খুঁজে পেলাম—সেই পথ, যা প্রিয় মাটি ও মানুষকে রক্ষা করবে।
- মঞ্জুশ্রী চাটার্জীhttps://www.thepapyrus.org/author/%e0%a6%ae%e0%a6%9e%e0%a7%8d%e0%a6%9c%e0%a7%81%e0%a6%b6%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a7%80-%e0%a6%9a%e0%a6%be%e0%a6%9f%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%9c%e0%a7%80/বৃহস্পতিবার, আগস্ট 14, 2025
- মঞ্জুশ্রী চাটার্জীhttps://www.thepapyrus.org/author/%e0%a6%ae%e0%a6%9e%e0%a7%8d%e0%a6%9c%e0%a7%81%e0%a6%b6%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a7%80-%e0%a6%9a%e0%a6%be%e0%a6%9f%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%9c%e0%a7%80/বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর 11, 2025
- মঞ্জুশ্রী চাটার্জীhttps://www.thepapyrus.org/author/%e0%a6%ae%e0%a6%9e%e0%a7%8d%e0%a6%9c%e0%a7%81%e0%a6%b6%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a7%80-%e0%a6%9a%e0%a6%be%e0%a6%9f%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%9c%e0%a7%80/বৃহস্পতিবার, অক্টোবর 9, 2025
- মঞ্জুশ্রী চাটার্জীhttps://www.thepapyrus.org/author/%e0%a6%ae%e0%a6%9e%e0%a7%8d%e0%a6%9c%e0%a7%81%e0%a6%b6%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a7%80-%e0%a6%9a%e0%a6%be%e0%a6%9f%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%9c%e0%a7%80/বৃহস্পতিবার, জানুয়ারি 8, 2026











