সেপ্টেম্বর 25, 2026

১

পকেটের টাকা আর সকালবেলা আমার মাথা—দুটোই ফাঁকা থাকতে পছন্দ করে। পকেটের টাকা নিয়ে যদিও আমার কোনো মাথাব্যথা নেই, মাথাব্যথা হওয়ার আগেই দেখি টাকা শেষ হয়ে গিয়েছে। সত্যি বলতে কী যে লিখছি আমি নিজেও জানি না। এখন মূলত রাস্তা দিয়ে হাঁটছি—ফ্লোরিডার রাস্তায়, আশেপাশে মানুষ নেই। কয়েকজন পুলিশ বামের পথ দিয়ে হেঁটে গেল। পুলিশগুলো আমার দিকে বিরক্তির সাথে যেভাবে তাকালো, মনে হলো তারা যেন চিড়িয়াখানার উল্লুক দেখতে গিয়েছে; কিন্তু গিয়ে দেখে উল্লুকটা ঘুমাচ্ছে।

যাই হোক আমি মূলত তিন দিন ধরে ঘুমাচ্ছি না, তিন সপ্তাহ ধরে কাপড় ধুচ্ছি না, তিন মাস ধরে সেলুনে যাচ্ছি না। আপনাদের  মনে হতেই পারে যে আমি প্রেমে পড়েছি, কিন্তু এটি সত্যি নয়। ২৬ বছরের জীবনে যখন কেউ ছয়জন সুন্দরীর কাছ থেকে রিজেক্টেড হয়, তখন তার জন্য আসলেই প্রেমে পড়া বারণ।

এখন আমার এই করুণ অবস্থার কারণ জানতে আমি  আমার ক্লোজ সহোদর বডি সাবিতকে কল দিই।  জিজ্ঞেস করতেই সে বলল,

“আরে মামা, যেহেতু বাতাসে বহিছে প্রেম, কিন্তু তোর তো প্রেম হবে না, তুই এক কাজ কর—মাস্ক পর। সব ঠিক হয়ে যাবে।”

বুঝলাম, সে রিলসের নেশায় এখনও বুঁদ হয়ে আছে। তাই ওর সাথে কথা না বাড়িয়ে আম্মাকে কল দিলাম। আম্মা বলল সময়মতো খাবার খেতে, ঘরদোর গুছিয়ে রাখতে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে। শেষে বলল, “বাংলাদেশের সেরা বলদ তুই, যতই বিলেত যাস তুই বলদই থাকবি।” আমার মায়ের যদি ক্ষমতা থাকতো তাহলে বিশ্বসেরা বলদের পুরস্কার যত্ন নিয়ে আমার হাতে তুলে দিত।

যাই হোক, উপলব্ধি করলাম যে আমার আসলেই ঠিকঠাক খাওয়া-দাওয়া হচ্ছে না। ঘর তো আল্লাহর নামে এতই পরিষ্কার যে ইঁদুরও খাবার চুরি করতে ঢোকে না। তাই কিছু উপায় না পেয়ে আমার আরেক বন্ধু সাইবার সাদমানের শরণাপন্ন হলাম। সে বলল রিসেন্টলি টেক জায়ান্ট ‘অরেঞ্জ’ একটি রোবট বের করেছে, যার কাজ হল বাড়ির দেখাশুনা আর সব কাজ করা। রোবটটার নাম ‘বাটলার এআই’। যেহেতু কেনার মতো অর্থকড়ি আমার নেই, তাই ভাবলাম ৩ মাসের সাবস্ক্রিপশন নিয়ে তাকে বাসায় আনব। তাই ফ্লোরিডার ‘অরেঞ্জ’ মলে গেলাম ‘বাটলার এআই’ নিতে।

২

বাটলার সব কাজ নিখুঁতভাবে করতে পারে। দেখতে ১২ বছরের আমেরিকান ছেলের মতো—সোনালি চুল, পরনে নরমাল একটি টি-শার্ট এবং জিন্স। বাটলার আসার পর আমার বাসা পুরো ঝকঝকে; সে রান্না করে, কাপড় ধুয়ে রাখে, ঝাড়ু দেয়। এমনকি আমাকে সান্ত্বনা পর্যন্ত দেয়। যেমন—ঠিক সেইদিন রাতের বেলা আমি ‘কাভিশ’ শুনছিলাম, বাটলার আমার পাশে এসে কিছুক্ষণ কাঁদল। এরপর আমাকে বলল, “স্যার সব ঠিক হয়ে যাবে, আপনি কোনো চিন্তা করবেন না।”

আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। এরপর বাটলার চলে গেল।

বাটলারের আবার অনেক ইগো প্রবলেম রয়েছে। আরেক দিনের ঘটনা—

“দেখো, বাটলার নামটা কেমন যেন! তোমাকে আমি একটি সুন্দর নাম দিতে চাই। ধরো, ‘মাইকেল জ্যাকসন’ নামটা কেমন হবে?”

সে সাথে সাথেই বলল, “না স্যার, আমাকে অন্য নামে প্লিজ ডাকবেন না। আমি নিজের অপমান মেনে নিতে পারি না।”

আমি তখন হাল ছেড়ে দিলাম। বাপরে! ওকে অপমান করে আমার লাভ নেই; ও কাজ না করলে আমার অবস্থা ১২টা বেজে ১০ মিনিট হয়ে যাবে।

৩

বাটলারের সাবস্ক্রিপশন প্রায় শেষের দিকে। মন বেজায় খারাপ। পকেটের অবস্থাও শোচনীয় হওয়ার কারণে বাটলারকে রিনিউ করারও সাহস পাচ্ছি না। বাইরে বৃষ্টি আর আমার মনে বাটলারের জন্য বেদনার সৃষ্টি; কাভিশ চালু করে ভাবছি কী করব। এমন সময় বাটলার রুমে এল। এসেই বলে—

“স্যার, একটা সমস্যা হয়েছে।”

“কী হয়েছে বাটলার?”

“আমি পাশের বাসার মেক্সিকান লোকটাকে মেরে ফেলেছি।”

“কী? কী করেছ?”

“মেক্সিকান লোকটি ভুলভাল গান গাচ্ছিল। আমি তাকে শুধরে দিতে গেলাম। সে আমাকে থাপ্পড় মেরেছে, তাই এরপর আমি তার নাভির মধ্যে কারেন্টের শক দিলাম। লোকটি সাথে সাথে পটল তুলল।”

আমি মাথায় হাত দিয়ে বলে উঠলাম, “বাপ রে! এইটা তুমি কী করলে বাটলার?”

“চিন্তা করবেন না স্যার। কাছেই বজ্রপাত হয়েছিল, আর আশেপাশে কেউ ছিল না। সবাই মনে করবে বজ্রপাতের কারণেই মৃত্যু।”

খেয়াল করলাম বাটলার এইসব বলে দিব্যি শান্তিতে ঘর ঝাড়ু দিতে শুরু করল। আমি তীর্থের কাকের মতো তার দিকে তাকিয়েই রইলাম।

শিক্ষার্থী | পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
Facebook
Threads
LinkedIn
Telegram
X
Reddit
Email
WhatsApp