কাশ্মীর এক বিতর্কিত উত্তরাধিকার:১৮৪৬-১৯৯০

অ্যালাস্তেইর ল্যাম্ব (Alastair Lamb) একজন কূটনীতিক ইতিহাসবিদ (Diplomatic Historian)। তিনি ১৯৩০ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি বিভিন্ন সময় University of Malay, Australian National University ও University of Ghana-য় গবেষণা ও শিক্ষকতার সাথে যুক্ত ছিলেন। ভারত-চীন ও ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত বিরোধ বিষয়ক তাঁর বেশ কিছু বই রয়েছে যার একটি হচ্ছে KASHMIR A Disputed Legacy 1846-1990। বইটিতে দুইটি খন্ডে (প্রথম খন্ড: Origins 1846 to 1947 এবং দ্বিতীয় খন্ড: Conflicts 1947-1990) কাশ্মীর-এর মূলকথা ও সমস্যার উৎপত্তি এবং পরবর্তীতে এ নিয়ে যুদ্ধ ও সংঘর্ষের বিশদ আলোচনা করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ঐতিহাসিক ও কূটনীতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ রয়েছে যা কাশ্মীর নিয়ে আগ্রহী পাঠকদের জন্য উপকারী হতে পারে। এখানে এ বইটির বাংলা অনুবাদ প্রকাশের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বর্তমান প্রকাশনায় প্রথম খন্ডের সূচনা প্রকাশ করা হলো যা ধারাবাহিক ভাবে পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে চলবে।


প্রাককথন

১৯৪৭ সালে বৃটিশ কর্তৃক ভারতীয় সাম্রাজ্য ত্যাগের সময় একটি একীভূত রাষ্ট্রব্যবস্থার অপরিহার্যতা সংরক্ষণে উত্তরসূরী দু’টি রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তান এর সহযোগিতার বিষয়টি বহুল আকাঙ্ক্ষিত ছিলো এবং সে সময়ের প্রেক্ষিতে এ আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন ছিলো আপাতদৃষ্টিতে উপমহাদেশে বৃটিশদের সবচেয়ে বড় অর্জন। কেননা দু’টি নতুন শাসনব্যবস্থার নেতৃস্থানীয়রা একই রকম ঐতিহ্য নিয়ে বেড়ে উঠেছেন। তাঁরা সামরিক বাহিনী ও প্রশাসনে একত্রে কাজ করেছেন এবং বৃটিশ রাজনৈতিক, বিচারিক প্রশাসন, নৈতিক ও শিক্ষাগত ধারণার একটি সাধারণ দায়ভাগ তাঁরা বহন করতেন। এ সব কিছু নিয়ে একজন একক গভর্নর জেনারেল ও একজন একক সেনাপতির অধীনে শাসনব্যবস্থা ন্যস্ত হবে এমন ভাবনা ১৯৪৭ এর গ্রীষ্মে অনেক পর্যবেক্ষকেরই ছিলো। এক্ষেত্রে পাকিস্তান সৃষ্টির পরিকল্পনা হয়তো ঐক্যের অপরিহার্যতা বিনষ্ট না করেই মুসলিম উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণ করেছে। অন্য কথায়, গ্রেট ব্রিটেন থেকে ভারত ও পাকিস্তানের কাছে ক্ষমতার পট পরিবর্তনের সর্বশেষ ফল হতে পারতো কোন এক জোটের আবির্ভাব। বিংশ শতকের শুরু থেকে যারা ভারতের স্বাধীনতার বিষয়টির সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত, বিশেষ করে সেসব বৃটিশ আইনপ্রণেতাগণ যারা ১৯৩৫ ভারত সরকার আইনের জোট বিষয়ক ধারার পরিকল্পনা করেছিলেন তাদের আকাঙ্ক্ষিত আনুষ্ঠানিক বিভাজনের তুলনায় নতুন জোটের আবির্ভাব অনেকটা অনানুষ্ঠানিকভাবেই হতে পারতো।

    কিন্তু বাস্তবতা ছিলো সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভারত ও পাকিস্তান তাদের জন্মের শুরুর সময় থেকেই পরষ্পর থেকে দূরে সরে যাচ্ছিলো এবং তাদের আভ্যন্তরীন ও আন্তর্জাতিক নীতিমালা ক্রমেই পরষ্পর থেকে বিপরীতমুখী হয়ে বিকশিত হচ্ছিলো। এর পেছনে সম্ভবতঃ এবং বস্তুতঃ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কারণটি নিঃসন্দেহে খুঁজে পাওয়া যায় তা হচ্ছে জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের উপর অধিকার বিষয়ক বিতর্ক।

    ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে বৃটিশদের প্রস্থানের পরবর্তী চার দশকে ১৯৪৭-৪৮ ও ১৯৬৫ সালে ভারত ও পাকিস্তান এই এলাকা অধিকারের প্রশ্নে দুইবার যুদ্ধে লিপ্ত হয়; এবং ১৯৭১ এর সঙ্কটময় মুহূর্তের সময় অর্থাৎ বাংলাদেশের জন্মের সময়ে দু’দেশের সৈন্যরা পুনরায় কাশ্মীরের মাটিতে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এ বই লেখার সময়েও (১৯৯১) কাশ্মীর বিষয়ে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে চতুর্থ যুদ্ধের সমূহ সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। বাস্তবক্ষেত্রে কাশ্মীরকে বাদ দিলেও খুব সম্ভবতঃ ভারত-পাকিস্থানের অদৃষ্টই হচ্ছে পরষ্পর থেকে বিচ্যুত হওয়া; আর কাশ্মীর এ প্রক্রিয়াকে আরো ত্বরান্বিত করেছে এবং চরম অনাকাঙ্ক্ষিত সহিংসতার জন্ম দিয়েছে। যৌক্তিকভাবেই বৈদেশিক নীতি প্রণয়নে ভারত-পাকিস্তান উভয়ের জন্যই কাশ্মীর প্রভাব বিস্তারকারী ভূমিকা পালন করে থাকে; এবং সন্দেহাতীতভাবে দুই জাতির (১৯৭১ সালে যুক্ত হওয়া তৃতীয় শক্তি বাংলাদেশ) আভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রে কাশ্মীর প্রভাব বিস্তার করে থাকে।

    মূলতঃ কাশ্মীর বিতর্কের প্রকৃতি খুবই সহজ যদিও এর বিস্তারিত জটিলতা প্রকৃতপক্ষে ভয়ঙ্কর। একজন হিন্দু মহারাজার অধীনে প্রধানত মুসলিম জনগোষ্ঠীর ভারতীয় রাজকীয় রাজ্য জম্মু ও কাশ্মীর ভৌগলিক ভাবে এমনভাবে অবস্থিত যে ১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে বৃটিশদের প্রস্থানের সময় এটি ভারত বা পাকিস্তান যে কোন দেশের সাথে যুক্ত হতে পারতো। ভারতীয় রাজ্যকে মুসলিম ও অমুসলিম অংশে বিভক্ত করার যুক্তিতে কাশ্মীরের পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হওয়াই উচিত ছিলো। এক্ষেত্রে মহারাজা ভারতের সাথে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। মহারাজার এই সিদ্ধান্তের পেছনে ভারতীয় অস্ত্রের শক্তির সমর্থন ছিলো যার বিরুদ্ধে পাকিস্তান অস্ত্রের শক্তির চ্যালেঞ্জও ছিলো দুর্বল। ১৯৪৭ সালে ভারতীয় রাজ্য থেকে বৃটিশদের প্রস্থানের পেছনে এমনই অবস্থা তৈরি হয়েছিলো। তবে এটা সন্দেহাতীত ভাবে বলা যায় যে, সে সময় যদি বৃটিশদের নীতি ও বাস্তবায়নের কার্যধারা ভিন্ন হতো তাহলে হয়তো কাশ্মীর সমস্যার উদ্ভবই হতো না; অন্ততঃ এ রকম চরম বিদ্বেষপূর্ণ হতো না।  

    বিগত দশকগুলোতে কাশ্মীর বিতর্কের ধরন বিভিন্নভাবে বিকশিত হয়েছে এবং যেন মৌলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো এমন নতুন নতুন দ্বিধা-দ্বন্দের জন্ম দিয়েছে যা ১৯৪৭ সালে একদমই ছিলো না। বর্তমানে সমস্যার এমন সঙ্কটপূর্ণ অবস্থা তৈরি হবে তা জন্মকালে পরিস্থিতি থেকে উপলব্ধিই করা যায়নি। ১৯৪৭ সালের মূল বিষয়াদির সমাধান ব্যতীত কাশ্মীর বিতর্ক ভারত ও পাকিস্তানের রাজনীতিতে মারাত্মক ক্ষতি বয়ে নিয়ে আসার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। আমরা এখানে হয়তো তাত্ত্বিক সমাধানের বিপরীতে গিয়ে কোন বাস্তব সমাধানে পৌঁছাতে পারবো না, তবে মৌলিক বিষয়গুলোর প্রকৃতি এবং বিভক্তি চুক্তিপত্রের চাপসমূহ হয়তো বুঝতে পারবো; এবং সময়ের সাথে সাথে কীভাবে তা আরো পরিবর্তিত, ঘোলাটে ও বিচ্যুত হয়েছে সে সম্পর্কেও ধারণা পাবো। বিষয়টি মূলে ছিলো ১৯৪৭ এর অক্টোবরে জম্মু ও কাশ্মীরের মহারাজা কর্তৃক ভারতের সাথে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তার পর থেকে পরবর্তী ঘটনা প্রবাহিত হয়ে আসছে যার ফলাফল এখনো আমরা দেখতে পাচ্ছি।

    বইটির প্রথম অংশে কাশ্মীর সমস্যার মূল বিষয়গুলো যাচাই করার প্রয়াস নেয়া হয়েছে – কী করে জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্য প্রথম স্থানে উঠে এলো, বৃটিশ নীতিমালায় এটি কীভাবে ভূমিকা রাখলো এবং আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিকাশের প্রক্রিয়াসমূহ; যেটা পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালে প্রজ্জ্বলিত বিতর্কের একটি মূল উপাদান হিসেবে আবির্ভূত হয়। বইটির দ্বিতীয় অংশে বিতর্কের ফলাফল বিশ্লেষণ করা হয়েছে এবং ১৯৯০ সালে ভয়াবহতার শীর্ষবিন্দুতে (যদিও এটাই কাশ্মীর সঙ্কটের শেষ পর্যায় নয়) পৌঁছানো পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ের ঘটনার সাথে সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে।

(এখানে বইটির দুইটি খন্ডের প্রথম খন্ড ধারাবাহিকভাবে কয়েকটি অধ্যায়ে প্রকাশ করা হবে। বর্তমান পর্যায়ে ‘প্রাককথন’ শিরোনামে প্রথম খন্ডের ভূমিকাটুকু প্রকাশ করা হলো। পরবর্তীতে ধারাবাহিকভাবে অন্যান্য অধ্যায় প্রকাশিত হবে।)

১.     জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্য বলতে সাধারণতঃ শুধুমাত্র কাশ্মীরকে বোঝানো হয়ে থাকে। প্রকৃতপক্ষে, কাশ্মীর হচ্ছে শুধুমাত্র কাশ্মীর উপত্যকা, অন্যান্য রাজ্য যেমন, জম্মু, লাদাখ ও বারতিস্তান এর কোন অংশ নয়। বইটিতে কাশ্মীর বলতে শুধু মাত্র কাশ্মীর উপত্যকাকে এবং জম্মু ও কাশ্মীর বলতে সম্পূর্ণ রাজ্যকে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু পারিভাষিক শব্দাবলী ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিষয়টিতে সব সময় কঠোর অবস্থানে থাকা সম্ভব হয়নি।
কমেন্ট করুন
ব্যবস্থাপক |

সদস‍্য, সম্পাদনা পর্ষদ, প‍্যাপাইরাস

প্রাক্তন শিক্ষার্থী

পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সেশন:১৯৯৯-২০০০

রোকনুজ্জামান

সদস‍্য, সম্পাদনা পর্ষদ, প‍্যাপাইরাস প্রাক্তন শিক্ষার্থী পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেশন:১৯৯৯-২০০০

0