সম্পাদকীয় এপ্রিল ২০১৯

অস্ট্রিয়ান পদার্থবিজ্ঞানী শ্রোডিংগার ১৯৩৫ সালে কোয়ান্টাম মেকানিক্স ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একটি কাল্পনিক পরীক্ষা ব্যবহার করেন, যা শ্রোডিংগারের বিড়াল (Schrodinger’s Cat) নামে পরিচিত। মনে করুন, একটি বন্ধ বাক্সে একটি বিড়াল আছে, যার জীবন কিছু তেজস্ক্রিয় পরমানুর উপর নির্ভরশীল। একক সময়ে একটি পরমানুর ক্ষয় হলে (যার সম্ভাবনা ৫০%) বিড়ালের মৃত্যু হবে। কোন পরমানুর ক্ষয় না হলে (সম্ভাবনা ৫০%) বিড়ালটি বেঁচে থাকবে। আসুন, বাক্সটি না খুলে বোঝার চেষ্টা করি বিড়ালের ভাগ্যে কী ঘটলো। 

পদার্থবিজ্ঞানী বোর ও তার সহকারী হাইজেনবার্গ ১৯২৫ সাল থেকে ১৯২৭ সাল সময়কালে কোপেনহেগেনে কর্মরত অবস্থায় কোয়ান্টাম মেকানিক্স যেভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, তা কোপেনহেগেন ব্যাখ্যা (Copenhagen Interpretation) নামে পরিচিত। শ্রোডিংগারের বিড়াল পরীক্ষায় কোপেনহেগেন ব্যাখ্যা প্রয়োগ করলে বলতে হয়, বিড়ালটি সুপারপজিশনে (superposition) আছে – একই সাথে জীবিত ও মৃত – যতক্ষণ পর্যন্ত বাক্সটি বন্ধ আছে। বাক্সটি খুলে পর্যবেক্ষণ করা হলে সুপারপজিশন ভেঙ্গে পড়বে এবং একটি দৈব ফলাফল আমরা দেখতে পাবো। 

এভারিট ১৯৫৭ সালে নতুনভাবে কোয়ান্টাম মেকানিক্স ব্যাখ্যা করেছেন। একে বলা হয় বহু-জগত ব্যাখ্যা (Many-Worlds Interpretation)। এই ব্যাখ্যা অনুসারে, পরমানুর ক্ষয় হওয়া আর না হওয়ার উপর ভিত্তি করে একটি জগত ভেঙ্গে দু’টি জগত তৈরি হবে – একটিতে বিড়ালটি মারা যাবে এবং অন্যটিতে বেঁচে থাকবে। বাক্সটি খোলা হলেও দু’টি জগত বহাল থাকবে। একটি জগতে পর্যবেক্ষক বিড়ালকে জীবিত দেখবেন এবং অন্য জগতে তিনি বিড়ালকে মৃত দেখবেন। তবে, জগত দু’টি পরষ্পর বিচ্ছিন্ন এবং তাদের মধ্যে যোগাযোগ অসম্ভব। 

যতই পাগলের প্রলাপ মনে হোক, পদার্থবিজ্ঞনীদের মধ্যে বহু-জগত ব্যাখ্যায় বিশ্বাসীদের সংখ্যাই বেশী! 

এম.আই.টি.র অধ্যাপক টেগমার্ক ১৯৯৮ সালে শ্রোডিংগারের বিড়াল পরীক্ষায় কিছুটা পরিবর্তন এনেছেন, যা কোয়ান্টাম সুইসাইড (Quantum Suicide) নামে পরিচিত। এই পরীক্ষায় বিড়াল ব্যবহার না করে পর্যবেক্ষক নিজেই বাক্সের মধ্যে থাকবেন, যাতে তিনি কোপেনহেগেন ব্যাখ্যা আর বহু-জগত ব্যাখ্যার পার্থক্য বুঝতে পারেন। কোপেনহেগেন ব্যাখ্যা সত্যি হলে এক পর্যায়ে পর্যবেক্ষক মারা যাবেন। কিন্তু, বহু-জগত ব্যাখ্যা সত্যি হলে প্রতিটি ধাপে (প্রতি একক সময়ে) পূর্বের প্রতিটি জগত থেকে দু’টি জগত তৈরি হবে। সৃষ্ট জগতগুলির একটিতে পর্যবেক্ষক বেঁচে থাকবেন। যে জগতে পর্যবেক্ষক মারা গেছেন, তা থেকে সৃৃষ্ট পরবর্তী সব জগতে তিনি মৃতই থাকবেন। অনেক ধাপ পরে বেঁচে থাকার তাত্ত্বিক সম্ভাবনা প্রায় শূন্য হলেও পর্যবেক্ষক অসংখ্য জগতের একটিতে বেঁচে থাকবেন। একে বলা হয় Quantum Immortality (কোয়ান্টাম অমরত্ব)। 

বর্ষা সংখ্যা ২০১৫ প্রকাশের পর প্যাপাইরাস পত্রিকা আত্মহত্যা করেছিল। পত্রিকার সাথে সংশ্লিষ্টরা, মানে আমরা, অনেক হতাশার মাঝে পত্রিকাটি বন্ধ করে দিয়েছিলাম। প্রয়োজনীয় সংখ্যক লেখা পাওয়া যাচ্ছিল না, কাজ করার লোক পাওয়া যাচ্ছিল না – আত্মহত্যা ছাড়া প্যাপাইরাসের পথ ছিল না। 

কিন্তু, পুরানো সেই জগতে প্যাপাইরাসের মৃত্যু হলেও, নতুন প্রজন্মের মাঝে নতুন আঙ্গিকে প্যাপাইরাসকে বেঁচে থাকতে দেখা যাচ্ছে! বহু-জগত ব্যাখ্যা বিশ্বাস না করে উপায় আছে? 

প্যাপাইরাস পত্রিকার কোয়ান্টাম অমরত্ব আজ প্রতিষ্ঠিত। নির্দ্বিধায় বলা যায়, শত বর্ষ পরেও অন্য রকম এক জগতে অন্য এক রূপে প্যাপাইরাস বেঁচে থাকবে। 

কমেন্ট করুন

প্রাক্তন শিক্ষার্থী

পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সেশনঃ ১৯৮৩ - ৮৪

জাফর আহমেদ খান

প্রাক্তন শিক্ষার্থীপরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সেশনঃ ১৯৮৩ - ৮৪